স্বীকৃত কপটতা ও আমাদের নির্বাচন

মোঃ মোশারফ হোসেন

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নির্বাচন একটি অপরিহার্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ নির্বাচন বিহীন গণতন্ত্র হতে পারেনা। আবার অবাধ,সুষ্ঠু,নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়াও গণতন্ত্র সফল হয়না। তাই ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন গণতন্ত্র বিকাশের জন্য যেমন পূর্বশর্ত তেমনি নৈতিক,সামাজিক,অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় শান্তি-শৃংখোলা ও ভারসাম্য রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্যও জরুরী। এতে জনমত যেমন স্বচ্ছভাবে প্রতিফলিত হয় তেমনি রাষ্ট্র কাঠামো মজবুত হওয়ার পাশাপাশি জনগণের অধিকারও নিশ্চিত হয়। নির্বাচন হলো একটি দেশের বৈধ ভোটারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে দুটি পক্ষ বিদ্যমান – একটি প্রার্থী, অপরটি ভোটার বা সমর্থক। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রার্থী ও ভোটারকে কিছু শর্ত মানতে হয় বটে কিন্তু বাস্তবতায় আমাদের দেশে তা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। জাতীয় বা স্থানীয় যে কোন নির্বাচন এলেই উভয় পক্ষের নির্বাচন কালীণ যে অতি স্বাভাবিক চিত্র পরিলক্ষিত হয় তা হলো-প্রতিশ্রুতির পসরা সাজিয়ে বসেন উভয় পক্ষ। তাতে কপটতা যেন সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে। কারণ, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে বা গোপনে এমন সব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় যার কম সংখ্যকই আলোর মুখ দেখে। হোক তা নির্বাচনী এলাকার কিংবা রাষ্ট্রীয়। এজন্য প্রার্থী নিজেকে সাজিয়ে তুলেন জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের মত করে যা শুধু নির্বাচন এলেই দেখায় যায়। প্রার্থী তার ভাষণে জনগণকে চমকপ্রদ শ্লোগানে ভরা অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে ভবিষ্যতের এমন সব স্বপ্ন দেখান যার কোন কোনটি পূরণ করতে প্রার্থীর কয়েক মেয়াদেও সম্ভব হবার নয়। প্রার্থী নিজেকে এতটা বড় মনের ও দানবীর বলে জাহির করেন যে বেশিরভাগই নির্বাচনী ব্যয় যেন আইন করেও ঠেকানো যায় না। তাছাড়া প্রার্থীর আত্বীয়-স্বজন,বন্ধু-বান্ধব,পাড়া-প্রতিবেশিসহ সকল শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে সম্পর্ক যেন নতুন মাত্রা পায় এমনকি রাস্তার ভিখারিও প্রার্থীর বুকে স্থান পায়। প্রতিপক্ষের সীমাহীন সমালোচনা ও গিবত, ধর্মের প্রতি নজির বিহীন অথচ ক্ষণস্থায়ী আবেগপূর্ণ দরদ যেন প্রতিটি নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণার নিত্যচিত্র। আর এ সব কিছুর একমাত্র উদ্দেশ্য ভোট। ভোটের ফল প্রকাশের সাথে সাথে চিত্রও পাল্টে যায় অবলীলায়।

  অপরপক্ষে প্রার্থীর কর্মীদের সীমাহীন তোষামুদী, প্রার্থীর প্রতি স্বার্থেভরা ভক্তি এবং প্রার্থীকে মিথ্যা প্রশংসায় সিক্ত করে তোলা যেন প্রতিটি কর্মীর ধ্যান-জ্ঞান হয়ে যায়। এ কাজে ভোটার নন এমন লোকের সংখ্যাও নেহায়েত কম না। যারা রাস্তায় বেপরোয়া শোডাউন,উচ্চ শব্দের ভাষণে শব্দ দূষণে যেন চারদিক প্রকম্পিত।

এদিকে নির্বাচনী হাওয়ায় যে বেলুনটা সবচেয়ে বেশি ফুলে ফেঁপে ওঠে তা হলো একজন ভোটার। প্রতিটি প্রার্থীর  সফলতার দোয়া করা, ভোটের প্রতিশ্রুতি দেয়া, বা প্রার্থীকে সফলভাবে বিদায় করতে পারা একজন সাধারণ ভোটারের যেন অগ্নি পরীক্ষায় পাশ করার মত। নিজের অজান্তেই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় প্রতিশ্রুতি দিতে হয় ভোটের। অথচ নিজের মনের কোনে বাস করে আপন প্রার্থীর প্রতীক। কোন কোন ভোটার বিভিন্নভাবে এক বা একাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে উৎকোচ ও সুবিধা গ্রহণের নির্বাচন যেন এক ভরা মৌসুমের নাম। চায়ের দোকান,গাড়িতে-বাড়িতে, পথ চলতে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে যেখানে সেখানে নির্বাচনী তর্কে কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও যেন আমাদের সাথেই নিত্য বসত করে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোক বাদে বাকি সবারই যেন প্রায় একই অবস্থা।

 এ রকম আরো কত যে নাটকীয় বাস্তবতা আমাদের দেশে নির্বাচনকে ঘিরে বিদ্যমান তার যেন ইয়ত্তা নেই। এমন প্রতারণামূলক,ঘৃণ্য-জঘন্য বিষয়ের চর্চা যা মুনাকেফি বা কপটতা সবার স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত আমাদের মুসলমানদের দেশে। এর দায় কার? আবার দায়মুক্তই বা কে? অথচ গণতান্ত্রিক অমুসলিম দেশেও এতটা বেপরোয়া কপটতা এতটা দেখা যায় না। উপরিউল্লিখিত এ চিত্র এ দেশের সবারই জানা থাকলেও ক্রমবর্ধমান এ কপটতার প্রতিকারের যেন কোন পদক্ষেপ নেই এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়।

  আর ইসলামে কপটতাকে মারাত্বকভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং এর পরিণতি জাহান্নাম বর্ণনা করে আল্লাহ বলেনঃ “নিশ্চয়ই কপটচারীরা জাহান্নামের নিম্নস্তরে অবস্থান করবে”। সুরা নিসা, আয়াত- ১৪৫। কপটচারীর পরিচয় দিয়ে রাসুল (স) বলেন, “যার মধ্যে চারটি গুণ পাওয়া যাবে সে একজন একনিষ্ঠ কপটচারী। (১) কথা বলার সময় মিথ্যা বলে, (২) প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভঙ্গ করে, (৩) আমানতের খেয়ানত করে । বুখারি ও মুসলিম। তিনি আরো বলেন, “মুনাফিকের উদারণ হলো দুই বকরির মাঝে বান ডাকা ছাগীর ন্যায় যা কখনো এর দিকে একবার আবার কখনো ওরদিকে একবার বুঝা যায় না সে কার অনুসারী” । মুসলিম।

  ভোট একটি পবিত্র আমানত। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের ভোটার যোগ্য প্রার্থীকে না দিয়ে অপাত্রে নিক্ষেপ করে আমানতের খেয়ানত করে থাকে। আর আমাদের দেশের অশিক্ষিত ভোটার যেখানেই সুবিধা পান সেখানেই ছুটে যায়। এবং একজন ভোটার প্রার্থীকে সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে প্রার্থীর সকল ভাল বা মন্দের সমান অংশীদার হয়ে থাকে সে উপলব্ধি না করে সামান্য স্বার্থের কাছে ভোট নামের আমানত বিক্রি করে দেয়। হয়তো এ জন্যই বিখ্যাত রাষ্ট্র বিজ্ঞানী প্লেটো দুঃখ করে বলেছিলেন-“গণতন্ত্র মূর্খের শাসন”।

 এমনি নানাভাবে ভোট ব্যবসা, ভোট জালিয়াতি, ভোট চুরি,ভুয়া ভোট, অনিয়ম-উশৃংখোল পরিবেশ এবং নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতাসহ নানান অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ প্রচলিত ও এক অর্থে স্বীকৃত বিষয় যেন প্রতিটি নির্বাচনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এমন অনিয়ম ও কপটতা একজন মুসলিম ভোটার বা প্রার্থী কেউই করতে পারেনা। পরিশেষে এ বিষয়ে  উভয় পক্ষসহ ধর্মপ্রাণ মুসলিম নাগরিক,রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারক, প্রত্যেক দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যাতে গণতন্ত্রের সুষ্ঠু ও পরিপূর্ণ বিকাশে এবং জনগণের ধর্মীয় ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনে আমাদের দেশ বিশ্ববাসীর কাছে মডেল হিসেবে খ্যাতি অর্জন করতে পারে।

Md.Mosharaf Hossain

M.phil (Fellow)  Islamic University,

Kushtia, Bangladesh.

e-mail:professormosharafiu@gmail.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!