সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি নির্বাচন:আওয়ামী প্যানেলের ভরাডুবির নেপথ্যে

ভরাডুবির কারণ খুঁজছে আ’লীগ

 

 

 

 

 

 

 

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) ২০১৮-১৯ সেশনের নির্বাচনে ভরাডুবির কারণ খুঁজছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিএনপি-জামায়াত-সমর্থিত প্যানেলের কাছে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত প্যানেলের শোচনীয় হারের নেপথ্যে ইতোমধ্যে বেশ কিছু কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে নিম্ন আদালতের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞার ‘বাধ্যতামূলক’ প্রস্থান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন ইস্যু এবং সর্বোপরি ক্ষমতাসীন দলের আইনজীবীদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও কোন্দলকে দায়ী করা হচ্ছে। এসব ইস্যুতে সরকারের ভূমিকা ভালোভাবে নেননি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীরা। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নির্বাচনে।সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের এবারের নির্বাচনে সভাপতি ও সম্পাদকসহ ১০টি পদে বিজয়ী হয় বিএনপি-জামায়াত-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা। অন্য দিকে আওয়ামী লীগ তথা সরকার সমর্থিত প্যানেল পায় ছয়টি পদ। সভাপতি পদে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত নীল প্যানেল থেকে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ৫৪ ভোট বেশি পেয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেলের অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে হারান। সম্পাদক পদে বিএনপি-জামায়াত-সমর্থিত নীল প্যানেলের ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ৪৪১ ভোট বেশি পেয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেলের অ্যাডভোকেট এস কে মো: মোরসেদকে হারিয়ে জয়লাভ করেন।নির্বাচনে এ বিজয়কে সরকারের বিরুদ্ধে জনরায়ের প্রতিফলন বলে ইতোমধ্যেই আখ্যায়িত করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা বলেছেন, বিচারাঙ্গণকে কুক্ষিগত করাসহ সরকারের বিভিন্ন ধরনের অন্যায় ও অত্যাচারের প্রতিফলন ঘটেছে আইনজীবীদের নির্বাচনে। আইনজীবীরা অনেক সচেতন। তারা ভোটের মাধ্যমে বিরোধী দল ও মতকে দমন, আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসনের অভাব, পুলিশের হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডসহ সব কিছু নিয়ে সরকারের বাড়াবাড়ির প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সুপ্রিম কোর্ট বারকে বিএনপিপন্থীদের নেতৃত্ব থেকে পুনরুদ্ধার করে নিজেদের কব্জায় নিতে সব ধরনের চেষ্টাই করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা। এ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের আইনজীবী নেতাদের কঠোর নির্দেশনা দেন। আইনজীবীদের কোন্দল মিটিয়ে যেকোনো মূল্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেলের বিজয় নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়া দলের হাই কমান্ড থেকে।এমন প্রেক্ষাপটে বার পুনরুদ্ধার করতে আইনজীবী নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামেন। প্যানলের বিজয় নিশ্চিত করতে দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবী নেতারা। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল তাদের পক্ষে যায়নি। নানা চাপে থেকেও বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্যানেলের এ বিপুল বিজয়ে চরম হতাশ হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং বিএনপির চরম সঙ্কটেও এ ধরনের বিজয় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। বিশেষ করে সভাপতি পদে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য এবং প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ূনের হার কোনোভাবেই মানতে পারছেন না তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুইজন নেতা বলেন, ‘বিচারাঙ্গণ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড আইনজীবীরা ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। সেজন্য ব্যালটের মাধ্যেমে তাদের মতামত তুলে ধরেছেন।’ নির্বাচনের এ ফলাফল নিয়ে আওয়ামী লীগে বিশ্লেষণ চলছে বলে জানান তারা।বিচারাঙ্গণ নিয়ে সরকারের কোন কোন কর্মকাণ্ড আইনজীবীরা ভালোভাবে নেননি সে সম্পর্কে জানতে চাইলে তাদের একজন বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগ নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তার প্রতিফলন ব্যালটে দেখা যায়।’দলের সম্পাদকমণ্ডলীর একাধিক সদস্যের মতে, ‘নিম্ন আদালতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার জামিন আটকে দেয়ার বিষয়টিও এ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ পন্থী আইনজীবীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভেদ এ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর জয় নিশ্চিতে সহায়ক হয়েছে।’ কেউ কেউ আবার সঠিক প্রার্থী বাছাই না করাকেও হারের কারণ বলে উল্লেখ করেন।সুপ্রিম কোর্ট বারে আওয়ামী লীগ পন্থীদের ভরাডুবির কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগের বিষয়ে সরকার ও তার সমর্থিত আইনজীবীরা যে বিরূপ ভূমিকা রেখেছিল তা সাধারণ আইনজীবীদের কাছে পছন্দনীয় বা গ্রহণযোগ্য ছিল না। এ ছাড়াও নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির হাতে রেখে তাদের চাকরির যে শৃঙ্খলা বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে, তাও আইনজীবীরা সহজভাবে নেননি। এসব কারণেই তারা আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের ভোট দেননি।’খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন আপিল বিভাগে স্থগিত করাটাকেও পরাজয়ের তৃতীয় কারণ উল্লেখ করে সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘পাঁচ বছরের সাজার মামলায় কনিষ্ঠ আইনজীবীরা শুনানি করলেই হাইকোর্ট জামিন দিয়ে দেন। তবুও হাইকোর্ট তাকে জামিন দিলেন, কিন্তু আদেশ একটু ঘুরিয়ে দিলেন। এরপর সেই আদেশের ওপর আপিল বিভাগ আবার হস্তক্ষেপ করলেন। এর ফলে খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে যে ধীরে চলার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তা আইনজীবীরা পছন্দ করেননি।’এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘এ নির্বাচন নিয়ে আমাদের আইনজীবীরা আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। নির্বাচনের এমন ফলাফল হওয়ার কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্যানেলের এমন পরাজয়ের কোনো কারণ ছিল না। তবুও এ পরাজয়ের রহস্য কী তা উদঘাটনে আমরা বসবো। পরাজয়ের কারণগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে। বিশেষ করে আমাদের প্রার্থী নির্বাচনে কোনো ত্রুটি ছিল কি না সেটি পর্যালোচনা করা হবে।’এক প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিলের সাবেক এ চেয়ারম্যান বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নিজের দোষে নিজে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তার পদত্যাগে সরকার বা আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের হাত ছিল না। সুতরাং নির্বাচনে এর প্রভাব পড়ার কারণ নেই।’Noyadiganta

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!