১৮ এপ্রিল :বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিস্মৃত স্মরণীয় দিন 

 

১৮ এপ্রিল, বাংলাদেরশের ইতিহাসে একটি বিজয়ের দিন। ২০০১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ৩০ বছর পর বাংলাদেশ প্রথম বহিঃশত্রু দ্বারা প্রত্যক্ষ আক্রমণের শিকার হয় এবং সৈন্য সংখ্যা এবং অস্ত্র অনেক কম থাকার পরও পরিপূর্ণ বিজয়ী অর্জন করে। কিন্তু আমরা এতোই আত্মবিস্মৃত জাতি যে এই দিনটিকে মনে রাখারও প্রয়োজন মনে করিনি।

ঘটনার শুরু ২০০১ সালের এপ্রিল মাসে যখন তৎকালীন বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ.ল.ম ফজলুর রহমান জানতে পারেন যে ভারতীয় বিএসএফ নোম্যান্স ল্যান্ডের উপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করে বাংলাদেশের এলাকা পদুয়াকে কানেক্ট করছে আর পদুয়াতে অস্থায়ী বিএসএফ ক্যাম্প করেছে। বিডিআর এর পক্ষ থেকে বারবার প্রতিবাদ করার পরও ভারতীয় পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতা করা হলোনা এমনকি ফ্ল্যাগ মিটিং-এও রাজি হলো না। বাংলাদেশের সার্বভৌম এলাকার উপরে এই রকম আচরণে এপ্রিলের ১৫-১৬ তারিখ রাতে মেজর জেনারেল ফজলুর রহমানের নির্দেশে চার শ’র মতো ফোর্স পদুয়াতে মুভ করে আর পদুয়ায় ভারতীয় বিএসএফ ক্যাম্প ঘেরাও করে ফেলে।

বিএসএফের ওখানে প্রায় ৭০ জনের মতো সোলজার ছিল, ছয়টা মাত্র ফায়ার করার পরেই বিএসএফ সৈন্যরা সেখানে সারেন্ডার করে। বিডিআর পদুয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৬ তারিখে নেগসিয়েশন শুরু হলো ইন্ডিয়ার সংগে। কথা ছিল নেগোসিয়েশন চলাকালিন কোন পক্ষই সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে। এই নেগোসিয়েশন যখন ডাহুকীতে চলছিল- তখন ভারত বিশ্বাসঘাতকতা করে বাংলাদেশের অজান্তে ১৮ এপ্রিল ভোরের আলো ফোটার আগেই ওখান থেকে প্রায় দুশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার বরাইবাড়ী এলাকার বিডিআর ক্যাম্প ও ঐ এলাকাকে দখলে নেবার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিএসএফের সমন্বয়য়ে গঠিত প্রায় ৫০০ ফোর্স বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে আগ্রাসন চালায়।

৩০ বছরের মাথায় এটাই ছিল বহিঃশত্রু দ্বারা আমাদের দেশ প্রথম আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। সেখানে তখন বিডিআর এর মাত্র ১১ জন সদস্য ছিল। ভারতীয় সৈন্যদের আকস্মিক গুলিতে শহীদ হন বিডআর এর ল্যান্স নায়েক মোঃ ওহিদুজ্জামান। এতে ভয়ের পরিবর্তে আগুনের মতো জ্বলে ওঠেন বিডিআর এর বাকি ১০ জওয়ান। দুইটা মাত্র সাব মেশিন গান আর অন্য সাধারণ অস্ত্র নিয়ে দুই দিক থেকে ভারতের বিশাল বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। প্রথম প্রতিআক্রমণেই ভারতীয় বাহিনীর ১৭/১৮টা লাশ পড়ে যায়। ভারতীয় হানাদার বাহিনীকে ওখানেই আটকে রাখা হয়। এরই মধ্যে মেজর জেনারেল ফজলুর রহমানের নির্দেশে ময়মনসিংহ এবং নেত্রকোনা থেকে প্রায় চারশ’ ফোর্স সেখানে মুভ করে এবং দশটার দিকে ওখানে পৌঁছে যায়। ওপেন গ্রাউন্ডে ভারতীয় বাহিনীর সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ভারতীয় বাহিনী আগেই থমকে গিয়েছিল, বিডিআর এর পূর্ণ প্রতিআক্রমণে দিশাহারা হয়ে তারা পালাতে থাকে। বাংলাদেশের সীমানায় ফেলে যায় ১৮টা মৃতদেহ আর সাথে নিয়ে যায় আরো প্রায় ১৭৪ টি মৃতদেহ। আরো কিছু ভারতীয় সৈন্য দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যাওয়ার সময় আটক হয়। বাংলাদেশ পক্ষে তিনজন শাহাদত বরণ করেন। ভারতীয় বাহিনী পূর্ণ পরাজয় মেনে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়।

আজ সেই ১৮ই এপ্রিল। আমরা কেউ হয়তো স্মরণ করিনি আমাদের সেই বীরদের যারা দেশের জন্যে আল্লাহর নামে বুক টান করে দাঁড়িয়েছিল পাঁচগুণ বড় শত্রু বাহিনীর সামনে আর ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিজয়। কিন্তু ইতিহাস একদিন ঠিকই মূল্যায়ন করবে এই বীরদের….
নায়েব সুবেদার আবদুল্লাহ, হাবিলদার নজরুল ইসলাম, ল্যান্স নায়েক ফজলুল হক, ল্যান্স নায়েক ওয়াহিদুজ্জামান, সিপাহি মোয়াজ্জেম হোসেন, ইদ্রিস আলী, আবদুল হামিদ, লিটন মিয়া, বদরুজ্জামান, এফএসের নায়েক জালালউদ্দিন মিয়া ও সিপাহি ইছহাক আর তাদের যোগ্য নেতা মেজর জেনারেল ফজলুর রহমানকে। সালাম তোমাদের ১৬ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে। (সংগ্রহীত)

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!