সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা আছে হুমকি নেই

বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে এ মাসেই এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন না হলে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বা ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন থাকলেও এর মধ্যে কোনো হুমকি নেই বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম ও বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান।

ওয়াশিংটনে প্রভাবশালী নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টার সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক বাংলাদেশি সাংবাদিককে ওই প্রস্তাব ও রাজনীতি সম্পর্কিত বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। উইলসন সেন্টার পরে সেই প্রশ্নোত্তর পর্বের ভিডিও প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশ ভারত আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় দেখতে চায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে ভারতের অস্বস্তি আছে। অন্যদিকে চীনের কাছে ব্যাবসায়িক স্বার্থই বড়। যেকোনো সরকারের সঙ্গে চীন কাজ করতে পারবে। বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের যোগাযোগ আছে বলেও উল্লেখ আছে উইলসন সেন্টারের ওই ভিডিওতে।

উইলসন সেন্টারের গবেষকরা বলেন, বিরোধীরা জাতিসংঘের মধ্যস্থতার অনুরোধ করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। সরকার অনুরোধ না করলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতার সুযোগ সীমিত। তা ছাড়া জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র কেউই বাংলাদেশের সমস্যা সমাধান বা অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন করে দিতে পারবে না। এটি বাংলাদেশকেই করতে হবে।

উইলসন সেন্টারের পলিসি স্কলার সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বেশ জোরালোভাবে অনুভব করে যে সত্যিকারের সঠিক গন্তব্যের পথে উঠতে বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রয়োজন। আমি অনুভব করি, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

না হলে কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে উইলসন সেন্টারের এশিয়া কর্মসূচির উপ-পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি জানার সময় এখনো আসেনি। কংগ্রেসের ওই প্রস্তাবের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হলো যুক্তরাষ্ট্র যে বাংলাদেশের দিকে নজর রাখছে, তার বহিঃপ্রকাশ। আমার মনে হয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার নির্বাচনপূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে অনেক সম্পৃক্ত আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের অর্থ হলো বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের, অন্তত ক্যাপিটল হিলের অনেক স্বার্থ জড়িত। তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। তবুও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তার শীর্ষ অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখছে না।’

কুগেলম্যান বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ নিয়ে কংগ্রেসে আরো প্রস্তাব উঠেছিল। সেটি ভিন্ন ধরনের প্রস্তাব, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ না করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। আমার মনে হয়, নির্বাচন নিয়ে গৃহীত প্রস্তাবের চেয়ে নেই প্রস্তাবটি কম উদ্দেশ্যপূর্ণ ও কম নিরপেক্ষ।’ তিনি বলেন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে শুনানিতেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক স্বার্থের কথা উঠে এসেছে। অন্তত নির্বাচনের প্রাক্কালে ক্যাপিটল হিলে এটি হয়েছে।

অন্যদিকে সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম বলেন, ‘আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার, নির্বাহী বিভাগ অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে পাঁচ বছর আগের চেয়ে বেশি সতর্ক করেছে। পাঁচ বছর আগে তাদের সঙ্গে কাজের সুবাদে আমি জানি, তখন পুরোপুরি ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল। আর আমরা জানি কেমন নির্বাচন হয়েছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচন যে পুরো প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছে, তা আমি বলব না। তবে আমলে নেওয়ার মতো বিষয় হলো, নির্বাহী বিভাগও সক্রিয় হয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরোর প্রধান অত্যন্ত জোরালো বিবৃতি দিয়েছেন। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূতও এমনটি করেছেন।’

বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের প্রস্তাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে প্রশ্ন ছিল দুই বিশ্লেষকের কাছে। এর আগে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে আইন বিভাগে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর নির্বাহী বিভাগ যেমন উদ্যোগ নিয়েছে, এ ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও ছিল।

জবাবে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম বলেন, ‘আমি জানি না নির্বাহী বিভাগ এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে কাজ করবে কি না। ওই প্রস্তাব মানা না হলে করণীয় কী হবে, তা সেখানে উল্লেখ আছে কি না, তা আমার জানা নেই। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার, বিশেষ করে নির্বাহী বিভাগ প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার আগে থেকেই সক্রিয় ছিল এবং এখনো আছে।’ তিনি বলেন, সক্রিয় হওয়ার অর্থ সেখানে স্বার্থ ও প্রত্যাশা আছে। এর অর্থ এই নয় যে এটি কোনো ধরনের হস্তক্ষেপে গড়াচ্ছে বা কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এরপর কুগেলম্যান বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে কংগ্রেসে অসংখ্য প্রস্তাব ওঠে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। তাই আমি মনে করি, আমাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। হ্যাঁ, নির্বাচন নিয়ে প্রস্তাবটি উঠেছে নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কেউ এর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে—এটি বাস্তবসম্মতও নয়।’

বাংলাদেশের নির্বাচনকে এ অঞ্চলের দেশগুলো কিভাবে দেখছে—এমন প্রশ্নের জবাবে কুগেলম্যান বলেন, ‘ভারত নিঃসন্দেহে এই নির্বাচন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বেশ নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আমার মনে হয়, ভারত চাইবে আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় থাকুক।’ বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটকে তুলনামূলকভাবে ‘ইসলামপন্থী’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতে রক্ষণশীল হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার বাংলাদেশে তাদের ক্ষমতায় আসার পরিস্থিতি দেখলে অস্বস্তি বোধ করবে। এ কারণে ভারত নিবিড়ভাবে নজর রাখছে। তিনি আরো বলেন, চীন বাংলাদেশে আরো ব্যবসা বাড়াতে চায়। তারা বিশাল ‘এক অঞ্চল, এক পথ’ পরিকল্পনা বিস্তারের চেষ্টা করছে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন তার সঙ্গেই কাজ করতে চীন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।

কুগেলম্যান বলেন, ‘পুরো অঞ্চল কী ভাবছে, তা নিয়ে চিন্তা করলে বাড়তি গুরুত্বই দেওয়া হবে। ভারতই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। চীন ততটা নয়। তবে নিঃসন্দেহে পাকিস্তান। বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের যোগাযোগ আছে। তবে আমার মনে হয়, পুরো অঞ্চল এ নির্বাচনের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে এটি বললে অতিরঞ্জিত হবে।’ তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বল্পসংখ্যক পর্যবেক্ষক পাঠানোর পরিকল্পনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে যুক্তরাষ্ট্র আসলে এ নির্বাচনকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।

জাতিসংঘ কী ভূমিকা রাখছে—জানতে চাইলে কুগেলম্যান বলেন, ‘জাতিসংঘ নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিচ্ছে। আমি বুঝতে পারি, বিরোধী দলের মধ্যস্থতা করার অনুরোধ জাতিসংঘ ফিরিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ যা বলেছে, তা যৌক্তিক। জাতিসংঘকে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণ পেতে হবে।’ তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হয়েই জাতিসংঘ বিবৃতি দিচ্ছে। জাতিসংঘের ভূমিকা রাখার সুযোগ সীমিত। আহ্বান জানানো ছাড়া তার তেমন কিছু করার নেই। দিন শেষে সবাই যতটা সম্ভব অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করে। নির্বাচনের আগে ভোটের জন্য হেফাজতে ইসলামকে আস্থায় নেওয়ার সমালোচনা করেন মাইলাম। তিনি বলেন, এ থেকেও বোঝা যায়, আওয়ামী পুনর্নির্বাচিত হওয়ার জন্য মরিয়া। কুগেলম্যান বলেন, নির্বাচনের আগে এমন প্রবণতা স্বাভাবিক। ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ প্রকাশের কথা উল্লেখ করে এবার অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে যুক্তরাষ্ট্র কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে—জানতে চাইলে মাইলাম বলেন, ২০১৪ সালে ওই প্রতিক্রিয়া দেখানো ছাড়া উপায় ছিল না। এমন নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হলে এবারও হয়তো কিছু প্রতিক্রিয়া হবে। কারণ আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ বাংলাদেশের জন্য সময় দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে আমরা ভেবেছিলাম দ্রুত একটি নির্বাচন হবে। শুধু বাংলাদেশিরাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে। আমরা করে দিতে পারব না। এটি বাংলাদেশিদেরই বিষয়।’

প্রশ্নকারী সাংবাদিক যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের পৃষ্ঠপোষক’ অভিহিত করে বক্তব্য দিলে প্রতিক্রিয়ায় মাইলাম বলেন, ‘আমি এ নিয়ে আর বাজি ধরি না।’ এরপর কুগেলম্যান হাসতে হাসতে বলেন, ‘সময় বদলে গেছে।’ kalerkontho

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!