শ্রীলংকায় আবারো ক্ষমতায় আসছেন রাজাপাকসা!  মাসুম খলিলী

শ্রীলংকায় আবারো ক্ষমতায় আসছেন রাজাপাকসা! 

মাসুম খলিলী
শ্রীলংকায় বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসের নব গঠিত রাজনৈতিক দল শ্রীলংকা পোদুজানা পেরামুনা (এসএলপিপি)১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ধরনের বিজয় লাভ করেছে। এই বিজয়ের পর রাজপাকসে আগাম নির্বাচন দাবি করেছেন। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী রণিল বিক্রমাসিঙ্গে ইউএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের কথা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনাকে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়,৪৪.৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে এই নির্বাচনে ২৩৯টি আসন জিতেছে এসএলপিপি। অন্যদিকে, ৩২.৬৩ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ৪১টি কাউন্সিলে জিতেছে ইউএনপি। তামিল পার্টি ইল্লাঙ্কাই তামিল আরাসু কাচ্চি (আইটিএকে) ৩৪টি কাউন্সিলে জিতেছে আর মাত্র ১০টিতে জিতেছে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার নেতৃত্বাধীন শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টি (এসএলএফপি)।
এই স্থানীয় নির্বাচনে রাজাপাকসার বিশাল বিজয়ে দেখা যায় এসএলএফপি’র প্রায় সব ভোট চলে গেছে তার নতুন দলের পক্ষে।রাজপাকসে দীর্ঘদিনএসএলএফপিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ২০১৫ সালে ফ্রিডম পার্টির সাবেক নেত্রী ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারুতুঙ্গা আর রাজাপাকসের স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক মৈত্রিপালা সিরিসেনা ইউএনপির সাথে হাত মেলান। তারা বিক্রমাসিঙ্ঘেকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী করার শর্তে সিরিসেনাকে সম্মিলিত বিরোধি দলীয় প্রার্থি হিসাবে দাঁড় করান। এতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজাপাকসে হেরে যান সিরিসেনার কাছে। হেরে যাবার পর রাজাপাকসে সিরিসেনার হাতে ফ্রিডম পার্টির নেতৃত্ব সমর্পনের ব্যাপারে কোন বিরোধিতা করেননি। কিন্তু ঐকমত্যের এই সরকার নানা ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে তিনি যৌথ বিরোধি দল নামে ভিন্ন এক মেরুকরণে নেতৃত্ব দেন। এই বিরোধি জোট স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে নতুন দল হিসাবে আত্বপ্রকাশ করে আর পুষ্প কুড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে নেমে আশাতীত ফল লাভ করে।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে সিরিসেনার এসএলএফপির নেতারাই এখন শুধু দলের সাথে রয়েছেন। স্থানীয় নির্বাচনের পর বর্তমান সরকারের মন্ত্রীত্বে আছেন এমন অনেক এসএলএফপির সিনিয়র সদস্য রাজাপাকসার সাথে দেখা করেছেন।
২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের আগে রাজাপাকসা চীনপন্থী হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। চীনা অর্থায়নে মাত্তালা বিমানবন্দর এবং হাম্বানতোতা বন্দর প্রকল্পের মতো বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। ক্ষমতাচ্যুত হবার পর তিনি তার ক্ষমতাচ্যুতির পুরো আয়োজনের পেছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয় ভুমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করেছিলেন।
এবারের নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে শ্রীলংকার জনগণ একটা কার্যকর সরকার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ঐক্য সততা ও সশস্ত্র বাহিনীর নিরাপত্তার পক্ষে রায় দিয়েছে।সিংহলী জাতীয়তাবাদীরা মনে করে বর্তমান সরকার ক্রমেই পশ্চিমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। রক্তক্ষয়ী তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বীররা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে উদারপন্থীরা মনে করছে তামিলদেরকে দেয়া কোন প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে সিরিসেনা জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণার দিকে চলেছেন। দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে তামিলদের প্রতি এর আগে নতুন সংবিধান গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। সে প্রতিশ্রুতি পালনে সরকার খুব বেশি কিছু করতে পারেনি। অন্য দিকে উন্নয়নমূলক কাজেও সরকার সেভাবে সফল হতে পারেনি। যে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছিল সেটিও তারা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে কুখ্যাত সেন্ট্রাল ব্যাংক বীমা কেলেঙ্কারি তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।
এবারের ভোটের ধরন অনেকটা জাতি ও ধর্মীয় ধারায় প্রভাবিত হয়েছে। বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু এলাকায় রাজাপাকসার এসএলপিপি বেশি ভালো করেছে।তামিল, মুসলিম ও স্থানীয় খ্রিস্টান প্রধান এলাকায় ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি ভালো করেছে। যুদ্ধে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের শোক প্রশমনে বা নতুন সংবিধান বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে খুব সামান্য পদক্ষেপই নেয়া হলেও সংখ্যালঘু তামিল ও শ্রীলংকার মুসলিমরা অপেক্ষাকৃত “কম ক্ষতিকর”রনিল বিক্রমাসিঙ্গের দলকে ভোট দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারির নির্বাচনে যে লিবারেল ভোটগুলো মৈত্রিপালা সিরিসেনার পক্ষে গিয়েছিল, সেগুলো এবার গেছে মাহিন্দা রাজাপাকসার কাছে।
বিব্রতকর পরাজয়ের পরও ক্ষমতায় থাকার জন্য ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) এসএলএফপি’র কিছু দলত্যাগীদের সাথে নিয়ে সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছে।রণিল এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার সাথে দেখা করে তার এই আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে অবহিত করেছেন। কিছু স্থানীয় মিডিয়ার রিপোর্ট অনুসারে প্রেসিডেন্ট এসএলএফপি’র সদস্যদের বলেছেন শিগগিরই তিনি বড় ধরনের পরিবর্তন আনবেন।
প্রধানমন্ত্রী রণিল মনে করছেন,সংসদে ইউএনপির যে সদস্য সংখ্যা রয়েছে তাতে দলটি নিজে সরকার গঠন করতে পারে। সংসদের ২২৫ আসনের মধ্যে ১০৬টি রয়েছে তাদের। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য আরও সাতজন এমপির সমর্থন তাদের দরকার। তারা আশা করছে মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিলে হয়তো এসএলএফপি ক্যাম্প থেকে তারা সে সমর্থন পাবে।
কিন্তু এতো সহজে রণিল বিক্রমাসিঙ্গে সরকার গঠন করতে পারবেন বলে মনে হয় না। এটি করতে গেলে সিরিসেনার অনুগত যারা ফ্রিডম পার্টিতে অবশিষ্ট রয়েছেন তারা মুখ ঘোরাবে রাজাপাকসের দিকে। সেটি হলে এসএলএফপির নেতৃত্ব রাজাপাকসের কাছে ছেড়ে দিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবার ব্যাপারে সিরিসেনার উপর চাপ বাড়বে।
বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী আগামী সংসদ নির্বাচনের তারিখ ২০২০ সালের আগস্টে। সংবিধান অনুসারে এর দেড় বছর আগে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়া যেতে পারে। তবে,সংসদ চাইলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে আরও আগে নির্বাচনের আয়োজন করতে পারে। রাজাপাকসার নতুন দল এসএলপিপি চাইছে ২০১৯ সালেই সংসদ নির্বাচন দেয়া হোক। এই নির্বাচনে যে আবারো রাজাপাকসে ক্ষমতায় আসবে তাতে সন্দেহ কমই রয়েছে। তবে সংবিধান অনুযায়ী তিনি আর প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। যদিও প্রধানমন্ত্রী হবার পথে তার সামনে কোন বাধা নেই।
শ্রীলংকায় রাজপাকসের পক্ষে যে জনজোয়ার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সৃষ্টি হয়েছে সেটি কোন ভাবেই স্বস্তিকর নয় দিল্লির জন্য। আগের নির্বাচনের কলকাঠি পেছন থেকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালনার করার বিষয়টি শ্রীলঙ্কায় ওপেন সিক্রেট। তবে দেশটির বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জোট সরকার ভারতীয় স্বার্থের পক্ষে খুব বেশি কিছু করতে পারেনি। জোট সরকারকে চীনা বিনিয়োগের জন্য এক ধরনের ভারসাম্য নীতি অনুসরণ করতে হয়েছে। কিন্তু রাজাপাকসে তার অবস্থান কোন সময় পরিবর্তন করেননি। তিনি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় দুয়েকটি ক্ষেত্রে চীনা বিনিয়োগের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু তামিল যুদ্ধে তার ও পরিবারের অন্য কয়েক সদস্যের বিরুদ্ধে পশ্চিমের যুদ্ধাপরাধের যে খড়ক তা থেকে কেবল সুরক্ষা দিতে পারে চীনারাই। এই বাস্তবতার কারণে তিনি সপ্তাহব্যাপি চীন সফরও করে এসেছেন গত বছরের শেষ দিকে। বেইজিং শ্রীলংকার সব সরকারের সাথে কাজ করার নীতি অনুসরণ করলেও পরিক্ষিত মিত্র রাজপাকসে থেকে কোনভাবেই মুখ ফেরাবে বলে মনে হয় না।
এতে আগামী নির্বাচনে রাজাপাকসের সরকার যে অবয়বেই হোক না কেন ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আর সেটি হলে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় পররাষ্ট্র নীতি আরেকবার হোঁচড় খাবে এই প্রতিবেশি দ্বীপ দেশটিতে।

Image may contain: 1 person, smiling

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!