সালাফিয়্যাত মাদখালী গ্রুপে রূপান্তরিত হওয়ার ইতিকথা  :শায়েখ সিরাজুল ইসলাম

 

১৯৯৫ সালের দিকে মদীনাতে বড় ধরণের একটা পরিবর্তন আসে। ঐ সময় মদীনা বিশ্যবিদ্যালয়ে ডঃ শায়খ রবী বিন হাদী আলমাদখালীকে অনেক বড় পজিশান দেয়া হয়। এবং তার মাধ্যমে সালফিয়্যাতের একটা নির্দিষ্ট মাযহাব বা চৈন্তিক দল প্রতিষ্ঠার সব পথ পরিস্কার করা হয়।আমরাও বুঝতেছিলাম ব্যাপারটা।

মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশী ছাত্র নিতে মূলত ৪টা স্রোত ব্যবহার করা হতো। জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশ। এদের দ্বায়িত্বে ছিলো মাওলানা ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ। আহলে হাদীস। এদের দায়িত্বে ছিলেন দুই গ্রুপ। ডঃ আব্দুল বারী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন একটার মুরুব্বি। আরেকটার মুরুব্বি ডঃ গালিবরা। গালিবরা বললাম, কারণ গালিব সাহেব তখন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতো স্থান করতে পারেননি, ফলে আব্দুল মতীন সালাফী ও ঢাকার মুহাম্মাদীয়া আরাবিয়্যাহ তখন এই ট্রেন্ড দেখা শুনা করত। আরকেটা স্রোত ছিলো দেওবন্দীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন দলের আলাদা কোন শক্তি ছিলোনা। কিন্তু ১৯৯৩-১৯৯৫ পর্যন্ত দেখলাম তড়িৎ গতিতে ডঃ আব্দুল বারীর গ্রুপ দূর্বল হয়ে সালাফীদের এমন একদল ছাত্রদের ঐখানে নেয়া হয়, যারা নিজদের যেন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের সম্পদ মনে করতে লাগলেন। জামাআত, দেওবন্দীদেরকে খুব কোণঠাসা করা শুরু করলেন। এবং তারপরে ১৯৯৫ সনে সেখানে এক আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজিত হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিলো এই সময়ের “খাওয়ারিজ” সনাক্ত করণ।

এই সেমিনারের মধ্যমণি ছিলেন ডঃ রবী বিন হাদী আলমাদখালী। তিনি তার দীর্ঘ প্রবন্ধে প্রমান করেন এই যুগের খাওয়ারিজ হলো হাসানুল বান্না, সাইয়েদ কুতুব, মাওলানা মাওদূদী, ইলিয়াস কান্দেহলভী সহ যারা গত শতাব্দীতে ইসলামী রিভাইভালের জন্য কাজ করেছেন তারা সবাই।

তার প্রবন্ধ পরে বই হিসেবে বের হয়।
এই বইটার নাম দেনঃ منهج الأنبياء في الدعوة إلى الله فيه الحكمة والعدل অর্থাৎ দাওয়াত ইলাল্লাহের ব্যপারে নবীগণের কর্মপদ্ধতি, এতে আছে হিকমাহ এবং ইনসাফ। এই গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন মাওলানা মাওদূদী ইসলামের একজন বিভ্রান্ত দলের প্রতিষ্ঠাতা, দেখিয়েছেন সাইয়েদ কুতুব কতো বড় বিভ্রান্ত।

তিনি তার গ্রন্থের দ্বিতীয় প্রকাশনার ভূমিকায় স্পষ্ট ভাবে এই সব দলের লোকদের কে জাহান্নামের দরোযার দিকে আহবান কারী হিসেবে চিহ্নিত করেন, এবং এদেরকে “মানুষের দেহে শয়তান” বলে মহানবীর (সা) দেখানো একদল বিভ্রান্ত উম্মাতের ই সাক্ষাত গ্রুপ মনে করেন। সেখানে তিনি সালাফিদের ছাড়া আর বাকী দলগুলোকে বিভ্রান্ত বলে উল্লেখ করেন। পৃষ্ঠা ৬।

তিনি এই বইটাতে নবীগণের দাওয়াতী কর্মপদ্ধতির কথাকে তুলে ধরেছেন খুব সহজ ভাষায়। বুঝাতে চেয়েছেন তাদের একমাত্র কাজ ছিলো তাওহীদের প্রতিষ্ঠা করা। নূহ, ইব্রাহীম, ইউসুফ ও মূসা (আলাইহিমুসসালাম) এর কর্মপদ্ধতি তিনি এনেছেন। এরপরে আলোচনা করেছেন আমাদের নবী (সা) এর মাক্কী জীবনে তাওহীদের দাওয়াত ও মাদানী জীবনে তাওহীদের গুরুত্বারোপের মাত্রা। দুঃখ হলো তিনি দাউদ ও সুলাইমান (আঃ) কথা আনেন ই নি।

এরপরে তিনি আলোচনা করেছেন “ইত্তিজাহাতুদ দুআহ” বা দাঈ ইলাল্লাহগণের ট্রেন্ড বা আচরণসমূহ। সেখানে তিনি পৃথিবীর ইসলামের জন্য কাজ করা দলগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। পৃষ্ঠা ১৩৮-১৩৯

একঃ সালাফিয়্যাতের চিন্তাধারার আলোকে চলা দল।

দুইঃ সূফীধারায় চলা দল। নাম না ধরলেও শায়খ আসলাম ও শায়খ তাকীউদ্দীন হেলালীর সমালোচনাকৃত দল বলাতে যে কেও বুঝতে পারে তিনি তাবলীগকে বুঝিয়েছেন।

তিনঃ যারা ইসলামি রাজনীতি নিয়ে কাজ করে এমন দল। এই সব দলের গুরু হিসেবে তিনি মাওলানা মাওদূদীকে দেখিয়েছেন।
তিনি প্রমান করেছেন সালাফি দল ছাড়া আর বাকী দুই ধরণের দল ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে।

তিনি তার আলোচনায় মাওদূদীর উপর অনেক লম্বা চ্যাপ্টার উৎসর্গ করেছেন। যার সার সংক্ষেপ মূলত ১৪১ পৃষ্ঠায় বলেছেন। তন্মধ্যে প্রধান সমালোচনা হলোঃ

১। তিনি তার আন্দোলন নবী রাসূল গণের মতই শুরু করেননি। তাওহীদের আলোচনা তার আন্দোলনের কিছুই না। অথচ তার দেশ শিরকে ভরা।

২। তার আন্দোলনে বিশাল অংশ জুড়েই হলো রাজনীতি। ক্ষমতা দখল, অন্যের হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহন ইত্যাদি। এই পয়েন্টে তিনি আলোচনা করে গেছেন বইটির বিশাল অংশ জুড়ে। এর পরে তিনি আলোচনা করেছেন ইখওয়ান নিয়ে। সাইয়েদ কুতুব, আব্দুল কাদের আওদাহ প্রমুখের আলোচনা স্থান পেয়েছে বড় পরিসরে।

তার এই বই বাজারে আসার পর হৈ চৈ পড়ে যায়। অধিকাংশ উলামা তার লেখা পড়ে থমকে যান। এইভাবে এই সব আন্দোলনকারীকে ইসলাম বহির্ভুত দল হিসেবে আগে কেও চিহ্নিত করেনি। তিনিই প্রথম যিনি এদেরকে বিভ্রান্ত বলে আখ্যা দেন। এর পরেই শুরু হয় চারটা বড়বড় পরিবর্তনঃ

১। এদের চিন্তা চেতনাকেই সাঊদী সরকার প্রমোট করা শুরু করেন। এবং মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ করা নানা দেশের ছেলেদের মধ্যে যারা মাদখালী সাহেবের মতের সাথে মিল দেন, তাদের দাঈ ইলাল্লাহর চাকুরি দিইয়ে বিভিন্ন দেশে পাঠান। তাদের আরামে বসে দাওয়াতী কাজের মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় মাদখালী মাযহাব প্রমোট করা।

২। এদের একান্ত লক্ষ হয়ে দাঁড়ায় ইসলামি আন্দোলন নামের যত দল আছে তাদেরকে বিভ্রান্ত প্রমানে উঠে পড়ে লেগে যাওয়া। ফলে যুবকদের বিশাল দল এই সব আন্দোলন থেকে ছিটকে পড়ে সালাফিদের দলে যোগদান করে।

৩। দেশে দেশে এর আগে আহলে হাদীস বা আনসারুস সুন্নাহ ইত্যাকার নামের যে দল গুলো ছিলো তাদের মধ্যে ফাটল ধরানো হয়। কারণ তারা মূলত আহলে হাদীস বা সালাফি ভাবধারার মানুষ হলেও ইসলামি আন্দোলন গুলোর সাথে অংগাংগী হয়ে কাজ করতো। বাংলাদেশের উত্তরবংগে একচেটিয়া আহলে হাদীস থাকা সত্ত্বেও তারা জামায়াতে ইসলামিকে সমর্থন করতো। কিন্তু এই মাদখালীদের উত্থানের পর তারা জামায়াত থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে নিজেদের মাঝেও ফাটল তৈরি করে। মুজাফফর ও মুফতি আব্দুর রাযযাকের গন্ডোগোল তারই অংশ।

৪। যেহেতু মাদখালীদের সরকারই প্রমোট করে, সেহেতু এই গ্রুপের লোকেরা যেখানে গেছে সেখানে সরকারের সাথে থেকে সরকার বিরোধী ইসলাম পন্থীদের শেষ করার পেছনে কাজ করে যাচ্ছে। “সরকার” বলতে এরা মনে করে “যে যে দেশে রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে জেঁকে আছে”। মজার ব্যপার হলো এরা মূরসী সরকারকে উৎখাতের চিন্তাও করে এই কারণে যে, মুরসী ছিলেন প্রতিষ্ঠিত সরকার বিরোধী, ও ইখওয়ানের লোক।

এই দলের উত্থানের পর ইসলাম ও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে, যে তারা ইসলামি আন্দোলনের বড় বড় নেতেদের হত্যা করা “কোন গুনাহ না” ধারণাটা স্বস্ব সরকারের অন্তরে সহীহ আক্বীদার আকরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফলে আব্দুল কাদের মোল্লার নাক বেয়ে চলা রক্তের নদী ওদের মনে আনন্দের প্রবাহ বাড়িয়েছে, মীর কাসিম, মাওলানা মুতিউর রহমান নিজামি ও আলী আহসানদের কেটে যাওয়া গলা দেখে তাদের মুখ বিজয়ের সাফল্যে স্নিগ্ধ কোমল হয়েছে। রাবেয়া স্কয়ারের রক্ত ওদের বিচলিত করেনা। কারাগারে ডঃ বাদী এর লাশ তাদের মাথায় ঘুমের পশরা বিলায়। সারা দুনিয়ার ইসলামি আন্দোলনের নেতা কর্মীরাই হয়ে ওঠে এদের পরম শত্রু, আর দরবেশ বাবারা হয় তাদের “হাফিযাহুল্লাহ” নামক সহীহ হাদীসের দুয়ার পাত্র হবার একান্ত ভাগ্যবান মানুষ।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!