সিলেট-৫ আসনে ধানের শীষ প্রার্থী জমিয়তের উবায়দুল্লাহ ফারুক কি জামানত রক্ষা করতে পারবেন ?

সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে নৌকার প্রার্থী সাবেক এমপি হাফিজ আহমদ মজুমদার, লাঙলের প্রার্থী বর্তমান এমপি সেলিম উদ্দীন, আর ধানের শীষের প্রার্থী জামানত বাজেযাপ্ত হওয়া সাবেক এমপি প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক।

বিএনপি অনেক বার সরকারে থাকলেও সিলেট-৫ আসনে কোন সময়ই দলটির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়িয়ে কেউ জামানতও রক্ষা করতে পারেনি। বিতর্কিত সেই ১৫ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনে একবারই মাত্র ধানের শীষ নিয়ে মাত্র চারদিনের জন্য এমপি হয়েছিলেন আবুল কাহির চৌধুরী। বিএনপির হাইকমান্ডও মনে হয় চায় না যে, তাদের এই প্রতীক এই আসনের এই অজনপ্রিয় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসুক। তারা মনে হয় এটাই চায় যে, সিলেট-৫ আসনে ধানের শীষ যেন অতীতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে আবারও জামানত হারায়। ফলে তারা চূড়ান্ত সময়ে এমন এক মাওলানা সাহেবের হাতে ধানের শীষ তুলে দিলেন যিনি নিজে অতীতে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জামানত হারিয়েছেন, এর আগে তাঁর দলের অন্য প্রার্থীও জামানত হারিয়েছেন।

ধানের শীষের একটু অতীত ঘুরে তারপর আসছি উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেবের কাছে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে এই আসনে জিয়াউর রহমান ধানের শীষ তুলে দেন হারিছ চৌধুরীর হাতে। সেদিন স্বতন্ত্র প্রার্থী এমএ হক বিজয়ী হয়েছিলেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন মুসলিম লীগের মিনিস্টার আব্দুছ সালাম। হারিছ চৌধুরীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। ১৯৯১ সালে সারাদেশে ধানের শীষের জয়জয়কার হলেও এখান থেকে মিনার প্রতীক নিয়ে পাশ করেন খেলাফত মজলিসের মাওলানা ওবায়দুল হক। হারিছ চৌধুরী সে নির্বাচনেও খুবই কম ভোট পান। ফলে অভিমান করে আর নির্বাচনে দাঁড়াননি।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীর সেই প্রহসনের নির্বাচনে ডাব মার্কা নিয়ে আশিক চৌধুরী দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলেও; কিছুদিন পর অংশগ্রহণমূলক সেই নির্বাচনে কানাইঘাটের তিন চৌধুরীর কোন জনই বিএনপি থেকে প্রার্থী হতে আগ্রহী হননি। ফলে হারিছ চৌধুরী তাঁর মামা জকিগঞ্জের মতিন চৌধুরীকে ধানের শীষ দিয়ে দাঁড় করান। মতিন চৌধুরী মাত্র ৪,৮৬০ ভোট পেয়েছিলেন। এর দ্বিগুণ ভোট পেলে কি জামানত রক্ষা হতো? অবশ্য, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই মতিন চৌধুরীই জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে ১৩, ২৯৮ ভোট পেয়েছিলেন।

১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সে নির্বাচনে মোট ১১ জন প্রার্থী ছিলেন। ভোট কাস্ট হয়েছিল ৬৩.৫৮%। হাফিজ আহমদ মজুমদার ২৫.২২% ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, অল্প ভোটের ব্যবধানে ২৫% ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন ফরিদ উদ্দীন চৌধুরী এবং লাঙল প্রতীক নিয়ে ১২.৮৮% ভোট বা ১৫,০৫৪ ভোট পেয়ে কোন রকম জামানত রক্ষা করতে পেরেছিলেন এমএ রকিব। সিলেট-৫ এর বর্তমান ধানের শীষের প্রার্থী এবং ২০০৮ সালে খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে জামানত হারানো মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের দল জমিয়তের প্রার্থী মাওলানা আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী ১৯৯৬ সালের সেই নির্বাচনে খেজুর গাছ নিয়ে জামানত হারান। অবশ্য আলিমুদ্দীন সাহেব মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের চাইতে বেশি ভোট তথা ১৩,৩২৫ ভাট বা ১১.৪০% ভোট পেয়েছিলেন। সে সময়ের সদ্য সাবেক এমপি মাওলানা ওবায়দুল হক মিনার প্রতীক নিয়ে ১০,৪২৫ বা ৮.৯২% ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছিলেন। ফুলতলীর পীর সাহেবের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানও ঘড়ি মার্কা নিয়ে ১৪,৩৫৬ ভোট বা ১২.২৮% ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছিলেন।

চারদলীয় জোটের প্রার্থী ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী পাশ করেন ২০০১ সালে; কিন্তু ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নয়। সে নির্বাচনে তিনি পান ৭৭,৭৫০ ভোট, যা মোট কাস্টিং ভোটের ৪৯.১৩%। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি হাফিজ আহমদ মজুমদার পেয়েছিলেন ৫২,৮৮৫ ভোট বা ৩৩.৪২% ভোট। জাতীয় পার্টির রেয়াজুল হক পান-২৩,৫৩৮ ভোট বা ১৪.৮৭% ভোট। ২০০১ সালের সে নির্বাচনে ভোট কাস্টিং এর হার ছিল ৬৬.৭৫%।

৯ম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি ভোট কাস্ট হয়েছিল। অস্বাভাবিক বেশি তথা ৮২.৩৮%,ভোট কাস্টিং সেদিন জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। যাহোক, নির্বাচিত হন হাফিজ আহমদ মজুমদার। প্রাপ্ত ভোট ছিল- ১,০৯,৬৯০, যা মোট ভোটের ৪৪.৯২% এবং কাস্টিং ভোটের ৫৪.৫৩% । নিকটমতম প্রতিদ্বন্দ্বি ফরিদ উদ্দীন চৌধুরী পান ৭৮,০৬১ ভোট বা ৩৮.৮০% ভোট। এই নির্বাচনে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বিএনপি জোটের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামানাত হারান। উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেবের প্রাপ্ত ভোট ছিল- ৮,৯৪৬, যা মোট ভোটের ৩.৬৬% এবং কাস্টিং ভোটের ৪.৩৯%। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মুফতি ওয়াক্কাস ও শাহিনুর পাশা চৌধুরী ছাড়া জমিয়তের উবায়দুল্লাহ ফারুকের মতো পাঁচ জন প্রার্থী ছিলেন খেজুর গাছ নিয়ে। ৫ জনেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের হাতে ধানের শীষ তুলে দেওয়া হয় একেবারেই শেষ মুহুর্তে। এতে কানাইঘাট-জকিগঞ্জের জনতা হোঁচট খায়। কানাইঘাট-জকিগঞ্জের বিএনপির নেতা-কর্মীরা এতে সন্তুষ্ট না হলেও উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের কোন কোন নেতা সন্তুষ্ট হয়েছেন। তাদের সন্তোষ প্রকাশ এই কারণে যে, মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক তো ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচিত হতে পারবেন না- এটা নিশ্চিত; ফলে ভবিষ্যতে তারা কেউ সহজে পেয়ে যাবেন এই প্রতীক। আসলে এমন ভাবনা ভুল। নির্বাচনে যদি একবার ধানের শীষ বিজয়ী হতো, তাহলে এখন যারা স্বপ্ন দেখছেন; তাদের জন্য ইতিবাচক হতো। কারণ, মানুষ ধানের শীষে ভোট দিয়ে অভ্যস্থ হতো। কিন্তু এবারও যদি ধানের শীষের জামানত বাজেয়াপ্ত হয় কিংবা জামানত রক্ষা হয় কিন্ত ভোট কম পায়, তাহলে অবস্থা ১৯৯৬ সালের মতো হবে। অর্থাত, হারিছ চৌধুরী ১৯৯১ সালের পর আর সাহস করেননি ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করতে, অন্যদিকে বিএনপির কয়েক জন নেতা থাকা সত্ত্বেও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে কেউ এগিয়ে আসেনি নির্বাচনে দাঁড়াতে।

উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেবের জেতার সম্ভাবনা কতটুকু? পারবেন কি তিনি ধানের শীষ নিয়ে পাশ করতে? না-কি ধানের শীষের ভবিষ্যত নস্ট হবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে? যেহেতু ফরিদ উদ্দীন চৌধুরীকে মাইনাস করা হয়েছে, বিএনপির কারো হাতে তো যেতে পারতো ধানের শীষ?
Courtesy : Ehsanul Haque Jasim, a prominent Journalist.

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!