” সেক্যুলারিজম, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক ”- রশিদ ঘানুশী |

( রশিদ ঘানুশী তিউনেশিয়ার আননাহদা পার্টির প্রেসিডেন্ট। Center for the Study of Islam and Democracy (CSID)-র আয়োজনে ২০১২ সালের ২ মার্চ অনুষ্ঠিত এক সিম্পোজিয়ামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক একটি ভাষণ দেন। বক্তব্যটি আরবি থেকে ট্রান্সক্রিপ্ট করে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন সিএসআইডির কর্মকর্তা ব্রাহিম রওয়াবাহ। বাংলায় অনুবাদ করেছেন মাসউদুল আলম।)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর রাসূল (সা), তাঁর পরিবারবর্গ, সাহাবী ও উম্মতের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ, ভাই ও বোনেরা – আসসালামু আলাইকুম।

তিউনিশিয়ার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ ও বিদেশী অতিথিদের সামনে এই সন্ধ্যায় আমাকে কিছু বলার সুযোগ দেয়ার জন্য আমি CSID-কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি আপনাদেরকে জ্ঞান দিতে এখানে আসিনি। আজকের নির্ধারিত বিষয়ে নতুন করে বলার মতো কিছু নেই। তবুও একটি সাধারণ ঐক্যমত্যে পৌঁছার লক্ষ্যে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে পারি। এটি আমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে সার্বজনীন ঐক্যমত্য কিংবা কমপক্ষে কাজ চালিয়ে নেয়ার মতো ঐক্যমত্যে পৌঁছতে সাহায্য করবে।

আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো ইসলামের সাথে সেক্যুলারিজমের সম্পর্ক। একদৃষ্টিতে বিষয়টি বেশ জটিল। এই সম্পর্ক কি দ্বন্দ্ব ও অনৈক্যের? নাকি সম্প্রীতি ও সাযুজ্যতার? প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে আরো কিছু প্রশ্ন এসে যায়। যেমন: সরকার ব্যবস্থার সাথে ইসলামের সম্পর্ক কী? ইসলাম ও আইনের মধ্যকার সম্পর্ক কী? এই প্রশ্নগুলো তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার।

সেক্যুলারিজম ও ইসলাম নিয়ে কথা বলার সময় মনে হতে পারে – আমরা সহজবোধ্য ও স্পষ্টতর কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলছি। অথচ এ বিষয়গুলো নিয়ে লোকজনের মাঝে যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে, রয়েছে নানা ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি। তারমানে সেক্যুলারিজমের শুধু একটি ধরনই রয়েছে, তা নয়; বরং এর নানা ধরন রয়েছে। ইসলামের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। কে কোন উদ্দেশ্যে কী প্রস্তাব করছে – এর ভিত্তিতে ইসলাম ও সেক্যুলারিজমের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে।

সেক্যুলারিজমের উৎপত্তি
সাদামাটাভাবে মনে করা হয় – সেক্যুলারিজম একটি দর্শন। আদর্শবাদী ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি মোকাবেলা করার বিষয়ে এটি একটি দার্শনিক চিন্তা। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা তা নয়। ইউরোপে সৃষ্ট নানা ধরনের সমস্যার একটি নিয়মতান্ত্রিক সমাধান হিসেবে পাশ্চাত্যে সেক্যুলারিজম হাজির হয়। ক্রমান্বয়ে এর বিবর্তন ও রূপায়ন ঘটে। নিছক দর্শন বা অধিবিদ্যাগত ব্যাপার হিসেবে এর উদ্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর অধিকাংশ সৃষ্ট হয়েছে প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানরা আলাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে। এর ফলে ক্যাথলিক চার্চের একাধিপত্য খর্ব হয়ে যায়। ১৬-১৭ শতকে ইউরোপের সংঘটিত ধর্মযুদ্ধগুলোও এই সমস্যার অন্যতম কারণ। এরই প্রেক্ষাপটে সেক্যুলারিজমের উদ্ভব ঘটে।

এখানে প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন হলো – যেসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেক্যুলারিজমের সূচনা হয়েছে, আমাদের কি সেসব পর্যায় এসেছে? এই সমগ্র প্রক্রিয়ার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার প্রসঙ্গ। যেমন: ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষতা এবং মানুষের বিবেচনাবোধের ওপর হস্তক্ষেপ করা হতে বিরত থাকা। এর ফলে রাষ্ট্রক্ষমতা সামাজিক ব্যাপারে সীমাবদ্ধ হয়েছে এবং ধর্মের পরিধি ব্যক্তিগত ব্যাপারে সীমিত থেকেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মের ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক জীবনে ধর্মীয় হস্তক্ষেপ সুস্পষ্ট। রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ সত্ত্বেও সেখানে ধর্মের তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। সেখানকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তৃতায় উল্লেখযোগ্য হারে ধর্মকে ব্যবহার করেন। তাদের সকল নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্ম একটি আলোচিত বিষয়। স্কুলে প্রার্থনা করা এবং গর্ভপাতের অধিকারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রত্যেক দলেরই নিজস্ব বক্তব্য থাকে।

সেখানকার এই বাস্তবতার পেছনে একটা ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইভানজ্যালিক খ্রিষ্টানদের দ্বারা। তারা ইউরোপের ক্যাথলিক চার্চের নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্যে স্বীয় ধর্ম নিয়ে আমেরিকায় পালিয়ে এসেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তারা ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’ হিসেবে বিবেচনা করেছিল। তাদের মতে, এই স্বপ্নভূমির কথা তাওরাত ও গসপেলে বর্ণিত রয়েছে।

ফ্রাঙ্কো-আমেরিকান চিন্তক টকুইভেল একবার মন্তব্য করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক দল হচ্ছে চার্চ। সেখানে চার্চ যে ব্যাপক ক্ষমতা ভোগ করে ইউরোপে তা দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রে চার্চে প্রার্থনাকারীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও ইউরোপে তা ৫ শতাংশেরও কম।

ইউরোপে ধর্মের ভূমিকা
ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটেও ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। এখানে ফ্রেঞ্চ ও অ্যাংলো-স্যাক্সন নামে দুইটি ধারা বিদ্যমান। অ্যাংলো-স্যাক্সন ধারায় ব্রিটিশ রাণী পার্থিব ও ধর্মীয় উভয় ধরনের শক্তির প্রতীক। অন্যদিকে, ফ্রান্সে ধর্ম ও রাষ্ট্র সম্পূর্ণ পৃথক। চার্চ ও রাষ্ট্রের বিপ্লবীদের মধ্যে সংঘাতের যে ইতিহাস ফ্রান্সের রয়েছে, তার পরিণতি হিসেবে এই পৃথকীকরণ ঘটেছে। তাহলে ইউরোপেও আমরা সেক্যুলারিজমের একই ধরন দেখছি না। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা তো বটেই, এমনকি ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীরাও, সেকুল্যারিজমের শুধু ফরাসী ভার্সন দ্বারা প্রভাবিত। এই ব্যাখ্যা অনুসারে ধর্ম জনপরিমণ্ডল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকবে। রাষ্ট্রই হবে জাতীয় পরিচয়ের একমাত্র শর্ত। জনপরিমণ্ডল থেকে ধর্ম ও এর প্রতীকগুলোকে বাদ দেয়ার এই মূলনীতির কারণে শুধু ফ্রান্সে হেডস্কার্ফ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশে এ ধরনের মূলনীতি না থাকায় সে সব দেশে হেডস্কার্ফ নিয়ে এ ধরনের কঠোর অবস্থান দেখা যায় না। নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ফলে শুধু ফ্রান্সেই রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে এই বিশেষ অবস্থা তৈরি হয়েছে।

আমরা সাধারণত একটা বিষয়ের মুখোমুখি হই না। সেটা হচ্ছে – সেক্যুলারিজমের আরোপিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াটি, অর্থাৎ ‘রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা’। এর মানে হলো ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সব ধরনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদানকারী হলো রাষ্ট্র। রাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোনো দলের পক্ষ হয়ে কোনো বিষয়ে নাক গলাবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্মের ব্যাপারে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার মতো ব্যাপার কি ইসলামে আছে?

ইসলাম একটি সমন্বিত ব্যবস্থা
ইসলাম হচ্ছে রাজনীতি, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত ব্যবস্থা। মহানবী (সা) ধর্মের সাথে সাথে রাষ্ট্রেরও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। মদীনা থেকে মক্কায় আগত যে দলটি প্রথমে আনুগত্যের শপথ (আকাবার প্রথম শপথ) করেছিল, তা ছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমানের ধর্মীয় শপথ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের শপথ (আকাবার দ্বিতীয় শপথ) ছিল মদীনা আক্রান্ত হলে প্রয়োজনে তরবারী দিয়ে হলেও মুসলমানদেরকে রক্ষা করা সংক্রান্ত। ইসলামপূর্ব সময়ে মদীনা পরিচিত ছিল ইয়াসরিব হিসেবে। মোহাম্মদ (সা) সেখানে হিজরত করার পর নাম পাল্টে রাখা হয় মদীনা। এই পরিবর্তন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মদীনা অর্থ শহর বা নগর। এই নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে যে, ইসলাম নিছক কোনো ধর্ম নয় বরং এটি একটা সভ্যতা সংক্রান্ত ব্যাপার। ইসলাম মানুষকে যাযাবর জীবন থেকে নাগরিক জীবনে নিয়ে এসেছে। তাই নগরব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর যাযাবর জীবনে ফিরে যাওয়াকে নিতান্তই অনাকাঙ্খিত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাই ইসলাম যেখানেই গেছে সেখানেই নগরের পত্তন হয়েছে। উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে পুরনো নগরীটি আমাদের দেশে অবস্থিত, যেটি আরবরা গড়ে তুলেছে। ইসলাম যে একটি সভ্যতা নির্মাণকারী ধর্ম – মহানবী (সা) কর্তৃক নগর প্রতিষ্ঠাই এর সুস্পষ্ট প্রমাণ। এ ধর্ম যুদ্ধরত গোত্রগুলোকে যাযাবর জীবন থেকে সভ্য হিসেবে উন্নীত করেছে এবং একটা রাষ্ট্রের অধীনে তাদের ঐক্যবদ্ধ করেছে।

ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতির প্রসঙ্গ
যেহেতু মহানবী (সা) মসজিদে নামাজ পড়াতেন, তাই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ছিলেন ইমাম। আবার একই সাথে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক নেতা। তিনি লোকজনের বিরোধ মীমাংসা করতেন, সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন এবং বিভিন্ন সন্ধি ও চুক্তিতে স্বাক্ষর করতেন। মহানবী (সা) মদীনায় এসে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি একটি সংবিধান উপস্থাপন করেন, যা ‘সহীফাহ’ নামে পরিচিত। আপনাদের কাছে এর উদাহরণ হলেন মোস্তফা।[1] এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সংবিধান। অনেকগুলো চুক্তির সমন্বয়ে প্রণীত এই সংবিধানটি ছিল মক্কার মুহাজির ও তাদের আশ্রয়দাতা মদীনার আনসারদের মধ্যকার সম্পর্কের ভিত্তি। পরবর্তীতে ইহুদী গোত্রগুলো এই সংবিধানের আওতায় আসে।

আনসার ও মুহাজিরদেরকে একটি জাতি হিসেবে বিচেনা করা হয়েছিল এবং ইহুদীদেরকে এ জাতিসত্তায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এ সংবিধানে দুই ধর্মীয় জাতিকে একটি রাজনৈতিক জাতিসত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা অন্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচয় লাভ করে। এই সংবিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ধর্ম ও রাজনৈতিকতার মধ্যে পার্থক্য, যা বর্তমানকালের রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ ধারণার সাথে সংগতিপূর্ণ। মোহাম্মদ সালিম আল আওয়া এবং মোহাম্মদ ওমরের মতো খ্যাতনামা স্কলারগণ এই অভিমত দিয়েছেন।

ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো পৃথকভাবে এ সংবিধানে উল্লেখিত ছিল। সেখানে বলা ছিল যে, মুসলিমরা একটি ধর্মীয় জাতি (উম্মাহ) এবং ইহুদীরা আরেকটি ধর্মীয় জাতি। এই দুই পক্ষ ও পৌত্তলিকরা মিলে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি জাতি হিসেবে গঠিত হয়েছিল। ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা সর্বদা স্পষ্ট না থাকলেও মহানবী (সা) কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন ব্যবস্থা থেকে এই পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। এরই আলোকে বলা যায়, ধর্ম হলো ইবাদত ও আনুগত্য সংক্রান্ত ব্যাপার, আর রাজনীতি হলো যুক্তি ও বিবেচনাবোধের ব্যাপার। মহানবীর (সা) কোনো বক্তব্য সাহাবীদের কাছে বোধগম্য না হলে তাঁরা জিজ্ঞেস করতেন, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওহী, নাকি নিছক তাঁর ব্যক্তিগত মতামত। ওহী হলে তাঁরা মেনে নিতেন। আর মহানবীর (সা) ব্যক্তিগত মতামত হলে প্রয়োজনবোধে ভিন্নমত পোষণ করতেন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মহানবীর (সা) বিভিন্ন সময়ে নেয়া সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সাহাবীরা একাধিকবার দ্বিমত পোষণ করেছেন।[2]

একদিন মদীনায় কিছু লোক খেজুর গাছের পরাগায়ণের কাজ করছিল। মহানবী (সা) তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, “আমি এ কাজের কোনো সুফল দেখছি না।” লোকেরা এ কথাকে ওহী মনে করে পরাগায়ণের কাজ বন্ধ করে দিলো। ফলে সে বছর অন্যবারের তুলনায় ফলন কম হলো। তারপর তারা মহানবীকে (সা) জিজ্ঞেস করলো, কেন তিনি এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি জবাব দিলেন, তোমাদের জাগতিক ব্যাপারের লাভজনক ব্যাপারগুলো তোমরাই ভালো জানো।

ধর্মের প্রকৃত ভূমিকা
সুতরাং কৃষি, শিল্প, সরকার পরিচালনার পদ্ধতির মতো বিষয় সম্পর্কে ব্যবহারিক নির্দেশনা প্রদান ধর্মের কাজ নয়। কারণ অভিজ্ঞতার আলোকে সত্যে উপনীত হতে যুক্তিবোধই যথেষ্ট। ধর্মের ভূমিকা হলো মানুষের অস্তিত্ব, উৎপত্তি, গন্তব্য এবং সৃষ্টির উদ্দেশ্য ইত্যাদি সম্পর্কিত গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া। ধর্মের আরেকটা কাজ হলো কিছু মূল্যবোধ ও মূলনীতি প্রদান করা। এগুলো আমাদের চিন্তা, আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়নে নির্দেশনা প্রদান করবে। (The role of religion, however, is to answer the big question for us, those relating to our existence, origins, destiny, and the purpose for which we were created, and to provide us with a system of values and principles that would guide our thinking, behaviour, and the regulations of the state to which we aspire.)

জনজীবন থেকে ধর্মকে বাদ দেওয়া অর্থে রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণের ধারণা কখনোই ইসলামে ছিল না। এ পর্যন্ত মুসলমানদের জীবনে ইসলামের প্রভাব সুস্পষ্ট। তাদের জনজীবন ইসলামের শিক্ষা ও নির্দেশনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ। যদিও ধর্ম ও রাজনীতির স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তারা সচেতন। ইসলামী স্কলারদের চিন্তাধারায়ও এই পার্থক্য সুস্পষ্ট। তারা চুক্তি/লেনদেনের পদ্ধতি (মুয়ামালাত) এবং ইবাদতকে আলাদা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ইবাদত হচ্ছে অপরিবর্তনীয় ও প্রথাগতভাবে পালনের বিষয়। অর্থাৎ এখানে সত্যে পৌঁছার জন্যে যুক্তি যথেষ্ট নয়। আর সাধারণ কল্যাণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্র হলো মুয়ামালাত। ইমাম আল শাতিবী ও ইবনে আশুরের মতো মহান স্কলারগণ জোর দিয়ে বলেছেন, ইসলাম এসেছে মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য। স্কলারগণ একমত হয়েছেন, সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই সকল ঐশীগ্রন্থের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। ধর্মীয় নির্দেশনা, উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ ও মূলনীতি অনুযায়ী পরিচালিত যুক্তিবোধের আলোকে এই ব্যাপারগুলো বাস্তবায়নযোগ্য। মুয়ামালাতের ব্যাপারগুলো প্রতিনিয়ত বিকশিত ও পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু আকিদা, মূল্যবোধ ও সদগুণ সবসময়ই অপরিবর্তনীয়।

ইসলামে বহুত্ববাদ ও চিন্তার স্বাধীনতার ধারণা
ইসলামের ইতিহাসে সবসময়ই রাষ্ট্র তার কাজকর্মে কোনো না কোনোভাবে ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত ছিল। কোনো বিশেষ স্থান-কালের লোকেরা ইসলামী মূল্যবোধকে যেভাবে বুঝেছে, তার আলোকে রাষ্ট্রের আইন প্রণীত হয়েছে। এদতসত্তেও শুধুমাত্র ঐশী আইন-কানুন দ্বারা পরিচালিত হতো বলেই কোনো রাষ্ট্র ইসলামী হিসেবে গণ্য ছিল না। বরং সেখানে মানবীয় বিচার-বিবেচনাও কার্যকর ছিল, যার সমালোচনা করা যেতো। রাষ্ট্র একটা পর্যায় পর্যন্ত নিরপেক্ষতা বজায় রাখতো। রাষ্ট্র যখন এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতো এবং একটা একক ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিতো – যেমনটা ঘটেছিল আব্বাসীয় আমলে – তখনই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়তো। বলে রাখা দরকার যে, একই ধর্মের নানা ধরনের ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিকোণ নিয়ে আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর আশংকা ছিল, রাষ্ট্রের উপরও এই বিভাজন প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তিনি ইমাম মালিককে (রহ) ডেকে আনলেন এবং এই সবকিছুর সমন্বয় করে একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রণয়ন করতে অনুরোধ করলেন। এর ফলে ইমাম মালিক (রহ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল মুয়াত্তা’ রচনা করেন। এতে খলিফা আল মনসুর খুবই খুশি হলেন। তিনি এটাকে সকল মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক আইনে পরিণত করতে চাইলেন। এতে ইমাম মালিক (রহ) আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি এ রকম কিছু না করার জন্যে খলিফাকে অনুরোধ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল – মহানবীর (সা) সাহাবীরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং তাঁরা ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাঁরা লোকজনকে পরিস্থিতির আলোকে উপযুক্ত পন্থা বেছে নেয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। এ কারণেই আমরা উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় একটা মাজহাব, পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অন্য মাজহাব, আবার মিশরে আরেকটা মাজহাবের প্রাধান্য দেখি।

ধর্মীয় ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে খ্রিষ্টধর্মে চার্চই একমাত্র কর্তৃপক্ষ। ইসলামে এ ধরনের কর্তৃপক্ষ না থাকায় ব্যাখ্যাদান ও চিন্তার অর্থবহ স্বাধীনতা রয়েছে। এই স্বাধীনতার ফলে স্বভাবতই বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। আইন প্রণয়ন ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে আইন প্রণয়ণের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নির্বাচন ও গণতন্ত্রই হচ্ছে এখন পর্যন্ত অনুসরণীয় মানবজাতির জন্যে সর্বাধিক কার্যকর ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতির নেতৃত্ব গড়ে ওঠে এবং ব্যক্তিচিন্তার পরিবর্তে সামষ্টিক মতামত প্রাধান্য লাভ করে। অন্যদিকে, পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে ‘চার্চ’ ও কোরআনের মুখপাত্র হিসেবে ‘পোপ’ না থাকায়; কোনো বিশেষ স্কলার, দল বা রাষ্ট্রের পরিবর্তে সমগ্র জাতি পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে ঐশ্বরিক ইচ্ছার প্রকাশ ঘটায়।

আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন কোরআনের একটিমাত্র ব্যাখ্যা এবং আকিদা সংক্রান্ত মুতাজিলা দর্শনকে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং ধর্মের ওপর রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের চেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেন। এতে তিনি হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হন। তাঁর এই প্রচেষ্টার ফলে জনমত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলে যায় এবং আল মামুন শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হন।

আমাদের চ্যালেঞ্জ
পাশ্চাত্যের সমস্যাগুলো ধর্ম থেকে রাষ্ট্রের মুক্তিকে (… liberating the state from religion) কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছিল। এটি করতে গিয়ে তারা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের কবল থেকে ধর্মের মুক্তি এবং ধর্মের উপরে আধিপত্য করা থেকে রাষ্ট্রকে বিরত রাখাই আমাদের প্রেক্ষাপটে বিবেচ্য বিষয় (in our context, the problem is one of liberating religion from the state and preventing it from dominating religion)। এক্ষেত্রে ধর্মকে সামাজিক পরিমণ্ডলের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সকল মুসলমানের জন্য কোরআন পড়া এবং তারা যেভাবে উপযুক্ত মনে করে সেভাবে একে বুঝার সুযোগ রাখতে হবে। বহুত্ববাদে কোনো সমস্যা নেই। এটা মানুষের মধ্যে সহনশীলতা তৈরি করে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্যে মুসলমানদের প্রয়োজন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। ইসলামে যে ‘শুরা’র ধারণা রয়েছে, তার সঠিক মূল্যায়ন করতে এটাই সবচেয়ে ভালো উপায়।

চার্চের মতো একক ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদী প্রতিষ্ঠান আমাদের ঐতিহ্যে নেই। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। শুধু আমাদের শিয়া ভাইয়েরা এ ধরনের কর্তৃত্ববাদী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশ্বাসী। সুন্নীদের মধ্যে স্কলারদের কাউন্সিল বা এ ধরনের কোনো ব্যাপার নেই, যারা বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিমত এবং নানা ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে পারেন। তাই আমাদের প্রচুর স্কলার ও বুদ্ধিজীবী দরকার, যারা মুক্ত পরিবেশে আমাদের ইস্যুগুলো নিয়ে গবেষণা ও বিতর্ক করবেন এবং নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইনসভাকে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন।[3]

রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক
আমাদের দেশে সেক্যুলার ও ইসলামপন্থীদের মধ্যে বিতর্ক চলছে। উভয় পক্ষই একে অপরকে চরমপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করছে। একটা পক্ষ রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ইসলাম সম্পর্কে তাদের বুঝজ্ঞানকে উপর থেকে চাপিয়ে দেয়ার পক্ষপাতি। আরেকটা পক্ষ রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও জাতীয় সংস্কৃতি থেকে ইসলামের প্রভাব উপড়ে ফেলতে আগ্রহী।

মুসলিম বিশ্বসহ পুরো বিশ্বে এখন একটা ধর্মীয় পুনর্জাগরণ চলছে। পোপ দ্বিতীয় জন পল যে কার্যক্রম শুরু করেছিলেন, সেই সূত্রে পূর্ব ইউরোপে ক্যাথলিক চার্চের অধিকতর ভূমিকা দৃশ্যমান হচ্ছে। পুতিনের পক্ষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের সাফল্যও লক্ষ্যনীয়। এমন এক সন্ধিক্ষণে সংস্কৃতি ও শিক্ষাব্যবস্থা সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে ধর্মের প্রভাবের বিরোধিতা করাটা অযৌক্তিক। তবে ইসলামকে চাপিয়ে দেয়ারও প্রয়োজন নেই। এটা অভিজাতদের ধর্ম নয়, এটা গণমানুষের ধর্ম। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য নয়, ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা আছে বলেই ইসলামের এত অনুসারী এবং দীর্ঘসময় ধরে এটি টিকে আছে। রাষ্ট্র বরং প্রায়শ ধর্মের উপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমি আগেও বলেছি, ইসলামপন্থী বা অন্যান্য ধারার সাথে যারা যুক্ত তাদের অনেকের মধ্যে রাষ্ট্রের বন্ধন থেকে মুক্ত করে ধর্মকে একটা সামাজিক ব্যাপার হিসেবে রেখে দেওয়ার ব্যাপারে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। রাষ্ট্র কেন ইমামদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়? কেন মসজিদকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়?

রাষ্ট্রের পক্ষে নিরপেক্ষ থাকাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদসঙ্কুল ব্যাপার। ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ বলতে কি বুঝানো হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করছে এটা গ্রহণযোগ্য নাকি বর্জনীয়। ওহীর প্রত্যক্ষ বিষয় এবং প্রায়োগিক রাজনৈতিক বিষয়ের মধ্যকার পার্থক্য প্রাথমিক যুগের মুসলিমরা যেভাবে বুঝতেন সেভাবে যদি বিবেচনা করা হয় – অর্থাৎ রাষ্ট্র হচ্ছে একটা মানবীয় ব্যাপার, আর ওহী হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত – তাহলে তা ঠিক আছে। আর যদি একে ফরাসী ধারণা কিংবা মার্কসীয় অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে তা ভয়ানক বিপদজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। এই ব্যাখ্যা রাষ্ট্র ও ধর্ম উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণের ফলে রাষ্ট্র মাফিয়াচক্রে পরিণত হবে, বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হয়ে পড়বে লুণ্ঠনবাদী, রাজনীতি হয়ে পড়বে প্রতারণা ও ভণ্ডামিপূর্ণ। কিছু ইতিবাচক দিক ছাড়া বাকি ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যে ঠিক এই ব্যাপারগুলোই ঘটেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি অল্প কয়েকজন অর্থনৈতিক দালালের খপ্পড়ে বন্দি। এরা প্রচুর অর্থের মালিক, অসংখ্য মিডিয়া তাদের হাতে। এসবের মাধ্যমে তারা রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণ করে।

এই বিবেচনায় মানুষের জন্যে ধর্ম খুবই প্রয়োজনীয়। ধর্মের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক নির্দেশনার ফলে মানুষ ন্যায় ও অন্যায়ের (হালাল ও হারাম) মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে।[4] হালাল-হারাম নির্ধারণে চার্চের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের ব্যাপার যেহেতু ইসলামে নেই, তাই এসব বিষয় অগ্রগণ্য চিন্তাবিদগণ, জনগণ ও মিডিয়া আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি থেকে ধর্মকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এবং সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অতএব, মানুষের মুক্তি ও অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারবে – এমন একটা ভারসাম্যপূর্ণ রাস্তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। ধর্মই এই কাজটি করতে পারে। এই ভারসাম্য অর্জন করতে আমাদেরকে ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণ প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হবে। ধর্মের কোনটা অপরিবর্তনীয়, আর কোনটা পরিবর্তনীয় – সেই মানদণ্ড ঠিক করতে হবে। আমাদের আইনপ্রণেতাদেরকে ধর্মের মূল্যবোধ সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত ও প্রশিক্ষিত হতে হবে। এমন লোকেরা আইন প্রণয়ন করতে গেলে শুধুমাত্র ধমীয় স্কলারদের মুখাপেক্ষী থাকার দরকার পড়ে না। একই কথা রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ধর্মীয় ইবাদত পালনে বল প্রয়োগের মধ্যে কোনো ফায়দা নেই। রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তির মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্য বান্দাদের মুনাফিকে পরিণত করার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। মানুষকে স্বাধীন হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষের বাহ্যিক কিছু দিককে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও তাদের অন্তরের অবস্থা ও দৃঢ় বিশ্বাসকে পরিবর্তন করা অসম্ভব।

হেডস্কার্ফ বা নেকাব হলো এক্ষেত্রে আমাদের সামনে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। এর দুইটা মডেল রয়েছে। প্রথমটিতে নেকাব পরিধানের রাষ্ট্রীয় হুকুম তামিল করতে বাধ্য করা হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে রাষ্ট্র নেকাবকে নিষিদ্ধ করেছে। একবার আমি একটি মুসলিম দেশের এয়ারপোর্টে সব নারীকেই বোরকা পরিহিত অবস্থায় দেখলাম। কিন্তু বিমানটি আকাশে উড়ার সাথে সাথে সব বোরকাও উড়ে গেল! এটা যে ওই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা, তা স্পষ্ট। জনগণের ধর্মপালনের নিশ্চয়তা সাধনে দেশটি দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বেন আলীর শাসনামলে তিউনিসিয়ায় নারীদের নেকাব পরা নিষিদ্ধ ছিল। নারীরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক পরে জনসমক্ষে আসতে পারতো না। এখানেও রাষ্ট্র দমনপীড়ন চালিয়েছে এবং ব্যর্থ হয়েছে।

বিশ্বাসের স্বাধীনতা
ধর্মের মূল ক্ষেত্র হচ্ছে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, রাষ্ট্রীয় ব্যাপার নয়। আর রাষ্ট্রের সর্বপ্রথম দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের সেবা তথা কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ইত্যাদি নিশ্চিত করা। মানুষের হৃদয়-মন নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রের কাজ নয়। এ কারণে আমি জনগণের উপর সব ধরনের বলপ্রয়োগের বিরোধী। “ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই” কোরআনের এই আয়াতের উপর ভিত্তি করে আমি মানুষের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী চলা কিংবা ধর্মত্যাগ করার স্বাধীনতার পক্ষে।

কাউকে জোর করে মুসলিম বানানোর কোনো মানে নেই। প্রকাশ্যে বিশ্বাসী, আর অন্তরে অবিশ্বাসী – মুসলিম জাতির এ ধরনের কোনো আত্মপ্রতারকের দরকার নেই। স্বাধীনতা এমন একটা মৌলিক ব্যাপার, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ইসলামের ওপর অবিচল থাকতে পারে। অতএব যিনি কালিমায়ে শাহাদাত ঘোষণা করেন, তিনি স্বাধীন ইচ্ছার ভিত্তিতেই সেটি করেন। যার মূলে রয়েছে সচেতনতা এবং দৃঢ় বিশ্বাস।

মক্কার লোকেরা যখন মোহাম্মদকে (সা) তাঁর ধর্মের ব্যাপারে আপত্তি জানালো, তখন তিনি তাঁর দাওয়াতী তৎপরতায় হস্তক্ষেপ না করতে তাদেরকে অনুরোধ করেন। তিনি লোকদের কাছে তাঁর বাণী প্রচারের স্বাধীনতা চাইলেন। মক্কার লোকেরা যদি তাঁকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিতো, তাহলে তিনি মাতৃভূমি ছেড়ে হিজরত করতেন না। তাঁর বাণী এতোই শক্তিশালী ছিল যে, তারা একে দমিয়ে রাখতে বিকল্প কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না। একমাত্র সত্য হওয়ার কারণে ইসলাম এতই শক্তিশালী যে, এর প্রতি আকৃষ্ট করতে মানুষের ওপর পেশিশক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। যাবতীয় রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ে ইসলাম ঘোষণা করে – “যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তাহলে প্রমাণ হাজির করো”।[5]

শেষ কথা
আমাদের দেশে চলমান বিতর্কের অধিকাংশই সেক্যুলারিজম ও ইসলাম নিয়ে ভুল বুঝাবুঝির কারণে হচ্ছে। আমরা বাস্তবে দেখিয়েছি যে – সেক্যুলারিজম কোনো নাস্তিক্যবাদী দর্শন নয়। বরং বিশ্বাস ও চিন্তার স্বাধীনতাকে অক্ষুন্ন রাখতে এটা একটা প্রক্রিয়াগত ব্যবস্থা। আব্দুল ওয়াহহাব আল মাসিরি তাঁর গবেষণায় কট্টর সেক্যুলারিজম ও উদার সেক্যুলারিজমের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছেন। কট্টর সেক্যুলারিজমের উদাহরণ হিসেবে ফ্রান্সের ইতিহাস থেকে জ্যাকবীয় মডেলের কথা বলা যায়। যাজকতন্ত্রের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ চলছিল, তখন জ্যাকবীয়দের প্রধান শ্লোগান ছিল – “শেষ রাজাকে ফাঁসি দাও শেষ পাদ্রিটার দড়িতে” (strangle the last king with the entrails of the last priest)। এটা হচ্ছে ফ্রান্সের বাস্তবতা, যেটি সেক্যুলারিজমের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। ইসলাম নিয়েও এ ধরনের কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। এ কারণে অনেকে মনে করে – ইসলাম শুধু মানুষের স্বাধীনতা হরণ করে বিজয়ী হতে চায় এবং জোরপূর্বক নামাজ, রোজা ও নেকাবের মতো বিষয় চাপিয়ে দিতে চায়। অথচ ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ্য থেকে এগুলো অনেক দূরের ব্যাপার। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা কপটতাকে সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছেন। কপট লোকদের জন্যে চিরস্থায়ী দোজখের আগুন রয়েছে বলে সাবধান করা হয়েছে।

আমরা ইতোমধ্যে বিপ্লবের মাধ্যমে একটা স্বৈরাচারকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়েছি। এই বিপ্লব আমাদেরকে নাগরিক মূল্যবোধ মেনে চলার কথা বলে। এই দেশ নির্দিষ্ট কোনো দলের হবে না। বরং এই দেশ হবে ধর্ম, লিঙ্গ বা অন্য যে কোনো বিবেচনার ঊর্ধ্বে সকল নাগরিকের। নাগরিকদের সমঅধিকার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে যে কোনো কিছু করার স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের প্রতিনিধিদের দ্বারা সংসদে প্রণীত আইন মেনে চলার অধিকার ইসলাম আমাদেরকে দিয়েছে।

সেক্যুলারিজমের সাথে ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে এই হচ্ছে আমার দৃষ্টিভঙ্গি। আশা করি আমি মূল ব্যাপারটা বলতে পেরেছি। মনোযোগ দিয়ে শোনার জন্যে আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।

নোট

[1] জনাব মোস্তফা বিন জাফর বিপ্লবোত্তর তিউনিশিয়ার নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত National Constituent Assembly’র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি এই সিম্পোজিয়ামে উপস্থিত ছিলেন।

[2] মহানবীর (সা) ‘নবুওয়াতি মর্যাদা’ নিয়ে শায়খ তাহের বিন আশুর ব্যাপক কাজ করেছেন। তাঁর গবেষণায় এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

[3] এ বিষয়টিকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত আইনসভার ধারণার পরিবর্তে শ্রেণী, পেশা ও যোগ্যতানির্ভর প্রতিনিধিত্বশীল আইনসভার ধারণা আমাদেরকে বিবেচনায় রাখতে হবে। – অনুবাদক

[4] সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস নৈতিকতাকে উদ্দেশ্যপূর্ণ ও স্থায়ী ভিত্তি প্রদান করে। নৈতিকতার জন্যে ধর্ম অপরিহার্য শর্ত না হলেও ধর্ম বহির্ভূত নৈতিকতার কোনো বস্তুগত ভিত্তি (objective reality) পাওয়া যায় না। – অনুবাদক

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!