হাদীস বিশারদ মাওলানা এ কে এম ইউসুফের ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। 

হাদীস বিশারদ মাওলানা একেএম ইউসুফের ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। 
মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ ১৯২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার রাজৈর গ্রামের মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আজিমুদ্দীন হাওলাদার। তিনি তার পিতার তৃতীয় সন্তান। ১৯৫০ সালে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় অধ্যয়নকালে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা উপমহাদেশের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তানায়ক সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদীর (র.) কয়েকটি বই পড়ে লেখক ও তাঁর ইসলামী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৫২ সালে আলিয়া মাদরাসা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে খুলনা আলিয়া মাদরাসায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। খুলনা আলিয়া মাদরাসায় কর্মরত অবস্থায় ১৯৫২ সালের জুন মাসে তিনি জামায়াতে ইসলামীর রুকনিয়াতের শপথ নেন। তিনি বাংলাদেশীদের মধ্যে দ্বিতীয় রুকন ছিলেন। প্রথম রুকন ছিলেন মরহুম মাওলানা আব্দুর রহীম। ১৯৫৩ সালের প্রথম দিকে তিনি খুলনা আলিয়া মাদরাসা থেকে বিদায় নিয়ে কিছু দিনের জন্য ঢাকায় যান। ওই সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রকাশিত উর্দু বইয়ের বাংলা অনুবাদ করতেন। ‘শান্তিপথ’ ও ‘ইসলামের জীবন পদ্ধতি’ নামের দু’টি পুস্তিকা বাংলায় অনুবাদ করেন। পরে তিনি ঢাকা থেকে বরিশাল জেলার মঠবাড়ীয়া থানার উপকণ্ঠে অবস্থিত টিকিকাটা সিনিয়র মাদরাসায় প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদান করেন। এখানে তিনি ৩ বছরের মতো কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি জামায়াতে ইসলামীর খুলনা বিভাগের (বৃহত্তর খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালী নিয়ে গঠিত) আমীরের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে খুলনা শহরে আসেন। ১৯৫৮ সালের ৮ অক্টোবর আইয়ুব খান কর্তৃক সামরিক শাসন জারির আগ পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি খুলনা আলিয়া মাদরাসার কর্তৃপক্ষের অনুরোধে অধ্যক্ষ হিসাবে আবার যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে তিনি মাদরাসার অধ্য পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে খুলনা ও বরিশাল আসন থেকে জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি প্রাদেশিক সরকারের গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতাত্তোর তৎকালীন সরকার তাকে গ্রেফতার করে এবং ২ বছর কারাভোগের পর ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি মুক্তি পান।

মাওলানা ইউসুফ ১৯৫০ সালে ঢাকার সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া থেকে ফাজিল পাস করেন। পূর্ব পাকিস্তান মাদরাসা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীায় সারাদেশে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। এ জন্য সরকারি বৃত্তিও পেয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে তিনি রেকর্ড সংখ্যক নাম্বার নিয়ে কামিল পাস করেন।

জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্ব পালন : ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাওলানা একেএম ইউসুফ জামায়াতে ইসলামীর খুলনা বিভাগের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের নায়েবে আমীর হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। ১৯৬২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ণ ৩ টার্মে সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদীর (র.) নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় শূরার সদস্য ছিলেন। পরে তিনি স্বাধীনতাত্তোর ৩ টার্ম সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি নায়েবে আমীর এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিনিয়র নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে ১৪ জুন কৃষকদের সেবারব্রত নিয়ে সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চাষীকল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। মাওলানা একেএম ইউসুফ এই সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পাবলিকেশন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ১৯৯৫ সাল থেকে দারুল আরাবীয়া হতে আরবী ভাষায় একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এটা ছিল বাংলাদেশের একমাত্র আরবি পত্রিকা। তিনি ‘মহাগ্রন্থ আল কুরআন কি ও কেন?’, ‘হাদীসের আলোকে মানব জীবন (প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড)’, ‘আমার আমেরিকা, কানাডা ও ইংল্যান্ড সফর’, আমার আফগানিস্তান সফর’, ‘দর্পণ (নির্বাচিত প্রবন্ধ সমূহের সঙ্কলন)’, ‘দেশ হতে দেশান্তরে (১৩টি দেশ এর ভ্রমণ কাহিনী)’, ‘কুরআন-হাদীসের আলোকে জিহাদ’, ‘মাওলানা মওদূদী ও জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতার অন্তরালে’ নামের বই প্রকাশ করেন।

মাওলানা একেএম ইউসুফ জীবদ্দশায় দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে ৪টি মহাদেশের ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, আরব আমিরাত, ওমান, জর্দান, মিসর, সুদান, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর, মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, গ্রেট বৃটেন, আমেরিকা ও কানাডা ভ্রমণ করেছেন। মোমতাজুল মুহাদ্দেসিন মাওলানা একেএম ইউসুফ এর সাথে কাতার ও কুয়েত সরকারের ছিল সুগভীর সম্পর্ক। তাঁর আমন্ত্রণে এ দুই দেশের একাধিক মন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন। কাতার ও কুয়েত সরকার তার কর্মকাণ্ডের ওপর ছিল খুবই আস্থাশীল। যার কারণে ঢাকা, খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, সাতীরা, ঝিনাইদহ, ফরিদপুরসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চাষীকল্যাণ সমিতির উদ্যোগে এই দুই দেশের সরকারের অর্থায়নে মাওলানা একেএম ইউসুফ এর প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা ৪ শতাধিক মসজিদ, মাদরাসা ও এয়াতিমখানা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে।২০১৪ সালের এই দিনে আল্লামা সাঈদীসহ অসংখ্য অালেমের উস্তাদ মাওলানা ইউসুফ কথিত ট্রাইব্যুনালের সাজানো মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহ রাব্বুল অালামিন তাঁকে শাহাদাতের মর্যাদা দিন এবং জান্নাতের সব্বোর্চ স্থানে দাখিল করুন।
Ataur Rahman Sarker

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!