যে কারণে ঢাকায় আসেন ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা

ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার আকস্মিক ঢাকা সফর নিয়ে দুই দেশের কূটনীতিক ও রাজনৈতিক মহলে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। তার দু’দিনের সফরটি ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশে আসার মাত্র একদিন আগে। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গত বছর পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতীয় হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত মঙ্গলবার সকালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিমানে তাকে ঢাকায় পৌঁছে দেয়।

শ্রিংলা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির থেকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ বার্তা’ নিয়ে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য। পৌঁছানোর দিনেই গণভবনে শ্রিংলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে এই ‘গুরুত্বপূর্ণ বার্তা’ নিয়েই। দু’জনের মধ্যে গণভবনে প্রায় ৯০ মিনিট আলোচনা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, শ্রিংলা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতে উৎপাদিত কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে কথা বলেছেন।
ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত।

আবার ঢাকায় সাংবাদিকদের শ্রিংলা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অবকাঠামোসহ অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধিতে ভারতের প্রতিশ্রুতির কথা জানাতে এসেছেন তিনি। তবে অনেকেই মনে করছেন, এই মহামারির মধ্যে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব নিশ্চই শুধু এই বার্তা দিতেই আসেননি। এই বার্তা সাধারণ কূটনৈতিক উপায়েই দেয়া সম্ভব ছিল। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রিভা দাস গাঙ্গুলি তো রয়েছেনই।

গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও শ্রিংলার সঙ্গে প্রতিবেশী মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। ওই বৈঠকেই শ্রিংলার ঢাকা সফর চূড়ান্ত হয়।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে চীন যেভাবে প্রভাব বিস্তার করছে, সেটি মোকাবিলারই একটা চেষ্টা করা হয়েছে এই সফরে। চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। দুই দেশ এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

এ বছরের জুন মাসে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ সুবিধা দিয়েছে চীন। এর সঙ্গে রয়েছে সামুদ্রিক ও লেদার পণ্যও। এর ফলে এখন থেকে বাংলাদেশের ৮ হাজার ২৫৬টি পণ্য কোনো ধরনের শুল্ক ছাড়াই চীনের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের আরো অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, চীন এখন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বেশকিছু প্রকল্পে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে, যা ভারত সীমান্তের খুবই কাছে। বাংলাদেশের রংপুর বিভাগে অর্থনৈতিক জোন, তিস্তা প্রকল্প, পাওয়ার প্লান্ট, রাস্তা, ব্রিজ, পর্যটন প্রকল্প এবং কারখানা নির্মাণসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে চীন।

পাশাপাশি ধারণা করা হচ্ছে, চীন পাকিস্তানকেও চাপ দিচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য। এরমধ্য দিয়ে চীন ভারতকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরতে চায়। গত জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এতে তিনি কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলেন। যদিও এতে শেখ হাসিনা ইমরান খানকে স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন যে, কাশ্মীর ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে এই ফোনকেই দিল্লি একটি বিপদ সংকেত হিসেবে দেখছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বেইজিং এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টাও চালাচ্ছে। দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে নজর দিয়েছে চীন। এর মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে আরো বেশি প্রবেশ নিশ্চিত করতে চায় দেশটি। এরই মধ্যে দেশটির পিপল’স লিবারেশন আর্মির নৌবাহিনী মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। নিয়মিতভাবেই দুই দেশের নৌঘাটিগুলোতে যাতায়াত রয়েছে চীনা যুদ্ধজাহাজের। চীনের নৌবাহিনী এখন যদি বাংলাদেশে পা রাখতে পারে, তাহলে এটি সহজেই বঙ্গোপসাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর কার্যক্রম ও তাদের স্বার্থের দিকে নজর দিতে পারবে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের কাছে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জও।

এতসব দিক বিবেচনায় ইন্দো-বাংলা সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত আগ্রহী হয়ে উঠেছে। শ্রীংলা ঢাকায় এসেছেন মূলত একঝুড়ি প্রস্তাব ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে। বাংলাদেশকে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন প্রদানে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে সেই অনেক প্রতিশ্রুতির একটি। নরেন্দ্র মোদি শ্রীংলার মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে এই প্রতিশ্রুতিগুলো পৌঁছে দিয়েছেন। যেসব প্রস্তাব বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো- মহামারি পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক বৃদ্ধি। একইসঙ্গে নয়া দিল্লি ঢাকাকে একটি তালিকা দিতেও অনুরোধ করেছে। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে নিয়ে আসতে পারে।

এ ছাড়া ভারতীয় বিনিয়োগে বাংলাদেশে চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধিতে একটি ‘কংক্রিট’ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব। পাশাপাশি বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা করেছেন শ্রীংলা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কীভাবে লাভবান হবে সেটি তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে স্পষ্ট করতে চেয়েছেন। করোনাভাইরাস মহামারি রূপ ধারণ করার পর শ্রীংলাই প্রথম কোনো বিদেশি দূত যিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করলেন।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র দাবি করেছে, শ্রীংলার সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিবাচকতা দেখিয়েছেন। বিশ্ব যখন করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত তখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে নরেন্দ্র মোদির প্রচেষ্টাকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।
সফরে শ্রীংলা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। একইসঙ্গে তিনি প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ হোটেল থেকে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মিয়ানমারে পুনর্বাসনে বাংলাদেশকে সমর্থন দেবে তার দেশ। আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উত্থাপন করবে ভারত।

শেখ হাসিনা শ্রীংলাকে জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যেকার নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে এবং সীমান্তে অপরাধ দমনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সঙ্গে কাজ করবে বর্ডার গার্ডস অব বাংলাদেশ (বিজিবি)। সব মিলিয়ে ভারতীয় পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শ্রীংলার দুইদিনের ঢাকা সফর ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ হয়েছে।

এ মাসের প্রথম দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক রক্তের যেখানে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শুধুমাত্র অর্থনৈতিক। শ্রীংলার সঙ্গে বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই ধরনের ভাব প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীও নয়া দিল্লিতে তার বাংলাদেশ সফর নিয়ে ইতিবাচক ভাব প্রকাশ করেছেন।

।। (ভারতভিত্তিক ডানপন্থী ম্যাগাজিন স্বরাজ্যে প্রকাশিত গণমাধ্যমটির সহযোগী সম্পাদক জয়দ্বীপ মজুমদারের কলাম থেকে অনূদিত by মানবজমিন)।।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!