ঐতিহাসিক ১১ নবেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবসানের শতবর্ষে প্যারিসে বিশ্ব নেতারা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবসানের শতবর্ষে প্যারিসে বিশ্ব নেতারা

১৯১৮ সালের ১১ নবেম্বর এক চুক্তির মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ‘আরমিসটিস’ (সংঘাতের অবসান) নামে পরিচিত ওই চুক্তি। গতকাল শতবর্ষ পূর্ণ করল শান্তি প্রতিষ্ঠার সেই ঐতিহাসিক দিনটি। দেশে দেশে নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হয়েছে।  আর দিবসটি উপলক্ষে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জড়ো হন বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশের নেতারা। এর মধ্যে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলসহ বহু রাজরানী, রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান। অনুষ্ঠানের পর তারা সবাই এলিজে প্রাসাদে ম্যাক্রোঁর সঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নেবেন। শতবর্ষ আগে ফ্রান্সের স্থানীয় সময়  বেলা ১১টায় ইউরোপের পশ্চিম রণাঙ্গনের কামানগুলো নীরব হয়ে গিয়েছিল। প্যারিসের উত্তরে কমপিয়েনে বনে ফ্রান্স ও জার্মানির প্রতিনিধিরা যুদ্ধবিরতিতে স্বাক্ষর করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিলেন। শনিবার ওই একই জায়গায় এক অনুষ্ঠানে ম্যাক্রোঁ ও মের্কেল পরস্পরের হাত ধরে আবেগের এক বিরল প্রদর্শনী দেখিয়েছেন যা এর আগে দুটি বিশ্ব শক্তির নেতাদের মধ্যে আগে দেখা যায়নি। চার বছর ধরে চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এক কোটি সৈন্য ও লাখ লাখ বেসামরিকের জীবন কেড়ে নিয়েছিল।  ১০০ বছর পরে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ প্যারিসের আক দ্য ত্রিয়ুফের নিচে দাঁড়িয়ে ওই সৈন্য ও তাদের পরিবারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভাষণ দেন। ১৮০৬ সালে সম্রাট নেপোলিয়নের তৈরি এই স্মৃতিস্তম্ভটিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত অজ্ঞাত এক সৈন্যকে কবর দেওয়া হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে রক্তাক্ত লড়াই ছিল। এই যুদ্ধ ইউরোপের রাজনীতি ও মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলেও তা মাত্র দুই দশক টিকেছিল, এরপর নািস জার্মানির উত্থান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেছিল। এদিকে যুক্তরাজ্য বরাবরই বিশেষ মর্যাদায় আরমিসটিস ডে পালন করে। চলতি বছরের শুরু থেকেই নানা আনুষ্ঠানিকতা পালন করছে ব্রিটিশরা। ইউরোপ প্রান্তে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় লড়াই ‘ব্যাটল অব সোম’। সেখানে ৭২ হাজার ৩৯৬ জন ব্রিটিশ-কমনওয়েলথ সেনা নিহত হন। তাঁদের মরদেহের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। সেই সেনাদের এবার অন্য রকমভাবে স্মরণ করছে যুক্তরাজ্য। শনিবার লন্ডনের রয়্যাল আলবার্ট হলে অনুষ্ঠিত হয় কনসার্ট। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথসহ রাজপরিবারের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে এতে অংশ নেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতবর্ষের অন্তত ১৫ লাখ সৈন্য ব্রিটিশদের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। এঁদের মধ্যে চার লাখের অধিক ছিলেন মুসলিম। বিবিসি এএফপি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কী ঘটেছিল?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ১০০ বছর হয়ে গেছে। আজকের এই দিনে ১১ নভেম্বরেই শেষ হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। চার বছর ধরে চলা যুদ্ধে প্রায় ২ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল। এদিনেই গোলা ছোড়া বন্ধ করেছিল ইউরোপের কামান। ১৯১৪ থেকে শুরু হয়ে ১৯১৮ সালে শেষ হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

আর এ দিনকে স্মরণ করতে বিশ্বের প্রায় নেতাই উপস্থিত হয়েছেন‘আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফ’ স্মৃতিসৌধের নিচে। প্রথমে এসে দাঁড়ান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল। সকাল ১১টা, সারি দিয়ে দাঁড়ালেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান ও ইজরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু। এ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভারতীয় উপরাষ্ট্রপতি বেঙ্কাইয়া নায়ডুও। এদের সবার শেষে এলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শতাব্দি পেরিয়ে গেলেও বিশেষ মুহূর্ত ধরে রাখতেই সবাই এক ছাতার নিচে।

প্রায় ৭০ জন রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতিতে প্যারিসই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ল। এছাড়া বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ শহীদদের স্মরণে দু’মিনিট নীরবতা পালন ছাড়াও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ এদিনটি পালন করেছে।

‘আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফ’ ছিল ‘বিজয়স্তম্ভ’, এখন ‘স্মৃতিসৌধ’। নিজের ‘গ্র্যান্ড আর্মি’র জন্য ১৮০৬ এই স্তম্ভটি তৈরি করেছিলেন নেপোলিয়ন। পরে এখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত এক অজ্ঞাতপরিচয় সৈনিকের দেহ সমাহিত করা হয়। আজ সেখান থেকেই মাইক হাতে মাকর ‘নয়া যুদ্ধের’ ডাক দিলেন। যুদ্ধটা শান্তি চেয়ে।

বললেন, ‘আসুন, পরস্পরকে ভয় না পেয়ে, বিশ্বাসের একটা যৌথ ভিত্তি গড়ে তুলি।’ দেশাত্মবোধকে, জাতীয়তাবাদের ঠিক উল্টোটা বলে ব্যাখ্যা করলেন তিনি।

কূটনীতিকদের একাংশের দাবি, এটা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকেই কটাক্ষ করে। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদিও তাতে বিশেষ আমল দেননি। বরং এই মুহূর্তে ‘জোটবদ্ধ এবং নতুন ইউরোপ’ চাই বলে আর্জি পেশ করলেন ট্রাম্প।

রোববার প্যারিসের অনুষ্ঠানে না-থাকলেও শান্তির পক্ষে বার্তা দিয়েছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। তিনি টুইট করেন, ‘ভারত সরাসরি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে না-জড়ালেও, অন্যের হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের বাহিনী লড়াই করেছে। দিনটা স্মরণীয়।’

সভাস্থলের দিকে ট্রাম্পের কনভয় যখন ঢুকছে হঠাৎ দেখা গেল, উর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত করে দুই মহিলা নেমে পড়েছেন মাঝরাস্তায়। তাদের পিঠে লেখা, ‘স্বাগত যুদ্ধাপরাধীরা’। আর বুকে কালো কালিতে— ‘ভুয়ো শান্তিপ্রতিষ্ঠাতা’। তারা ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে এমনটি করেছেন। এতে বোঝা যায় আমেরিকার এখনও বিশ্বের কাছে যুদ্ধবাজ। পরে পুলিশ তাদের আটকায়।

কিন্তু পরে প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায় উড়তে দেখা গেল ‘ট্রাম্প-বেলুন’। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরোধিতায় নামল ৫০টিরও বেশি সংগঠন।

এ দিন ‘আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফ’-এ বেশির ভাগ রাষ্ট্রনেতারা একসঙ্গে এলেও, ট্রাম্প আসেন আলাদা। হোয়াইট হাউস জানায় প্রোটোকল। একা এলেন পুতিনও। সূত্র: আনন্দবাজার

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!