১৫ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী পাকিস্তান বিরোধী ভুয়া সংবাদ, নেপথ্যে ভারত: বিবিসি

– ছবি : সংগৃহীত
ভারতের স্বার্থ হাসিলের জন্য গত ১৫ বছর ধরে বিশ্ব জুড়ে চালানো হচ্ছিল ভুয়া তথ্য প্রচারের এক অভিযান – আর তাতে ব্যবহৃত হয়েছিল এমন একজন অধ্যাপকের নাম – যিনি অনেক আগেই মারা গেছেন।

সম্প্রতি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের চালানো এক নতুন তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য।

এ ছাড়াও পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু প্রতিষ্ঠানকে, আরো কাজে লাগানো হচ্ছিল কমপক্ষে ৭৫০টি ভুয়া মিডিয়া প্রতিষ্ঠানকে।

যে মৃত অধ্যাপকের নাম এজন্য চুরি করা হয়েছিল – তিনি ২০০৬ সালে ৯২ বছর বয়সে মারা গেছেন। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।

“আমরা যতগুলো চক্রের মুখোশ উন্মোচন করেছি তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়” – বলছিলেন আলেক্সান্দ্রে আলাফিলিপে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ডিসইনফোল্যাবের নির্বাহী পরিচালক – যারা এই তদন্ত চালানোর পর বুধবার এক বিশদ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।

নেটওয়ার্কটির উদ্দেশ্য ছিল মূলত “পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করা”, এবং জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিল (ইউএনএইচআরসি) ও ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করা।

ইইউ ডিসইনফোল্যাব এই চক্রটির কথা আংশিকভাবে উদ্ঘাটন করে গত বছর। কিন্তু এখন তারা বলছে, প্রথম যেটা ভাবা হয়েছিল তার চাইতে এই কার্যক্রম অনেক বেশি ব্যাপক এবং জোরদার।

এমন কোন প্রমাণ নেই যে এ চক্রটি ভারতের সরকারের সাথে সম্পর্কিত।

তবে তারা ভুয়া কিছু মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের তৈরি কনটেন্ট ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলে ধরার ওপর খুবই নির্ভরশীল।

এতে সহায়ক হয় এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই) – ভারতের বৃহত্তম সংবাদ এজেন্সি, যাদের ওপর এ তদন্তের সময় বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে।

ব্রাসেলস ভিত্তিক ইইউ ডিসইনফোল্যাব গবেষকরা মনে করেন, এই নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভারতের প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রচারণামূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে দেয়া।

দুটি দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে কী প্রচার হচ্ছে তার নিয়ন্ত্রণ দখল করার জন্য বহুকাল ধরে চেষ্টা করে চলেছে।

গত বছর গবেষকরা উদ্ঘাটন করেন যে বিশ্বের মোট ৬৫টি দেশ জুড়ে কাজ করছে ২৬৫টি ভারত-সমর্থক ওয়েবসাইট । তারা দেখতে পান, এই সাইটগুলোর গোড়ায় আছে একটিই জায়গা – আর সেটি হলো দিল্লি-ভিত্তিক একটি ভারতীয় হোল্ডিং কোম্পানি, যার নাম শ্রীবাস্তব গ্রুপ বা এসজি।

‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকলস’ শিরোনামে প্রকাশিত বুধবারের রিপোর্টটিতে বলা হয়, এসজির কার্যক্রম ছড়িয়ে আছে কমপক্ষে ১১৬টি দেশে এবং তারা ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যবৃন্দ ও জাতিসঙ্ঘকে টার্গেট করেছিল।

গত বছরের রিপোর্টটি প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে যে ইইউ এবং জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তারা এসজি সম্পর্কে কতটুকু জানতেন, এবং এসব প্রয়াসের মোকাবিলা করতে তারা আরো বেশি কিছু করতে পারতেন কীনা।

“গুপ্তচর সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কথা সুনিশ্চিত নয়”
আলাফিলিপে বলেন, ভূয়া তথ্য ছড়ানোর জন্য বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে এ পর্যায়ের সমন্বয়ের নজির ইইউ ডিসইনফোল্যাবের গবেষকরা কখনো দেখেননি।

“গত ১৫ বছর ধরে – এবং গত বছর তাদের স্বরূপ প্রকাশ পেয়ে যাবার পরও – এই নেটওয়ার্কটি এত কার্যকরভাবে কাজ করে গেছে যে তাতে বোঝা যায় ইন্ডিয়ান ক্রনিকলসের তৎপরতা এবং একাগ্রতা কত উন্নত মানের ছিল” – বলেন তিনি।

“এরকম একটি কার্যক্রম পরিকল্পনা করা এবং চালিয়ে যাওয়া দু-চারটি কম্পিউটারের কাজ নয়, এজন্য তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু দরকার” – বলেন তিনি।

গবেষকরা সতর্ক করেন যে, অধিকতর তদন্তের আগে পর্যন্ত ইন্ডিয়ান ক্রনিকলসের সাথে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা বা এরকম কারো সংশ্লিষ্টতার কথা সুনিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।

ভুয়া তথ্য প্রচারের নেটওয়ার্কের ব্যাপারে একজন বিশেষজ্ঞ বেন নিম্মো বলেন, তিনি যা দেখেছেন তার মধ্যে এটি ‘সবচেয়ে বেশি একনিষ্ঠ ও জটিল’ কর্মকাণ্ড-চালানো নেটওয়ার্কগুলোর অন্যতম।

তবে তিনি এর পেছনে সক্রিয় থাকা কাউকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে চাননা।

নিম্মো একটি ডিজিটাল মনিটরিং প্রতিষ্ঠান গ্রাফিকার তদন্ত-বিষয়ক পরিচালক। তিনি এ প্রসঙ্গে ইন্টারনেটে এর আগে ব্যক্তিগতভাবে চালানো ব্যাপক মাত্রার ট্রলিং কার্যক্রমের উদাহরণ দেন।

“তারা বড় আকারে কাজ করছে – এর মানে এই নয় যে তারা কোন একটি রাষ্ট্র কর্তৃক সরাসরি পরিচালিত।”

এ ব্যাপারে মন্তব্যের জন্য ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করেছিল কিন্তু এ প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোন জবাব পায়নি।

ভূতুড়ে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া এনজিও
শ্রীবাস্তব গ্রুপের সাথে অন্তত ১০টি জাতিসঙ্ঘের অনুমোদনপ্রাপ্ত এনজিওসহ আরো বেশ কিছু এনজিও’র সরাসরি সম্পর্ক বের করা হয় এ তদন্তে। ভারতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানের সমালোচনা করার জন্য এই যোগাযোগকে ব্যবহার করা হতো। এটি ছিল এই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি ।

“জেনেভায় এই থিংক ট্যাংক ও এনজিওগুলোর দায়িত্ব ছিল লবিইং করা, বিভিন্ন বিক্ষোভের আয়োজন করা, সংবাদ সম্মেলন এবং জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কথা বলা। অনেক সময় জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদেরকে ওই সব অনুমোদিত সংগঠনের পক্ষ থেকে কথা বলতে দেয়া হতো” – বলা হয় ওই রিপোর্টে।

তদন্তটিতে দেখা যায়, এসজির এসব কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালের শেষ দিকে – বর্তমান আকারে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠিত হবার কয়েক মাস পরই।

একটি এনজিও বিশেষ করে গবেষকদের নজর কেড়েছে। এটি হচ্ছে ‘কমিশন টু স্টাডি দি অরগানাইজেশন অব পিস’ বা সিএসওপি।

এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩০এর দশকে। ১৯৭৫ সালে এটি জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন পায়, কিন্তু ১৯৭০এর দশকের শেষ দিকে এটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

সিএসওপির একজন সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক লুইস বি সন। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর একজন নেতৃস্থানীয় পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি ৩৯ বছর হার্ভার্ড ল’ ফ্যাকাল্টির সদস্য ছিলেন। অধ্যাপক সন মারা যান ২০০৬ সালে।

কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, তার পরের বছর অর্থাৎ ২০০৭ সালে ইউএনএইচআরসির একটি অধিবেশনে অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় আছেন লুইস সন নামে সিএসওপির একজন সাবেক চেয়ারম্যান। এর কয়েক বছর পর ২০১১ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে আরো একটি ইভেন্টের তালিকায় লুইস সনের নাম দেখা যায়।

তালিকা দুটিতে মৃত অধ্যাপকের নাম দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান গবেষকরা। গবেষকরা পরে তাদের এই তদন্তকে সেই অধ্যাপকের স্মৃতিতে উৎসর্গ করেন এবং লেখেন – তার নাম এই রিপোর্টে উক্ত খল চরিত্ররা আত্মসাৎ করেছে।

তারা বলেন, “২০০৫ সালে সিএসওপিকে পুনরুজ্জীবিত করে তার পরিচয়কে হাইজ্যাক করা হয়েছে। আমাদের প্রথম তদন্তে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে তারাই এটা করেছে।”

তদন্তে আরো বেরিয়ে এসেছে জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন পায়নি এমন এনজিওগুলোর ভারত-পন্থী শত শত কর্মকাণ্ডের কথা।

তাদেরকে ইউএনএইচআরসিতে বার বার বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়া হয়েছে , এবং তারা পাকিস্তানকে হেয় করার সেই একই এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

অন্য অনেক অনুষ্ঠানে দেখা গেছে, পাকিস্তান বা ভারতের সাথে যাদের ঘোষিত উদ্দেশ্যের দৃশ্যত কোন সম্পর্ক নেই এমন কিছু এনজিও বা অন্যান্য সংস্থাও ইউএনএইচআরসিতে পাকিস্তানকে আক্রমণ করে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে।

ইউএনএইচআরসির ৪০ তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের মার্চ মাসে। এতে দেখা যায়, ইউনাইটেড স্কুলস ইন্টারন্যাশনাল (ইউএসআই) নামে আরেকটি জাতিসঙ্ঘ-অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান – যার সাথে এসজি’র সরাসরি সম্পর্ক আছে – তারা কথা বলার সুযোগ পায়।

এতে বক্তব্য রাখেন ইওয়ানা বারাকোভা। তিনি এ্যামস্টার্ডাম ভিত্তিক থিংকট্যাংক ‘ইউরোপিয়ান ফাউন্ডেশন ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ'(এফসাস) এর একজন গবেষণা বিশ্লেষক।

বারাকোভা সেই অধিবেশনে “পাকিস্তানের চালানো নৃশংসতা” সম্পর্কে কথা বলেন। তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠান (এফসাস) ইউএসআইএর অংশীদার এবং “তিনি প্রতিষ্ঠানিক লজিস্টিকসের ব্যাপারে দায়ী নন।”

এফসাসের পরিচালকের সাথে যোগাযোগ করলেও কোন জবাব পায়নি। এই পরিচালক নিজেও ওই একই অধিবেশনে পাকিস্তানের সমালোচনা করার জন্য ইউএসআইএর প্রতিনিধিত্ব করেন ।

এসজি সংশ্লিষ্ট ভারত-সমর্থক কনটেন্ট নতুন আঙ্গিকে পরিবেশন করা এবং তার প্রচার বাড়ানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যতঃ প্রধান ভূমিকা পালন করে এ এনআই। এই প্রতিষ্ঠানটির জন্ম ১৯৭১ সালে এবং তারা নিজেদের বর্ণনা করে “দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃস্থানীয় মাল্টিমিডিয়া নিউজ এজেন্সি” বলে।

তাদের ভারত, দক্ষিণ এশিয়া এবং বাকি বিশ্বে ১০০টিরও বেশি ব্যুরো আছে। ভারতের সংবাদ মাধ্যম, বিশেষত সম্প্রচার মাধ্যম এএনআইয়ের কনটেন্ট ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে।

ইইউ ডিসইনফোল্যাব দেখেছে যে , অন্তত ১২টি ক্ষেত্রে এএনআই প্রধানতঃ পাকিস্তান-বিরোধী এবং কখনো কখনো চীন-বিরোধী নিবন্ধ পুনঃপ্রকাশ করেছে। এগুলো লিখেছেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যরা। এগুলো প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ইইউ ক্রনিকলে – যা এসজি-সংশ্লিষ্ট ফেক নিউজ বা ভুয়া খবরের ওয়েবসাইটগুলোর একটি।

ইইউ ক্রনিকল
ইইউ ক্রনিকলের জন্ম এ বছরের মে মাসে। এর আগে ‘ইপি টুডে’ নামে একটি সাইট ছিল – যাকে ভুয়াখবর সংক্রান্ত আগেকার রিপোর্টে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তার পরই এটিকে বন্ধ করে নতুন নামে চালু করা হয়।

ইইউ ডিসইনফোল্যাব রিপোর্টে বলা হচ্ছে, “এই অপারেশনের পেছনের লোকেরা অন্য প্রতিষ্ঠানের নাম হাইজ্যাক করতো, ইইউ অবজারভারের মত প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ার বেশ ধারণ করার চেষ্টা করতো। তারা ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের লেটারহেড ব্যবহার করেছে, ভুয়া ফোন নাম্বার দিয়ে ওয়েবসাইট নিবন্ধন করিয়েছে, জাতিসঙ্ঘে ভুয়া ঠিকানা দিয়েছে, তা ছাড়া তাদের মালিকানাধীন থিংক ট্যাংকের বই প্রকাশ করতে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও সৃষ্টি করেছে।”‘

“তারা বিভিন্ন স্তরে ভুয়া মিডিয়া ব্যবহার করেছে যারা একে অপরের কন্টেন্ট পুনঃপ্রকাশ করতো তা থেকে উদ্ধৃতি দিতো। যেসব রাজনীতিবিদ আন্তরিকভাবেই নারী বা সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করতে চাইতেন – তাদেরকে তারা চূড়ান্ত বিচারে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেছে। যখন তাদের উদ্দেশ্য মিলে যেতো – তখন তারা উগ্র-দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদদের কথা বলার জায়গা করে দিয়েছে।”

আলাফিলিপে বলেন, “প্রভাব বিস্তারের পুরো কার্যক্রমকে” বৈধতা দিতে এএনআই বার্তা সংস্থাটিকে ব্যবহার করা হচ্ছিল। তাদের কনটেন্টগুলোকে “ব্যাপক প্রচার এবং বিশ্বাসযোগ্যতা” দেবার জন্য “অন্য যে কোন মাধ্যমের চেয়ে তারা এএনআইয়ের ওপরই বেশি নির্ভর করতো।”

এএনআইয়ের সংবাদ রিপোর্টগুলো ভারতের বহু মূলধারার সংবাদ মাধ্যম ও প্রকাশনায় জায়গা পেয়েছে। গবেষকরা দেখেন যে তাদের কনটেন্টগুলো ৯৫টি দেশের অন্তত ৫০০টি ভুয়া সংবাদ ওযেবসাইটে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে।

ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় শ্রীবাস্তব গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্ষোভের আয়োজন করেছে, এবং সেগুলোর খবর পরিবেশন করেছে এএনআই এবং এসজি সংশ্লিষ্ট ভুয়া সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট।

ইইউ এবং জাতিসঙ্ঘের দিকে বিশেষ মনোযোগ
তদন্তে পাওয়া গেছে যে, ভুয়া তথ্য ছড়ানোর এই নেটওয়ার্কটি প্রভাব বিস্তারের জন্য দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছিল।

জেনেভায় লবিইং ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের দায়িত্বে ছিল থিংক ট্যাংক ও এনজিওগুলো। তারা নিবন্ধিত সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ইউএনএইচআরসি’র অধিবেশনগুলোতেও কথা বলতো।

অন্যদিকে ব্রাসেলসে তাদের লক্ষ্য ছিল ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যরা। এমইপিদের নিয়ে যাওয়া হতো বিভিন্ন দেশ সফরে এবং পরে তাদেরকে ইইউ ক্রনিকলের মতো ভুয়া মিডিয়ায় ‘এক্সক্লুসিভ ‘ নিবন্ধ লিখিয়ে নেয়া হতো। তার পর সেই সব সম্পাদকীয় নিবন্ধ বহু জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া হতো এএনআইকে ব্যবহার করে।

গবেষকরা দেখেছেন যে, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্যের নাম তদন্তের সময় বার বার উঠে এসেছে। তাদের একজন হলেন ফরাসী এমইপি থিয়েরি মারিয়ানি। তিনি ইইউ ক্রনিকলে দুটি নিবন্ধ লিখেছেন।

তা ছাড়া গত বছর ভারত-শাসিত কাশ্মীরে এক বিতর্কিত সফরেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

মারিয়ানি ফ্রান্সের উগ্রদক্ষিণপন্থী ন্যাশনাল ফ্রন্টের সদস্য। তিনি বলেন, “ইইউ ক্রনিকল সংবাদপত্রের পেছনে যদি ভারতীয় সরকার থেকে থাকে – সেটা আমার কোন সমস্যা নয়।”

“আমি তাতেই স্বাক্ষর করি যা আমি চাই এবং যা আমি মনে করি। এটাই আমার মত। (ক্ষমতাসীন) ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-তে আমার চেনাজানা অনেকে আছেন, এবং আমি নরেন্দ্র মোদির সরকারকে সমর্থন করি” – বলেন তিনি।

রিপোর্টটিতে আরো দু’জন এমইপির নাম আছে। এরা হলেন বুলগেরিয়ার এ্যঞ্জেল দিয়ামবাস্কি, এবং পোল্যান্ডের গ্রিগোরিস টোবিসোস্কি। তারা ইইউ ক্রনিকলে প্রকাশিত নিবন্ধগুলো লেখার কথা অস্বীকার করেন।

তাদের নামে প্রকাশিত ওই নিবন্ধগুলো পরে এএনআই পুনঃপ্রকাশ করেছে।

ভুয়া তথ্য প্রচারের নেটওয়ার্কগুলোর মোকাবিলা করতে ইইউ কী করছে – এ প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্র বিষয়ক ইইউ মুখপাত্র পিটার স্টানো গত বছর ইপি টুডের আসল পরিচয় উদ্ঘাটনে তাদের পদক্ষেপগুলোর কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “ভুয়া তথ্য এবং যারা তা প্রচার করে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা আমাদের অন্যতম একটি পন্থা। আমারা তাদের চিহ্নিত করা এবং ধরার কাজ চালিয়ে যাবো।”

তবে তিনি বলেন, ব্রাসেলসে নিবন্ধন করা এনজিওদের তহবিল এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নটির জবাব দেবার দায়িত্ব বেলজিয়ামের কর্তৃপক্ষের।

ইউএনএইচআরসি’র একজন মুখপাত্র রোলান্ডো গোমেজ বলেন, এনজিওরা কাকে কথা বলার সুযোগ দেবে বা কোন ইস্যু তারা উত্থাপন করবে – এটা তাদের ব্যাপার।

“এমন কোন আইন নেই যাতে বলা আছে যে এনজিওগুলোকে শুধু নির্দিষ্টভাবে অমুক বিষয়েই কথা বলতে হবে। সেটা করা হলে তা হবে তাদের বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ” – বলেন মি. গোমেজ।

‘এ কাজ ভারত করেছে বলেই প্রতিক্রিয়া হয়েছে মৃদু’
ইইউ ডিসইনফোল্যাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্যারি মাশাডো বলেন, ভুয়া তথ্য প্রচারের নেটওয়ার্ক বিষয়ে যেসব তথ্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে – তার মতে এ ব্যাপারে মৃদু প্রতিক্রিয়ার আংশিক কারণ হচ্ছে “এটার পেছনে স্পষ্টতঃ ভারতীয়দের হাত আছে।”

“আপনি কল্পনা করুন, এই একই কার্যক্রম যদি চীন বা রাশিয়া চালাতো, তাহলে সারা বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কী হতো? তাহলে একটা আন্তর্জাতিক ক্ষোভ সৃষ্টি হতো, যার পরিণামে শুরু হতো তদন্ত এমনকি নিষেধাজ্ঞা আরোপ পর্যন্ত হয়ে যেতো” -বলেন তিনি।

তবে ওই রিপোর্টে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট সদস্যদের (এমইপি) এসব কর্মকান্ড উঠে আসার পর তাদের সহকর্মীদের কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন।

গ্রীন পার্টির এমইপি ড্যানিয়েল ফ্রিউন্ড বলেছেন, এমইপিদের উচিত তাদের কমকান্ডের কথা স্পষ্ট করে সবাইকে জানানো।

“গত কয়েক বছরে অন্তত ২৪টি ক্ষেত্রে বিধি ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে। এর একটির ব্যাপারেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যখন সবচেয়ে গুরুতর পদক্ষেপ হচ্ছে ধরা পড়লে একটা বিবৃতি জমা দেয়া, তখন বিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রণোদনা তো কম থাকবেই” বলেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন এমইপি বলেন, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের যে সদস্যরা ইইউ ক্রনিকলের মতো সাইটে লেখেন – তাদেরকে ‘নির্বাচনী পর্যটক’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

“নিচের কাতারের এমইপিদের একটা দল আছে – যারা বিতৃষ্ণা উদ্রেককারী সরকারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় ভ্রমণ করাটাকে তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের চাইতে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে” বিবিসিকে বলেন এই এমইপি – “এসব লোকদের দিয়ে চমক সৃষ্টি করাটাকে কিভাবে কেউ সহায়ক বলে মনে করতে পারে – সেটাই বিস্ময়কর।”

বিবিসি এ ব্যাপারে এএনআইয়ের কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েছে। তা ছাড়া ভারত, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ সফর করেছেন এবং ইইউ ক্রনিকলে নিবন্ধ লিখেছেন এমন আরো ৯ জন এমইপি’র কাছেও প্রশ্ন পাঠানো হয়।

এর কোনটিরই জবাব পাওয়া যায়নি।

কে এই শ্রীবাস্তব গ্রুপ – এর পরেই বা কি?
গত বছর এবং এ বছরের তদন্তেও দেখা যায় – উদ্ঘাটিত এই বিশ্বব্যাপী কার্যক্রমের কেন্দ্র বিন্দুতে আছে অংকিত শ্রীবাস্তব নামে এক ব্যক্তি।

শ্রীবাস্তবের ব্যক্তিগত ইমেইল তার তার কোন প্রতিষ্ঠানের ইমেইল ঠিকানা দিয়ে ৪০০টিরও বেশি ডোমেইন নাম কেনা হয়েছে।

ইইউ ডিসইনফোল্যাব তার তদন্তে এসব তথ্য পেয়েছে।

তা ছাড়া আছে একটি রহস্যময় টেক ফার্ম ‘আগলায়া’। এবছর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এর ওয়েবসাইটটিতে ঢোকা যাচ্ছে না।

কিন্তু অতীতে এই কোম্পানিটি “হ্যাকিং ও স্পাই টুলস” এবং “তথ্য-যুদ্ধ পরিচালনা সেবা” সংক্রান্ত সামগ্রীর বিজ্ঞাপন প্রচার করেছিল।

আগলায়ার বিপণনসংক্রান্ত পুস্তিকায় তাদের কিছু সেবাকে “সাইবার ন্যুকস” বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে “দেশীয় স্তরে সুনামহানি করার সক্ষমতার” কথা।

ফোর্বস ম্যাগাজিনে ২০১৭ সালে দেয়া এক সাক্ষাতকারে অংকুর শ্রীবাস্তব নামে এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি “শুধুমাত্র ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার কাছেই বিক্রি করেন।”

তার সাথে অংকিত শ্রীবাস্তবের কোন আত্মীয়তা আছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।

তৃতীয় আরেকজন শ্রীবাস্তব হচ্ছেন ড. প্রমীলা শ্রীবাস্তব। তিনি এই গ্রুপের চেয়ারপারসন, এবং অংকিত শ্রীবাস্তবের মা।

‘জেনেভায় দেয়া হুমকি’
ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের একজন শিশুচিকিৎসক ড. হর্ষিন্দর কাউর।

ইইউ ডিসইনফোল্যাবকে তিনি বলেছেন, ২০০৯ সালে ইউএনএইচআরসির আমন্ত্রণে তিনি জেনেভায় একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন নারীভ্রূণহত্যা বিষয়ে। সেসময় তাকে ড. পি শ্রীবাস্তব নামে একজন মহিলা হুমকি দিয়েছিলেন, এবং দাবি করেছিলেন যে তিনি ভারতের “একজন অত্যন্ত সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা।”

ডা. কাউর বলেন, তাকে যিনি হুমকি দিয়েছিলেন তিনিই প্রমীলা শ্রীবাস্তব।

বিবিসি অংকিত শ্রীবাস্তবকে এক ইমেইল পাঠিয়ে এটিসহ রিপোর্টে উল্লিখিত বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিল, কিন্তু কোন জবাব পায়নি।

দিল্লির সফদরজঙ্গ এনক্লেভে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গেলে সেখানকার কর্মীরা বিবিসির প্রশ্নের কোন উত্তর দেয়নি।

এই নেটওয়ার্কটির কী হবে, বা এই তদন্তের আলোকে এটিতে কী ধরণের পরিবর্তন এতে আসতে পারে – তা স্পষ্ট নয়।

ইন্ডিয়ান ক্রনিকলসের লেখকরা বলছেন, তারা যা পেয়েছেন তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত-গ্রহণকারীদের পদক্ষেপ নেয়া উচিত – যাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য একটি প্রাসঙ্গিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়।

আলাফিলিপে বলেন, ২০১৯এর তদন্তটির পর “কোন সরকারি যোগাযোগ বা নিষেধাজ্ঞা – কিছুই হয়নি। এই নিষ্ক্রিয়তা ইন্ডিয়ান ক্রনিকলসকে এই বার্তাই দিয়েছে যে ‘তোমরা ধরা পড়েছো, কিন্তু এতে কিছুই হবে না’।”

“আমাদের মনে হয়, ভুয়া তথ্য প্রচারের জন্য শাস্তি হওয়া উচিত এবং এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা। আগামী বছর যদি এই একই ব্যক্তিদের একই কৌশল নিয়ে আরেকটি রিপোর্ট প্রকাশ পায় – তাহলে তা হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা” – বিবিসিকে বলেন তিনি।

“এর অর্থ হবে, বিদেশী হস্তক্ষেপ নিয়ে ইইউ প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন মাথাব্যথা নেই।”

সূত্র : বিবিসি/নয়া দিগন্ত অনলাইন ১১ ডিসেম্বর ২০২০

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!