সভ্যতার প্রতিটি ইট ও কাঠে শ্রমিকের ঘাম ও রক্তের চিহৃ

 বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কুলিমজুর’ কবিতায় জানান দেয় শ্রমিকের সম্মান। প্রকৃত মর্যাদা। ১লা মে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে এ দিনটি পালিত হয়। যার পরিচয় ‘মে দিবস’ হিসেবে। ১৮৮৬ সালের মে মাসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক আন্দোলন ও সংগ্রামের পুণ্যস্মৃতির সম্মানে এই দিনটি পালিত হয়।

শ্রমিকরা আজও নির্যাতিত। পান না তাঁদের ন্যায্য মজুরি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ অবস্থা ছিল আরো খারাপ। শ্রমিকরা তখন দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করলেও তার বিনিময়ে সামান্য মজুরিও পেতেন না। উপরন্তু ছিল মালিকপক্ষের অনবরত অকথ্য নির্যাতন।

১৮৬০ সালে শ্রমিকরা তাঁদের মজুরি না কমিয়ে সারা দিনে আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের জন্য দাবি জানান। এ জন্য তাঁরা একটি সংগঠনও তৈরি করেন। পরবর্তীকালে, যার নাম হয় আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার। এই সংগঠন শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অবিরত আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে।

১৮৮৪ সালে সংগঠনটি দিনে কাজের সময় ‘আট ঘণ্টা’ নির্ধারণের জন্য মালিকপক্ষের কাছে সময় বেঁধে দেয়। সময় দেওয়া হয় ১৮৮৬ সালের ১ মে পর্যন্ত। বারবার মালিকপক্ষের কাছে দাবি জানানো হলেও একটুও সাড়া মেলে না তাঁদের কাছে। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এ বিষয়ে এক আলোড়ন তোলা আর্টিকেল। ব্যস, বিদ্রোহ ওঠে চরমে। আর শিকাগো হয়ে ওঠে প্রতিবাদ-বিদ্রোহের মূলমঞ্চ।

পহেলা মে যতই এগিয়ে আসছিল, দুই পক্ষের সংঘর্ষ অবধারিত হয়ে উঠছিল। মালিক-বণিক শ্রেণি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। এরই মধ্যে পুলিশ আগে তাঁদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল। আবারও চলল তেমনই প্রস্তুতি। শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে পুলিশদের বিশেষ অস্ত্র কিনে দেন ব্যবসায়ীরা।

পহেলা মে তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন লাখ শ্রমিক কাজ ফেলে নেমে আসেন রাস্তায়। আন্দোলন চরমে ওঠে। ৩ মে, ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা শিকাগোর হে মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় জড়ো হওয়া শ্রমিকদের দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিছু পুলিশ সদস্য। এমন সময় হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণে কিছু পুলিশ আহত হন, পরে মারা যান ছয়জন।

পরে পুলিশও শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ চালালে নিহত হন ১১ জন শ্রমিক। পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করে ছয়জনকে প্রহসনমূলকভাবে দোষী সাব্যস্ত করে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়।

কিন্তু এই মিথ্যা বিচারের অপরাধ শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে। ২৬ জুন ১৮৯৩ সালে ইলিনয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিথ্যে ছিল ওই বিচার। পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।

শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ‘দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ’-এর দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়।
এক দল শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা পায় তাদের ন্যায্য দাবী। বিজয় সূচিত হয় শ্রমিক শিবিরে।

শত আনন্দের মাঝেও কোথাও যেন চরম ঘাটতি বিরাজমান। আজও শ্রমিক বঞ্চিত তাদের কাঙ্খিক মজুরী ও সম্মান থেকে।

লেখক:
এম জাকির রহমান
শিক্ষার্থী,
সমাজকর্ম বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ১ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এজেড

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!