সাংবাদিকতা ও ইসলাম মোঃ মোশারফ হোসেন

সাংবাদিকতা বর্তমানে তথ্যপ্রবাহ ও তথ্যায়নের যুগে সর্বাধিক প্রচলিত ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও পেশার নাম। বর্তমান পৃথিবীর এমন কোন কাজ নেই তা ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক যা ই হোক না কেন তা কোন সংবাদ নয়। প্রতিটি ঘটে যাওয়া ঘটনা বা কাজ তা প্রচারিত হোক বা না হোক তা সংবাদ। এত ঘটনার মধ্যে জীবনের অবিচ্ছেদ্য ঘটনা সংবাদ আকারে সকলের সামনে যিনি উপস্থাপন করেন তিনিই সাংবাদিক। আর এ পেশাকেই বলা হয় সাংবাদিকতা। শাব্দিক অর্থে সাংবাদিকতা শব্দটি এসেছে সংবাদ থেকে;যার ইংরেজি প্রতি শব্দ হল News এবং আরবি প্রতি শব্দ হল খবর, হাদিস, কিসসা বা নাবা। এই নাবা থেকেই নবি। নবি শব্দের অর্থ সংবাদ দাতা,সংবাদ বাহক,দূত ইত্যাদি। এ অর্থে প্রত্যেক নবিই একেকজন সাংবাদিক তা বলা যায়।যেমনটি একজন নবিকে কৃষি কাজের জন্য বলা যায় কৃষক। পবিত্র কুরআনে নাবা শব্দের যথেষ্ট ব্যবহার রয়েছে। এমনকি একটি সুরার নামও রয়েছে ’আন্ নাবা’ বা সংবাদ।মানুষের প্রতিটি কাজকেই পবিত্র কুরআনে সংবাদ বলে উল্লেখ করেছে। ইসলামের সর্বশেষ নবি হযরত মুহাম্মদ (স) এর যত বাণী রয়েছে সে গুলোকে খবর বা সংবাদ বলা হয়েছে। তিনি সাহাবিদের উপদেশ দিতে গিয়ে এভাবে উল্লেখ করেছেন- “আমি কি তোমাদেরকে এমন সংবাদ দিবনা যার উপর আমল করলে তোমরা জান্নাতে যেতে পারবে?”
যেহেতু প্রত্যেক নবি-রাসুল আল্লাহর দেয়া সংবাদ পৃথিবীর মানুষদের কাছে পৌঁছে দিতেন; তাঁরা মূলতঃ সাংবাদিকতাই তথা সংবাদ কর্মী হিসেবে কাজ করতেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।তাহলে বুঝা গেল সাংবাদিকতা পেশাটি কতটা মহান, মহৎ, বিরাট মর্যাদা ও দায়িত্বপূর্ণ।আমরা জানি একজন সাংবাদিককে এ ক্ষেত্রে রিপোর্ট করতে হয়, সংবাদ আদান-প্রদান করতে হয়। বিষয়টিকে আমরা আল্লাহর কাছ থেকে সংবাদ আনা-নেয়ার কাজে নিয়োজিত ফেরেস্তা জিব্রাইল,মিকাইল ও বিশেষ মুহূর্তে ও বিশেষভাবে ব্যবহৃত অন্যান্য ফেরেস্তাদের কাজের সাথেও তুলনা করতে পারি। যারা আসমানি সংবাদ সমূহ নবি-রাসুলদের কাছে পৌঁছে দেন এবং দুনিয়ার যত খবর আসমানে নিয়ে যাওয়ার কাজে নিয়োজিত। পুরো সিস্টেম বা পদ্ধতিকে বর্তমান প্রচার মিডিয়ার প্রিন্ট,ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন বা আকাশ যোগাযোগের সাথে চমৎকার সামঞ্জস্য বা মিল রয়েছে বলে ধারণা করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে কোন ধরণের তথ্য বিকৃতি বা সামান্য ব্যতিক্রম তো দূরের কথা এরকম চিন্তাও করা যায় না।কারণ বিষয়টি ধর্মীয়,অধিকারের সাথে জড়িত এবং জবাবদিহিমূলক।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রতিটি কাজের হিসাব নিবেন বলে আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।সাংবাদিকতা এর বাইরে নয়। তথ্য প্রচার ও প্রসারে একজন সাংবাদিকের কাজকে যদি নবি-রাসুল ও ফেরেস্তাদের কাজের সাথে উপমা দেয়ার মত এতটাই মূল্যায়নের সুযোগ ইসলামে থাকে তাহলে সংবাদ সংগ্রহ,আদান-প্রদান, সম্পাদনা ও প্রচারের ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিককে কতটা বিশুদ্ধ জ্ঞান,মন-মগজের অধিকারী হওয়া ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। যেহেতু মানুষের প্রতিটি কথা,কাজ ও ঘটে যাওয়া সবকিছু সংবাদ ও প্রচারের বিষয়বস্তু এবং মানুষের জান-মাল,সম্মানসহ অন্যান্য বিষয়, রাষ্ট্রীয়,সামাজিক ও নাগরিক অধিকারের মত অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর সাথে জড়িত তাই সংবাদ প্রচার ও প্রকাশে বস্তুনিষ্ঠতার পাশাপাশি জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতাও রয়েছে বহুগুণে। সেটা ইহকালে হোক আর পরকালে হোক। কারণ রাসুল (স) বলেন: “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল আর প্রত্যেককেই তার কাজের জন্য জিজ্ঞাসা করা হবে”- বুখারি ও মুসলিম। একজন সাংবাদিক যেহেতু দেশ ও দশের অবস্থা সকলের সামনে তুলে ধরেন তাই তাকে অনেক বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তিনি যা করছেন তা নিছক সাংবাদিকতাই নয়; তার কাজের ধর্মীয় মূল্যায়নও রয়েছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ সাংবাদিক ও জনগণ হলো মুসলিম।এ পেশায় এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয় যা অন্য পেশায় কম। তাই সতর্কতাও একটু বেশি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দেশীয় নিয়ম-কানুনের পাশাপাশি একজন সাংবাদিকের ইসলামের দিক-নির্দেশনা গুরুত্বের সাথে এবং স্বচ্ছভাবে জানা থাকা উচিত। আমাদের নবি হযরত মুহাম্মদ (স) তাঁর থেকে তথ্য প্রচারে সতর্কতার নির্দেশ দিয়ে বলেন: “আমার থেকে একটিমাত্র বাণী হলেও প্রচার করো। আর বনি ইস্রাইলের ঘটনা বর্ণনা করো তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যারোপ করবে সে যেন জাহান্নামে তার জায়গা ঠিক করে নেয়।” বুখারি ও মুসলিম। এ অর্থে আরো অনেক সতর্কবাণী রয়েছে।ইসলামের মূলনীতি হলো কোন কাজের শাস্তি যদি জাহান্নাম বলা হয় সে কাজ করা হারাম এবং তা থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব।তাছাড়া অন্যের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে রাসুল (স) বলেনঃ “একজন মুসলমানের উপর আরেকজন মুসলমানের তিনটি জিনিস হারাম করা হয়েছে – ১।জীবন অর্থাৎ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যাবেনা।২।সম্পদ অর্থাৎ কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করা যাবেনা। ৩।সম্মান অর্থাৎ কারো সম্মানহানী করা যাবেনা।” তিরমিযি। ইসলামে মিথ্যাকে হারাম এবং সব অপরাধের জননী বলা হয়েছে।এমন তথ্য গোপন করা যাবেনা যাতে কারো অধিকার নষ্ট হয়। অন্যের গিবত (কারো মাঝে বিদ্যমান দোষ) প্রকাশ করা ইসলাম হারাম করেছে।তবে সাংবাদিকগণ যে সকল বিষয়ের সমালোচনামূলক সংবাদ পরিবেশন করতে পারবেন তা হল- ১।কারো বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ যাতে অন্যের বৈধ হক্ব জড়িত। ২।ধর্মীয় ফতোয়া প্রচারে যাতে অন্যের দোষের কথা উল্লেখ থাকে। ৩।সতর্কী করণ সংবাদ অর্থাৎ কেউ জালেম, দুর্নীতিবাজ,সুদখোর, ঘুষখোর বা অন্যকোন উপায়ে ধর্ম,সমাজ,রাষ্ট্র বা সর্বসাধারণের জন্য প্রমানিত ক্ষতিকর তাদের ব্যাপরে সতর্কতামূলক সংবাদ প্রচার করা। তবে এ ক্ষেত্রে কেউ যদি দণ্ডপ্রাপ্ত ও তওবা করে থাকে তার বিষয় আলাদা।৪।কেউ যদি অপরাধ স্বীকার করে সে অপরাধের সংবাদ প্রচার করা। ৫। সমাজ থেকে কোন মন্দ দূরীকরণে সহযোগিতা কামনার্থে বা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখে এমন সংবাদ প্রচার করা।৬। কোন ব্যক্তি,সম্প্রদায়,গোষ্ঠী বা দলের পরিচয় যদি নিন্দনীয় হয় তা অবিকৃত প্রচার করা।একটি সংবাদ কখোনোই গুজবের জন্য হতে পারেনা এবং তা হতে পারেনা কাউকে ধোকা,প্রতারণা বা বিভ্রান্ত করার জন্য।আর তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্যের বিকৃতি,মিথ্যা,ষড়যন্ত্র বা উদ্দেশ্যমূলক বা হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার মানসে যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ ধরনের সাংবাদিকতা দেশ ও জাতির জন্য যেমন নিষিদ্ধ তেমনি ইসলামেও হারাম বা নিষিদ্ধ। রাসুল (স) বলেনঃ “কোন মানুষ মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শুনে (সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে) অন্যের কাছে বলে বেড়ায়।” -সিলসিলাতুস সহিহাহ । সংবাদ পরিবেশনে সতর্কতার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন- “হে মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে তোমরা তা যাচাই-বাছাই করো; যাতে অজ্ঞতা বশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতি সাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হতে হয়।” সুরা হুজুরাত আয়াত-৬।এ আয়াত প্রমাণ করে কোন সংবাদই নির্বিচার প্রচার করা যায় না। কারণ উক্ত সংবাদের ভিত্তিতে কেউ না আবার অজ্ঞতা বশতঃ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। আজ একজন সংবাদ কর্মীর সহযোগিতায় বহুরুপী তথ্য সংবাদে ওঠে আসে। এ তথ্যের ভিত্তিতে ব্যক্তি,গোষ্ঠী,সম্প্রদায়,সমাজ এমন কি রাষ্ট্রও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।অনেক সন্ত্রাসী,অপরাধী এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ড আইনের আওতায় আসে;দুর্নীতি দমনে,অপরাধ কমিয়ে আনার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি,মানবাধিকার সুরক্ষায়ও ব্যাপক ভূমিকা রাখে সাংবাদিকতা। আবার রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উত্তেজনা,অশ্লীলতা অনেক অপ্রীতিকর সংবাদ ও ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সংবাদের ফলেই।অশ্লীলতা নিয়ন্ত্রনে মহান আল্লাহ বলেনঃ “নিশ্চয়ই যারা চায় মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক,তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদয়ক শাস্তি; আল্লাহ জানেন তোমরা জানোনা।” সুরা নুর,আয়াত-১৯।তথ্য মিডিয়াকে যে কোন দেশের দর্পন বলা হয়।কোন দর্পন যদি অস্বচ্ছ,উল্টো,প্রতারণামূলক বা বিকৃত হয় নিশ্চয়ই তা কেউ গ্রহণ করবেনা।পরিশেষে বলব সাংবাদিকতায় যেহেতু শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মানুষদের নিয়ে কাজ করে তাই সংবাদের সাথে জড়িত সকলকর্মীকে সুশিক্ষিত,মেধাবী,সুপণ্ডিত,আইন ও অধিকারের বিষয়ে সচেতন সর্বোপরি ধর্মীয় বিষয়ে অঢেল জ্ঞান থাকতে হবে।তবেই একটি মুসলিম দেশের সাংবাদিক হিসেবে এ পেশার সৌন্দর্য ফুটে ওঠে এবং এ পেশায় নিয়োজিত একজন সংবাদ কর্মী হিসেবে নিছক কাজ করা নয় বরং কাজটি পরিণত হয় ইবাদতে এবং ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের উত্তম প্রতিদানের কারন। এর ব্যতিক্রম হলেই একজন সংবাদ কর্মী হয়ে যাবেন দুনিয়া ও আখিরাতে একজন ক্ষতিকর প্রাণী। আল্লাহর কাছে কামনা করি যিনিই সাংবাদিকতায় যুক্ত আছেন ধর্মীয় অনুভুতি নিয়ে ইবাদতের আদলে কাজ করে দেশ ও জাতির সেবা করে পরকালে অগণিত পূণ্য অর্জন করতে পারেন।আমিন।
e-mail:professormosharafiu@gmail.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!