সাইফুর রহমানের স্মৃতি: মাসুম খলিলী

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় অর্থমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালনকারী অর্থনীতিবিদ এম সাইফুর রহমানের আজ ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী। এই বিরল প্রতিভার ব্যক্তিকে বাংলাদেশ অর্থনীতির ব্যবহারিক গুরু হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। তিনি একমাত্র বাংলাদেশি যিনি বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফএর নির্বাচিত গবর্ণর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর সাইফুর রহমান এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি হঠাৎ করে পাদ প্রদীপে আসেননি। ছাত্র জীবনেই তিনি ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। ভাষা সৈনিক হিসাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের একুশে পদকও পেয়েছেন। ছাত্র জীবনে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন তিনি।

পেশাগত জীবনে সাইফুর রহমান ছিলেন নিরীক্ষক। যিনি চার্টার্ডএকাউন্টেন্টের ডিগ্রী নিয়েছেন ইংল্যান্ডের ইন্সটিটিউিট অব চার্টার্ড একাউন্টেন্ট ইন ইংল্যান্ড এন্ড ওয়ালস থেকে। তিনি ছিলেন মুদ্রানীতি, রাজস্ব নীতি ও উন্নয়ন অর্র্থনীতির আন্তর্জাতিক মানের একজন বিশেষজ্ঞ। শুধু বাংলাদেশ অর্থনীতির খুটিনাটি বিষয়ই নয় উপরন্তু বিশ্ব অর্থনীতির সমকালীন প্রবণতােকে তিনি যেভাবে বিশ্লেষণ করতেন তা বিষ্ময়কর মনে হতো। ১৪ বছর বাংলাদেশের কেবিনেট মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করে নিজ দেশের পক্ষে ১২টি জাতীয় বাজেট তিনি উপস্থাপন করেছেন। সম্ভবত এটি বাংলাদেশের যে কোন অর্থমন্ত্রীর সবচেয়ে বেশি বাজেট উপস্থাপন।

সাইফুর রহমানের সাথে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির বড় অংশ অর্থনৈতিক সাংবাদিক হিসাবে। তবে কলেজে পড়াকালেই তার নামের সাথে আমার বিশেষ পরিচয় ঘটে। তার প্রতিষ্ঠিত ও মালিকানাধীন সিএ ফার্ম রহমান রহমান এন্ড হক থেকে আমার বড় ভাই মাহফুজ খলিলী সিএ পাশ করেছেন এবং পাস করার পর সেখানেই কয়েক বছর কাজ করেন। সেই সময়টাতে তিনি সম্ভবত বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড একাউন্টেন্টস এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেখান থেকে তাকে বাণিজ্য মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দান করেন। অবশ্য সাইফুর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠা এবং তার আগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের গঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। মৌলভিবাজারে জন্মগ্রহণকারী এই বিশেষভাবে শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বকে সিলেটের মানুষ ছয়ফুর রহমান হিসাবে জানেন। প্রথম দিকে অর্থমন্ত্রী হিসাবে তিনি অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও অন্যান্য বাজেট ডকুমেন্টে এ বানানেই স্বাক্ষর করতেন । পরে অবশ্য সব ক্ষেত্রে তিনি সাইফুর রহমান হয়ে গেছেন।

সাইফুর রহমান বিয়ে করেছিলেন চট্টগ্রামের বিখ্যাত একে খান পরিবারে। এই হিসাবে চট্টগ্রামের প্রতি তার এক ধরনের টান ছিল। আর অর্থমন্ত্রী হিসাবে চট্টগ্রামের উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দিতে তিনি কার্পণ্য করতেন না, যদিও সাইফুর রহমানকে এখনো সিলেটের উন্নয়নের কারিগর হিসাবে জানেন দল মত নির্বিশেষে সিলেটের সব মানুষ। অবশ্য তিনি যে সিলেটের মানুষ সেটি তার বাজেট বক্তৃতা শোনার সময়ও বোঝা যেত। আর এই মানুষটি বিশ্ব ব্যাংক-আইএমএফ এর বাষিক গবর্নর সভায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে।

১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন সাইফুর রহমান। তার উপর অগাধ আস্থা ছিল প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার। তিনি অর্থমন্ত্রণালয়ের কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন অনুভব করতেন না। এ সময়ে অর্থনৈতিক রিপোর্টার হিসাবে এবং এর আগে বিরোধি দলের অন্যতম প্রধান নেতা হিসাবে অর্থনীতির উপর যে সব মন্তব্য তিনি করতেন তা নিয়মিত ফলো করার সুযোগ হতো। অর্থনৈতিক রিপোর্টার হিসাবে আমাদের কাজ ছিল অর্থমন্ত্রীর দৈনন্দিন কার্যক্রমের উপর নজর রাখা। সাইফুর রহমান বরাবরই একজন রিপোর্টার বান্ধব মন্ত্রী ছিলেন। শেষ মেয়াদে তিনি দায়িত্ব পালনের সময় বেশ খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েন। তখন তার স্ত্রী দুররে রহমান দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং ২০০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন । স্ত্রীর মৃত্যুর প্রভাব তার উপর বিশেষভাবে পড়ে। তবে এতো কিছুর পরও তাকে কখনো দায়িত্ব পালনে সেভাবে ক্লান্ত মনে হতো না। প্রতি বছর তিনি অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সদস্যদের সাথে বাজেট প্রণয়নের সময় বসতেন এবং বাজেটের নানান বিষয়ে তাদের সাথে মত বিনিময় করতেন। ২০০৬ সালে ইআরএফ এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি থাকাকালে এই ধরনের এক অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসাবে তার সরকারের শেষ প্রাক বাজেট আলোচনা তার একেবারে পাশে থেকে শোনার সুযোগ হয়। তদানীন্তন ইআরএফ সেক্রেটারি নাজমুল আহসান সেই সভাটি পরিচালনা করেছিলেন।

সাইফুর রহমান এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশেকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়া। ব্যক্তিগতভাবে তিনি মুক্তবাজারে বিশ্বাস করতেন। ৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর শহীদ জিয়ার সরকারের কমান্ড অর্থনীতি থেকে বাজার ভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ৯০ এর দশকের অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল কাজটি তিনি করেছেন। ২০০১ সালের পরের মেয়াদে এটাকে আরো বেশ খানিকটা সৃদৃঢ ভিত্তি দিয়েছেন। সাইফুর রহমানের নীতির বৈশিষ্ট ছিল সার্বজনীন। তার সময়ে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের লিংকেজ শিল্প এবং ভারি শিল্প কারখানার শক্ত ভিত্তি লাভ করে।

তিনি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমস্যাকে কাঠামো দিয়েই দেখতেন এবং সমাধানের চেষ্টাটিও সেভাবেই করতেন । যার কারণে সে সময় প্রতি বছর ৫/৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রভাব দেশের গ্রাম গ্রামান্তরে শিল্প এলাকায এমনকি হাট বাজারে গেলেও বোঝা যেত। এখন ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর বেকারত্বের হার সর্বোচ্চে। নতুন শিল্প কারখানা করার মতো গ্যাস বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। সাইফুর রহমানের ৯০ এর দশকের প্রথম মেয়াদে নেয়া বিভিন্ন নীতির ধারাবাহিকতা এর পরে অর্র্থমন্ত্রী হওয়া শাহ এ এমএস কিবরিয়া অনেকখানি অনুসরণ করেছেন। কিন্তু ২০০৭ সালের পর সেই ধারাবাহিতা আর রক্ষিত হয়নি। আর এখন অর্থনীতির অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কেতাবে আছে তো গোয়ালে নেই’।

আমরা শোনতাম সাইফুর রহমানের শরীরে এক সময় ক্যান্সার জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি অপসারণ করা হয়েছে। এরপরও তাকে আমরা ৭৬ বছর বয়সেও প্রাণবন্তই দেখতাম। কিন্তু এই বিরল মানুষটি তাকে বহনকারী গাড়ি দুর্ঘটনায় খাদে পড়ে চির বিদায় গ্রহণ করেছেন ২০০৯ সালে। বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যারা এক যুগ পরেও কাজ করবেন তারাও সাইফুর রহমানকে স্মরণ না করে পারবেন না।
#

ক্যাপশন: ২০০৬ সালে অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরামে আয়োজিত প্রাক বাজেট মত বিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছেন তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান। এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করি আমি। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সেক্রেটারি নাজমুল আহসান।

Image may contain: 2 people, text

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!