স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরঃ প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

আবুল কালাম আজাদ

১৯৪৭ সালে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন শেষ হয়ে বিজয় এসেছিল ঠিকই কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত স্বাদ দীর্ঘ চব্বিশ বছরেও আশানুরূপ আস্বাদন করতে পারেনি। বাঙালিদের গলায় ছিল বঞ্চনার বেড়ি যা মাতৃভাষা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক মুক্তি পর্যন্ত বিপর্যস্ত করেছিল । শাসকগোষ্ঠী পূর্বাঞ্চলের জনগনকে মেরুদণ্ডহীন অধিকার বঞ্চিত জাতিতে পরিণত করতে চেয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ যা বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকায়,বাংলার অবারিত সবুজের বুকে চীর স্মরণীয়।

নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে এ দেশের মানুষ অনুভব করেছিল স্বাধীনতা অর্জনের। অবশেষে স্বাধীনতা অর্জিত হলো। সালটা তখন ১৯৭১! দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। দেখতে দেখতে স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছর পূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু এই স্বাধীনতা অর্জনকে ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা যেটুকু ছিল তার প্রাপ্তি কতখানি তা অবশ্যই খতিয়ে দেখার বিষয় ।

স্বাধীনতা মানে শুধু দেশকে দুষ্টচক্রের কবল থেকে ছিনিয়ে আনা নয়। নয় শুধু ভাগ করে নিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নতুন বোতলে ইচ্ছেমতো সেই পুরাতন পানীয় পান করা। স্বাধীনতা প্রকৃত মানে দেশকে সব আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা। স্বাধীনভাবে মানুষের চলাফেরা নিশ্চিত করা এবং দেশকে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনভাবে বাসযোগ্য করে তোলা। অন্যায়-অত্যাচার-জুলুম-নির্যাতন আর অপসংস্কৃতি ও স্বেচ্ছাচারিতার পাহাড় ভেঙে একটি শান্তিসুখের দেশ গড়া। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছরে পদাপর্ণ করে তা কতটুকু সম্ভব হয়েছে? আমাদের দেশ এখনো দুর্নীতির এক আঁতুড়ঘর। প্রতিদিন কলমের গুঁতোয় লুটপাট হয়ে যায় হাজার হাজার কোটি টাকা। যাদের হাতে প্রতিকারে ক্ষমতা তাদের কেউ বলে এটা তেমন কোনো ব্যপার না, সাগর থেকে এক বালতি জল নিলে কিছু হয় না। দুর্নীতির এমন মহামারী কখনো কারো কল্পনায় ছিল না !
এ দেশের মানুষের মাঝে বর্তমান সময় দলে দলে কোন্দল লেগেই থাকে, লেগে থাকে শাসক শাসিত শ্রেণি বৈষম্য । এতে ধূলিসাৎ হচ্ছে স্বাধীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষের মতো বেঁচে থাকার প্রত্যাশা।
মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণাপত্রের মূলমন্ত্র সাম্য, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি যেন আজও কেবল স্বপ্নই থেকে গেছে। মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে গেছে। ন্যায়বিচার বাস্তবায়ন যেন কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যায়ভাবে একে-অন্যের ওপর প্রতিনিয়ত করা হচ্ছে অবিচার। স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।
স্বাধীনতার ৫০ বছরেও ফুটপাতে মানুষ ঘুমায়। অনাহারে দিনাতিপাত করতে হয় কত মানুষের ! বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছে শত শত।

১৯৭১ সালে যে লাখ লাখ মানুষ তাজা প্রাণ দিয়েছে তা এসব দেখার জন্য মোটেই নয়। স্বপ্ন ছিল দেশের মানুষ অনাহারে থাকবে না, থাকবে না কোনো মানুষ বাসস্থানহীন, মারা যাবে না বিনা চিকিৎসায় কেউ। এখানে এসে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরে এসেও কেন পারিনি আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি মিলাতে?

আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হতেই হবে। এতে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে নিজস্ব স্বাধীন মত প্রকাশের। কিন্তু সেই মত প্রকাশেও তৈরি হয়েছে কঠিন প্রতিবন্ধকতা। স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও যদি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করা না যায়, তাহলে স্বাধীনতা অর্জনের মহান স্বপ্নে বাধা তৈরি করার শামিল নয় কি ?
আমরা স্বাধীনতা লাভের জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছি। সহ্য করেছি অসহনীয় নির্যাতন। চেয়েছি রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, সামাজিক সুশাসন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। স্বাধীনতার এসব সুফল সবাই সমানভাবে পাননি। কুক্ষিগত থেকে গেছে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে। সুশাসন যেন সাধারণ জনগণের কাছে আজও স্বপ্ন। তাইতো স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও বলতে হয় শাসনতন্ত্র এখনো কাটা ঘুড়ির মতো ভাসমান। যার মূল কারণ আমাদের রাজনৈতিক কাঠামোতে কঠিন বৈষম্য বিদ্যমান।

১৯৭১ সালে জন্মের সময় বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দারিদ্র্যপীড়িত দেশ ছিল। মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ মানুষই ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আজ তা নেমে এসেছে ২০ শতাংশের নিচে। যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে নির্দেশ করে। কিন্তু দেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভ করলেও থেকে গেছে প্রকট অর্থনৈতিক বৈষম্য। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দেশের অগ্রগতি জানতে হলে, বিশ্লেষণ প্রয়োজন ১৯৭১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত সামষ্টিক ও ব্যাষ্টিক অর্থনীতি সম্পর্কে দেশের অবস্থান। যদিও ৫০ বছরের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সার্বিক বিশ্লেষণ করা জটিল। তবুও কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করা যায় ।
১৯৭০ সালে স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল শুধু ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু ২০২০ সালে এসে অনুমিত জিডিপি ৮৬০.৯১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা আর ২০২০-২০২১ সালের বাজেট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে উন্নয়ন বাজেটের আকার ছিল ৫০১ কোটি টাকা- যা ২০২০-২১ সালে হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা।
আমাদের দেশের অর্থনীতিকে সচল করেছে গার্মেন্টস শিল্প। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প যাত্রা শুরু করে ষাটের দশকে। তবে সত্তরের দশকের শেষের দিকে রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে এই শিল্পের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী শিল্প খাত। ২০১৯ সালেও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ। ১৯৮১-৮২ সালে মোট রপ্তানি আয়ে এই শিল্প খাতের অবদান ছিল মাত্র ১.১ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে দেশের রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশ আসে গার্মেন্টস শিল্প থেকে। সময়ের পরিক্রমায় গার্মেন্টস শিল্প সম্প্রসারণ হতে থাকে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে গার্মেন্টেস শিল্প বিস্ময়কর প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বর্তমানে গার্মেন্টস শিল্পে প্রায় ৪০-৪৫ লাখ শ্রমিক কর্মরত।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলছে। ২০১৯ সালে ১৮ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা- যা আগের বছরে ছিল ১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালের রেমিট্যান্স আসে প্রায় ১৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। যা বিগত বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। আমাদের দেশের প্রবৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয় প্রবাসীদের পাঠানো এই রেমিট্যান্সকে। যা স্বাধানীতার ৫০ বছরে প্রত্যাশার শীর্ষে।
এই প্রবৃদ্ধির কারনেই সম্ভব হয়েছে পদ্মা সেতুর বাস্তবে রূপদান ! যার মাধ্যমে দেশ এগিয়ে গেল আরো এক ধাপ। একসময়ের স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান। স্বাধীনতার ৫০ বছরে পদ্মা সেতুর এই দৃশ্যমানতা দেশের অগ্রগতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে সূচনা করল নতুন অধ্যায়ের। ৬.১৫ কিলোমিটারের এই সেতুর প্রথম স্প্যান বসানো হয় ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এবং ৪১তম শেষ স্প্যানটি বসানো হয় ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর। পদ্মা সেতুর ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের। উপকৃত হবে প্রায় ২১টি জেলার মানুষ। তৈরি হবে ভারি শিল্প কারখানা। এতে বাড়বে কর্মসংস্থান। যা অনেকের বেকারত্ব ঘুচাতে সাহায্য করবে।
মাথাপিছু আয়, বাজেট বৃদ্ধি, জিডিপি, প্রবৃদ্ধি এসব অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিচায়ক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে দেশের সাধারণ জনগণ যেটুকু সুফল পাওয়ার কথা, তা তারা মোটেই পায়নি। তবে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন স্বাধানীতার ৫০ বছরেও যে হয়নি, তা না। সড়ক ব্যবস্থা, বিদ্যুতায়ন, নগরায়ন এসবে উন্নয়নের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। যেটা স্বাধীনতার ৫০ বছরে কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক। এত অগ্রগতির মধ্যে আর্থিক বৈষম্য প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কল্যাণে আমদানি নীতি উদার হয়েছে, ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে এবং আমদানি-রপ্তানির উদারনীতির ফলে পাচার হচ্ছে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ।

গার্মেন্টেস শিল্পের মতো পাটশিল্পও ছিল সমৃদ্ধির পথে। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত কাঁচা পাট ও পাটজাতদ্রব্য মোট রপ্তানিতে ৫০% অবদান রেখে রপ্তানি আয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পাটশিল্পের সমৃদ্ধির পথ। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে পাটশিল্পের যখন বিশ্বে চাহিদা বাড়তে শুরু করল, তখন আমরা সেই শিল্পকে নিজ হাতে কবর দিয়েছি। একসময় পাট দেশের অর্থকরী ফসল ছিল, ছিল সোনালী আঁশ । শুধু তাই নয়, দেশের রপ্তানি আয়ের বেশির ভাগ আসতো পাটশিল্প থেকেই। কিন্তু এই শিল্প রক্ষায় সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করার ফলে, পাটশিল্প প্রায় ধ্বংসের পথে। যা স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আমাদের চরম অদক্ষতার পরিচয় বহন করছে ।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের অর্জন কতটুকু! দেশের শিক্ষার হার বেড়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ঝরে পড়ার হার রোধ করা হয়েছে। বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার হার বেড়েছে।
জাতীয় জীবনের সর্বত্র নেতৃত্বদানের উপযোগী, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিশীল, মানবমুখী, সুনাগরিক তৈরি করাই হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বমানের শিক্ষার লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য,
টেন্ডার বানিজ্য আর ছাত্র-শিক্ষকের লেজুড়বৃত্তি রাজনীতিতে নষ্ট হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার আসল লক্ষ্য। ফলে সেশন জট থেকে শুরু করে সৃষ্টি হচ্ছে নানা অনিয়মের। যেটার প্রভাব পড়ছে মানসম্মত শিক্ষায়। মানসম্মত শিক্ষার চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে যে চাহিদা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ পূরণে ব্যর্থ। যার কারণে বিশ্বে সন্তোষজনক অবস্থানে জায়গা করে নিতে পারছে না আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। স্বল্পতা রয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেটের আর লুটপাট চলছে সীমাহীন । মূলত যথাযথ ভর্তুকির ওপরে নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসম্মত, বিজ্ঞানধর্মী, গবষণালব্ধ শিক্ষা প্রদান। বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যর্থতায় বেড়ে চলেছে বেকারত্বের হার। বর্তমানে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬-২৭ লাখ। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে যেটি দেশের জন্য মারত্মক অভিশাপ স্বরূপ।

স্বাধীনতার অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্র। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশে স্বাধীন মত প্রকাশ করবে, এই আকাংখাই দেশের মানুষের মধ্যে তীব্র ছিল। দেখা গেছে, গণতন্ত্রের মৌলিক যে চেতনা, বিগত পঞ্চাশ বছরে তা কোনো না কোনোভাবে বারবার ব্যহত হয়েছে। কখনওবা তা সেনাশাসনের মাধ্যমে হোঁচট খেয়েছে। আবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। শাসক শ্রেণীর মধ্যে জনগণের ক্ষমতা মূল্যায়নের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা এবং কৌশলে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। পূর্ণ গণতন্ত্রের বিষয়টি এখন এক অলিক বিষয় বলে মনে হয় । আপেক্ষিকতার ঘেরাটোপে বন্দি সমাজ । গণতন্ত্রের অন্যতম যে স্পিরিট, ‘গভর্নমেন্ট অফ দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল’ বিষয়টি দেখা যায় না। শাসক শ্রেণী গণতন্ত্রকে তাদের মতো করেই ব্যবহার করেছে। আমরা যদি বিগত একযুগে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবস্থা বিবেচনা করি তাহলে দেখব, তা অনেকটা আঁতুর ঘরেই হামাগুড়ি দিচ্ছে । গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণের মতামত ও রায়কে উপেক্ষা করা হচ্ছে । মানুষের মতামতের ভিত্তিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। সব ধরনের নির্বাচনে বিনাভোট ও রাতের আঁধারে নির্বাচন হওয়ার নজির সৃষ্টি হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে বিস্তর সমালোচনা হলেও সরকার তার তোয়াক্কা করছে না। বরং গণতন্ত্রের অন্যতম শক্তি বিরোধী রাজনীতি কোণঠাসা করে এক ধরনের বিরাজনীতিকরণের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, সরকার অনুগত বিরোধীদলকে একইসঙ্গে সরকারের অংশ এবং সংসদে বিরোধীদলের আসনে বসার মতো প্রক্রিয়াও দেখা গেছে। গণতন্ত্রে প্রকৃত বিরোধীদল থাকার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ থাকার বিষয়টি নেই বললেই চলে। ফলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কেউ কেউ ‘হাইব্রিড’ বলছে। গণতন্ত্রের এই সংকটের মধ্যে খুন, গুম, নিপীড়ন-নির্যাতন, ধর্ষণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিরোধীদলের অনেক নেতা-কর্মী গুম-খুনের শিকার হয়েছে। প্রায় সময়ই নিখোঁজ নেতা-কর্মীদের পরিবারকে সন্তান ও বাবার খোঁজ চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে দেখা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরোধীমত দমনে সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্ক তুলে দিয়ে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়া ন্যাক্কারজনক আকার ধারণ করেছে । গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়নকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। সরকারের মধ্যে এখন এ প্রবণতা প্রকট যে, বিরোধী দল থাকলে উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। ফলে বিরোধী রাজনীতি নিশ্চিহ্ন বা নিস্ক্রিয় করে দিতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের কাজ উন্নয়ন করা। তবে উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না করলে উন্নয়ন টেকসই হতেই পারে না। এতে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা থাকে না। অনিয়ম ও দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়। বাস্তবে তাই দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে অনিয়ম, সময়ক্ষেপণ, ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল নির্মাণ কাঠামোর খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। এতে জনগণের অর্থের ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। গণতান্ত্রিক কাঠামোতে উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালিত হলে এ ধরনের অপচয় ও অনিয়মের সুযোগ কম থাকে। অথচ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এর প্রধানতম উপাদান জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে সববিরোধী দলের ঐক্যমতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে সংযোজিত করা হয়েছিল। এ সরকারের অধীনে যে কয়টি নির্বাচন হয়েছিল তার সবকটি দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। ভাবা হয়েছিল, এতে বাংলাদেশের গণতন্ত্র মজবুত ভিত্তি পাবে। এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল। বর্তমান সরকার আদালতের এক রায়ের কারণে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাদ দেয় এ কথা বলে যে, এ পদ্ধতি গণতন্ত্রের জন্য সাংঘর্ষিক। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনই গণতন্ত্রের মূল স্পিরিট। দেখা গেল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার পর দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনসহ যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে, সবগুলোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দেশে-বিদেশে এসব নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা নেই বলে গণতন্ত্র এতটাই দুর্বল হয়েছে যে, বাকস্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতাও অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বিরোধী রাজনীতি সীমিত হয়ে পড়া সহ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে গঠনমূলক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করা হয়েছে। বাকস্বাধীনতা বলে এখন কিছুই নেই। এ আইনের ধারায় সংবাদপত্র থেকে শুরু করে অতি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ নিয়ে সাংবাদিক ও বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিবাদ করলেও সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। সরকারের শাসন ব্যবস্থায় বিরোধীমত কঠোরহস্তে দমন করে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড এগিয়ে নেয়ার নীতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এতে গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে চরম সংশয় দেখা দিয়েছে।
তাই অধিকাংশ মনে সংগোপনে হলেও আক্ষেপ, ” হায়রে স্বাধীনতা, কী চেয়েছি আর কী যে পেলাম! ”

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!