সমাজের শ্রেষ্ঠ নাগরিকরাই সর্বাধিক অবহেলিত!

মহান আল্লাহ বলেনঃ ” নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে আলেমগণই আল্লাহকে ভয় করে” আল কুরআন। আল্লাহর ভয়ে যারা ভীত তারা স্বভাবতই নিজেরা ভাল থাকে এবং অন্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারেনা। কারণ স্বাভাবিকভাবে একজন ভীতু মানুষ নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাস্ত থাকে। ইসলাম এমন এক সার্বজনীন কল্যাণ ব্যবস্থা যা গঠিত হয় আল্লাহর ভয়ে ভীতু জনগণ নিয়ে। আবার এটাও স্বাভাবিক যে ব্যক্তি আল্লাহতে ভীত সে অপর কোন কিছুতে ভীত নয়।

মানব জাতির কল্যাণের যত পর্যায় রয়েছে তার সব কটি ইসলামে বিদ্যমান। আর এসব কর্মসূচি কেবল আলেমদের মাধ্যমেই আবহমানকাল ধরে মানব সমাজে লালন-পালন করে আসছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ছায়াদার বৃক্ষের ন্যায় আলেমগণ বিনামূল্যে মানুষকে নৈতিক ও ধর্ম শিক্ষা দিয়ে মানব সমাজ বিনির্মাণ করে যাচ্ছেন। সুদূর অতীত থেকে আজ অবধি অতি অল্প রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রাপ্ত এবং বেশিরভাগ স্বীকৃতিহীনভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে এত উপকারী ভূমিকা কোন জাতি, দেশ বা সমাজে আলেম ছাডা অন্য কেউ রাখেনি। এ অবদান রাখতে গিয়ে অনেক সময় আলেমগণ জুলুম, শাস্তি এমনকি মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গনও করেছেন সে সংখ্যা নেহায়েত কম না।

তাছাড়া চরম বাস্তবতা হলো সমাজে এ গুণী জনগণগুলো সর্বাধিক অবহেলিত! পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোন নজির নেই কোন আলেমের অধীনে কোন আলিম জালিম হয়েছে, কোন আলেম খুন, হত্যা, চুরি, জেনা,ভ্যাবিচার, অন্যের সম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণ, জনগনের সম্পদ অবৈধভাবে ভোগ, ঘুষ, সুদ বা অনুরুপ অপরাধ দ্বারা সমাজ ও দেশকে কলুষিত করেছে। যদিও কিছু কুলাংগার আলেম কিছু উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তার বেশিরভাগ হয়েছে অআলেম নিয়ন্ত্রিত সমাজে। অথবা তার পিছে রয়েছে সুনির্দিষ্ট ও বিচ্ছিন্ন কারণ।

কয়েক শতাব্দী ধরে পৃথিবীজুড়ে আলেমগণ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বহীন অবস্থানে রয়েছেন। তারা সমাজে বেশিরভাগই কৃচ্ছ্রব্রত জীবন যাপন করেন। সত্যিই বিস্ময়কর ব্যাপার হলো আলেম যত বড় মাপের হন তিনি ততবেশি দুনিয়া বিমুখ এবং নির্লোভ হয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে অআলেম ব্যক্তিরা ঐসব স্বার্থ জড়িত জায়গা গুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং তারা নিজেরা প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে ভাবে ভয়ংকর সব অপরাধে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ে যেখান থেকে আমৃত্যু বেরিয়ে আসতে পারে না। শুধু তাই নয় তারা পরবর্তীর জন্য এমন এক প্রজন্ম সৃষ্টি করে যায় উক্ত পাপের ওয়ারিশান হিসেবে যারা সময়ের সেরা নিকৃষ্ট উদারণ রেখে যায়। যেকারণে সমাজে আলেমের সংখ্যা কম এবং অপরাধীর সংখ্যা সবসময়ই শীর্ষে থাকে। জ্ঞান নির্মাণ করে আর অজ্ঞতা ধ্বংস করে।

রাসুলুল্লাহ (সা) আলেমের মৃত্যুকে জ্ঞানের মৃত্যু বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা কারো অন্তর থেকে জ্ঞান ছিনিয়ে নেন না;বরং তিনি জ্ঞান উঠিয়ে নেন দ্বীনের আলেমদের মৃত্যু দানের মাধ্যমে”। বুখারি ও মুসলিম। তাহলে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে হাদিসের ভাষায় মানব জাতির মধ্যে জ্ঞানের ধারক ও বাহক আলেমগণ। এরাই যেকোন দেশের প্রথম শ্রেণির নাগরিক। কোন হারামখোর, পাপী, ধর্ম ও দেশীয় আইনে অপরাধী এবং দুশ্চরিত্রের অধিকারীরা সমাজ ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসলেও তারা অন্তত প্রথম শ্রেণির নাগরিক নয় বরং প্রথম শ্রেণির অপরাধী।

একজন আলেমের পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনে আল্লাহ ছাড়া আর কারো জবাবদিহিতার আর কোন জায়গা থাকেনা। এ অনুভূতি জাতীয় অনুভূতি হওয়া উচিত। কারণ তিনি কোন কাজ মানুষের বাহবা পাওয়ার জন্য করেন না বরং করেন আল্লাহকে খুশি করার জন্য।

প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে তারা শুধু মানুষের নয় অন্যান্য জীবের জন্যও উপকারী। রাসুল (স) বলেনঃ ” মানুষের মধ্যে সে ই বেশি উত্তম যে মানবজাতির উপকার করে”। হাদিস। শুধুমাত্র আলেমরাই এ কথা যথার্থ উপলব্ধি করে আমল করে। একজন প্রকৃত আলেমের কাছ থেকে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া তো দূরের কথা কেউ এতটুকু আহত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকে। কারণ সে রাসুলের (স) সে কথার অনুসরণ করে রাসুল (স) বলেনঃ “প্রকৃত মুসলিম হলো সে ই যার হাত ও কথার ক্ষতি থেকে অন্যেরা নিরাপদ থাকে”। হাদিস

আর অপর পক্ষে অন্য যেকোন নাগরিক তার জীবনের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপে সে অভিযোগের পাত্র। একজন দুনিয়াদার ব্যাক্তির চোখে একজন আলেম পশ্চাদপদ, অসামাজিক আর কতো নানান নিন্দনীয় পাত্র কোন কারণ ছাড়াই!

আলেমদেরকে সর্বোচ্চ দুভাগে ভাগ করা যেতে পারে ১। প্রকৃত আলেম আর ২। অপ্রকৃত বা নামদারী আলেম।অআলেমদেরকে অগণিত শিরোনামে ভাগ করা যায়। তারমধ্যে- কাফির, ফাসিক, কপট, ফাজির,অমুসলিম, নাস্তিক, ধর্মনিরপেক্ষ, ইত্যাদি। অসংখ্য এ শিরোনামে অপ্রকৃত আলেমরা ঢুকে পড়ে যায় বলে অনেকে সব আলেমকে একপাত্রের মনে করে ভুল করে থাকে।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ অআলেম হওয়ায় তারা এমন স্বপ্ন সাজাতে মরিয়া যে ভেবে দেখার সময় নেই। এমনকি জীবনটাই ক্ষয় করে দিচ্ছে। বেদ্বীন ফর্মুলায় জীবন পরিচালনা করতে গিয়ে কখনো দ্বীনহীন কখনো শুণ্যহাতে অপরাধী হচ্ছে। জীবন, দেশ ও সমাজ সাজাতে গিয়ে সবই নষ্ট ও ধ্বংস করে দিচ্ছে। আর যুগে যুগে জ্ঞানশূন্য ছানি পড়া দৃষ্টিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে আলেমদেরকে। প্রকৃত একজন আলেম কোন নির্দিষ্ট পরিবার, সমাজ বা দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা। তিনি বিশ্ববাসীর জন্য, মানবতার জন্য। আর একজন অআলেম মানুষ সে তার নিজের জন্য। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ্য কিছু মানুষ থাকেন যারা নিজেরা অআলেম হলেও আলেমের সহযোগী হিসেবে কাজ করে ভালবাসে এবং আলেমের কাজে ভূমিকা ও অবদান রাখেন তারাও প্রমাণিত ধর্ম ও সমাজের সুনাগরিক হিসেবে বিবেচিত। আলেমগণকে যেমন জ্ঞানের কারণে নবীদের উত্তরাধিকারী বলা হয়েছে তেমনি এ সুনাগরিক গণকে আলেমদের উত্তরাধিকারী বলা যায়।

আর এখানে আলেম বলতে নিছক কামিল, দাওরা, তথাকথিত মুহাদ্দিস, মুফাসসির বা মুফতিকে বুঝানো হয় নি।৷ ইসলামে আলেম বলতে কাগজের ডিগ্রিধারী ব্যক্তির স্বীকৃতিকে নির্দেশ করেনা। বরং আলেম বলতে ইসলাম সম্পর্কে সেভাবে জানা যেভাবে জানলে নবীদের (আ) যোগ্য উত্তরসূরী বলা হয়।
এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকতেও পারে নাও থাকতে পারে। যেমন সাহাবী (রা)।
তারা কোন কাগজের ডিগ্রিধারী না হয়েও আলেম হয়েছিলেন এবং দুনিয়াতেই জান্নাতের ডিগ্রি প্রাপ্ত হয়েছেন।

প্রকৃত আলেমগণকে তথা কথিত সাময়িক ভাইরাল হওয়ার প্রয়োজন থাকেনা; থাকেনা লোক দেখানো কাজ করার।

জ্ঞান ও সুবিবেচনায় সকল কল্যাণ কাজের সাথে সম্পর্ক থাকে আলেমের। শুধু তা ই নয় কোন ভাল কাজ হাত ছাড়া হলে আফসোস করেও তার সমর্থন করে থাকেন। অপর পক্ষে অআলেমগণ পাপের কাজের সাথে সমর্থন করে হলেও।

তাহলে এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে আলেমগণ এতটা ভাল হওয়া সত্ত্বেও তারা আজ সমাজের সর্বাধিক অবহেলিত অথচ তারাই যেকোন সময়, সমাজ এবং দেশের শ্রেষ্ঠ নাগরিক। সময় ঘুরে যাক। শ্রেষ্ঠ নাগরিকরাই হোক সমাজ ও দেশের কর্ণধার। আল্লাহ ক্ববুল করুন। আমিন।

মোঃ মোশারফ হোসেন
প্রভাষক (আরবি)
শহর গোপিন পুর ফাযিল মাদ্রাসা
ঘাটাইল, টাংগাইল

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!