সুলতান সুলেমান থেকে খলিফা এরদোগান,একজন সফল ‘রাষ্ট্রনায়কের’ ‘বিশ্বনেতা’ হয়ে ওঠার রহস্য

এফ শাহজাহান

মনে হতে পারে প্রাগম্যাটিজম বা বুদ্ধিমত্তা,বিচক্ষণতা , প্রজ্ঞা কৌশল আর দূরদর্শিতার সমন্বয় করতে পারার কারনেই এরদোয়ান আজ মুসলিম বিশ্বের জনপ্রিয় সুলতান সুলেমান হয়ে উঠেছেন।

আবার কারো মনে হতে পারে, ক্যারিশম্যাটিজম বা যাদুবাস্তবতার মিশেল ঘটিয়ে মানুষের মন জয় করতে করতে এরদোগান আজ মজলুম মুসলিম মিল্লাতের খলিফা হতে সক্ষম হয়েছেন।

এরদোগানের বিজয়ের জন্য প্রাগম্যাটিজম বা ক্যারিশম্যাটিজম যেটাই বলেন না কেন, বিশ্বরাজনীতির সাম্প্রতিক গতি প্রকৃতি এবং ভূরাজনৈতিক প্রবণতা  কোনটাই খলিফা এরদোগানের জন্য অনুকুল ছিল না। সবটাই ছিল চরম প্রতিকুল ।

তাই শুধু প্রাগম্যাটিজম অথবা ক্যারিশম্যাটিজমই তাকে সাফল্য এনে দেয়নি।এর পেছনে কাজ করেছে আরো কিছু দৃষ্টিভঙ্গিগত বিষয়।

তার নিজের দেশ এবং সেই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও ছিল তার এবং তার দলের বিজয়ের জন্য চরম এক চ্যালেঞ্জ।  বৈশ্বিক ইসলামোফোবিয়া ,ট্রাম্পজিশন, জায়নিজমের দুনিয়াব্যাপি অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসন, সবকিছু মোকাবেলায় তার এ বিজয় সত্যিই দুনিয়াজুড়ে চুলচেরা বিশ্লেষনের দাবি রাখে।

সে কারনে আমরা তার বিজয়ের পেছনের শক্তিকে প্রাগম্যাটিজম আর ক্যারিশম্যাটিজম যেটাই বলি না কেন, এটা স্বীকার করতেই হবে যে নিশ্চয় কোন ‘ম্যাচমেরিজমের’ জোরে এরদোয়ানের এই বিজয় অর্জিত হয়নি।

‘ম্যাচম্যারিজম’টা কী ?

‘ম্যাচম্যারিজম’ হল ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা।  অথবা ভোটাররা যাকেই ভোট দিক না কেন,যিনি ক্ষমতায় থাকবেন,ভোট গণনার পর দেখা যাবে তিনিই বিজয়ী হয়েছেন।

ম্যাচম্যারিজম এর মুল কথা হল,

যারা ভোট দিচ্ছেন তারা গুরুত্বপুর্ণ নন,যারা ভোট গণণা করেন তারাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এরকম কোন ম্যাচম্যারিজম এর সুযোগ ছিল না এরদোগানের সামনে।

তাহলে কীসে তার এই অবিরাম বিজয় সম্ভব হচ্ছে ?

আসুন সেটাই এবার বিশ্লেষন করে দেখি।

এই বিজয়ের জন্য তার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সাফল্য নিহিত আছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ইউরোপের মস্তকে বসে এই যে এরদোয়ান নিজের ক্যারিশমা দেখাচ্ছেন, তা কেবল শুধুই তার দূরদর্শিতা এবং কর্মকৌশলের কারণে এমনটা ভাবাও ঠিক নয়।

তাহলে কী ছিল তার সেই দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার মুলমন্ত্র ?

” যদি উড়তে না পার তবে দৌড়াও ’’
তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষতাকে মেনে নিয়েই রাজনীতি করছেন এরদোয়ান । কামালের ধর্মনিরেপক্ষতায় ছিলো, সব ধর্মকে নিরুৎসাহিত করা । এরদোয়ান বললেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হলো সব ধর্ম পালনের অধিকার। ধর্ম পালন করলে যেমন বাধা দেয়া যাবেনা, তেমনি না পালন করলেও বাধ্য করা যাবেনা। এই আদর্শ একে পার্টিতেও প্রয়োগ করলেন তিনি। সেজন্য দেখা যায়,  হিজাবমুক্ত অনেক মহিলা কর্মী একে পার্টির হয়েছেন। এরদোয়ানের এ নীতির কারণে তুরস্কের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান বাধাহীনভাবে ইসলাম পালনের সুযোগ পায়।তাছাড়া, একে পার্টির সদস্য হওয়ার শর্ত ধর্ম পালনও নয়। সততার প্রতি আপোষহীন থাকাকেই এখানে প্রাধান্য দেয়া হয়।

এরদোগানের এই নীতিটা হচ্ছে সাময়িক।এই নীতির পেছনের দর্শণ হচ্ছে”যদি উড়তে না পার তবে দৌড়াও’’ ।

এরফলে ২০০৩ সালে প্রথম যখন তিনি ক্ষমতায় আসেন,তখনই তিনি  তড়িঘড়ি করে বিপ্লবী হয়ে উঠেন নি । এর পূর্বে মেয়েরা বিকিনি পরিধান করে উলঙ্গ হয়ে রাস্তায় ঘুরাফিরা করত। বর্তমানে সেই সব মহিলাদের অধিকাংশই পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে রাস্তায় বের হন। এরদোগান ক্ষমতায় আসার পূর্বে তুরস্কের সমস্ত সরকারী প্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ব ছিল। সেনাবাহিনীতে নামাজ পড়ায় নিষেধাজ্ঞা ছিল।

একবারে হুকুম জারি করে নয়,তিনি পর্যায়ক্রমে সেই সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন। বর্তমানে তুরস্কে হিজাবের বিপ্লব চলছে। যা দুই দশক আগে কল্পনাও করা যেত না।

“ যদি দৌড়াতে না পার তবে হাঁটো ”
তুরস্কের কট্টর বাম ও কট্টর ডানপন্থীদের কাছে এরদোয়ান নিকৃষ্ট মানুষ।এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় এরদোগানের এই নীতিটা হচ্ছে  ‘ যদি দৌড়াতে না পার তবে হাঁটো’ দর্শনের ভিত্তিতে নেওয়া । এরদোয়ান এমন মধ্যপন্থার আশ্রয় নিয়েছেন, যেখানে সুবিচার ও সুশাসনই মূল কথা। ফলে সব শ্রেণির মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ঠ হতে বাধ্য হয়েছেন।

ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর স্ত্রী হিজাব পরিধান করে একটি অনুষ্ঠানে আসার কারনে তুরস্কের তৎকালীন সেনাপ্রধান প্রকাশ্যে বিরোধীতা করেন। এবং সেই অনুষ্ঠান বর্জন করেছিলেন।

তুরস্কে একসময় আজান নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৫০সালে প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেস আজানের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিলেন। একারনে সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এবং তাঁকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল। ৯০এর দশকে প্রধানমন্ত্রী এরবাকান একটি ইফতার মাহফিল করায় সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেয়।

সেই তুরস্কে এরদোগান ক্ষমতায় এসে একসাথে সবকিছু করেননি। ধীর স্থীরভাবে ঠান্ডা মাথায় কাজ করছেন। সর্বপ্রথম তিনি প্রভাবশালী সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। দেশে দৃশ্যমান উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েছেন। সাধারণ পোশাক পরে তিনি কৌশলে স্যাকুলার তুরস্ককে পুরোপুরি ইসলামীকরনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

“ যদি হাঁটতে না পার,তবে হামাগুড়ি দাও”

এরদোয়ান কখনোই কোন পপুলার কনসেপ্টের আশ্রয় নেন নি। তিনি দেশের প্রয়োজনে যৌক্তিক একটি মডেল উপস্থাপন করেছেন, যেটা প্রচলিত বাম ও ইসলামী আন্দোলনের ধারণাকে ভেঙ্গে দিয়েছে। তিনি একটি সুদূরপ্রসারী ও প্রাজ্ঞ চিন্তার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তার একে পার্টির কর্মপন্থায়, ফলে হুজুগে নয়; জনগণ জাগরণে-মননে ধারণ করছেন একে পার্টির আদর্শকে । এরদোগানের এই নীতিটা হচ্ছে  ‘’যদি হাঁটতে না পার,তবে হামাগুড়ি দাও’’ দর্শনের ভিত্তিতে নেওয়া। ফলে তিনি বারবার নির্বাচিত হচ্ছেন ।

এজন্য ক্ষমতায় এস তিনি হাম্বিতম্বি করেননি । ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি তুরস্কে প্রায় ৮হাজার মসজিদ নির্মান করেছেন। ইউরোপের অধিকাংশ দেশে তুরস্কের সরকারী অর্থায়নে মসজিদ নির্মান করে দিয়েছেন। তাদের বেতন ও তুরস্ক সরকার বহন করে থাকে। তার সময়ে তুরস্কের সমস্ত কলেজ ভার্সিটি ও স্কুলে মসজিদ নির্মান করা হয়েছে। তিনি প্রত্যেক স্কুল কলেজ ও ভার্সিটিতে ইসলামী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছেন। এমনকি নাস্তিকদের ছেলে মেয়েরাও এখন সেখানে কোরআনের আয়াত মুখস্ত ও ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক শিখতে হচ্ছে।

এরদোগান ঘোষণা দিয়েছেন: আমরা কখনো নাস্তিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারি না। এটা আমাদের মিশন হতে পারে না। আমরা একটি ধার্মিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই।

 “ যাই করনা কেন, মনে রেখ সামনে এগিয়ে যেতে হবেই ’’

ব্যর্থ সেনা অভুত্থানের পর এরদোয়ান ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ককে পাকাপোক্ত করেছেন । তবে সিরিয়ার ব্যাপারে তিনি তার রাষ্ট্রের নীতিতে অটল থেকেছেন । এরদোয়ান ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্কচ্ছেদ করেন নি কৌশলগত কারণে ।  ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক একটি চুক্তির ভিত্তিতে হয়েছে, এর ফলে ফিলিস্তিনে ত্রাণ সরবরাহ সহজ হয়েছে । চুক্তির কারণে যেকোন সময় ইসরায়েলের উপর চাপ প্রয়োগের সুযোগ তৈরী হয়েছে । এরদোয়ান ক্ষমতায় এসেই সংস্কার শুরু করেন নি। তিনি প্রথমে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন । পরে তিনি ধীরে ধীরে সংস্কার কাজে হাত দিয়েছেন ।

তার এই দর্শনের মুলমন্ত্র ছিল “ যাই করনা কেন, মনে রেখ সামনে এগিয়ে যেতে হবেই ’’ ।

এই কনসেপ্ট তুরস্কের মানুষের কাছে পছন্দ হয়েছে । তিনি ক্ষমতায় গিয়ে গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করেন নি। সমালোচনার পরিবেশকে উন্মুক্ত রেখেছেন । এমনকি তাকসিম স্কয়ারে বিক্ষোভকেও শক্তভাবে প্রতিরোধ করেন নি।

জেরুজালেম ইস্যুতে সবচেয়ে সোচ্চার ভুমিকা পালন করছেন তিনি। বাইতুল মুকাদ্দাসকে রক্ষার জন্য ৫৭টি মুসলিম দেশকে নিয়ে ইসলামী সেনাবাহিনী গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। ৩০লাখ সিরীয় মুসলিম শরনার্থীকে তার দেশে আশ্রয় তো দিয়েছেন। এবং তাদের উচ্চ শিক্ষাও নিশ্চিত করছেন। পৃথিবীর নির্যাতিত মুসলিমদের দান খয়রাতে নজির সৃস্টি করেছেন। এই মুহুর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে দানশীল দেশ তুরস্ক। এছাড়াও রুহিঙ্গা ইস্যু সহ মুসলিমদের প্রায় সব ইস্যুতে তিনি সোচ্চার রয়েছেন।

৫৭টি মুসলিম দেশের সংগঠন ওআইসির বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন এরদোগান ।

“ সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়াই সাফল্যের বড় শর্ত ”

ব্যর্থ  সেনা অভ্যূত্থানের পর তিনি লৌহমানবের যে পরিচয় দিয়েছেন, সেটাও তার প্রাগম্যাটিজম আর ক্যারিশম্যাটিজমজেক বাড়িয়ে দিয়েছে। সবকিছু মিলেই সময় এখন শুধুই এরদোগানের।

“ আপাতত আর কেউ নেই ”

মজলুম জনতাকে একটু দরদ দিয়ে কথা বলে মন ভালো করে দেয়ার মতো কোনো নেতা দুনিয়াতে বেঁচে নাই। দুনিয়া এখন নেতাহীন, নেতৃত্বের হাহাকার। মিথ্যে স্বপ্ন দেখানোর জন্য পর্যন্ত কোনো নেতা দুনিয়ায় পাওয়া দুষ্কর।

এমন দু:সময়ে মজলুম মানবতার সামনে একমাত্র এরদোগান।   তিনি ছাড়া আপাতত আর কেউ নেই।  এরদোয়ানের একটি বক্তব্য, তাঁর বডি ল্যাংগুয়েজ দিকহারাদেরকে ভালো লাগাচ্ছে, অন্তরে প্রশান্তি জাগাচ্ছে ।  সেজন্য এখন তিনিই মুসলিম  মিল্লাতের কান্ডারী হয়ে উঠছেন।  তার প্রতি মুসলিম বিশ্বের এই মানসিকতা দেখে তার বিরোধীপক্ষ শুধু হতাশই হচ্ছেন না,তারা খেই হারিয়ে ফেলছেন।

এসব কিছুই এরদোগানের লাগাতর বিজয়কে ত্বরান্বিত করছে। আগামীতেও করবে।

Asianbarta.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!