শেখ হাসিনার নির্বাচনি সন্ত্রাস : ফিরোজ মাহবুব কামাল

ম্যালেরিয়া বা নিউমনিয়ার ন্যায় প্রতিটি রোগই পৃথিবীর সব দেশে সব সময় একই সিম্পটম নিয়ে হাজির হয়। ফলে বাংলাদেশে বসে বিলেতের ডাক্তারদের লেখা বই পড়ে চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞান লাভে অসুবিধা হয়না। এবং অসুবিধা হয় না যে কোন দেশে বসে রোগ চিনতে। তেমনি দুনিয়ার প্রতিদেশে স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী সরকারও একই রূপ সিম্পটম নিয়ে হাজির হয়। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের যে চরিত্রটি শেখ মুজিবের সময় ছিল এখনও সেটিই বেঁচে আছে। শেখ হাসিনার নির্বাচনী কৌশলও অবিকল তাই -যা শেখ মুজিবের ছিল। সে কৌশলটি হলো নির্বাচনি সন্ত্রাস এবং নির্বাচনের আগেই বিজয়। এবং সেটি সন্ত্রাসের মাধ্যমে মাঠ দখলে নিয়ে এবং বিরোধী দলগুলিকে রাজপথ থেকে বিলুপ্ত করে। সেরূপ কৌশল দেখা গেছে ১৯৭০ সালের নির্বাচনও। সে নির্বাচনে শেখ মুজিব বিরোধীদের রাজপথে নামতে দেননি। দলীয় গুণ্ডা লেলিয়ে তাদেরকে মিটিং মিছিলও করতে দেয়নি। আওয়ামী লীগের বাইরে সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে তিনটি প্রধান দল হলোঃ এক). ফজলুল কাদের চৌধুরীর নৃতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ, দুই). নুরুল আমীন সাহেবের নৃতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডিমোক্রাটিক পার্টি এবং তিন). জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগের দলীয় গুন্ডাগণ এ তিনটি দলের কোনটিকেই ঢাকার পল্টন ময়দানে কোন মিটিং করতে দেয়নি। একই অবস্থা ছিল দেশের অন্যান্য শহরেও।

স্বচোখে দেখা সে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী গুণ্ডামীর উদাহরণ দেখা যাক। ১৯৭০ সালের ১৮ জানুয়ারীতে পল্টন ময়দানে  ছিল জামায়াতে ইসলামের জনসভা। সে জনসভার উপর হামলা করে দুই জনকে হত্যা করে এবং শত শত ব্যক্তিকে আহত করে। ২৫ শে জানুয়ারি ছিল মুসলিম লীগের মিটিং। সে মিটিংয়ে প্রধান বক্তা ছিলেন  ফজলুল কাদের চৌধুরী। জনসভা শুরু হওয়ার আগেই পণ্ড করে দেয় সে জনসভা। আওয়ামী লীগ তার ফ্যাসিবাদী চরিত্র আদৌ বদলায়নি –আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সেটিই পুরাপুরি প্রকাশ পাচ্ছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির রীতি হলো, যে কোন নির্বাচনে বিজয়ের সাথে পরাজয়ের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হয়। শেখ হাসিনার সমস্যা হলো তিনি হারতে রাজী নন। রাজী ছিলেন না শেখ মুজিবও।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                       ফ্যাসিবাদী রাজনীতির  সেটিই রীতি। গণতন্ত্রের জন্য সেটি মহা বিপদ ঘটায়। স্বৈরাচারী শাসকগণ নিজেদের বিজয়কে সুনিশ্চিত করতেই বিরোধী দলকে বিলুপ্ত করে। শেখ মুজিব তাই সকল দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশালী নিজাম প্রতিষ্ঠা করেন। শেখ হাসিনা বিরোধী দল নিষিদ্ধ না করলেও অসম্ভব করেছেন নিরেপক্ষ নির্বাচন।

খেলা নিরপেক্ষ করতে হলে রিফারী নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হতে হয়। সেটিই সারা দুনিয়ার নিয়ম। প্রতিদ্বন্দি দু’টি দলের মধ্য কোন একটি দল থেকে রিফারী নেয়া হলো খেলা কখনোই নিরপেক্ষ হয়না। গ্রহণযোগ্যও হয় না। বাংলাদেশে তাই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রথা। শেখ হাসিনার কাছে সেটি ক্ষমতায় যাওয়ার আগে ভাল লাগলেও এখন সেটি ভাল লাগে না। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তাতে থাকে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা হারানোর ভয়। শেখ হাসিনা তেমন একটি পরাজয় মেনে নীতি রাজি নন। ফলে নিজেই সেজেছেন রিফারী এবং চালু করেছেন গুম-খুনের রাজনীতি।

নিরপেক্ষ নির্বাচনে অর্থ হলোঃ সব দল নির্বাচনী প্রচার সমান সুযোগ দেয়া। প্রতিদ্বন্দী দল দু’টির মাঝে একটি দলের খেলোয়াড়দের হাত-পা ভাঙ্গা হলে বা তাদেরকে লাল দেখিয়ে মাঠের বাইরে পাঠানো হলে খেলাতে কোন দলটি জিতবে সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন। নির্বাচনে সেটিই হয় প্রতিদ্বন্দি দলের নেতাকর্মীদের জেলে নিয়ে বা রাজনীতির ময়দানে মিটিং মিছিল করতে না দিয়ে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার তো তাই করছে। সেটি বুঝা বাংলাদেশের পত্রিকার প্রতি দিনের খবরের দিকে তাকালে। সম্প্রতি প্রকাশিত খবরের শিরোনামগুলি হলোঃ মির্জা ফখরুলের নির্বাচনী প্রচারে হামলা ও গাড়ি ভাঙচুর; মওদুদের নির্বাচনী সভায় সরকার সমর্থকদের হামলা, আহত ৪০; মওদুদ আহম্মদের গাড়িতে ককটেল নিক্ষেপ, ৪/৫ জন আহত; মঈন খানের নির্বাচনী প্রচারে হামলা ও ভাঙচুর, ৪ মোটরসাইকেল ছিনতাই; চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি প্রার্থীর গাড়িবহরে আওয়ামী লীগের হামলা-ভাঙচুর; রাজগঞ্জে যুবদল নেতার বাড়িতে আ.লীগ-যুবলীগের ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ; সীতাকুণ্ডে নির্বাচনী সভা থেকে বিএনপির ২৫ নেতাকর্মী আটক; বিএনপির সাবেক ৩ কমিশনার আটক; চৌগাছায় জামায়াতের ২ নেতা গ্রেফতার; নড়াইলে বিএনপির প্রার্থীর কর্মীসভায় হামলা, নির্বাচনী সংঘর্ষঃ বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধসহ আহত ৬৭; শাহজাদপুরে বিএনপি প্রার্থীর বাড়িতে হামলা; ৩টি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ; বগুড়ায় বিএনপি প্রার্থীর গাড়িবহরে হামলা এবং ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া; খালেদা জিয়ার উপদেষ্টার বাসায় পুলিশের তল্লাশি এবং কয়েকজন আটক; রাজধানীতে নারী-শিশুসহ বিএনপির ৭ নেতাকর্মীকে তুলে নেয়ার অভিযোগ; মানিকগঞ্জে বিএনপি প্রার্থীর প্রচারণায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের দফায় দফায় হামলা; ময়মনসিংহে বিএনপির মিছিলে হামলা-ভাংচুর এবং আহত ৩৫; ধুনটে বিএনপির প্রার্থীর গাড়ি বহরে হামলা-ভাংচুর এবং আহত ২০, নাটোরে বিএনপির প্রার্থীর পোস্টারে আগুন এবং পোস্টার লাগাতে বাধা, চলছে ব্যাপক ধরপাকড়ঃ রাজধানীতেই বিএনপির অর্ধশত নেতাকর্মী আটক।

এর পরও কি বুঝতে বাঁকী থাকে, নির্বাচন জিততে শেখ হাসিনা কতটা বেপরওয়া। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ততই তাঁর স্বৈরাচারি রূপটি অতি হিংসাত্মক ও আক্রমণমুখি হচ্ছে। বিরোধী দলকে তাই বুঝতে হবে, স্রেফ নির্বাচনে অংশ নিলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। ফ্যাসিবাদী সরকারকে কখনোই নির্বাচনে হারানো যায় না। নির্বাচনে অংশ নেয়ার একটি সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে স্বৈর-সরকারের গণবিরোধী অপরাধী চরিত্র জনগণের সামনে উম্মোচিত হয় মাত্র। জনগণ তখন চিনতে পারে প্রকৃত ভোট ডাকাতদের। সে সাথে বিরোধী দল পায় একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে একতা গড়ার সুযোগ এবং জনগণের সাখে সংযোগের সুযোগ। এত দিন সে সুযোগটি তারা পায়নি। নির্বাচনে অংশ নেয়ার এটিই আসল লাভ। বুঝতে হবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু হয় মাত্র, শেষ হয়না।  ফলে ফাসিবাদী স্বৈরাচার হটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে লড়াই শুরু হলো, এখন কাজ হলো নির্বাচনের পর এ লড়াইকে তীব্রতর করা। ফাসিবাদের উৎখাতে এ ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। ১২/১২/২০১৮

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!