সার্চ কমিটি,নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ : তারপর? সাঈদ তারেক

সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশে এখন আর কেউই বা কোন কিছুই নিরুপেক্ষ নাই। জাতীয়তাবাদ ভাগ হয়ে গেছে অনেক আগেই- বাঙ্গালী আর বাংলাদেশী। রাজনীতির দুই মেরু- চেতনাধারী চেতনার বাইরে। দেশপ্রেমও নাকি দুই মোড়কে আবৃত- ভারতীয় আর পাকিস্তানী। রাজনৈতিক দলগুলো বিভক্ত দুই শিবিরে- সরকারী এবং সরকার বিরোধী। গাবতলী গরুর হাটে গিয়েও মানুষ খোঁজে ইন্ডিয়ান আর দেশী গরু। জনগনও দুই পক্ষ- আওয়ামী লীগ আর এন্টি আওয়ামী লীগ। এ অবস্থায় নিরুপেক্ষ লোক খুঁজে পাওয়া দুরূহই বটে। ’৯২-’৯৫ কালে বেগম খালেদা জিয়ার কথাটা মনে পড়ে গেল- পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরুপেক্ষ নয়!
জাতির এই দুরাবস্থা শুরু তিন দশক আগে জিঘাংসা প্রতিহিংসা দম্ভ অহমিকা আজীবনের জন্য ক্ষমতা কুক্ষিগত করার উদগ্র মানসিকতা আর প্রতিপক্ষ নির্মূলের ঘৃণ্য রাজনীতি চর্চার মধ্য দিয়ে। বছর বছর তা বহুগুনহারে লালিত হয়ে এখন বিষবৃক্ষ। বাটি চালান দিয়েও এখন একজন নিরুপেক্ষ লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগ তাদের শাষন ক্ষমতাকে পোক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী করতে গনহারে সর্বত্র দলীয় বা দল সমর্থকদেরকে বসিয়েছে। এটা এখন কেউ আর বিশ্বাষ করে না যে সাংবিধানিক এবং রাষ্ট্রীয় পদগুলোয় একজনও দল-নিরুপেক্ষ কেউ আছে। কাজেই সার্চ কমিটি যাদেরকে নিয়েই করা হোক প্রশ্ন থেকেই যাবে।
মোদ্দা কথাটা হচ্ছে পরের টার্মে কে থাকবে। আওয়ামী লীগ, না বিরোধীরা। সমস্যার গিট্ঠুটা ওখানেই। ফলে এখানে আওয়ামী লীগের চাওয়াটাই হচ্ছে বড় কথা, যেহেতু তারা ক্ষমতায়। যদি তারা চায় থেকে যাবে- তাতে যে যাই বলুক, সেক্ষেত্রে ইলেকশন কমিশন হবে তাদের পছন্দের লোকদের দিয়ে, আইন বানিয়ে বা সার্চ কমিটি দিয়ে। আর যদি মনে করে পরের টার্মে আর কেউ এলেও আপত্তি নাই তাহলে কমিশনের চেহারা হবে অন্যরকম। এরপরেও প্রশ্ন, নির্বাচনের সময় সরকারে কারা থাকবে। যদি কোন দলীয় সরকার থাকে নির্বাচন কমিশন যতই নিরুপেক্ষ হোক সরকারের ইচ্ছার বাইরে তাদের যাবার সুযোগ থাকবে না। চৌদ্দ আঠারোর মত ভোট হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাবে। আবার এটাও ঠিক অ-আওয়ামী লীগ (তত্বাবধায়ক বললাম না কারন তাদেরও নিরুপেক্ষ হবার সম্ভাবনা কম।) সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের জন্য জিতে আসা কঠিন হতে পারে। কাজেই এখন পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করছে আওয়ামী লীগ কোনটা চাইবে তার ওপর, পরের টার্মে তারা থাকবে কি থাকবে না। যেহেতু এখনও নাটাই তাদেরই হাতে।
আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, চৌদ্দ আঠারোর মত একতরফায় না গিয়ে আওয়ামী লীগের উচিত হবে সত্যিকারের জনমত প্রতিফলনের জন্য একটা অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা- তাতে যদি সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন সরকারও করতে হয়। পরের টার্মে সরকার কারা চালাবে তা জনগনই বলে দিক। তাদের শাষনকালের উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির কারনে যদি মানুষ মনে করে আওয়ামী লীগেরই থাকা উচিত, ভোট দেবে। তারা ক্ষমতায় থেকে যাবে বা ফিরে আসবে। আর যদি নিজেদেরই সন্দেহ থাকে কৃতকর্মের কারনে মানুষের ভোট নাও পাওয়া যেতে পারে তাহলে ভিন্ন কথা। তবে এটা ঠিক- চসেষ্কু, হাইলে সেলাসী ,সাদ্দাম, গাদ্দাফী, হোসনী মোবারক চিয়াং কাই শেক বা মাহাথীর মোহাম্মদদের মত সুদীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতা আকড়ে থাকার সময়কাল এখন না। যুগ বদলেছে, মানুষের চিন্তা চেতনাও অনেক অগ্রসর। দুই টার্ম ঠিক আছে তিন টার্ম অগত্যা, কিন্তু এর পরেও কন্টিনিউ করতে গেলে মানুষ মোচড়ামুচড়ি করবেই। তা যতই উন্নয়নের ঢাক বাজানো হোক।
এর মধ্যে বাইরে থেকে কিছু বালা মুসিবত এসে চেপেছে। স্যাংশনের আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল একরকম। রাতারাতি হাওয়া বদলে গেছে। হম্বিতম্বি অনেক কমেছে। মনে হচ্ছে ফ্রিস্টাইলেরও কিছুটা রাশ টেনে ধরা হয়েছে। অপরাধীগুলো পর্যন্ত এখন আর অস্ত্র উদ্ধারে গিয়ে পুলিশের ওপর গুলী ছুড়ছে না! এটা ভাল লক্ষণ। মন্ত্রী এমপিরা যে যাই বলুন, বাংলাদেশের জন্য মার্কিন সাংশন একটা ফ্যাক্টর। বলাবলি হচ্ছে শুধু স্যাংশনই শেষ না, এর সূত্র ধরে আরও কিছু বিধিনিষেধের কবলে পড়ে যেতে পারে দেশ। শান্তি মিশনে গিয়েও গড়াতে পারে। শুরু হয়েছিল গনতন্ত্র সম্মেলনে ডাক না পাওয়া দিয়ে এর পর এলো ছয় ব্যক্তি এবং এক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, সাথে সাবেক সেনাপ্রধানের ভিসা বাতিল। সেদিন ১২ মানবাধিকার সংস্থা জাতিসংঘের কাছে এক আর্জি জানিয়েছে। ইইউতে শ্লোভাকিয়ার এমপি চিঠি পাঠিয়েছে যেন গোটা বাংলাদেশের ওপরই নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। সামনে আর কি কি অপেক্ষা করছে কে জানে তবে আন্তর্জাতিক মহলের এসব পদক্ষেপ দেশের জন্য অশনি সংকেত তো বটেই।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রানের উপায় আওয়ামী লীগ তথা তাদের সরকারকেই বের করতে হবে, কারন তাদের শাষনকালেই ঘটনাগুলো ঘটছে। একটা হতে পারে আমেরিকার সাথে দেনদরবার করা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন সেটা তারা করছেন। দ্বিতীয়ত: যে সব অভিযোগে এই নিষেধাজ্ঞা সেগুলোর সুরাহা করা। মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা, কথিত গুম খুনের ঘটনাগুলোর তদন্ত করে দায়ীদেরকে বিচারের আওতায় আনা। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, গনতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। সর্বোপরি চৌদ্দ-আঠারো স্টাইল মাথা নেমে নামিয়ে ফেলা। সামনে একটা অবাধ এবং সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
এটা তারা সার্চ কমিটি করে করবে না নির্বাচনকালীন সরকার দিয়ে করবে নির্ভর করছে তাদের দেশপ্রেম প্রজ্ঞা বিচক্ষণতার ওপর।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!