“সালাম” জঙ্গিবাদ নয় শান্তিবাদ

মোঃ মোশারফ হোসেন
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “যদি তোমাদেরকে কেউ দোয়া করে অর্থাৎ সালাম দেয় তাহলে তোমরাও তাদের জন্য দোয়া করো; তারচেয়ে উত্তম দোয়া বা তারমতই। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ের হিসাব গ্রহণকারী”। সুরা নিসা আয়াত- ৮৬। সুরা নুরের ২৭ নং আয়াতেও সালামের ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইসলাম শান্তি, কল্যাণ, পারস্পারিক ভালবাসা ও সম্প্রীতির ধর্ম। আর এসবের বিপরীতটাই হলো অশান্তিবাদ বা জঙ্গিবাদ। মুসলমানগণ দেখা হলেই একে অপরকে সালামের মাধ্যমে শান্তির বাণী শোনায় এবং দেখা শেষেও একজন অপরজনের জন্য ‘আল্লাহ হাফেজ’ অর্থ ‘আল্লাহ রক্ষা করুন’ বলে দোয়া করে থাকে। আদি পিতা হযরত আদম (আ) এর সৃষ্টির পর ফিরিস্তাদের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই সালাম বিনিময় হয়েছিল।
পৃথিবীর আর কোন ধর্ম, দর্শন বা মতবাদে এরকমটা নেই। যেমন আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসুলুল্লাহ সাঃ থেকে বর্ণনা করেন; রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেনঃ “তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা যে পর্যন্ত না ঈমান আনবে; আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবেনা যে পর্যন্ত না একে অপরকে ভাল বাসবে। আমি কি এমন একটি বিষয়ের কথা তোমাদেরকে বলব না যখন তা আমল করবে যাতে তোমাদের মধ্যে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে? তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের ব্যাপক প্রচলন করো” সহিস মুসলিম – ৫৪। জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে রাসুলুল্লাহ সাঃ উত্তর করেছিলেন ইসলামের সর্বোত্তম কাজ হলো সালাম বিনিময় করা। রাসুলুল্লাহ সাঃ সালামের ব্যাপক প্রচলন করেন এ বলে যে যদি কারো সাথে একবার দেখা হওয়ার পর একটি গাছ, পাথর, বা দেয়ালের আড়ালের পর আবার দেখা হয় তবুও যেন পূণরায় সালাম দেয়া হয়। সাহাবী (রা) তা-ই কর‍তেন। যে সালাম দিতে কৃপণতা করে তাকে রাসুলুল্লাহ সাঃ সর্বাধিক কৃপণ বলে সমালোচনা করেছেন। সালাম একধারে একটি ইবাদত, ইসলামী সংস্কৃতি, উত্তম শিষ্টাচার এবং সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টিতে বিশাল ভূমিকা পালনকারী । তাই ইসলামে নিজ বা অন্যের গৃহে প্রবেশ, সাক্ষাতে, টেলিফোন, সংবাদে, বিপদে-আপদে, আনন্দ-খুশিতে এক কথায় ইসলামের সর্বাধিক প্রচলিত পরিভাষা হলো সালাম। এটা কোন রাজনৈতিক দলের ব্যবহৃত বা চালুকৃত রসম বা নিয়ম নয়। সালামের ফযিলত, বরকত, সালাম না দিলে কী ক্ষতি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অর্থাৎ সালাম নিয়ে হাদিসের বহুল প্রচলিত সংকলন গ্রন্থ ‘মিশকাতুল মাসাবিহ’তে শতাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে অশুদ্ধ পদ্ধতির সালাম যা আমাদের দেশে প্রচলিত যেমন ‘স্লামালাইকুম’ একটি অভিশাপ কামনা করা অর্থে ব্যবহৃত হয়। একবার এক ইহুদি রাসুলুল্লাহ সাঃ কে ‘আস সালামু আলাইকুম’ অর্থ ‘আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক’ এর পরিবর্তে ‘আসসামু আলাইকুম’ অর্থ ‘আপনার মৃত্যু হোক’ বলে অভিশাপ করেছিল। তৎক্ষণাৎ আয়শা (রাঃ) প্রতিবাদ করে বলেছিলেন ‘ওয়া আলাইকুমুস সাম’ অর্থাৎ তোমারও মৃত্যু হোক বলে অভিশাপ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাঃ এরকম অশুদ্ধ সালাম দানকারীর জবাবে শিখিয়ে দিলেন ‘ ওয়া আলাইকুম’ অর্থাৎ ‘আর তোমারও হোক’। তাই যারা ‘স্লামালাইকুম’ বা ‘স্লাম কুম’ যার সঠিক কোন অর্থ নেই বা থাকলেও বিষয়টি সালামের বিকৃত উপস্থাপন যা মন্দ বৈ কিছু নয়। এমন সালাম দাতার উত্তরে রাসুলের শিখানো পদ্ধতিতে শুধু ‘ওয়া আলাইকুম’ বলাই সুন্নত।
আর সকল বিপদ- আপদে শুধু মানুষ নয় মহা বিশ্বের সব কিছুর হিফাযতের মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা। মহান আল্লাহ তায়ালার একটি গুণবাচক নাম রয়েছে ‘হাফিযুন’ তথা রক্ষাকারী । কে আছে এমন যে আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চায় না। আর একজন মুসলমান অপর মুসলমানের জন্য নিরাপত্তা কামনা করবে এটা সুন্নত বা ক্ষেত্র বিশেষ ওয়াজিব পর্যায়ের আমল। কারণ রাসুলুল্লাহ সাঃ শিখিয়েছেন যে একজন মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের ছয়টি অধিকার থাকে তার একটি হলো দেখা হলে সালাম দিবে আর অপর একটি হলো সে উপস্থিত থাকুক বা অনুপস্থিত থাকুক তার জন্য কল্যাণ কামনা করবে। অপর হাদিসে এসেছে একজন মুসলিম নিজের জন্য যা ভাল মনে করবে অন্যের জন্যও তা-ই ভাল মনে করবে। এগুলো ইসলামের বুনিয়াদি শিষ্টাচার কোন দলের দলীয় স্লোগান নয়। শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করা, প্রচার করা বা চর্চা করাকে জঙ্গিবাদ আখ্যা দেয়া মানে আলোকে অন্ধকার বলে সম্বোধন করার মত গাঁজা খোরী প্রলাপ বা বিকৃত মস্তিষ্কের পরিচায়ক। এমন বিকলাঙ্গ জ্ঞানের অধিকারীকে সম্মানজনক চেয়ার দেয়া, তার কথা প্রচারের সুযোগ করে দেয়াসহ যেকোনভাবে সহযোগিতা করা ইসলামের শিষ্টাচারের বিরোধিতা, অশান্তি সৃষ্টি, সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি বিঘ্নিত করার পাশাপাশি সর্বোপরি মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শামিল। একজন মুসলিম হিসেবে এমন জঘণ্য বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করছি। পরিশেষে বলব সালাম যেহেতু একটি ইবাদত তা শুদ্ধভাবেই করতে হয়; অশুদ্ধভাবে কোন আমল আল্লাহর কাছে কবুল হয়না। তাই এই সুযোগে প্রত্যেক মুসলমান আজ থেকে অতীতের ভুল উচ্চারণ ঠিক করে নিয়ে সালামে দিবেন এবং পূর্ণাঙ্গ সওয়াবের অধিকারী হবেন। আল্লাহ সে তাওফিক সকলকে দান করুন। আমিন।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!