সিলেটের রাজনৈতিক সম্প্রীতি ও সৌজন্য

ইব্রাহীম চৌধুরী

আরবের ধনাঢ্য এক শেখ কঠিন অসুখে পড়েছেন। তাঁর শরীরের পুরো রক্ত বদলে ফেলতে হবে। সমস্যা হলো শেখের গ্রুপের রক্ত মিলছে না কারও সঙ্গে। ব্যাপক প্রচার চালিয়ে দূরে পশ্চিমা দেশের একজনের রক্তের মিল পাওয়া গেল। রক্ত দিন-জীবন বাঁচান! পশ্চিমা লোকটির কাছ থেকে দ্রুত রক্ত সংগ্রহ করা হলো। আরব শেখ এ দফা বেঁচে গেলেন পশ্চিমা লোকটির বদান্যতায়। এ বদান্যতার কোনো বিনিময় মূল্য নেই!

দিন যায়, মাস যায়—কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠলেন রক্তদাতা। নিছক কৌতুক করেই চিঠি লিখলেন। বন্ধু শেখ, এবারে কোনো সৌজন্য উপহার পেলাম না যে!

আরব্য শেখ উত্তর দিলেন, সৌজন্যের জন্য আমরা আরব জাতি বিখ্যাত। মুশকিল হলো, প্রথম যখন অসুখে পড়েছিলাম, আমার শরীরে আরবের রক্ত ছিল!

অসুখ–বিসুখে অনেক কিছুই বদলে যায়!

বদলায় না মানুষের ঐতিহ্যের অহংকার। সিলেট অঞ্চলের লোকজন সম্প্রীতি, সহানুভূতি আর সৌজন্যের জন্য বিখ্যাত। এসব দেখে দেখেই আমাদের বেড়ে ওঠা। সিলেটের ডাকসাইটে লোক ছিলেন আমিনুর রশীদ চৌধুরী। যুগভেরী পত্রিকার মালিক সম্পাদক হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। আশির দশকে সিলেট সমাচার নামের পত্রিকাটি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে যুগভেরীর। সমাচার–এর সম্পাদক ওয়াহেদ খানের দাপট তখন। সমাচার পত্রিকা ছেপে কুল পাচ্ছেন না ওয়াহেদ খান। এর মধ্যে নিউজপ্রিন্টের আকাল। নানা কোটা, বিধিনিষেধের কারণে, অর্থসংকটে সমাচার–এর ছাপা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। নিউজপ্রিন্টও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।

আমিনুর রশীদ চৌধুরী উপস্থিত হলেন সমাচার অফিসে। জানালেন, তাঁর কাছে কোটা আছে, আছে মজুত নিউজপ্রিন্ট। যত দিন সংকট না কাটে সমাচার পত্রিকা ছাপার জন্য নিউজপ্রিন্ট তিনি দেবেন! সৌজন্যের এ কাহিনির সাক্ষী অনেকেই পরে গর্ব করে এ ঘটনা গল্প করেছেন, আজও অনেকে করেন।

আমরা তখন শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালালবিরোধী আন্দোলন করছি। রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক দেওয়ান ফরিদ গাজী আমাদের অভিভাবক। ঈদের দিন বিকেলে তাঁর বাসায় গিয়ে আমি অবাক! যাদের সঙ্গে মুখ দেখাদেখি হলে সংঘর্ষ অনিবার্য, দেখি তাঁরাই এসে ফরিদ গাজী সাহেবকে পায়ে ধরে সালাম করে যাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করি, চাচা এসব কী হচ্ছে? বললেন, ‘সামাজিকতা আর সম্প্রীতি আমরার বাপ–দাদার ঐতিহ্য। ইতা নষ্ট করইও না বা!’

পঁচাত্তর–পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা তখন। বিএনপির ডাকসাইটে সব নেতার দাপট সিলেটে। প্রয়াত শহীদ আলী, খন্দকার আবদুল মালিক, লুতফুর রহমান। এর মধ্যে ছোট ঘটনায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লাম আমরা। দ্রুত সর্বদলীয় সভা আহ্বান করা হলো। এক ছাদের নিচে বসলেন জননেতা আবদুল হামিদ, আসাদ্দর আলী, শহীদ আলী, খন্দকার মালিক, দেওয়ান ফরিদ গাজী, লুতফুর রহমান, সৈয়দ আবু নসর, আ ন ম শফিকুল হক। অবাক হয়ে দেখি, সভায় উপস্থিত নানা দলের নেতা। এমনকি মাওলানা হাবিবুর রহমানও।

আমরা ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত পক্ষ। তখন বেশ প্রস্তুত নানাভাবে। সভায় নিশ্চয়ই বাগ্‌বিতণ্ডা হবে। নেতারা উত্তেজিত হবেন। আদালত মোড়ের সভায় বক্তৃতা দেওয়ার মতো জ্বালাময়ী হয়ে উঠবে বৈঠক। তখন আমাদের উত্তেজনা দেখে কে!

দ্রুত নিরাশ হলাম। শুনলাম, প্রয়াত ম আ মুক্তাদির অস্ফুটে বলছেন, বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আলাপে বসলেও এমন সৌজন্য হয় না। কিছুটা দেনদরবার হয়। বাইরে ছাত্রদের সংঘর্ষে রেখে এখানে নাটক চলছে বলে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করলেন। কে কাকে পায়ে ধরে সালাম করবেন, কাকে চেয়ার ছেড়ে দেবেন—এসবের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

জননেতা আবদুল হামিদ, আমাদের সবার হামিদ চাচা। খাসিয়া পানের সঙ্গে চুন আর জর্দা নিয়ে বললেন, ‘ও বা, রাজনীতি রাজনীতির জাগাত। আমরা সিলেটের ঐতিহ্য আরাইতাম পারতাম নায়!’

হে পৃথিবী নিরাময় হও কাব্যনাটক লেখে কবি আফজাল চৌধুরী তখন বেশ আলোড়ন তুলেছেন। আশির দশক। মতাদর্শগত ভিন্নতায় কবি দিলওয়ার আর আফজাল চৌধুরীর অবস্থান তখন দুই মেরুর। মুসমিল সাহিত্য সংসদে দেখি পাশাপাশি বসা আফজাল চৌধুরী আর কবি দিলওয়ার। তাঁদের মধ্যে কাব্যভাবনা নিয়ে কী আলোচনা হয়, তা দেখার অপেক্ষায় বসে আছি। নিদেনপক্ষে ‘কবির লড়াই’ হবে, এমনটাই ভাবছি। ‘নিরাশ’ হয়ে দেখি—দুজনের মধ্যে বিনয় আর সৌজন্য বিনিময়ের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। দেখে তরুণ কবি মহীউদ্দিন শিরু টিপ্পনী কাটলেন, ‘দুজনই সিলেটের কবি! কবির লড়াই আর হবে না।’

এবারের জাতীয় নির্বাচনের শুরুর দিকের উত্তেজনার মধ্যেই সৌজন্যের দেখা পাওয়া গেল সিলেটে। বিএনপি প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকা এনাম আহমেদ চৌধুরী উপস্থিত হলেন অর্থমন্ত্রী আবদুল মাল আবুল মুহিতের বাসায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী অর্থমন্ত্রীর অনুজ আবদুল মোমেন। তাঁদের এ সৌজন্য নিয়ে জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ হয়েছে। সৌজন্য হারানোর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ যেন এক অস্বাভাবিক ঘটনা!

সিলেটে এ ঘটনা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। দেশে–বিদেশে সিলেটের লোকজন তাঁদের ইতিহাস–ঐতিহ্য নিয়ে সব সময় সচেতন। ঐতিহ্যের বন্ধনকে সিলেট অঞ্চলের লোকজন ধারণ করেন বেশ অহংকারের সঙ্গে। দেশের চলমান রাজনৈতিক ঘটনায় সাম্প্রতিক এমন উদাহরণ অনেক আছে। সিলেট অঞ্চলের এবারের নির্বাচনের প্রার্থীদের লক্ষ করলে দেখা যাবে, রাজনৈতিকভাবে তাঁরা নানা দলে বিভক্ত ঠিকই। তাঁদের অনেকেরই পারস্পরিক সম্পর্ক চমৎকার। পরিবারে পরিবারে সম্পর্কিত নিজেরা নানাভাবে।

কথিত আছে, প্রাচ্য দেশে আসার আগে শাহজালাল (রহ.)–এর মামা মুর্শিদ সৈয়দ আহমদ কবীর (রহ.) তাঁকে এক মুঠো মাটি দিয়ে বলেছিলেন, ‘স্বাদে বর্ণে গন্ধে এই মাটির মতো মাটি যেখানে পাবে, সেখানে বসতি স্থাপন করে ধর্ম প্রচার করবে।’ হজরত শাহজালাল (রহ.) বিশিষ্ট শিষ্য শেখ আলীকে এই মাটির দায়িত্বে নিয়োগ করেন এবং নির্দেশ দেন যে যাত্রাপথে বিভিন্ন জনপদের মাটির সঙ্গে যেন এই জনপদের মাটির তুলনা করে তিনি দেখেন। পরে এই শিষ্যের উপাধি হয় চাষনী পীর। সিলেট শহরের শাহজালাল (রহ.)–এর মাজারের কাছেই গোয়াইপাড়ায় চাষনী পীরের মাজার।

বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন সিলেটের আদি বাসিন্দা। শ্রীচৈতন্য এখানেই এসেছিলেন ঠাকুরমাকে দেখতে। লীলাচ্ছলে কীর্তন করতে করতে মিলিয়ে গেলেন বলে লোকের বিশ্বাস। জাতিভেদ, কুসংস্কার আর অসাম্যের বিরুদ্ধে ভক্তি আর ভালোবাসার উত্তাপ ছড়িয়ে গেছেন শ্রীচৈতন্য। এ আলোর বিভা আজও পাওয়া যায় এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে।

রাজনীতি আর মত–পথের ভিন্নতায় সিলেট কখনো তার ঐতিহ্য হারায়নি—চরম উত্তেজনাকর রাজনৈতিক বৈরিতায়ও। সিলেটে কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অশালীন বা অসৌজন্যমূলক বক্তব্য দিয়ে ঘায়েল করার কোনো প্রয়াস দেখা যায়নি। সিলেটের মানুষের কাছে এ ধরনের আচরণ কখনো প্রশ্রয় পায়নি—সে সামাজিক ক্ষেত্রেই হোক আর রাজনীতির ময়দানেই হোক। রাজনীতি, নির্বাচন, মত আর পথের ভিন্নতার কাছে সিলেটের মানুষ কখনো নিজেদের সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি আর সৌজন্য বিসর্জন দেয়নি। আশা করা যায়, এবারেও তার ব্যতিক্রম হবে না। যদি–না আরব শেখের মতো অসুখে রক্ত বদল হয়ে যায়।

ইব্রাহীম চৌধুরী, আবাসিক সম্পাদক, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা!

(প্রথম আলো)

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!