লাখো জনতার উপস্থিতিতে দুইদফা জানাযা শেষে নিজগ্রামে শায়িত হলেন জননেতা জিএম রহিমুল্লাহ

কামাল হোসেন আজাদ/ শাহনেওয়াজ জিল্লু/ শাহজালাল শাহেদ, কক্সবাজার : লাখো জনতার উপস্থিতিতে দুইদফা জানাযা শেষে নিজগ্রাম কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালীর পারিবারিক কবরস্থানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন জননেতা জি.এম রহিমুল্লাহ। সাবেক ছাত্রনেতা কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জি.এম রহিমুল্লাহর স্মরণকালের বর্ণাঢ্য নামাযে জানাযার সাক্ষী হয়েছে কক্সবাজার বাসী। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে নামাযে জানাযার সময় নির্ধারণ করা হলেও মানুষের উপস্থিতি ও আগমনকে কেন্দ্র করে বাড়ানো হয় আরো ৩০মিনিট। ওই সময়ের আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় পুরো ময়দান। তিল ধারণের ঠাঁই না থাকায় খুলে দেয়া হয় পার্শ্ববর্তী বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম ও পৌর প্রি-প্যারেটরী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ। ততক্ষণে কক্সবাজারের কেন্দ্রীয় ঈদগাঁহ ময়দান পরিণত হয় জনসমুদ্রে। আশপাশের সড়ক উপসড়কে দলমত নির্বিশেষে সর্বশ্রেণির শোকাহত জনতা যে যেখানে জায়গা পাচ্ছেন সেখান থেকে জামায়াত নেতার নামাযে জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। নেতাকর্মী আর জনতার সাগর থেকে ফুফিয়ে ফুফিয়ে ও ঢুকরে ঢুকরে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল দূর-দূরান্ত থেকে। আর মরহুমের নিজগ্রাম ভারুয়াখালীতে পড়েছে শোকার্ত জনতার কান্নার রোল।

কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জি.এম রহিমুল্লাহর প্রথম নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল ১১টায়। কক্সবাজার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত জানাযার ইমামতি করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষনেতা মাওলানা আবদুল হালিম। জননেতা জি.এম রহিমুল্লাহর জানাযাপূর্ব সমাবেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন, আমার আদরের ভাই জিএম রহিমুল্লাহর মৃত্যুর সংবাদ বিশ্বাস হয়নি। কিভাবে তিনি এতো অল্প সময়ে চলে যাবেন; তা ভাবিনি। তিনি বলেন, আপনাদের জি.এম রহিমুল্লাহ ছিলেন ছোট মানুষ। হয়ে গেলেন জাতীয় নেতা। তিনি কক্সবাজারবাসীর গৌরব ছিলেন। তার মতো যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ কম মেলে।

জানাযাপূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল। তিনি বলেন, আজকে মহানবীর জন্মদিন। এমন দিনে জি.এম রহিমুল¬াহর জানাযা হচ্ছে। ভাবতে পারিনি তিনি এত কম সময়ে বিদায় নিবেন। তিনি বলেন, ‘তিনি সকল শ্রেণির মানুষের মন জয় করে রাজনীতি করতেন। মানুষের যে কোন বিপদে আগে ছুটে যেতেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সাবেক এমপি লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, জি.এম রহিমুল্লাহ আমার বন্ধু। তার সাথে আমার রাজনৈতিক বিরোধ ছিল, তা ঠিক। কিন্তু তার মতো সাহসী বলিষ্ঠ নেতা আমি আর দেখিনি। ২৪ ঘন্টাই রাজনীতি, সমাজসেবা ছিল তার কাজ। তিনি স্বার্থপর ছিলেন না; সেবা পরায়ন রাজনীতিবিদ ছিলেন।

চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমীর ও কক্সবাজার জেলার সাবেক আমীর মুহাম্মদ শাহজাহান। তিনি বলেন, তার ঘরে অনেক সময় চাল থাকতো না। আমাদের চাল কিনে দিতে হতো। তার মতো নির্লোভ মানুষ হয় না। একজন উপজেলা চেয়ারম্যান হলেও চাল-চলন ছিল সাধারণ মানুষের মতো।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের লে. কর্ণেল (অব.) ফোরকান আহমদ বলেন, আমি দায়িত্ব পালনের কারণে জিএম রহিমুল্লাহকে কাছ থেকে দেখেছি। প্রায় সময় আমার পরামর্শ নিতেন। খুবই কর্মঠ জনপ্রতিনিধি ছিলেন। জনগণের সেবার মানসিকতা লালন করতেন। একটি রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও তার মাঝে প্রভাব ছিলনা। তার মধ্যে অকল্যাণমূলক কাজ দেখিনি। তেমনিভাবে কারো কাছ থেকে শুনিওনি।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, আমি জি.এম রহিমুল্লাহর সাথে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছি। তিনি অত্যন্ত ভাল মানুষ ছিলেন। আস্থাভাজন হওয়ায় তৎসময় আমরা তাকে ইউপি চেয়ারম্যান সমিতি কক্সবাজার জেলা কমিটির সভাপতিও বানিয়েছিলাম। আরো বক্তব্য রাখেন- জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান, নায়েবে আমীর ঝিলংজা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল গফুর, টেকনাফের হোয়াইক্ষ্যং ইউপি চেয়ারম্যান জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারী, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ছাত্র আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খাঁন, অধ্যক্ষ নুর হোসেন সিদ্দিকী, কুমিল্লা ভিকটোরিয়া কলেজের সাবেক ভিপি অধ্যক্ষ রেজাউল করিম, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল, কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমীর আলহাজ্ব সাইদুল আলম, ইসলামী ঐক্যজোটের কক্সবাজার জেলা সভাপতি হাফেজ মাওলানা সালামত উল্লাহ, রামু উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান উপজেলা জামায়াতের আমীর ফজলুল্লাহ মো. হাসান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর কাশেম, কক্সবাজার সদর উপজেলার সাবেক  চেয়ারম্যান এড. সলিম উল্লাহ বাহাদুর, সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল আলম বাহাদুর, জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি হেদায়েত উল্লাহ, জেলা ছাত্রশিবির সভাপতি রবিউল আলম, চকরিয়া উপজেলা উত্তর আমীর মাওলানা ছাবের আহমদ, উখিয়া উপজেলা আমীর মাওলানা আবুল ফজল ও কক্সবাজার শহর ছাত্রশিবিরের সভাপতি রিদুয়ানুল হক জিসান।  প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানাযায় অংশগ্রহণ করে বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এ.এইচ.এম মাহমুদুর রহমান। পরিবাবের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন জাহিদ ইফতেখার। সমাবেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুল আলম বাহাদুর ও কক্সবাজার শহর জামায়াতের সেক্রেটারি সাবেক ছাত্রনেতা আবদুল্লাহ আল ফারুখ। উপস্থিত ছিলেন চকরিয়া উপজেলা দক্ষিণ জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক, লক্ষ্যারচর ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফা কাইছার প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

মরহুম জি.এম রহিমুল্লাহর দ্বিতীয় জানাজা পৌঁনে ৩টার দিকে সদর উপজেলার নিজগ্রাম ভারুয়াখালীর দারুল উলুম মাদরাসা সংলগ্ন মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। উম্মুক্ত মাঠে সংকুলান না হওয়ায় আশপাশের পাহাড়ের চূড়া, বাসাবাড়ির আঙ্গিনা, পথে-ঘাটে লোকজন অবস্থান নেয়। দুপুর ১২টার দিকে জি.এম রহিমুল্লাহর লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্স নিজ এলাকা ভারুয়াখালি পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সবার প্রিয় জি.এম রহিমুল্লাহকে একনজর দেখতে ছুটে আসে শিশু-কিশোর আবাল বৃদ্ধবণিতা। এসময় হুঁ-হুঁ করে অঝোর নয়নে অসংখ্য মানুষকে কাঁদতে দেখা গেছে। পাহাড়ের চূড়া আর বাড়ির আঙ্গিনা থেকে মা-বোনেরা উঁকি মেরে দেখছেন কৃতী সন্তান জননেতার জানাযার দৃশ্য। এতে ইমামতি করেন ভারুখালী ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল বশর। জানাযা শেষে জি.এম রহিমুল্লাহকে তার বাড়ির পাশে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মসজিদ ও মাদরাসা সংলগ্ন কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

ভারুয়াখালীতে দ্বিতীয় জানাযাপূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমীর জাফর সাদেক, বাঁশখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা মাওলানা জহিরুল ইসলাম, রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম, পেকুয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা যুবদলের সভাপতি শেফায়েত আজিজ রাজু, হোয়াইক্ষ্যং ইউপি চেয়ারম্যান জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারী, কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল আলম বাহাদুর, কক্সবাজার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু তালেব, সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এডভোকেট সলিম উল্লাহ বাহাদুর, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল, সাবেক ছাত্রনেতা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর কাশেম, ভারুয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান সিকদার, মাওলানা আবদুর রহিম, এডভোকেট নেজাম উদ্দিন প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন আলীকদম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম।

উল্লেখ্য, জামায়াত নেতা জি.এম রহিমুল্লাহ (৫৪) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার (২০নভেম্বর) কক্সবাজার শহরের হোটেল সাগরগাঁওতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এরআগের রাতে তিনি হোটেলের চতুর্থ তলার ৩১৬নম্বর কক্ষে একাই ঘুমান। দুপুর পর্যন্ত ঘুম থেকে না ওঠায় তাকে ডাকতে যায় হোটেলের এক বয় ছেলে। এরপর ডাকতে যায় হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জি.এম রহিমুল্লাহর শ্যালক শাহেদুল ইসলাম। তিনিও গিয়ে প্রথমে দরজা ধাক্কা দেন। কোনো সাড়া-শব্দ পাননি। পরে ভ্যান্টিলেটর দিয়ে উঁকি মেরে দেখেন- জি.এম রহিম উল্লাহ উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছেন। ২টা ৪০ মিনিটের দিকে বিকল্প চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেখেন তিনি মারা গেছেন। পরে পুলিশকে খবর দেয় তারা।

শাহেদ জানান, জি.এম রহিমুল্লাহ মাঝে মধ্যে হোটেল সাগরগাঁওতে রাত যাপন করতেন। সোমবার রাতেও এসে হোটেলের চার তলার ৩১৬ নং কক্ষে ঘুমাতে যান। হোটেলে থাকলে সকালে ফোন করে বাড়ী থেকে নাস্তা আনাতেন। কিন্তু মঙ্গলবার তিনি তা করেননি। জি.এম রহিমুল¬াহ কক্সবাজার সদরের ভারুয়াখালীর বানিয়াপাড়ার বাসিন্দা মৃত আব্দুল হাকিমের ছেলে। তিনি ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক  চেয়ারম্যান ছিলেন। ছিলেন তিনি ৪মেয়ে ও ১ছেলের জনক। এদিকে ওইদিন জনপ্রিয় জননেতা জি.এম রহিম উল্লাহর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বিপুল মানুষ হোটেল সাগরগাঁওয়ের সামনে ভিড় করে। একনজর দেখতে সাধারণ মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাকে দেখতে ছুটে আসেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি সাবেক এমপি অধ্যাপক এনামুল হক মনজু। অনেকে লাশ দেখে হতবিহবল হয়ে যায়। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে হোটেল প্রাঙ্গণে তার হিমাগার বেষ্টিত লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সটি সামনে রাখা হয়।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!