২০দলীয় ঐক্যজোটের রাজনীতি : গণআকাঙ্খা ও সুযোগ – প্রেক্ষিত সিলেট সিটি মেয়র পদে নির্বাচন :সিরাজুল ইসলাম শাহীন

গণআকাঙ্খা মূল্যায়ন করা এবং প্রাপ্ত সুযোগ যথাসময়ে সঠিকভাবে কাজে লাগানো রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ । বাংলাদেশের আপাময় জনগণ (মুষ্টিমেয় স্বার্থান্ধ ও ইসলাম বিদ্বেষী ছাড়া ) হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের কবল থেকে মুক্তি চায়। এজন্যে বিরোধী দলীয় কার্যকর শক্তি হিসেবে বিএনপি -জামায়াত ইস্পাত-কঠিন ঐক্য এখন গণআকাঙ্খায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ পথ পরিক্রমা মাড়িয়ে আসা এ দুটি দলের জোট রাজনীতি বর্তমানে রয়েছে নাজুক অবস্থায়। এমতাবস্থায় সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়ন একটি সুবর্ন সুযোগ । সঠিক সিদ্বান্ত জোটের ঐক্যের বন্ধন করবে দৃঢ় আর জনগনের মনে জাগাবে আশার আলো। অন্যথায় ব্যার্থতার দীর্ঘমেয়াদী দায়ভার নিতে হবে যা মোটেই কাম্য নয়। সংগত:কারণেই বল এখন বিএনপি-র কোর্টে – ছাড় দিতে হবে – সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিএনপি হাইকমান্ডকেই।
কারন :———-

১) জামায়াত প্রার্থীর অনন্য ইমেজ : – জামায়াত মনোনীত মেয়র প্রার্থী এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং জামায়াতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য হিসেবে দেশ-বিদেশে বহুল পরিচিত জাতীয় নেতা। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মূল শক্তি সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের প্রধান দুই কারিগরের একমাত্র জীবিত আইকন। অপরজন তৎকালিন ছাত্রদল সভাপতি সাবেক এম পি শেখ হাসিনার নৃশংসতার শিকার প্রয়াত নাসিরুদ্দিন পিনটু । মরহুম হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী – সামাদ আজাদ -সাইফুর রহমান হারিয়ে সিলেটবাসী যাদের নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখে তাদের অন্যতম – ক্লিন ইমেজের অধিকারী জোবায়ের। এমন একজন প্রাথীকে ২০দলীয় জোটের মনোনয়ন দিতে কালক্ষেপন শোভনীয় নয় ।

২) জামায়াতের হিস্যার ন্যায্যতা : ১২টি সিটি মেয়র পদের মধ্যে এবার মাত্র ১টিতে জামায়াত প্রার্থিতা দাবী করছে। গতবার সবগুলো ছেড়ে দিয়েছে। অর্থাৎ জামায়াতের দাবীর অনুপাত হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে ২৩ : ০১ । ২৩টি মেয়র পদে শ্রম ও ভোট বিএনপি কে দিয়ে মাত্র ১টি চাওয়ার ন্যায্যতা অনস্বীকার্য। এটুকু ছাড় দিতে না পারলে স্বভাবতঃই প্রশ্ন উঠবে তাহলে কি বিএনপি এখনও জোট রাজনীতির মানসিকতা রপ্ত করতে পারেনি ? এমনকি আওয়ামীলীগ থেকে হলেও শিখেনি। চট্রগ্রামের ডাকসাইটে প্রবীন নেতা নুরুল ইসলাম বিএসসি কে বসিয়ে রেখে তারা জনগনের সাথে সম্পর্কহীন বাম নেতাকে পর পর ২বার নগরীর হার্ট থেকে এমপি বানিয়ে সংসদের সামনের আসনে বসিয়ে সম্মান দিচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে মেম্বার হওয়ারও নয় এমন একজনকে পুরো টার্ম পূর্ণ – মন্ত্রীত্ব দিয়েছিল। আর জামায়াতের এ দাবী কারো করুনায় নয় বরং সরকারী স্ট্রীমরোলারে নেতা কর্মীদের জীবন-রক্ত আর রাজপথের সাহসী ভূমিকার উপর প্রতিষ্টিত। এই বাস্তবতা অস্বীকার করা গণআকাঙ্খা গলা টিপে হত্যার শামিল।

৩)রানিং মেয়রের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন : বিএনপি প্রার্থী রানিং মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজ দলীয় বলয়ে সবসময়েই বিতর্কিত। কিন্তু মরহুম সাইফুর রহমান সাহেবের হাত দিয়ে সিলেটের ঐতিহাসিক উন্নয়নে তার ভূমিকার মূল্যায়ন সিলেটবাসী দিয়েছেন। একবার নির্বাচিত মেয়র হয়েছেন। এমন কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তিনি নন যে তাকে বার বার মেয়র হতে হবে। গত নির্বাচনে বিএনপির একটি অংশ প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে আলোচিত বিএনপি নেতা জামানের সাথে কাজ করেছেন। অপর একটি বড় অংশ নিষ্ক্রিয় থেকেছেন। অবশিষ্ট্যাংশ সহ মূলতঃ জামাত-শিবিরের নিবেদিত প্রাণ জনশক্তি নিয়ে তিনি গতবার বৈতরণী পার হয়েছেন। জামাত প্রার্থী জোবায়ের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে তার জন্য ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। এবার জোবায়েরের জন্য তার সরে দাঁড়ানো ছিল ন্যূনতম সৌজন্যতা। অপর দিকে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক – সিলেট বিএনপির অন্যতম স্তম্ভ বদরুজ্জামান সেলিম ইতিমধ্যেই দলীয় সিদ্বান্ত প্রত্যাখ্যান করে তার বিরুদ্বে নির্বাচনে নেমে পড়েছেন। শামসুজ্জামান জামান আনুষ্টানিকভাবে স্বীয় গ্রূপের নেতা কর্মী সহ নির্বাচন থেকে দূরে থাকার ঘোষণা দিয়ে মূলত তার বিরুদ্বেই অবস্থান নিয়েছেন। খুলনা ও গাজীপুরে দলীয় কারনে রানিং মেয়র বাদ দেয়া গেলে জোটের স্বার্থে সিলেটে রানিং মেয়র বাদ দেয়া যাবে না এমন চিন্তা নিশ্চয়ই অবান্তর।

৪) জোটগত দুঃখ বেদনা উপশমের সুযোগ : ৪দলীয় জোট থেকে আজকের ২০দলীয় জোটের যাত্রা পথে পানি অনেক গড়িয়েছে। তলানিতে জমা হয়েছে মান -অভিমান -দুঃখ – বেদনার স্তুপ। বিগত উপজেলা নির্বাচনে সিলেট বিভাগে ২জন রানিং ( দক্ষিণ সুরমা ও দোয়ারা )সহ ৫টি উপজেলা চেয়ারম্যান ( বড়লেখা , ছাতক ও বিয়ানীবাজার )এবং পৌর নির্বাচনে ২জন পৌর মেয়র ( কানাইঘাট ও বড়লেখা )জামায়াত হারিয়েছে প্রধানতঃ স্থানীয় বিএনপির বাড়াবাড়ি ধরনের বিরুধীতার কারনে। এমনকি সড়ক পরিবহন সেক্টরের কেন্দ্রীয় নেতা দক্ষিণ সুরমার জনপ্রিয় উপজেলা চেয়ারম্যান এবং জোট ঘোষিত প্রার্থী জামায়াত নেতা মাওলানা লোকমান আহমদকে পরাজিত করে জেলা ছাত্রলীগ সাবেক সভাপতিকে বিজয়ী করার মূল খলনায়ক দুইজন -সফি আহমদ চৌধুরীকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে নিয়ে এবং আলী আহমদকে জেলা সেক্রেটারি পদায়ন করা হয়। সরকার বিরোধী আন্দোলনের প্রথম রোডমার্চ শেষে সিলেট আলিয়া ময়দানের জনসভার স্টেজে তৎকালীন জেলা জোট আহবায়কের রহস্যজনক ভূমিকায় সৃষ্ট ক্ষোভ নিরসনে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সেদিন মঞ্চে থাকা বিএনপির অনেক কেন্দ্রীয় নেতা তার আচরণে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। খোদ বিএনপি মহাসচিব এর প্ৰত্যক্ষ স্বাক্ষী এবং তিনি বিষয়টি পরে দেখবেন বললেও আর কিছুই হয়নি।

দলের দুঃসময়ে ইতিহাসের নির্মম -জঘন্য নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিএনপিকে কাছে পাওয়াতো দূরের কথা ন্যূনতম মানবিকতাও মিলেনি।

এসবের ফিরিস্তি অনেক লম্বা। কিন্তু ক্ষত উপশম ছাড়া কাঙ্খিত ইস্পাত কঠিন ঐক্য অসম্ভব। এক্ষেত্রে জামায়াতের এই দাবি – সিলেট সিটি মেয়র পদে এহসানুল মাহবুব জোবায়েরের মনোনয়ন অনেকটা টনিকের কাজ করবে। তাই এটি একটি সুযোগ ও বটে। একমাত্র বিএনপি হাইকমান্ডই পারেন এটি কাজে লাগাতে । এতে জোটের শরিক দল সহ ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ের জন্য অপেক্ষমান মুক্তিকামী দেশবাসীর কাছে বিএনপির মর্যাদা বাড়বে বৈ কমবে না।

sirajulislamshaheen@yahoo.com ; 08/07/2018 ; 11.45pm.

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!