প্রসঙ্গ স্বাধীনতার ঘোষণা :মিথ্যা এবং শত মিথ্যার যোগফল শুধু যে মিথ্যার বেসাতি

হোসেন শাহাদাত সোহরাওয়ার্দি, ওয়াশিংটন, DC

কিছুদিন আগে আমি বাংলাদেশের গত শতবর্ষের নির্ভীক সন্তান শহীদ জিয়াউর রহমান কে ‘কায়েদে আজাদী’ উপাধিতে ভূষিত করে একটি কবিতা রচনা করেছিলাম যা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আমি উপলব্ধি করি এবং আমার মত অনেক বাংলাদেশীরা কায়মন বাক্যে বিশ্বাস করেন এই উপাধি টা শহীদ জিয়াউর রহমানের একান্ত প্রাপ্য এবং তাঁকে অনেক আগেই উপাধিটি দিয়ে ভূষিত করা উচিত ছিল। সে যাহাই হউক, কেন তাঁকে উপাধি টি দিয়েছি এর একটা বিশ্লেষণ দেওয়া নিজে থেকেই অনুভব করছি। প্রথমেই আমি সেই কবিতা টিকে এখানে আবার নিবেদন করার প্রয়োজন বোধ করছি যাঁরা আগে পড়ার সুযোগ পাননি তাদের জন্য।

‘স্বাধীনতার নেতা’ জিয়াউর রহমান

প্যাচা ডাকা মাঝরাতে, টিক্কার শকুনেরা যখন দিচ্ছে কামানের হাঁক।

ইতিহাসের সেই বাঁকে, জনতা উন্মুখ হয়ে শুনতে চাচ্ছে একটি ডাক,

ভয়ঙ্কর আক্রমণে সমগ্র জাতি সম্পূর্ণ দিশেহারা, ভীত সন্ত্রস্ত বাঙালি,

আনন্দ চিত্তে আত্মহারা হয়ে পাকি হায়েনারা খেলছে রক্তস্নাত হোলি।

কামানে বারুদে জর্জরিত ইকবাল হল, পুলিশ লাইন আর ইপিআর,

হুঙ্কার ‘হত্যা করো, চাইনা মানুষ, চাই শুধু লাশ, ‘চালাও বলাৎকার’।

পলায়নপর সব রাজীনীতিবিদ, দ্বিধাগ্রস্ত সেনাপতি, নেই তাঁর প্ল্যান।

ফারল্যান্ডের সাথে সব সুব্যবস্থা নিশ্চিৎ, সমর্পনেই আমি ‘বুদ্ধিমান’।

ওদিকে, অদূরে বেঙ্গল রেজিমেন্টে রচিত হলো এক আকাঙ্খিত স্রোত।

অখ্যাত, চিত্তে দীপ্ত একজন মেজর জিয়া বলে উঠলেন “We Rvolt”,

কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে এসে দিলেন ডাক বাংলাদেশের “স্বাধীনতার”

যুদ্ধ হলো শুরু, দেশের সর্বত্র ছাত্র, সিপাহী,কাঁধে কাঁধ মেলালো তাঁর।

সেই দিন কাঙ্খিত ডাক না আসলে আমাদের স্বাধীনতা থাকতো অধরা।

ভাবতেও পারছিনা কি হতো জাতির, হাতে পড়তো গোলামীর হাতকড়া।

তোমার শানে শাহাদাত বার্ষিকীতে জাতির পক্ষে থেকে আমার শ্লোগান,

ডাকবো তোমাকে এই বলে, তুমি ‘স্বাধীনতার নায়ক’ জিয়াউর রহমান।

আজ থেকে নয়, তুমি সেই ২৭শে মার্চেই হয়েছো ‘স্বাধীনতার নায়ক’,

আর তোমার এই মুকুট বাংলাদেশের আপামর জনতার জন্য বিধায়ক।

ইতিহাসের ন্যায্য পাওনা উপাধি তোমার, আমি শুধু করলাম উচ্চারণ।

এই উচ্চারণে আমাদের কারো লাগবেনা কোনো আদালতের ফরমান।

মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, না করেননি, বিষয়টি অবশ্যই বিশদ আলোচনার দাবী রাখে। এই পর্যন্ত বহু আলোচনা হয়েছে এবং হয়তোআরো অনেক হবে। আমি শুধু স্বল্প পরিসরে আমার কবিতার বক্তব্যের পক্ষে আলোচনা করবো। আলোচনায় নিশ্চয় শহীদ জিয়াউর রহমানকে কেন আমরা ‘কায়েদে আজাদী’ বা স্বাধীনতার নেতা বা স্বাধীনতার নায়ক বলে ডাকবো তারও যুক্তিযুক্ত উপাখ্যান বা প্রমাণাদি উপস্থাপন থাকবে।

কেন এই প্রবন্ধের শিরোনাম “মিথ্যা + মিথ্যা এবং শত মিথ্যার যোগফল শুধু যে মিথ্যার বেসাতি সৃষ্টি করে” এর একটা শানে নজুল শ্রদ্ধেয় পাঠক/পাঠিকাদের জন্য দেওয়া আবশ্যক মনে করছি। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান যখন SEATO (South East Asian Treaty Organization) এবং CENTO (Central Treaty Organization) তে যোগদান করেছিল তখন সাংবাদিকদের একটি প্রশ্নের উত্তরে পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি সহাস্যে বলেছিলেন “জিরো + জিরো + জিরো অথবা জিরো X জিরো X জিরো ইজ ইকুয়েল টু জিরো অলওয়েজ, তাইনা?”। প্রশ্নটি ছিল “আপনি ইসলামিক রিপাব্লিক অফ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে কেন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশ গুলিকে সঙ্গে না নিয়ে পশ্চিমাদের ডিফেন্স ট্রিটি তে পাকিস্তান কে যুক্ত করলেন?”. SEATO’র সদস্যরা ছিল আমেরিকান যুক্ত রাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, নিউ জিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড এবং পাকিস্তান। CENTO’র সদস্যরা ছিল তুরুস্ক, ইরান, ইরাক,পকিস্তান এবং আমেরিকান যুক্ত রাষ্ট্র। শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী শহীদ সাহেব বোঝাতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানের মত দুর্বল রাষ্ট্রকে বন্ধুত্ব করতে হলে করতে হবে শক্তিশালী রাষ্ট্রদের সঙ্গে, দুর্বলদের সঙ্গে নয়। কারণ দুর্বল পাকিস্তানের স্বার্থে শক্তিমান রাষ্ট্রের সঙ্গে জোট বাঁধা বাঞ্ছনীয়। তখনকার সময় আরব রাষ্ট্র গুলিকে ধনী রাষ্ট্র বা শক্তিশালী রাষ্ট্র বলে গণ্য করা হতোনা।

যদিও দেশের আপামর জনসাধারণ ইতিহাস ও সত্য বিশ্রুত নয়, তথাপি আওয়ামী ও আওয়ামী ঘরানার লোকজন দাবী করেন যে শেখ মুজিবুর রহমান (তিনি নিজে নন) ২৫শে মার্চ রাতে বন্দীত্ব গ্রহণ করার পূর্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তাঁরা তাঁদের দাবীর পক্ষে সেই সময়ের প্রেক্ষিতের সহায়তা না নিয়ে অনেক দেশি বিদেশি লেখকদের বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। আর দিয়ে থাকেন যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তান সরকার কি বলেছেন তার উপর। বিশেষ করে WITNESS TO SURRENDER (SIDDIK SALIK) এবং REDACTD HAMOODUR RAHMAN CIMMISSION REPORTER উপর। তাঁদের দাবীর দুর্বলতা ও সেই সঙ্গে অসাড়তা প্রমান করা ই হবে এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। তাঁরা যে দুই তিনটি সেনারিও উপস্থাপন করেন তার সব গুলি মিথ্যা, মিথ্যা, ও মিথ্যার বেসাতি।

আওয়ামী ও আওয়ামী ঘরানার লোকদের দাবীগুলি যথাক্রমে এইরূপ।

প্রথম দাবী : তাঁরা দাবী করেন মরহুম শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এই ঘোষণাটি দিয়ে: “Pak Army suddenly attacked E.P.R. Base at Peelkhana, Razarbag Police Line and killing citizens. Street battles are going on in every street of Dacca, Chittagong. I appeal to nations of the world for help. Our freedom fighters are gallantly fighting with the enemies to free the motherland. I appeal and order you all in the name of Almighty Allah to fight to the last drop of blood to liberate the country. Ask police, the E.P.R., the Bengal Regiment and the Ansars to stand by you and to fight. No compromise. Victory is ours.”

তাঁরা বলেন এই উপরিউক্ত ঘোষণাটি শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে পাঠানো হয়েছিল সুবেদার মেজর মোহাম্মদ শওকত আলীর কাছে যিনি তখন EPR HEAD QUARTER পিলখানায় নিজ বাসায় অবস্থান করছিলেন। সেঘোষণার চিরকুট সেখানে পৌঁছে দেন কেও একজন পিলখানার গেইটে। ঘোষণাটি পাওয়ার পর শওকত আলী সাহেব ট্রান্সমিট করেছেন বাসভবন থেকে একটি পোর্টেবল ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে। এই ডিক্লারেশন এর তথ্য জানিয়েছেন ডক্টর পারভীন, সুবেদার মেজর মোহম্মদ শওকত আলীর মেয়ে একটি লেখনীর মাধ্যমে। ছাপা হয়েছিল daily ‘Janakantha’ এর ২৪শে জুলাই ২০০৪ সংস্করণে। ডক্টর পারভীন বলেন, ২৫শে মার্চ ১৯৭১ রাতে সুবেদার মেজর শওকত আলী পিলখানায় নিজের কর্মক্ষেত্রে ছিলেন। আর পরিবারের তে সবাই ছিলেন তখন রাজশাহীতে। তিনি সিগন্যাল কোরে বাঙালিদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন। আজিমপুর ফটকে প্রহরারত সৈনিক মারফত রাত ১০টার কিছু পরে তার কাছে একটা ঘোষণারচিরকুট পৌঁছে যায়। তার সাথে সে রাতে আরও দু-একজন ছিলেন। রাত সোয়া ১২টার দিকে ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্বলিত খবর পাঠানো অবস্থায় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। যদিও এই তথ্য হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট এবং পাকিস্তানে শেখ মুজিবের যে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার প্রসিডিংয়ে ও পাওয়া যায়নি। এসব তথ্যের উপর কিছু খুঁটিনাটি প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় জানতে চেষ্টা করতে পারি? কিভাবে? কখন? এবং কারা এই উদ্বেগের সাথে জড়িত? মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান এই ব্যাপারটি যুদ্ধের আগেও পরে কারো সাথে শেয়ার করেননি কেন? প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নঃ সুবেদার মেজর মোহাম্মদ শওকত আলী, কখন কিভাবে এই চিরকুট টি পেয়েছিলেন? কে তাঁর কাছে নিয়ে এসেছিলো? ব্যক্তিটির নাম? যে ব্যক্তি ঐ চিরকুট টির বাহক সেই ব্যক্তি কেন স্বাধীনতার পর RECOGNIZED হননি? কেন তাঁকে কোনো খেতাবে ভূষিত করা হয়নি? কেন সেই ব্যক্তি এগিয়ে এসে তাঁর কৃতিত্বের দাবি করেননি? চতুর্থ প্রশ্নঃ ডক্টর পারভীন ১৯৭২ জানুয়ারী থেকে ২০০৪ এর জুলাই মাস পর্যন্ত এই তথ্য কারো সাথে শেয়ার করলেন না কেন? এমন একটি মহৎ কাজ তাঁর বাবা করেছেন তাতে সুবেদার মেজর মোহাম্মদ শওকত আলী সাহেব কে শেখ মুজিব সরকার posthumously ‘বীর শ্রেষ্ঠ’ খেতাব প্রদান করেননি কেন? সেটা কি তাঁর প্রাপ্য ছিল না?

এখানে একটি উদ্ধৃতি যোগ করা আবশ্যক মনে করছি। (সূত্রঃ ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’, প্রথমা প্রকাশনী, ২০১০) “আমি যতটুক জানি, সামরিক বাহিনীর সিগন্যালস সব সময় অত্যন্ত বিশ্বাসী লোকদের দ্বারা গঠন করা হয়। সিগন্যালসই কোনো বাহিনীর আত্মরক্ষার ও আক্রমণের মূল যোগাযোগ মাধ্যম। আর ইপিআর ছিল মিশ্র বাহিনী। এই বাহিনীতে অনেক অবাঙালিও ছিল। সেখানে তাদের বাদ দিয়ে সন্দেহের পাত্র বাঙালিদের হাতে সিগন্যালস থাকতে পারে না। কাজেই ইপিআর সিগন্যালসের মাধ্যমে শেখ সাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন – এটা বোধহয় অবাস্তব কথা।”বাস্তব হলো, ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরুর ২ দিন আগে ২৩ মার্চ বেলুচ রেজিমেন্ট পিলখানার দায়িত্ব নিয়ে নেয় এবং ২৫ মার্চ দুপুরে ইপিআরের বাঙ্গালী সদস্যদের নিরস্ত্র করা হয়, এটা আটকের আগেই শেখ মুজিবকে জানিয়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবক নেতা আঃ রাজ্জাক। কাজেই ইপিআর ওয়ারলেস যোগে বার্তা পাঠানো সম্পূর্ন অসম্ভব। আর কথিত ইপিআর শওকত আলীর ওয়াকিটকি থেকে চট্টগ্রামে কেনো মেসেজ পাঠানো পুরোপুরি অবাস্তব ঘটনা। কেননা, ঢাকা থেকে চিটাগাংয়ের দুরত্ব ২১২ কি.মি.ওয়াকিটকির নেটওয়ার্কের বাহিরে। প্রযুক্তির এ চরম বিকাশের যুগে ঐরূপ কোনো ওয়াকিটকি অদ্যাবধি আবিস্কার হয়নি। তাছাড়া ইপিআরের ওয়ারলেস মারফত কোনো সংবাদ চট্টগ্রাম পাঠালে সেটি প্রথমেই জানার কথা চট্টগ্রাম ইপিআরের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন রফিকের। কেননা, তিনি ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষের লোক। কিন্তু আওয়ামীলীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত মেজর রফিক এরকম কোনো বার্তার কথা কখনই স্বীকার করেন নি। বরং তার দাবী, ঐদিন তারা অনেক চেষ্টা করেও ঢাকার সাথে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন নি। স্বাধীনতার ঘোষনা নিয়ে শেখ মুজিবের দাবীর সমর্থনে এগিয়ে আসেন আওয়ামী গবেষক ডঃ মযহারুল ইসলাম। ১৯৯৩ সালে ‘বঙ্গবন্ধূ শেখ মুজিব’ গ্রন্থে। ডঃ মাযহারদাবী করেন, ২৫ তারিখ রাত ১০ টার দিকে শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে তাজউদ্দিন ও ওসমানীর সাথে তিনিও ইংরেজীতে Declaration of Independence মুসাবিদা করেন। অথচ এ বইয়ের ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত প্রথম সংস্করণে ওই ঘটনার কোনো উল্লেখ ছিলোনা। তাছাড়া ২৫ মার্চ রাতে তাজউদ্দিন ৩২ নম্বর থেকে বেরিয়ে যান রাত ৯টার আগেই। সেক্ষেত্রে রাত দশটায় তাজউদ্দিনের উপস্থিতিতে খসড়া তৈরীর দাবী- বানোয়াট বলেই প্রতীয়মান হয়। তাজউদ্দিন নিজে মঈদুল হাসানকে বলেছেন যে, স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে মুজিব রাজী হননি। মুজিব তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। একইরূপ কথা জোহরা তাজউদ্দিনও সাক্ষাৎকারে বলেছেন। এর মাধ্যমেই ডঃ মাযহারের খসড়া গল্পটির অসাড়তা প্রমানিত হয়। নয় কি? এখানে বলা প্রয়োজন, শেখ মুজিব যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে চাইতেন, অবশ্যই তা দিতে পারতেন হোটেল ইন্টার-কন্টিনেন্টালে একটি টেলিফোন কলের মাধ্যমে। হোটেল তখন আন্তর্জাতিক সাংবাদিকেরা অবস্থান করছিলেন।

দ্বিতীয় দাবি : আওয়ামী এবং আওয়ামী ঘরানা দাবী করেন যে মরহুম শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা করেন চিটাগাং এ টেলিগ্রাম করে। দেখি তৎকালীন চিটাগাং আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্ট M R SIDDIQUI সাহেব কি বলেন এই ব্যাপারে। তিনি বলেন ২৬শে মার্চ সকাল ৬:৩০ মিনিটে আমার স্ত্রী লতিফা একটি টেলিফোন কল পান। টেলিফোনটি আসে দৈনিক ইত্তেফাক এর চিটাগাং সংবাদ দাতা মইনুল আলমের কাছ থেকে। তিনি লতিফাকে তাড়াতাড়ি একটি মেসেজ লিখে নিতে বললেন। আমার স্ত্রী সাথে সাথে তা লিখে নিলেন এবং জিজ্ঞেস ওরে জানতে পারলেন যে টেলিগ্রাফ অফিস থেকে কেউ একজন মইনুল সাহেব কে এই তথ্য জানিয়েছেন। মেসেজ টি এই রকম, “The message read ‘This may be last message. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.” এখানেও আমরা খুঁটিনাটি কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে স্বচেষ্ট হবো।

প্রথম প্রশ্ন: যে ব্যক্তিকে শেখ মুজিব তাঁর ডান হস্ত জানতেন, সেই তাজুদ্দিন আহমেদ কে ২৫শে মার্চ রাত ১০:৩০ মিনিটের সময় পর্যন্ত স্বাধীনতার একটি ঘোষণা দেননি, যা তাজউদ্দীন নিজে লিখে গিয়ে ছিলেন টেপ করবেন বলে। তাজউদ্দীন, আমিরুল ইসলাম কোনো ভাবেই শেখ মুজিবকে রাজি করতে পারেননি। বরং শেখ মুজিব বলেছিলেন, “তাজউদ্দীন আমি এই কাজটি করতে পারবোনা। এই রেকর্ডের জন্য আমার উপর রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা হবে।“ (সূত্র: তাজউদ্দীন আহমেদ ‘নেতা ও পিতা’) এখানে লক্ষ্য করুন, শেখ মুজিব বলেছেন “রাষ্ট্রদ্রোহীতা”, কোন রাষ্ট্রের বিপক্ষ্যে রাষ্ট্রদ্রোহীতা? পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের বিপক্ষ্যে, যার তিনি প্রধান মন্ত্রী হতে চাচ্ছেন। আমি বলবো মরহুম শেখ মুজিব সেই সময় মার্চের দিনগুলিতে রাষ্ট্রনায়কোচিত ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির সময় ছাত্র নেতা ছিলেন এবং পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন এবং রাষ্ট্রটি ভাঙার দুঃস্বপ্ন ও কখনো দেখতেন না। আরো একটু সংযোগ করি। যে নেতা, তাজউদ্দীন আহমেদের কথা যা সমগ্র জাতির আকাঙ্খা ও ছিল, রাখতে সমর্থ ছিলেন না, একই ব্যক্তি সেই রাতেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং সাথে সাথে স্বেচ্ছায় বন্দিত্ব বরণ করেছিলেন। তা ও কি কোনো ভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব? ধরলাম, তা সম্ভব। তবে প্রশ্ন নিশ্চয় জাগতে পারে তাঁরলিখা ঘোষণার ‘চিরকুট’ টি তিনি কিভাবে ও কার মাধ্যমে টেলিগ্রাফ অফিসে পৌঁছে দিয়েছিলেন? সেই বিদগ্ধ ব্যক্তিটি কে এবং কি তাঁর নাম ? তারপর চিটাগাং টেলিগ্রাফ অফিসের কোন সেই টেলিগ্রাফ অপারেটর, যিনি বার্তা টি রিসিভ করেছিলেন? তাঁর নাম স্বাধীনতার পর স্বচ্ছতার সাথে প্রকাশিত হলোনা কেন? যেহেতু তিনি টেলিফোন করেছিলেন তাঁর একটি পদক প্রাপ্য হলোনা কেন? সব টেলিগ্রাফ অফিসে একটি লগ বুক থাকে, চিটাগং এ ও নিশ্চয় ছিল, সেখানে টেলিগ্রাফ টি লিপিবদ্ধ হলোনা কেন? এখানে আরো একটু বলা প্রয়োজন। জিয়াউর রহমান যখন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে পৌঁছালেন তখন সেখানকার নেতা কর্মী ও কর্মকর্তারা জিয়া কে কোনো ব্রিফিং দিয়েছেলেন চিরকুট ডিক্লারেশনের? নিশ্চয় দেন নি। দিয়ে থাকলে জিয়া নিশ্চয় তাঁর করা প্রথম ড্রাফটে শেখ মুজিবকে একদম উল্লেখ করেননি কেন? জিয়া তাঁর প্রথম ডিক্লারেশন টি দিতেই পারতেন না যদি তাঁকে কোনো প্রকার তথ্য তখন দেয়া হতো। পাঠক/পাঠিকারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন ঘোষণা সম্বন্ধীয় গল্প টি কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

আওয়ামী ও আওয়ামী ঘরানার লোকেরা আরো একটি দাবি করে থাকেন, তাকে তৃতীয় দাবি বলতে পারি। সেটি হলো বলধা গার্ডেন থেকে একটি বাণী প্রচার হওয়া। বলধা গার্ডেন থেকে ওয়ারলেস এর মাধ্যমে ইংরেজিতে যে ঘোষণা দেওয়া হয় সেই বিষয়ে জানিয়ে ছিলেন ডেভিড লোসাক। তিনি THE DAILY TELEGRAPH পত্রিকায় দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সাংবাদিক ছিলেন। তিনি বলেন গলাটির আওয়াজ টি খুব ক্ষীণ ছিল। তিনি আওয়াজ টি বুঝতে না পারলেও ধরে নিয়ে ছিলেন যে এটি শেখ মুজিবের TAPED করা ঘোষণা। এই ব্যাপারে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের ‘একাত্তরের মার্চ: এ যেন এক অনন্ত যাত্রা’ প্রবন্ধে একজন A K M NURUL HOQ সাহেবের সাথে তাঁর কথোপকথন বর্ণনা করেন এইভাবে। “২৫ মার্চ দুপুর ২টার দিকে আমি দুপুরের খাবার খেতে বাসায় যাই। দেখলাম নুরুল হক সাহেব বাসায় ঢুকছেন। আমি গাড়ি থেকে নেমে তাকে রিসিভ করলাম। তিনি আমার বাসায় এলেন। আমার শ্বশুর (আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সাথে তিনি গভীরভাবে জড়িত ছিলেন) খান সাহেব ওসমান আলী ১৯ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। সে জন্য তিনি আমাকে সমবেদনা জানালেন। তিনি বললেন, ‘চেষ্টা করেছি কিন্তু আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না, আমার এখন করণীয় কী। ট্রান্সমিটারটা আমি খুলনা থেকে আনিয়েছি। এটা ছিল একটা পরিত্যক্ত ট্রান্সমিটার। অফিসে রেজিস্টার বইয়ে এটার কোনো হিসাব নেই। সবাই এটাকে বাতিল বলে মনে করতো। ওটা আমি আনিয়ে মেরামত করে চালু করেছি। ওটা কাজ করছে। ওটা নিয়ে আমি এখন কী করব।’ “আমি খোকা ভাইকে (এ কে এম নুরুল হক) বললাম, ‘বঙ্গবন্ধু বলে দিয়েছেন তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করবে। আমার কাছে কলম আছে, সংগঠন আছে, আমি এটা দিয়ে মোকাবিলা করব।’ আপনার কাছে ট্রান্সমিটার আছে, ইঞ্জিনিয়ারিং বুদ্ধি আছে, আপনি ওটা দিয়েই মোকাবিলা করবেন।“ এখানে প্রশ্ন নুরুল হক সাহেবের কাছে শেখ সাহেব কি ভাবে taped ডিক্লারেশন পাঠালেন? কার মাধ্যমে পাঠালেন? শেখ সাহেব তাঁর জীবদ্দশায় এই দাবি করেন নি এবং নুরুল হক সাহেবকে ও পুরস্কৃত করেন নি। কেন করেন নি ? এসব অসঙ্গতির কোনো সদুত্তরকোথাও পাওয়া যায়না।

এবার আসুন দেখি মঈদুল হাসান ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’, প্রথমা প্রকাশনী, ২০১০ কি বলেন। তিনি বলেন, “২৬ মার্চ পাকিস্তানী আক্রমনের মুখে শেখ মুজিবের নামে একটি প্রচারপত্র ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়ে – তাতে পাকবাহিনীর আক্রমনের কথা উল্লেখ ছিল এবং আহবান ছিল লড়াইয়ের। এর সূত্র খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ২৫ তারিখ রাতে ৩২ ধানমন্ডি থেকে নিজের বাসায় ফেরেন তাজউদ্দিন, অতঃপর আমীরুল ইসলামকে সাথে নিয়ে লালমাটিয়ায় আবদুল গফুরের বাসায় আত্মগোপন করেছিলেন, যার পাশেই ছিলো ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অফিস। এ প্রসঙ্গে মঈদুল হাসান বলেন, ”স্বাধীনতার ঘোষণার ওই যে ছোট্ট খসড়াটি তাজউদ্দিন আহমদ তৈরি করেছেলেন ২৬ মার্চ, সেটির প্রায় একই রকমের ঘোষণা দেখি- একই সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য কাগজে প্রচারিত হতে, ভারতের কাগজেও হয়েছে। সুতরাং আমি ধরে নিতে পারি, সে সময় তাজউদ্দিন আহমদ যে খসড়া করেছিলেন, সেটা অন্য কাউকে তিনি হয়তো দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে তখন তরুণ কর্মীর কোনো অভাব ছিল না। বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব তখনই স্বাধীনতা ঘোষণা চাইছিল। এদের মাধ্যমে যদি এটা প্রচারিত হয়ে থাকে, তাহলে আমি বিস্মিত হব না” (সূত্রঃ মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’)। তাহলে এটাই হচ্ছে, শেখ মুজিবের নামে তথাকথিত বার্তাটির গূঢ় রহস্য” (Ref: S. Mahmud Ali, 2010. Understanding Bangladesh. Columbia University Press.).

এই প্রসঙ্গে আমি আরেকটু কথা বলতে চাই। শেখ ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া মার্চে ১০/১১ দিন ঢাকায় আলাপ আলোচনা চালাচ্ছিলেন সমস্যা সমাধানের জন্য। আওয়ামী লীগের পক্ষে ডক্টর কামাল হোসেন, তাজউদ্দীন আহমেদ, খন্দকার মুশতাক আহমেদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম। এবং ইয়াহিয়ার পক্ষে উপদেষ্টা এ আর কর্নেলিয়াস, এম এম আহমেদ, জেনারেল পীরজাদা ও কর্নেল হাসান। ২৪শে মার্চের আলোচনায় একটি সমাধান বের হয়। যাতে ক্ষমতা ট্রান্সফার হবে ঠিক হয়। বাংলাদেশ পাকিস্তানের একটি ফেডারেশন হবে স্বায়ত্তশাসিত। আলোচনা কালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের নাম “ফেডারেশন অফ পাকিস্তান” প্রস্তাব করলে ইয়াহিয়ার প্রতিনিধি “ইউনিয়ন অফ পাকিস্তান” পাল্টা প্রস্তাব দেন। পরে ঠিক হয় চুক্তি স্বাক্ষর কালে নাম চূড়ান্ত হবে। আলোচনা শেষে স্থির হয়, ইয়াহিয়ার প্রতিনিধি পীরজাদা পরের দিন অর্থাৎ ২৫ তারিখে কামাল হোসেন কে টেলিফোন করে দলিলে স্বাক্ষর করার জন্য ডেকে নেবেন। কিন্তু শেখ মুজিব কে কিছু না জানিয়ে ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে আওয়ামী লীগ নিয়ম তান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা লাভের পথে হেঁটে ছিল। এই প্রসঙ্গে এন্থনি মাসকারেনহাসের বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন আওয়ামী লীগের পক্ষে একজন সাংবাদিক বিদেশী সাংবাদিকদের মাঝে একটি প্রেস নোট বিলি করেন। তাতে শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে আবেদন ছিল, “প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছে, ক্ষমতা হস্তান্তরে মতৈক্য হয়েছে এবং আমি আশা করি প্রেসিডেন্ট তা ঘোষণা করবেন” (সূত্র: এন্থনি মাসকারেনহাস, ‘রেপ অব বাংলাদেশ’)

এখন আমরা জিয়া যে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন তার পক্ষে আলোচনা করবো।

এবার চলুন দেখি জিয়ার ঘোষণার উপরে বিভিন্ন দলিলপত্র কি বলে? প্রথমেই দেখবো কি ছিল জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণায়? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্র, তৃতীয় খন্ডে বর্ণিত আছেই সেই ঘোষণাটি: “Dear fellow freedom fighters, I, Major Ziaur Rahman, Provisional President and Commander-in-Chief of Liberation Army do hereby proclaim independence of Bangladesh and appeal foe joining our liberation struggle, Bangladesh is independent. We have waged war for liberation war with whatever we have. We will have to fight and liberate the country from occupation of Pakistan Army. Inshallah, victory is ours.”

১৯৭২ সালে ৮ই এপ্রিল আওয়ামীলীগের কাউন্সিল অধিবেশন বসে। ওই অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে তাজউদ্দীন বলেন, “আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে চট্টগ্রামে সংগ্রামরত মেজর জিয়াউর রহমান বেতার মারফত বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন এবং বাংলাদেশে গণহত্যা রোধ করতে সারা পৃথিবীর সাহায্য কামনা করেন” (সূত্র: দৈনিক বাংলা, ৯ এপ্রিল ১৯৭২)। এর ঠিক এক বছর আগে ১১ই এপ্রিল ১৯৭১ প্রবাসী সরকার গঠনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কিভাবে চলছে সে সম্পর্কে স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারিত এক ভাষণে তাজউদ্দীন আহমেদ জাতিকে অবহিত করেন, “The brilliant success of our fighting forces and the daily additions to their strength in pan power and captured weapons has enabled the government of the People’s Republic of Bangladesh, first announced through Major Ziaur Rahman, to set up full-fledged operational base from which it is administering the liberated areas.” (Ref: Bangladesh Document vol I, Indian Government).

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের বক্তব্য এখানে বলা জরুরি মনে করছি। তিনি কোনো বক্তব্যেই শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো বর্ণনা দেন নি। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সেখান থেকে সরকার ও পূর্ণাঙ্গ একটি অপারেশনাল বেস পরিচালিত হবার কথা দ্ব্যর্থহীন ভাবে স্বীকার করেছেন। দেখি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইটে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের যুদ্ধের উপর কি উল্লেখ ছিল। উল্লেখ ছিলো, “Yahya left Dacca abruptly on 25th March 1971 and Tikka khan let loose his reign of terror the same night. The next day, while the whereabouts of Mujib remained unknown, Major Ziaur Rahman announced the formation of the Provisional Government of Bangladesh over radio Chittagong”

সেইসময় একজন সৈনিকের মুখে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিলো সময়ের দাবি। পাক বাহিনীর অন্যায় ও অমানবিক আগ্রাসন কে রুখে দেয়ার জন্য ও সাড়ে সাত কোটি জনতার কাঙ্খিত স্বাধীনতার ডাক আসে চট্টগ্রাম থেকে। মঈদুল হাসানের বর্ণনায়,”ফেব্রুয়ারী বা সম্ভবতঃ তার আগে থেকেই যে সময় প্রস্তুতি শুরু, তার অবশিষ্ট আয়োজন সম্পন্ন করার জন্য মার্চের মাঝামাঝি থেকে ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনার ধুম্রজাল বিস্তার করা হয়। এই আলোচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে যুগপৎ সন্দিহান ও আশাবাদী থাকায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের পক্ষে আসন্ন সামরিক হামলার বিরুদ্ধে যথোপযোগী সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। (আমার কথা শেখ মুজিব সম্পূর্ণ ভাবে আশাবাদী ছিলেন) শেষ মূহর্ত পর্যন্ত আওয়ামীলীগ নেতা ও কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েও সহর্মীদের সকল অনুরোধ উপেক্ষা করে নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেখ মুজিব রয়ে গেলেন নিজ বাস ভবনে। (সূত্র: মূলধারা ৭১)

প্রথমেই দেখি শেখ মুজিব স্বীকৃত ঐতিহাসিক দলিল থেকে উপস্থাপনা। (সূত্র: আনন্দ পাবলিশার্স, “বাংলা নামের দেশ”) ঐ পুস্তকে শেখ মুজিবুর রহমান ২৫শে মার্চ ১৯৭২ তারিখে স্বাক্ষরিত পত্রে/বাণীতে কি বলেন। বাণীতে প্রধানমন্ত্রী মুজিব বলেন, “১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ আমি ঘোষণা করেছিলাম, “এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম” বহু নির্যাতন ও বহু দুঃখভোগের পর আমাদের সংগ্রাম স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, বাংলাদেশ নাম নতুন রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছে। সেই সংগ্রামের কাহিনী ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। পাকিস্তানী সমরনায়কদের নরমৃগয়ার শিকার হয়েছে ৩০ লাখ লোক, এক কোটি লোক আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। জঙ্গিচক্র আঘাতের পর আঘাত হেনেছে, কিন্তু আমার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনোবল তাতে ভেঙ্গে পড়েনি, আমরা স্বাধীনতা আদায় করে নিয়েছি।” এই বাণীটি একটি প্রণিধান যোগ্য বাণী। আস্থার সঙ্গে বলতে পারি এই বাণীতেও তিনি ৭ই মার্চের ডাক কে স্বাধীনতার ডাক বলেই সমর্থন দিচ্ছেন।

ঐ গ্রন্থের আরেকটি জায়গায় লিখা হয়েছে,”মুজিব গ্রেফতার। সর্বত্র সঙ্ঘশক্তি প্রায় তছনছ। এই শুন্য অবস্থাকে ভরাট করে তোলার জন্য মেজর জিয়া রবিবার ২৮ মার্চ চট্টগ্রাম রেডিও থেকে অস্থায়ী সরকার ঘোষণা করলেন। তার প্রধান তিনি নিজেই। মনোবল বজায় রাখতে সব জেনেও বললেন, মুজিবের নির্দেশেইবেই সরকার, তিনি যেমন বলেছেন তেমন কাজ হচ্ছে।” অর্থাৎ, চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।

শেখ মুজিব বর্ণিত দলিল এবং তাজউদ্দীনের বক্তব্য কি কোনো সন্দহের অবকাশ রেখেছে?

মার্কিন যুক্তরাষ্টের সম্প্রতি ডিক্লাসিফাইড করা বাংলাদেশ সংক্রান্ত দলিলপত্রে উল্লেখ কি রয়েছে তা দেখি, “On March 27bthe clandestine radio announced the formation of a revolutionary army and a provisional government under the leadership of a Major Zia Khan”.

স্বাধীনতা ঘোষণা প্রসঙ্গে প্রবীণ নেতা অলি আহাদ তার জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫ বইতে লিখেন, “আগরতলা এসেম্বলি মেম্বার রেস্ট হাউস আমার ও আওয়ামী লীগ নেতা জাতীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মালেক উকিলের মধ্যে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর এক দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্টিত হয়। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট হাসায় জানাইয়া দেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতারের পূর্বমুহুর্ত অবধি কোনো নির্দেশ দান করেন নাই। প্রসঙ্গত ইহাও উল্লেখ্য যে, আমি সর্বজনাব জহুর আহমেদ চোধুরী, আব্দুল হান্নান, আলী আজম, লুৎফুল হাই প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতাদের সহিত বিভিন্ন সময় আলোচনা কালে শেখ মুজিব ভবিষ্যত কর্ম পন্থা বা লক্ষ্যে কোনো নির্দেষ দিয়েছিলেন কিনা, জানিতে চাহিয়াছিলাম। তাহারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন যে নেতার পক্ষে পাক বাহিনীর অতর্কিত হামলার ফলে কোনো নির্দেষ দান করিতে পারেন নাই। ”

আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশের প্রভিশনাল সরকার সম্পর্কে যে সকল বর্ণনা পাওয়া যায় তার মধ্যে কয়েকটি নিশ্চয় দেখতে পারি।

The Stateman published from New Delhi on March 29, 1971 reported a speech by Major Zia declaring himself the provisional head. In a broadcast over the Free Bangla Radio Major Zia khan, commander-in-chief of the liberation army said, “I herby assume the powers of the provisional head of the liberation army of Swadhin Bangladesh.”

The Daily Telegraph, 29th March 1971 reported, “The clandestine Radio Bangladesh, thought to be in the isolated tea plantation area in the north province last night announced that a provisional government had been set up, headed by Major Zia Khan, chief of the Bangladesh Liberation Army, since March 25. (Ref: International Press on Bangladesh Liberation war by Dr. M. D. Hussain, 1989).

Siddik Salik, PRO of Gen Tikka Khan in his book (Witness to Surrender) wrote, “Major Zia took control of the transmitters separately located on Kaptai Road and used the available equipment to broadcast the ‘declaration of independence’ of Bangladesh.

অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, “শেখ মুজিব নিজে ধরা দিলেন পাকিস্তানের কাছেই। আমরা ছোট্ট রেডিও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শোনার চেষ্টা করছিলাম কোথাও কিছু শোনা যায় কিনা। তখন হটাৎ একটি কণ্ঠস্বর শুনলাম, অচেনা-অজানা কণ্ঠস্বর, বললেন, মেজর জিয়া বলছি। ২৬ মার্চ তিনি নিজেকে বাংলাদেশের প্রভিশনাল কমান্ডার ইন চিফ ও রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণা করে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা বলেন এবং স্বাধীনতার ডাক দেন।” তিনি আরো বলেন, “স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জিয়াউর রহমান। এই কথা আগেও আমার বইতে আমি লিখেছি। (সূত্র: যখন সময় এলো ).

প্রবীণ রাজনীতিবিদ অলি আহাদ এর বই ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৭-১৯৭১’ থেকে আবার উদ্ধৃতি দিয়ে এই প্রবন্ধের ইতি টানবো। স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি জনাব আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর সহিত নিয়মিত যোগাযোগ রোযা করিতাম এবং মাঝে মাঝে তাহার অভয়দাস লেনের বাসায় রাত্রি যাপন করিতে গিয়া তাহারি রেডিও সেটে ২৭সে মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র হইতে ‘স্বাধীনবাংলা রেডিওর’ ঘোষণা শুনিতে পাই। এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হইতে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠস্বরে স্বাধীন বাংলার ডাক ধ্বনিত হইয়াছিল। এই ডাকের মধ্যে সেই দিশেহারা, হতভম্ব, সম্বিৎহারা ও মুক্তি প্রাণ বাঙালি জনতা শুনিতে পায় এক অভয়বাণী, আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে ঝাপাইয়া পড়িবার আহ্বান, স্বাধীনতা ও সাবভৌমত্বের লড়াইয়ের সংবাদ। ফলে সর্বত্র উচ্চারিত হয় মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীরের পতনের সংকল্প,আওয়াজ উঠে জালেমের নিকট আত্মসমর্পণ নয়, আহ্বান ধ্বনিত হইতে থাকে আত্মপ্রতিষ্ঠার, প্রতিরোধ শক্তিকে সুসংহতকরণের। এইভাবেই সেদিন জাতি আত্মসম্বিৎ ফিরিয়া পায় এবং মরণপণ সংগ্রামে ঝাপাইয়া পড়ে।” আর এইখানে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার স্বার্থকতা। তাই জিয়াই স্বাধীনতার একমাত্র প্রমাণিত ঘোষক। আর বাকি সব মিথ্যার বেসাতি। অর্থাৎ জিয়া ‘স্বাধীনতার নেতা’। পাঠক/পাঠিকারা, আপনারাই বিচার করুন আমি পক্ষে/বিপক্ষে অনেক উদ্ধৃতি দিয়েছি। আমার দেয়া শিরোনাম কে আমি বোঝাতে সক্ষম হয়েছি? তাই না?

পরিশেষে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ চৌধুরীর আর্টিকেল “আমি জিয়া বলছি” থেকে কেয়েকটি বাক্য সংযোজন না করলেই নয়, “বর্তমান আওয়ামী সরকার জিয়াউর রহমানকে অবহেলা-অবজ্ঞা করে, আইন করে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার “ভুতুড়ে” ঘোষক বানিয়েছে কোন দলিল প্রমাণ ছাড়াই। কি জঘণ্য ইতিহাস বিকৃতি! শেখ মুজিব নিজে কখনও জিয়াউর রহমানের ঘোষণাকে অস্বীকার করেন নি বা নিজেকে ঘোষক হিসাবে দাবী করেননি। তবে জিয়ার এই দুর্লভ কৃতিত্বে তিনি খুব একটা খুশীও ছিলেন না।”

উপসংহারে বলতে চাই, সেই সময়ের প্রেক্ষিত আমাদের সামনে ঘটেছে। প্রতিটি মূহর্ত গলধঃকরণ করেছি জ্ঞানের সহিত। তখন কনফ্লিক্টের সংস্কলিস্ট পার্টি গুলো (ইয়াহিয়া, মুজিব, ভুট্টো) কিভাবে তাঁদের কূটনীতির চাল নিজের স্বার্থে আনতে স্বচেষ্ট ছিলেন তা দেখেছি। আমার মনে হয়, ইয়াহিয়া ভেবেছিলেন ব্রুট ফোর্স প্রয়োগ করে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণকে কিছুটা কাবু করে ফেলবেন। তারপর শেখ মুজিবকে রিলিজ করে এমন একটি সরকার ঘটনা করবেন যাতে পাকিস্তানের কাঠামো কোনো ভাবেই দুর্বল না হয়। কিন্তু ইয়াহিয়া ও টিক্কা অনেক বেশি লাইন করে ফেলেছিলেন যাতে আমাদের বাঙালি ফোর্স সদস্যরা তাঁদের সামরিক oath ভেঙ্গে রিভোল্ট করে ফেলবেন, যা তাঁদের ক্যাল্কুলেশনে মোটেও ছিলোনা। এদিকে শেখ মুজিব ভেবেছিলেন ইয়াহিয়া যাবেন কোথায়? তিনি ফিরতে বাধ্য হবেন তাঁর কাছে সমাধানের জন্য। কারণ তিনি আন্তর্জাতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত একজন নির্বাচিত নেতা। দেশ ভেঙে ফেলার কথা মাথায় থাকলেও তা ছিল খুব দুর্বল অবস্থানে। তেমন ভাবে নিজের মনেই যুক্তি পাচ্ছিলেন না। সুতরাং তাকে এখনই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হবে তেমন অনুভূতি সৃষ্টিই হয়নি। এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন যে টিক্কার বাহিনী বাংলাদেশের মাইনোরিটি সম্প্রদায়ের উপর অহেতুক সর্বাধিক অত্যাচার শুরু করেছিলেন। ফলে ভারতে এক কোটি বাংলায় ঠাঁই নিতে বাধ্য হয়েছিল। বলা বাহুল্য, নির্বাসিত বাঙালিদের মধ্যে ৯০ লক্ষ লোকই ছিল মাইনোরিটি সম্প্রদায়ের। তাতে ভারতকে এই কনফ্লিক্টে আন্তে সাহায্য করেছে। আর ভারত এই কনফ্লিক্টে জড়িয়ে পড়ায় য়াহয়িয়া, শেখ মুজিবের হিসাব নিকাশ ধুলিস্যাত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!