১৯৪৬ সালে জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দ সিলেটের পাকিস্তানে যোগদানের বিরুদ্ধে ভোট দেয়

সাহাদত হোসেন খান
১৯৪৬ সালের গণপরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ সিলেটে বিজয়ী হয়। কিন্ত নেহরু এ বিজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীর নেতৃত্বাধীন জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দ ছিল কংগ্রেসের পক্ষে। গোটা সিলেটে তার প্রচুর ভক্ত ও মুরীদ ছিল। তিনি সিলেটের নয়া সড়কে নামাজ পড়াতেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগের বিপক্ষে প্রতিটি আসনে প্রার্থী দেন। তবে একটি আসনেও তার প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেনি। মুসলিম লীগকে বিজয়ী হতে দেখে নেহরু বললেন, মুসলিম লীগকে বাহ্যত বিজয়ী মনে হলেও কংগ্রেস ও জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দের মনোনীত প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট বিজয়ী মুসলিম লীগ প্রার্থীদের চেয়ে বেশি। তাই সিলেটকে ভারতে যোগদান করতে দেয়া হোক। নেহরুর দাবির বিরোধিতা করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মাউন্টব্যাটেনের সুপারিশের ভিত্তিতে বললেন, তাহলে গণভোটের মাধ্যমে জনমত যাচাই করা হোক। তার প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ৭ জুলাই সিলেট জেলায় গণভোট হয়। তাতে পূর্ববঙ্গে যোগদানের পক্ষে ভোট পড়ে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ এবং বিপক্ষে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১ ভোট। ৫৫ হাজার ৫৭৮ টি ভোট বেশি পড়ায় সিলেট পূর্ববঙ্গে যোগদান করে। তারপরও পুরো সিলেট পূর্ব বাংলা পায়নি। সিলেটের করিমগঞ্জ মহকুমা ও কাছারকে কেটে রেখে দেয়া হয়।
বঙ্গদেশ বিভক্ত হলে মুসলিম লীগ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পূর্ব বাংলায় সরকার গঠন করে। খাজা নাজিমুদ্দিন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের নিরাপত্তা রক্ষায় সোহরাওয়ার্দী সেখানে অবস্থান করতে থাকেন। পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল তার। লর্ড মাউন্টব্যাটেন মনে করতেন যে, তিনি নিশ্চিত পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। কিন্তু তার পরিবর্তে মুখ্যমন্ত্রী পদে নিয়োগ পান খাজা নাজিমুদ্দিন। লিয়াকত আলী খানের আনুকূল্যে পূর্ববাংলার মুসলিম লীগ নেতা নির্বাচিত হওয়ায় নাজিমুদ্দিনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পথ সুগম হয়। সোহরাওয়ার্দী প্রথম মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হলে আরো সুষ্ঠুভাবে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সম্পদ ভাগাভাগি হতো। জিন্নাহ বাংলার মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে নয়া দেশের নাগরিক হিসাবে সেবা করার সুযোগ দানে ব্যর্থ হন। ১৯৪১ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে সোহরাওয়ার্দী কলকাতায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগের একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। এ সম্মেলন শেষে পাকিস্তানে ফিরে এলে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন তাকে ‘ভারতীয় চর’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন এবং তাকে ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ দেন। এমনকি তার নাগরিকত্ব খারিজ করার হুমকিও দেয়া হয়েছিল।
১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল নাগাদ পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ ক্ষমতায় ছিল। পাকিস্তানের ডোমিনিয়ন মর্যাদার অবসান ঘটার পর পূর্ব বাংলা শাসন করতেন একজন অনির্বাচিত গভর্নর। ১৯৫৫ সালে পূর্ব বাংলার নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান।
(লেখাটি ‘পলাশী থেকে একাত্তর’ বই থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স)

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!