সাংস্কৃতিক হামলা ও বিপন্ন স্বাধীনতা : ফিরোজ মাহবুব কামাল

বাংলাদেশের বিপন্নতা

প্রতিদেশের ভৌগলিক মানচিত্রের সাথে একটি আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক মানচিত্রও থাকে। আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক মানচিত্রটি গড়ে উঠে দেশবাসীর ধর্মীয় বিশ্বাস,ধ্যানধারণা এবং সংস্কৃতির ভিত্তিতে। ভৌগলিক মানচিত্রের স্থায়ীত্বের জন্য আদর্শিক মানচিত্রটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,আদর্শিক মানচিত্র থেকেই নির্ধারিত হয় ভৌগলিক মানচিত্রের সীমারেখা। এটি দুর্বল হলে দেশের ভূগোল বাঁচে না। ভূগোলের অখণ্ডতা বাঁচাতে যেটি সিমেন্টের ন্যায় কাজ করে সেটি ভূমি, জলবায়ু বা আলোবাতাস নয়,বরং জনগণের অভিন্ন ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতি। দেশের অখণ্ড ভৌগলিক মানচিত্র যেমন ভেঙ্গে যেতে পারে, তেমনি বহু বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠিও একীভূতে হয়ে বিশাল রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পারে। এবং সেটি সম্ভব হয় অবিভক্ত আদর্শিক মানচিত্রের কারণে। ইসলামের পূর্বে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য খণ্ডিত ছিল নানা ভাষা ও নানা গোত্রের নামে। কিন্তু সে বিভক্ত জনগোষ্ঠী ও মানচিত্রকে একীভূত করে সে ভূমিতে গড়ে উঠেছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তি। আরব, কূর্দি, ইরানী,তুর্কি, মুর তখন এক উম্মাহতে পরিণত হয়েছিল।পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদ,গোত্রীয়বাদ ও রাজতন্ত্রের হামলায় সে আদর্শিক মানচিত্র বাঁচেনি। ফলে বাঁচেনি সে বিশাল ভৌগলিক মানচিত্রও। একই কারণে ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের ভূগোলও অখণ্ড থাকেনি, সেটি ভেঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান এ দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছিল। আবহমান বাংলার ভৌগলিক মানচিত্র এক হলেও তার আদর্শিক মানচিত্রটি খণ্ডিত। ফলে বাংলাও খণ্ডিত হয়েছে; একটি হিন্দু-প্রধান পশ্চিম বাংলায়, অপরটি মুসলিমপ্রধান পূর্ব বাংলায়। তাই একাত্তরে পাকিস্তান খণ্ডিত হলেও আদর্শিক ও ধর্মীয় বিভক্তির কারণে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম বাংলা একীভূত হয়নি। এবং ভারতে মিশে যায়নি পূর্ব পাকিস্তান।

 

আগ্রাসী শত্রুর হামলা শুধু ভৌগলিক মানচিত্রের উপর হয় না, প্রচণ্ড হামলা হয় আদর্শিক মানচিত্রের উপরও। যে কোন দেশের সরকার ও জনগণের দায়িত্ব হলো ভৌগলিক ও আদর্শিক এ উভয় মানচিত্রকে হেফাজত করা। নইলে স্বাধীনতা বাঁচে না। কারণ, একটি অপরটির পরিপূরক; ভৌগলিক মানচিত্র বিলুপ্ত হলে যেমন আদর্শিক মানচিত্র থাকে না। তেমনি আদর্শিক মানচিত্র বিলুপ্ত হলে ভৌগলিক মানচিত্রও বাঁচে না। তাই শুধু সেনাবাহিনী দিয়ে দেশ বাঁচানো যায় না। লড়াকু আদর্শিক সৈনিকও চাই। সাতচল্লিশে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল বিপুল সংখ্যক আদর্শিক সৈনিকের কারণে,পাকিস্তানের পক্ষে তুমুল বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটি তারা অতি সফল ভাবে লড়েছিলেন। আল্লামা ইকবাল, মাওলানা মহম্মদ আলী জওহরের ন্যায় বহু লড়াকু চিন্তানায়কদের কারণে সমগ্র ভারতবর্ষ ব্যাপী প্যান-ইসলামিক চেতনা প্লাবন শুরু হয়েছিল। সে প্লাবনে বাঙ্গালী,পাঞ্জাবী,বিহারী, পাঠান, বেলুচ, সিন্ধি -প্রভৃতি ভাষাভাষি মুসলমান ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা ভূলে একাকার হয়ে গিয়েছিল।ফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু ১৯৭১য়ে সেরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক সৈনিক পাকিস্তানের পক্ষে ছিল না। বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানটি তখন অধিকৃত হয়েছিল ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী ও সেক্যুলারিস্টদের হাতে। ফলে ১৯৪৭য়ের পাকিস্তান একাত্তরে এসে বাঁচেনি। দেশটির দুটি প্রদেশের মাঝে ভৌগলিক বিচ্ছেদের আগেই আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছেদ ঘটেছিল।

 

একই রূপ বিপদ ঘিরে ধরেছে বাংলাদেশকেও। শত্রুর লাগাতর ষড়যন্ত্রের মুখে পাকিস্তান খণ্ডিত হলেও একাত্তরের দুর্বলতা বহুলাংশে দেশটি কাটিয়ে উঠিয়েছে। একাত্তর পরবর্তী নতুন পাকিস্তান টিকে আছে পারমাণবিক বোমা ও শক্তিশালী সামরিক শক্তি নিয়ে। হাজার হাজার লড়াকু মোজাহিদ সৃষ্টি করতে পারে এমন দর্শনের বলও সেখানে কম নয়। ফলে ভারতের পক্ষে এদেশটিকে গিলে ফেলা এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।একাত্তরে যে ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সে সাহস ভারতের আজ  আর নেই। কিন্তু বাংলাদেশের বিপদটি আরো গভীর। পাশে প্রতিবেশী রূপে কোন মুসলিম দেশ নাই; তিন দিক দিয়ে ঘিরে আছে ভারত। সামরিক হামলা না হলেও লাগাতর চলছে বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতীক হামলা। সে হামলার মোকাবেলায় বাংলাদেশের হাতে আদর্শিক ও দর্শনের বল নাই। বরং দেশের প্রভাবশালী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীগণ অর্জন করেছে ভারতের প্রতি নতজানু দাস-সুলভ চরিত্র। বাংলাদেশের হাতে নেই সামরিক ও পারমাণবিক বলও। ভারত ঘেরা এ ক্ষুদ্র দেশটি স্বাধীন দেশ টিকে থাকতে পারে একমাত্র শক্তিশালী ইসলামী চেতনার বলে। কিন্তু গভীর সেক্যুলারাইজেশনের ফলে দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে সে আদর্শিক বলও।

 এজেন্ডা যেখানে বাঙালী মুসলিমের অকল্যাণ

বাঙালী মুসলমানদের কল্যাণ ভারতীয় হিন্দুগণ ১৯৪৭য়ের পূর্বে যেমন চায়নি, তেমনি ১৯৭১য়েও চায়নি। একাত্তরের পরও চায়নি। কল্যাণ চাইলে রবীন্দ্রনাথের মত ব্যক্তি কেন ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে কলকাতার রাজপথে মিছিল করবেন? ভারতীয় হিন্দুদের রাজনীতি পরিচালিত হয়েছে নিছক হিন্দু স্বার্থ ষোলকলায় আদায় করার লক্ষ্যে,এবং সেটি মুসলমানদের ক্ষতি করে। ১৯৪৭ সালে মুসলমানগণ বাংলার বিভক্তকরণ চায়নি,তারা চেয়েছিল অখণ্ড বাংলা। কিন্তু সেদিন বাংলার বিভক্তি চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেটি কোলকাতা শহরসহ বাংলার বিশাল অংশকে ভারতভূক্ত করার লক্ষ্যে। অথচ বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করেছিল ১৯০৫ সালে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করার কারণ,তাতে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের কল্যাণের সম্ভাবনা দেখেছিল।

 মুসলমানদের প্রতি ভারত সরকারের মনোভাবটি যে কীরূপ সেটি কি সে দেশের শতকরা ১৫ ভাগ মুসলমানকে প্রশাসনে শতকরা ৩ ভাগের কম চাকুরি, মসজিদ ধ্বংস,মুসলিম বিরোধী ঘন ঘন দাঙ্গা,মুসলিম রমনীদের ধর্ষণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না? বাংলাদেশের প্রতি তাদের কি মনোভাব সেটিও কি তারা গোপন রেখেছে? কারো মটিভ কখনোই গোপন থাকার বিষয় নয়,আচরন ও কর্মের মধ্য দিয়ে সেটি প্রকাশ পায়। একাত্তরে ভারতের মূল লক্ষ্যটি কখনোই স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশের নির্মাণ ছিল না,বরং সেটি ছিল উপমহাদেশের মুসলমানদের শক্তিহানী করা। একাত্তরে যুদ্ধজয়ের পর ভারত সেটি প্রমাণও করেছে। ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধটি ঢাল-তলোয়ারের ছিল না। দীর্ঘমেয়াদী এক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে তারা বহুহাজার কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র জমা করেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে,এবং তার বেশীর ভাগই সে যুদ্ধে অব্যবহৃত ছিল। পূর্ব-পাকিস্তানীরা ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ,অতএব সে অস্ত্র ক্রয়ে ব্যয় হয়েছিল তাদের অর্থ। ফলে অস্ত্রের উপর মালিকানা ছিল তাদের। কিন্তু ভারত সে অস্ত্রের উপর বাংলাদেশের মালিকানা দেয়নি। তারা সমুদয় অস্ত্র ভারতে নিয়ে যায়।

 ভারত বলে,একাত্তরের যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমাণ্ড একত্রে কাজ করেছিল। কিন্তু কোথায় সে যৌথ কমাণ্ড? যৌথ কমাণ্ড থাকলে পাকিস্তানী অস্ত্র ভারতে নেয়ার সিদ্ধান্তটি ভারত একা নেয় কি করে? বরং নিজেদের উদ্দেশ্যপূরণে মুক্তিবাহিনীকে তারা ব্যবহার করেছিল মাত্র। ভারতের লক্ষ্য ছিল,সামরিক দিক দিয়ে বাংলাদেশকে চিরতরে পঙ্গু রাখা। এমন একটি লক্ষ্য নিয়েই পাকিস্তানীদের পরিত্যক্ত যুদ্ধাস্ত্র ভারত বাংলাদেশকে দেয়নি। শুধু যুদ্ধাস্ত্র লুন্ঠনে নয়,ভারত তার বিবেকহীনতার প্রমাণ রেখেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি লুন্ঠনের মধ্য দিয়েও। ভারতীয় সে লুন্ঠনের ফলেই ১৯৭৪য়ে নেমে এসেছিল ভয়ানক দুর্ভিক্ষ এবং তাতে মারা পড়েছিল বহুলক্ষ মানুষ। বিবেকহীনতার আরো প্রমাণ,ফারাক্কাবাঁধ,টিপাইমুখ বাঁধ,বেরুবাড়ি দখল ও তালপট্টি দখল এবং বাংলাদেশের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া। এরূপ কাজ একমাত্র প্রতিবেশী শত্রু দেশই করতে পারে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এমন এক শত্রুসুলভ চেতনা নিয়ে ভারত কি বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারে?

 সাংস্কৃতিক দখলদারি

পতিতাপল্লি, ডাকাতপাড়া বা জঙ্গলের পাশে বসবাসের বিপদগুলি ভয়াবহ। হিংস্র পশু হামলায় প্রাণ হারাবার ভয় থাকে বনের পাশে বসবাসে। তেমনি আগ্রাসী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পাশে বসবাসের বিপদটি স্রেফ স্বাধীনতা হারানোর নয়, বরং ঈমান ও সংস্কৃতি হারানোরও। ধৃত শিকারের প্রতি হানাদার হিংস্র পশুর করুণা থাকে না। তেমনি দুর্বল প্রতিবেশীর প্রতি দরদ থাকে না আগ্রাসী প্রতিবেশীর। কাশ্মীর, হাবয়দারাবাদ, জুনাগড়, মানভাদর ও সিকিমের ন্যায় দুর্বল দেশগুলি তাই ভারত থেকে কোনরূপ করুণা পায়নি, বরং এদেশগুলি হারিয়ে গেছে দেশটির আগ্রাসী পেটে। স্বাধীন রূপে বাঁচতে হলে ইতিহাসের এ শিক্ষা থেকে শিক্ষা নেয়াটি জরুরী। নইলে স্বাধীনতা বাঁচে না। নিজ ধর্ম নিয়ে বেড়ে উঠার সংস্কৃতিও বাঁচে না।

 অমুসলিম দেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যা বাড়ানো হয় -তা হলো গোমরাহি তখা পথভ্রষ্টতা। পথভ্রষ্টতাই সেখানে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি। ভারতে সেটিই ঘটছে। অমুসলিম দেশে বসবাসের মুল বিপদটি এখানেই।সাংস্কৃতিক সীমান্ত বিলুপ্ত হওয়ায় কূল উপচানো প্লাবনের পানির ন্যায় সে বিপদ প্রবেশ করেছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশীদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদটি মূলতও এখানেই। ফারাক্কা বাঁধ,টিপাইমুখ বাঁধ,সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার চেয়েও এটি ভয়ানক। কারণ এখানে ব্পিদ ঈমান হারানোর এবং সে সাথে পরকালে জান্নাত হারানোর। সে কান্ডজ্ঞানটুকু আছে বলেই জনসংখ্যায় বাংলাদেশের সমান হয়েও সীমান্তের সুরক্ষা বাড়াতে পাকিস্তান পারমানবিক বোমা বানিয়েছে। বাংলাদেশের চেয়ে জনসংখ্যায় সাত ভাগের এক ভাগ হয়েও তিরিশ বছর যাবত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে আফগান জনতা।

 কোন কিছুই এ পৃথিবীতে বীনামূল্যে মিলে না। স্বাধীনতা তো নয়ই। ভারতের ন্যায় আগ্রাসী প্রতিবেশী দেশ থেকে স্বাধীনতা তাই উপহার রূপে পাওয়ার বিষয় নয়। স্বাধীনতা অর্জনে অর্থ, শ্রম ও রক্তব্যয়ের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক,সাংস্কৃতিক ও সামরিক বল চাই। সেরূপ কোরবানী ও বল চাই স্বাধীন ভাবে টিকে থাকার জন্যও। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কান্ডজ্ঞান নজরে পড়ে না। ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বরে যে ঘটনাটি মানব ইতিহাসে প্রধান ঘটনা রূপে ঘটেছিল সেটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর বিজয় নয়,বরং ভারতীয় বাহিনীর বিজয়। এবং ভারতের সে বিজয়টি উৎসবে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশে। কিন্তু ভারতের বিজয় ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যে এক জিনিষ নয় সে বোধটুকুই কজনের? রাজনীতি হচ্ছে আগ্রাসী ভারতের প্রতি নতজান কৃতজ্ঞতা নিয়ে। এমন আত্মসমর্পিত চেতনা নিয়ে কি স্বাধীনতা বাঁচে?

 ১৯৭১য়ে বহু হাজার ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে ঢুকেছিল। আন্তর্জাতিক চাপে ১৯৭২য়ে ভারত সে সৈন্য তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু দেশের আনাচে কানাচে সমাবেশ ঘটিয়েছে হাজার হাজার সাংস্কৃতিক সৈন্য। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে বহু লক্ষ সেক্যুলার এনজিও-কর্মী। দিন দিন তাদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ফলে ১৯৭২য়ে তাদের সামরিক দখলদারি শেষ হলেও সাংস্কৃতিক দখলদারি শেষ হয়নি। বরং বিপুল ভাবে বেড়েছে। অথচ সরকারের ও নাগরিকদের দায়িত্ব শুধু দেশের ভৌগলিক সীমান্ত পাহারাদেওয়া নয় অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো,জনগণের চেতনা-রাজ্য পাহারা দেওয়াও সেটি সুস্থ্য ঈমানআক্বিদা নিয়ে নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার স্বার্থে

 ভৌগলিক সীমান্ত পাহারায় অবহেলা হলে অধিকৃত হয় দেশ,তখন আসে রাজনৈতিক পরাজয়  গোলামী তখন রাষ্ট্রীয় পুঁজি ব্যয় হয় জনগণকে বিভ্রান্ত করার কাজে। চেতনা রাজ্যে তখন দখলদারি বাড়ে শয়তানী শক্তির। নমরুদ, ফিরাউনগণ তো এভাবেই দেশ-দখলের সাথে সাথে মানুষের মনের রাজ্যও দখল করেছিল। নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল ভগবানরূপে। একই ভাবে নিজেদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করে সেক্যুলারিস্টগণ। জনগন তখন ইসলাম থেকে দূরে সরে। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়। সে বিদ্রোহকে ব্যাপকতর ও দীর্ঘজীবী করা স্বার্থেই পুঁজিবাদী,সমাজবাদী,জাতীয়তাবাদীরা ইসলামের প্রচারকে নিষিদ্ধ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের বহুদেশে মিশরের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সৈয়দ কুতুব শহীদের বই তো একারণেই নিষিদ্ধ। কম্যুনিষ্ট শাসনামলে সোভিয়েত রাশিয়া হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসাকে ঘোড়ার খোয়ার বানিয়েছিল এবং নিষিদ্ধ করেছিল কোরআনচর্চা।

 বিলুপ্ত সাংস্কৃতিক সীমান্ত

বাংলাদেশের ভৌগলিক মানচিত্রের ন্যায় সাংস্কৃতিক মানচিত্রও পুরাপুরি অরক্ষিত। সাংস্কৃতিক সীমান্তের প্রতিরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কিছু করা দূরে থাক, সে সীমান্তটি পুরাপুরি বিলুপ্ত করেছে ১৯৭১য়ে দেশটির জন্ম থেকেই। ফলে যে বই বা যে পত্রিকা কোলকাতায় পাওয়া যায়,সেটি ঢাকাতেও পাওয়া যায়। ভারতীয় টিভি সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশীদের বেডরুমে সরবে ও সশরীরে কথা বলার। সাংস্কৃতিক সীমান্ত বলে বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশের যে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত আছে, এবং সেটির প্রহরারও যে প্রয়োজন রয়েছে সে হুশটিও সরকারের নাই। কারণ একটাই। আর তা হলো,বাংলাদেশের বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ ভারতীয়দের থেকে এক ভিন্ন ভূগোলে বাস করলেও তাদের চেতনার বা আদর্শের ভূগোলটি এক ও অভিন্ন। সে ভূগোলে কোন সীমান্ত নেই, ফলে প্রহরাও নাই। পশ্চিম বাংলার সংস্কৃতি আর বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তারা এক অভিন্ন মনে করে। তেমন এক অভিন্ন সংস্কৃতির ধারণা নিয়েই তারা কবি রবীন্দ্রনাথের গানকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত বানিয়েছে।

 বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের অভিযোগ, ১৯৪৭ সালে ভারতের সাথে বিশেষ করে পশ্চিম বাংলার সাথে ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজনটি গড়া হয়েছিল নিছক সাম্প্রদায়ীক চেতনায়। তারা পাকিস্তানের মানচিত্রে যেমন সাম্প্রদায়ীকতার গন্ধ পায়,তেমন গন্ধ পায় পাকিস্তানসৃষ্ট বাংলাদেশের মানচিত্রের মাঝেও। দেশের আওয়ামী-বাকশালীগণ নিজেদেরকে এরূপ সাম্প্রদায়ীক চেতনার উর্দ্ধে মনে করে, ফলে পাকিস্তানের গড়া বাংলাদেশের ১৯৪৭ সালে ভৌগলিক মানচিত্র তাদের কাছে বেমানান মনে হয়। বাংলাদেশের সীমানা বিলুপ্ত করতে পারছে না স্রেফ জনগণের ভয়ে। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের চেতনায় ভারতসেবী বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের ন্যায় ইসলামী চেতনা বিলুপ্ত হয়নি, ফলে মারা পড়েনি ১৯৪৭য়ে ভারত-বিভক্তির যৌক্তিকতার ধারণাটিও। জনগণের মনে সে চেতনাটি প্রবল ভাবে বেঁচে আছে বলেই বেরুবাড়ী ও তালপট্টির উপর ভারতীয় দখলদারি, ফারাক্কা ও টিপাইমুখ বাঁধ এবং বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়।

 আওয়ামী-বাকশালীগন জানে,ভারতের সাথে সীমান্ত বিলুপ্ত হলে তাদের ঝামেলাটি কমবে। বাংলাদেশের মাটিতে তাদের রাজনৈতিক শত্রুদের শায়েস্তা করার দায়ভারটি তখন সরাসরি ভারত নিয়ে নেবে। ফলে তাদের দমনে কোন রূপ বেগ পেতে হতো না। যেমনটি পেতে হয়না কাশ্মীরের ভারতসেবী ফারুক আব্দুল্লাহকে। ভারতবিরোধীদের শায়েস্তা করতে কাশ্মীরের শ্রীনগর,বারামোল্লা,আনন্দনাগ,জম্মুর মত নগরগুলির রাজপথে, এমনকি নিভৃত পল্লিতে মোতায়েন করা হযৈছে পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা, বিহার ও অন্যান্য ভারতীয় প্রদেশ থেকে নেয়া ৬ লাখের বেশী সৈন্য। বাংলাদেশের ভৌগলিক মানচিত্র বিলুপ্ত হলে ঢাকার রাজপথেও তখন ভারতীয় সৈন্য শোভা পেত। ফারুক আব্দুল্লাহর মত শেখ হাসিনাও তখন নিরাপদে আজীবন গদীতে থাকতে পারতেন। নির্বাচনি জয়ের এত ঝামেলা তাঁকে পোহাতে হতো না,সেটি সুচারু ভাবে সামাল দিত ভারত। কিন্তু অখণ্ড ভারত নির্মানের সে লক্ষ্যে পৌছতে হলে বাংলাদেশের মুসলিম মানস থেকে ইসলামী চেতনার বিলুপ্তি জরুরী। তখন বিলুপ্ত হবে বাংলাদেশের আদর্শিক মানচিত্র। ভারত সে লক্ষ্যেই দখলদারি জমিয়েছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।   

— 

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!