সিলেট সিটি নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থানে এডভোকেট জোবায়ের: এইচ এম জোবায়ের

বাংলাদশে জামায়াতে ইসলামী একটি গণতান্ত্রিক, নিয়মতান্ত্রিক, আদর্শবাদী ও ক্যাডার ভিত্তিক রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচনের ইতিহাসে এ দলটির রয়েছে নিরবিচ্ছিন্ন ভূমিকা, অংশগ্রহন এবং সাফল্যজনক ফলাফল। জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনেও দলটি ব্যাপকভাবে অংশগ্রহন করেছে এবং সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তারা আশা জাগানিয়া ফলাফল লাভ করে দেশ-বিদেশে রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দেয়। বর্তমান সরকারের বর্ণনাতীত দমন-পীড়ন, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি কোন কিছুই তাদের ভোট কমাতে পারেনি। বরং সমাজের নিরীহ, সৎ ও পরোপকারী লোকদের উপর চালানো অত্যাচারের স্টিম রোলার দেখে সাধারন মানুষের মুখের জবান বন্ধ হয়ে গেলেও ভোট আসলে তারা তাদের প্রতিবাদ ঠিকই প্রকাশ করেছে। সাধারন মানুষ শুধু একটি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশায়।

এবার আসি সিলেট সিটি নির্বাচন নিয়ে। ১৮৬৭ সালে পৌরসভা গঠনের প্রায় ১৩৫ বছর পর ২০০২ সালে নগরীর মর্যাদা পায় সিলেট। ২০০৯ সালে মহানগরীতে উন্নীত হলেও আয়তনে তেমন একটা বাড়েনি দেশের গুরুত্বর্পূণ এই মহানগরী। সিসিক সূত্র জানায়, তৎকালীন পৌরসভার সীমানা আয়তন ২৬.৫০ বর্গকিলোমিটার নিয়েই ২০০২ সালে সিলেট পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হয়। সে অনুযায়ী উত্তর সুরমায় ২৪টি ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সুরমায় ৩টি ওয়ার্ড নিয়ে ২০০২ সাল থেকে চলছে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম। সিলেট সিটিতে প্রথম থেকেই কমিশনার ও সংরক্ষিত মহিলা কমিশনার প্রার্থী দিয়ে এসেছে জামায়াত এবং তারা কাঙ্খিত সফলতাও পেয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম মেয়র পদের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন দেয় সংগঠনটি। সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে যারা গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন তাদের মতে, “জামায়াত সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই নিয়েছে”। তাদের মতে, জামায়াত ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয় এবং সংগঠনটি কোন ব্যাক্তির একক নিয়ন্ত্রণে চলেনা। তাদের মতে, জামায়াত সারাদেশের নির্বাচন, ভোটারদের পালস, সরকারের মোটিভ ইত্যাদি পর্যালোচনা করেই সিলেট সিটিতে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জামায়াতের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা এবং বিজয়ী হওয়ার জন্য নিন্মোক্ত বিষয়গুলো কাজ করে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে ঃ

১. সরকারের অবস্থান ঃ
খুলনা-গাজীপুরসহ সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে সরকার এবং ইসি নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। জনগণ নিজ হাতে নিজের ভোট দিতে পারেনি। সরকার দলীয় নেতারা প্রকাশ্যে ভোট ডাকাতিতে অংশ নিয়ে সিল মেরেছে এবং এ সংক্রান্ত ছবি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। শুধু দেশ নয় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশে^র অনেক রাষ্ট্রই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এমতাবস্থায় সরকার ও ইসির বিশ^যোগ্যতা শুন্যের কোটায় এসে নেমেছে। রাজনীতি গবেষকদের বিশ্লেষণ- সরকার বিগত নির্বাচন থেকে হয়তো শিক্ষা নিবে এবং আসন্ন সিলেট সহ অন্যান্য নির্বাচনে কিছুটা হলেও নির্লজ্জতার রাস্তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে। সে হিসেবে সিলেট সিটিতেই তারা একটি গ্রহনযোগ্য নির্বাচন দেয়ার চেষ্টা করতে পারে। বিশ্লেষকদের এই ধারণা যদি আংশিক সত্যে পরিণত হয় তবে ‘পাবলিক সেন্টিমেন্ট’ কোন দিকে যাবে তা সচেতন মাত্রই উপলব্ধি করতে পারেন। এই পেক্ষাপটে সুবিধাজনক রেজাল্ট পেয়ে যেতে পারে জামায়াত।

২. জামায়াতের নিজস্ব ভোট ও অতীত পরিসংখ্যান ঃ
মানুষ বলে, ‘আওয়ামীলীগের একজন বনাম জামায়াত-বিএনপির দশ জন’! অর্থাৎ জামায়াতের দশজন এক জায়গায় থাকলে যে আওয়াজ (হট্টগোল) হবে আওয়ামীলীগের একজনই তার থেকে বেশী করে থাকবেন। আওয়ামীলীগের চাপা নাকি ট্রাকের চাকায়ও পিষ্ট হয়না! তাই জামায়াতের ভোট অনেকটা নিরব ভোট। জামায়াতের বক্তব্য মতে সিলেট মহানগরে তাদের দলীয় ভোটার সমর্থক-সূধী মিলিয়ে পঁয়ত্রিশ হাজার প্লাস। তাদের এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের পরিসংখ্যান থেকে। ১৯৯৬ সালরে ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে জামায়াত মাত্র ৩ টি আসনে বিজয় লাভ করে। এই জাতীয় বিপর্যয়ের মধ্যে সিলেট সদরে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হুমায়ন রশীদ চৌধুরী এবং বিএনপির প্রার্থী সাইফুর রহমানের সাথে প্রতিদ্বন্দিতা করেন জামায়াতের প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ২৬ হাজার ভোট পান। ৯৬’র পরে অতিক্রান্ত হয়েছে ২২ বছর। একদিনের জন্যও থেমে থাকেনি জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রম। ফলে জামায়াত যে বর্তমানে ৩৫ হাজার ভোট নিজেদের একান্ত দলীয় বলে দাবী করছে তা যুক্তিযুক্ত। নিজস্ব ভোটের পাশাপাশি জামায়াত ইতোমধ্যেই ২০ দলের মাধ্যে ১৭ দলের সাথে মতবিনিময় করেছে। ১৭ দলের নেতা-কর্মীরা বিগত সময়ের মেয়রদের কাছ থেকে তাদের ‘শুন্য’ প্রাপ্তির কথা বলেছেন এবং মেয়র প্রার্থী এ্যাড. জুবায়েরকে তাদের পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ধারণা এসব দলের সম্মিলিত ভোট আনুমানকি ১৫-২০ হাজার হবে। এছাড়া নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, ২০ দলের বাহিরে আলেম-ওলামাদের একটি বিরাট অংশ জামায়াতের সাথে আছে বলে জানা যায়। তাদের সম্মিলিত ভোটের সংখ্যা আনুমানিক ১০ হাজারের মত। এদিক থেকে এগিয়ে থাকবে জামায়াত।

৩. কাউন্সিলর প্রার্থীদের রিজার্ভ ভোট
বিগত সিটি নির্বাচনে জামায়াতের নির্বাচিত কাউন্সিলরের সংখ্যা চার জন। আরো দুইজনের বিজয় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। এছাড়া সিলেট সদর উপজেলার বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানও জামায়াতের। এই দুই নির্বাচনী ফলাফল থেকে বুঝা যায় সদর তথা মহানগরীতে জামায়াতের অবস্থান কতটা সুসংহত। এবারের নির্বাচনে জামায়াতের ১৩ জন কমিশনার পদপ্রার্থী মাঠ চসে বেড়াচ্ছেন। নির্বাচনে- ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ কথাটি খুব বাস্তব সত্য কথা। তারপরও এসব কাউন্সিলর প্রার্থীদেরকে যারা ভালবাসেন এবং ভোট দিবেন তাদের একটা বড় অংশ মেয়র হিসেবে এ্যাড. জুবায়েরকে ভোট দিবেন বলে আশা করা যায়। ১৩ কাউন্সিলর প্রার্থীর এসব রিজার্ভ ভোটেও এগিয়ে যেতে পারেন জামায়াত প্রার্থী এ্যাড. এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

৪. বিএনপিতে কোন্দল!
বর্তমান মেয়র কখনো তৃণমূল বিএনপির নেতা-কর্মী ছিলেন না। সে হিসেবে সদ্য বহি:ষ্কৃত বিএনপির মহানগর সাধারন সম্পাদক সেলিম ছিলেন মাঠ থেকে উঠে আসা বিএনপির জাত নেতা। তার সাথে নিবেদিতপ্রাণ বিএনপির রয়েছে সুসম্পর্ক। বিএনপির রাজনীতিতে উড়ে এসে জোরে বসা আরিফের উপর দীর্ঘ দিন ধরেই দলীয় নেতা-কর্মীদের সম্পর্ক ভাল যাচ্ছেনা। তাই তৃণমূল নেতা-কর্মীরা পরিবর্তন চাচ্ছিলেন। এরপরও যখন আরিফুল হক মনোনয়ন ছিনিয়ে আনেন তখনই বেঁকে বসেন সেক্রেটারি সেলিম। গোপনে তার সাথে দলের পরীক্ষিত নেতাদের বিরাট অংশ হাত মিলায়। কিন্তু কেন্দ্রের কঠোর সিদ্ধান্ত এবং সেলিমের বহিষ্কারাদেশের ফলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের মাঝে বিরাট হতাশা নেমে আসে। তারা আফসোস করতে থাকেন। সিদ্ধান্তহীনতার দোলাচালে আছে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকরা। এমতাবস্থায় সাচেতন রাজনীতিবিদদের একটা বিরাট অংশ প্রাকাশ্যে আরিফের পক্ষে মাঠে থাকলেও ভোটের দিন হিসেব পাল্টে যেতে পারে। আওয়ামী প্রার্থীকে ঠেকাতে বিকল্প হিসেবে এ্যাড. জুবায়েরকে তারা বেছে নিবেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

৫. আওয়ামী প্রার্থীর চরিত্র নিয়ে জল্পনা!
বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী কুমিল্লা বংশোদ্ভুত সিলেটের নাগরিক। সিলেটের রাজনীতিতে তাকে বহিরাগত মনে করা হয়। এছাড়া এক মন্ত্রী এবং সিলেটের আরেক কেন্দ্রীয় নেতার সাথে তার সম্পর্ক তেমন ভাল নয় বলে জানা যায়। কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ চান না যে কামরান মেয়র হোক। প্লাস পয়েন্ট হল আওয়ামী প্রার্থীর চরিত্র নিয়ে মাঠে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। তিনি পান করেন এবং হোটেলে যান বলে ভোটারদের মাঝে আগে থেকেই বিকল্প প্রার্থীর দাবী উঠেছিল। কেন্দ্রীয় সংগঠন মাঠের দাবীকে গ্রাহ্য না করে কামরানকে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ দিলে একটা গ্রুপ নাখোশ হয়। আওয়ামীলীগের কোন্দল সাধারনত বিএনপির মত প্রকাশে আসে না। তারা আড়ালে থেকেই কাজ করে যান। সুতরাং সিলেট সিটির আওয়ামী ভোটও কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে যেতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

৬. কেন্দ্র দখল সম্ভভ নয়
বিগত নির্বাচন গুলোতে হালকা হুমকি-ধামকি দিয়ে বিএনপি নেতা-কর্মীদেরকে ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সিলেটে সেটা সম্ভব নয়। জামায়াত-শিবিরের সম্মিলিত প্রতিরোধে সন্ত্রাসীরা সুবিধা করতে পারবে না বলে মনে করেন অনেকে। তাদের ধারণা বিএনপির কোন কমিটমেন্ট নাই কিন্তু জামায়াতের লোকেরা কমিটেড। তাদেরকে হুমকি দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া সম্ভব নয়। তারা জীবন বাজি রেখে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে সুষ্ঠু পরিবেশ ধরে রাখতে তৎপর থাকবে। আর কেন্দ্র যদি নিরাপদ থাবে তবে সাধারণ মানুষ দলে দলে ভোক কেন্দ্রে আসবে এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। সন্ত্রাস নির্ভর কোন ব্যাক্তি বা দল সুবিধা করতে পারবেনা।

এমতাবস্থায় জামায়াত প্রার্থী এ্যড. এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এর ব্যক্তিগত সাধারন জীবনাচরণ, শিক্ষা-দীক্ষা, জনসম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সামাজিক পরিচয়, সাংগঠনিক পরিচয় এবং সিলেট জামায়াতের শক্তিশালী ভিত্তি ইত্যাদির কারনে এবারের মেয়র নির্বাচন কিছুটা ভিন্ন ধাচের হবে। সরকার যদি খুলনা-গাজীপুরের মত নগ্ন হস্তক্ষেপ না করে তবে অসম্ভব নয় জিতে যেতে পারেন জামায়াত প্রার্থী।

লেখক- সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!