সিদ্ধার্থ সিংহের মুকুটে বহুবর্ণ পালক

সুন্দর সুরাইয়া,কলকাতা

এই মুহূর্তে যিনি একসঙ্গে তিন-তিনটি দৈনিক কলাম লিখে সাড়া ফেলে দিয়েছেন, তাঁর নাম— সিদ্ধার্থ সিংহ।

বরুণ সেনগুপ্তের হাতে তৈরি, আনন্দবাজার পত্রিকার দুঁদে সাংবাদিক শ্যামলেন্দু মিত্র সম্পাদিত বেঙ্গল ওয়াচ-এ প্রতিদিন লিখছেন পৃথিবীর বিচিত্রতম সংবাদ নিয়ে একটি করে কলাম।

প্রথম পর্যায়ে দৈনিক কলামে ১০১টি পর্ব এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের অনিয়মিত কলামে, যদিও ‘অনিয়মিত কলাম’ বলা হয়েছে, কিন্তু প্রকাশিত হতো রোজই। সেই দ্বিতীয় পর্যায়ের ৫১টি পর্বের পরে শুরু হয়েছে তৃতীয় পর্যায়ের অনিয়মিত কলাম। সেই পর্যায়ে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গেছে প্রায় ৫০টি পর্ব। অর্থাৎ তিন দফায় সব মিলিয়ে ২০০টিরও বেশি কলাম।

এর পাশাপাশি নিউজ পিডিয়ায় প্রতিদিন লিখছেন বিশ্বখ্যাত কবি-লেখক-শিল্পীদের জীবনের বিচিত্রতম ঘটনা।

একই সঙ্গে প্রত্যেক দিন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলাদেশের স্টোরি অ্যান্ড আর্টিকেল-এ নানান বিষয় নিয়ে তাঁর একটি করে কলাম। তাঁর এই দৈনিক কলামটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, ওই পত্রিকা গোষ্ঠী গত ৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর ১৬৪ তম (একশো চৌষট্টি) পর্ব থেকে বাংলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দৈনিক কলামটির ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশ করতে শুরু করেছে।

না, শুধু অনুবাদেই থেমে থাকেননি তাঁরা। ১০ ফেব্রুয়ারি ১৬৮ তম পর্ব থেকে যাতে দৃষ্টিহীনেরা কানে শুনে এবং শ্রবণশক্তিহীনেরা গ্রাফিক্সের মাধ্যমে কাহিনির সঙ্গে সঙ্গে ফুটে ওঠা লেখাটাও পড়তে পারেন, সে জন্য সরাসরি বাংলা ইংরেজির পাশাপাশি ইউটিউবের মাধ্যমেও সিদ্ধার্থ সিংহের দৈনিক কলামটি গোটা বিশ্বের আপামর জনগণের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি অভিনব প্রয়াস।

এ ছাড়াও শুধু ভারত বা বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণির জনপ্রিয় পত্র-পত্রিকা এবং ওয়েবজিনগুলোতেও তিনি প্রায় প্রতিদিনই আট-দশটি করে গদ্য লিখছেন।

২০২০ সালে ‘সাহিত্য সম্রাট’ উপাধিতে সম্মানিত এবং ২০১২ সালে ‘বঙ্গ শিরোমণি’ সম্মানে ভূষিত সিদ্ধার্থ সিংহের জন্ম কলকাতায়। ১৯৬৪ সালে। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ই তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয় ‘দেশ’ পত্রিকায়। প্রথম ছড়া ‘শুকতারা’য়। প্রথম গদ্য ‘আনন্দবাজার’-এ। প্রথম গল্প ‘সানন্দা’য়। যা নিয়ে রাজনৈতিক মহল তোলপাড় হয়। মামলা হয় পাঁচ কোটি টাকার। পরে সত্যজিৎ কোটালের নাট্যরূপ এবং নির্দেশনায় প্রথম নাটক‌ মঞ্চস্থ হয় শিশির মঞ্চে— বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল।

ছোটদের জন্য যেমন মৌচাক, শিশুমেলা, সন্দেশ, শুকতারা, আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, চিরসবুজ লেখা, ঝালাপালা, রঙবেরং, শিশুমহল ছাড়াও বর্তমান, গণশক্তি, রবিবাসরীয় আনন্দমেলা-সহ সমস্ত দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায় লেখেন, তেমনি বড়দের জন্য লেখেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, প্রচ্ছদ কাহিনি এবং মুক্তগদ্য।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে প্রকাশিত ‘প্রভাত ফেরী’ পত্রিকায় অজানা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেয়ার হয়ে গিয়েছিল 3.6 K, মানে তিন হাজার ছশো। ভিউয়ার্স হয়েছিল 10,932।

‘রতিছন্দ’ নামে এক নতুন ছন্দের প্রবর্তন করেছেন তিনি। যেটা নিয়ে কলম ধরেছেন দু’পার বাংলার প্রায় আড়াইশো জন বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক। তাঁর এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দুশো চুয়ান্নটি। তার বেশির ভাগই অনুদিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। বেস্ট সেলারেও উঠেছে সে সব। ষোলোটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন এবং লিখতেও পারেন।

এ ছাড়াও বিভিন্ন চমকিত বিষয় নিয়ে যৌথ ভাবে পাঁচশোর ওপর সংকলন সম্পাদনা করেছেন লীলা মজুমদার, রমাপদ চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, মহাশ্বেতা দেবী, শংকর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, নবনীতা দেবসেন, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়দের সঙ্গে।

এই মুহূর্তে সম্পাদনা করছেন বেঙ্গল ওয়াচের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সাহিত্যের পাতা’। যেটি প্রকাশিত হয় প্রত্যেক রবিবার।

আমেরিকার উড়ালপুল পত্রিকার কলকাতার সম্পাদক।

তাঁর লেখা নাটক বেতারে তো হয়ই, মঞ্চস্থও হয় নিয়মিত। তাঁর কাহিনি নিয়ে ছায়াছবিও হয়েছে বেশ কয়েকটি। গান তো লেখেনই। মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন বেশ কয়েকটি বাংলা ছবিতে।

তাঁর ইংরেজি এবং বাংলা কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কয়েকটি সিনেমায়। বানিয়েছেন দুটি তথ্যচিত্র। লিখেছেন বেশ কয়েকটি ছায়াছবির চিত্রনাট্য।

পর পর তিন বার চ্যাম্পিয়ন হওয়া এই মুষ্টিযোদ্ধা এক সময় নিয়মিত মডেলিংয়ের কাজও করেছেন।

আশির দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই কবি, স্বয়ং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যাঁকে সব্যসাচী লেখক বলতেন, সেই সিদ্ধার্থ সিংহের লেখা পাঠ্য হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের একাধিক শ্রেণিতে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের এক তারিখ থেকে একত্রিশ তারিখের মধ্যে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, মুক্তগদ্য, প্রচ্ছদকাহিনি মিলিয়ে মোট তিনশো এগারোটি লেখা প্রকাশিত হওয়ায় ‘এক মাসে সর্বাধিক লেখা প্রকাশের বিশ্বরেকর্ড’ অর্জন করেছেন তিনি।

আনন্দবাজার পত্রিকার এই প্রাক্তনী ইতিমধ্যেই পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, স্বর্ণকলম পুরস্কার, সময়ের শব্দ আন্তরিক কলম, শান্তিরত্ন পুরস্কার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার, কাঞ্চন সাহিত্য পুরস্কার, সন্তোষকুমার ঘোষ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা লোক সাহিত্য পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, নতুন গতি পুরস্কার, ড্রিম লাইট অ্যাওয়ার্ড, কমলকুমার মজুমদার জন্মশতবর্ষ স্মারক সম্মান, সামসুল হক পুরস্কার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অণু সাহিত্য পুরস্কার, কাস্তেকবি দিনেশ দাস স্মৃতি পুরস্কার, শিলালিপি সাহিত্য পুরস্কার, চেখ সাহিত্য পুরস্কার, মায়া সেন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও ছোট-বড় অজস্র পুরস্কার ও সম্মাননা। পেয়েছেন ১৪০৬ সালের ‘শ্রেষ্ঠ কবি’ এবং ১৪১৮ সালের ‘শ্রেষ্ঠ গল্পকার’-এর শিরোপা।

আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘পঞ্চাশটি গল্প’, যে গল্পগুলো প্রকাশিত হয়েছিল দেশ, সানন্দা, সাপ্তাহিক বর্তমান, নবকল্লোল, আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় এবং ওয়ানস্টপ-এ। পাঁচশো পাতার সেই বইটির জন্য তাঁর নাম সম্প্রতি ‘সৃজনী ভারত সাহিত্য পুরস্কার’-এর জন্য ঘোষণা করা হয়েছে।

এই সব পুরস্কার এবং সম্মাননা বিভিন্ন সময়ে তাঁর মুকুটে যেমন এক একটা পালক হিসেবে‌ সংযোজিত হয়েছে, ঠিক তেমনি এখন এই মুহূর্তে প্রতিদিন তিন-তিনটি দৈনিক কলাম একসঙ্গে প্রকাশ হওয়াটাও নিঃসন্দেহে তাঁর মুকুটে আরেকটি বর্ণময় পালক।

——————–
সুন্দর সুরাইয়া
কলকাতা

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!