মুনাওয়ার বদরুদ্দোজার কাছ থেকে শেখা ভালোবাসা, ও ভালোভাষা

ডক্টর আব্দুস সালাম আজাদী

ভাইজান, মানে মুনাওয়ার হুসাইন বদরুদ্দোজা ছিলেন আমার প্রিয় উস্তাযগণের একজন শায়খ মুকাদ্দাস আলী (রহ) এর পুত্র। তিনি জন্মে ছিলেন আমার ৪/৫ বছর আগে, কাজেই আমি তাকে ভাইজান বলে ডাকলে সাতক্ষীরার ব্যাকরণে ঠিক হয়। কিন্তু এই ডাক তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন। তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম তার মুখে এই ডাক শুনে।

তার সাথে পরিচয় হয় ২০০৩ সালের মে মাসে। দাওয়াতুল ইসলাম ইউকে এন্ড আয়ারের বাৎসরিক কর্মী সম্মেলন উপলক্ষে একটা ম্যাগাযিন বের করা হয়। এটা “দাওয়াত” নামে আগে যারা বের করেছেন তারা ইউকে বাংলাদেশীদের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। আমি লন্ডনে আসার পর শায়খ আব্দুর রহমান মাদানীর পরামর্শে তদকালীন আমীর শায়খ মাহমুদুল হাসান খান (রহ) আমাকে এর সম্পাদনার কাজ দেন। ঐ সময়ে আমি উস্তায হাসান মুঈনুদ্দীনের সহায়তায় সন্ধান পাই অধ্যাপক মানসুর আহমাদ নামের এক অত্যন্ত যোগ্য সব্যসাচীর, যিনি আমাকে ৭ দিনেই ম্যাগাযিন বের করার ওয়াদা করলেন। তার কাছ থেকেই শুনলাম, মুনাওয়ার বদরুদ্দোজা ভাইয়ের নাম, যিনি নাকি লিখতে জানেন। টেলিফোনে আলাপ হলো, প্রথম কথাতেই ভালোবাসা হলো, হাতে একটা শক্ত ও সুন্দর লেখা আসলো, এবং ম্যগাযিনের মান উন্নিত হলো।

সেখান থেকে অনেকদিন আর যোগাযোগ হয়নি। হয়নি তার কারণ তিনি না, আমি। আমার ব্যাপারে ডঃ আবুল কালামের একটা সমালোচনা হলো, ‘আমি নাকি অতি সহজে মানুষের মনে “সান্ধাতে” পারি, তবে অপর পক্ষকে “ইম্প্রেস” করে দ্রুত কেটে পড়ি’। মনোয়ার ভায়ের সাথে তেমন ই হয়েছে আমার।
টানা ৪ বছর পর ২০০৭ সালে আমার পি এইচ ডির পর উনি কার কাছে যেন শুনলেন, এবং তার আনন্দ মাখা কংগ্রচুলেশানস জানালেন। “ইক্বরা” নামক তার গড়ে তোলা এক চ্যারিটি অরগানাইজেশানের এক ইফতার পার্টিতে আমাকে দাওয়াত দিলেন, এবং ঐ দিন ই আমার পরিচয় নিলেন। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র হওয়ায় তার আব্বু শায়খ মুকাদ্দাস আলীকে (র) চিনি কিনা জানতে চাইলেন। এবং ঐ দিন থেকে তিনি আমাকে “ভাইজান” বললেন, এবং আমি তার ভালোবাসার সেই টানের কাছে শাপলা ফুলের মত নুয়ে পড়লাম।Image may contain: 7 people, people sitting and indoor

আমার লেখা কেমন জানিনা, তবে ছাত্র জীবনে আমার বন্ধুদের কাছে কিংবা ছোট ভাইদের কাছে চিঠি লিখতাম। আমার ছাত্র ব্যাঙ্কার আব্দুল মাজিদ আমার একটা চিঠি আজ অবধি মুখস্ত করে রেখেছে। আমার চিঠির পাঠক পাঠিকাদের কথা শুনে মনে হতো আমার লেখা ভালো। তবে আমার লেখার যিনি প্রথম গুরু হলেন তিনি ছিলেন আমাদের সবার সাহিত্য সাধনার “শায়খুস শুয়ুখ” কবি মতিউর রহমান মল্লিক। তিনিই আমাকে বলেছিলেন লেখার জগতে পা বাড়াতে, এবং দুই হাতে লিখতে। মাসিক ‘কলম’ এ আমি লিখতাম, গর্বিত হতাম লেখা বের হলে এবং আরো লেখার প্রেরণা পেতাম। কিন্তু আমার লেখার মান নিয়ে ডঃ আবুল কালাম আজাদ রাগতেন। তিনি মনে করতেন, “আমার রচনায় বংকীমীয় শব্দের প্রাধান্য ও রাবিন্দ্রিক ভাবের প্রাচুর্য”। সংশয়িত হতাম। জীবনের সর্বপ্রথম আমাকে এক সাবলীল বাংলার সন্ধান দিলেন এই মুনাওয়ার হুসাইন বদরুদ্দোজা ভাইজান।

এর মধ্যে তিনি অধুনা লুপ্ত “ সাপ্তাহিক ইউরোবাংলায়” লেখা আমার প্রবন্ধ গুলো পড়েছেন, এবং তার ভাষায় ‘তার অন্তঃশীল মাধুর্য ও সৌন্দর্যের মাঝে ডুব ও দিয়েছেন’। তবে ,তিনি বলেছেন, “এই গুলো সাধারণদের জন্য লেখা নয়”। তিনি বললেন, “ভাইজান, মনে কষ্ট নিয়েন না, আমাদের আলিম সমাজকে সাংবাদিকতার ভাষায় লিখতে হবে। যা পড়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রীপ্রাপ্তরা বুঝতে পারবেন”। তিনি আমাকে সাংবাদিকতার ভাষায়র উপর ২০ মিনিটের একটা ‘দরসুল লুগাহ” দান করলেন লন্ডনের একটা রেস্টুরেন্টে, এবং দেখালেন “গার্ডিয়ানের” ভাষার চমক, “ডেইলি মেইলের” উত্তেজক শীরোনাম, “টাইমসের” ফিচার গুলোর আংগিক সৌষ্ঠব এবং বাংলাদেশের “প্রথম আলোর” সারল্যে ভরা শক্তিশালী লেখাগুলোর “উদ্ভিন্ন যৌবনের অন্তঃসলীল প্রস্রবন”।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ক্লাসে সাইকো-লিংগুইস্টিক্স, সোশীয়-লিঙ্গুইস্টিকস কিংবা “স্টাডী অন ল্যাঙ্গুয়েজের” থিউরী গুলো নিয়ে আবার নতুন ভাবে পড়ার প্রেরণা হয়ে রইলেন তিনি। ডঃ তাহা হুসাইনের আরবী ধারাকে বলা হয় “ সাহলুন মুমতানি’” মানে এমন সহজ যেটা তৈরি করা একেবারে অসম্ভব। আমাদের রবীন্দ্রনাথ যেটাকে বলতেনঃ
সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে,
সহজ কথা যায় না বলা সহজে।
আমাকে আমার ভাইজান ঐ লেখা আবিস্কার করে লিখতে বললেন। আমাদের লেখার জীবনের আরেক মোড় তিনি ঘুরিয়ে দিলেন।

২০১৪ সালে আমার ভাইজান ফোন করলেন, তার আব্বাজা্নের ইন্তেকাল করার দুঃসংবাদ শোনালেন এবং হাউমাউ করে কাঁদলেন। বললেন তার জীবনের বঞ্চনার কথা, আব্বার কাছ থেকে তার দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির কথা, তার আম্মার করুণ রোদনের কথা, এবং আমার প্রিয় উস্তাযের জন্য দুয়া করার কথা। ঐ রাতেই যখন বললাম, ভাইজান আমাদের এই উস্তাযের জীবন ও কর্মের উপর একটা স্মারক গ্রন্থ লেখা উচিত। তিনি রাজি হলেন এবং বললেন দ্রুত বের করে আব্বার স্মৃতিতে তিনি বইটা উৎসর্গ করবেন। এক রোববারে তিনি ছয় শ’ পাউন্ড এনে আমাকে দিয়ে বললেন, ভাইজান, কাজ শুরু করেন, আপনি ও কালাম ভাইজান দ্বায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে যান। আলহামদুলিল্লাহ বইটা বের হয়েছে, এবং যতটুকু জানি ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার আধুনিক কালের শুয়ুখদের নিয়ে এটাই প্রথম স্মারক গ্রন্থ। এই লেখা লেখির সময়ে ভাইজানের সাথে আমার সম্পর্ক একদম কাঁঠালের আঠার মত লেগে থাকে।

তিনি আমাকে ফেইসবুকের “স্ট্যাটাস যুদ্ধে” সহযোদ্ধা বানিয়ে ছিলেন। এই জগত খুব মারত্মক সেন্সিটিভ, এবং লেখকদের বিপদ এখানে তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিটা ক্লিকে। কোন স্ট্যাটাস দিলেই দেখতাম ভাইজানের লাইক আছে, অথবা সাপোর্ট করে মন্তব্য আছে। তার স্ট্যাটাসেও থাকতো আমার সরব ও কৌতুকময় উপস্থিতি। আমাদের দুইজনকে কেও আঘাত করলে একে অপরে “কাঠঠোকরা” বা হুদহুদ পাখির ভূমিকা নিতাম।

তিনি আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন গত ১১ তারিখ সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে। সারা রাত ঘুমাইনি। তার ইন্তেকালের সংবাদ পেয়ে খুব মুষড়ে পড়ি। পরে ভাবলাম, ভাইজানের তো ক্যান্সার হয়েছিলো, আমার তো প্রায় সেই রকমই আরেক রোগ, কাজেই শোকাহত হয়ে লাভ কি, তাড়াতাড়ি ভাইজান ও তার আব্বার সাথে দেখা তো হতেও পারে, কাজেই আমলে সালেহ বাড়িয়ে সামনে যাওয়াই শ্রেয়।

গতকাল ম্যাসেঞ্জার খুলে আমাদের গত কয়েক বছরের চ্যাট বা কথোপকথন গুলো পড়তেছিলাম, কখনও হাসতেছিলাম, কখনও কাঁদতে কাঁদতে দু’চোখ ছাপাচ্ছিলাম, কখনো রেগে উঠতেছিলাম তার কষ্টের হরফ পড়ে। আবার কখনো বলতেছিলাম, ভাইজান, এইটা না করলে আপনি ভালো করতেন, শরীর ভাংতো না, মন ঠিক থাকতো।

অনেক আগের একটা কথা পড়লাম। বললাম, ভাইজান, ফোন দিয়েছিলেন কেন? বললেন, ভাইজান, বিদেশে ইনভেস্টমেন্ট এর একটা সুযোগ আছে, আপনি চাইলে আপনাকে নিতে পারি। আমি লিখলাম ভাইজান, “আমার আব্বাও আমাকে ব্যবসায়ে নিতে পারেনি। জীবনে ডঃ কালাম, ডঃ তরীক, ডঃ গিয়াস, আমি এবং শায়খ আব্দুর রহমান মাদানী একটা ব্যবসা করেছিলাম। মধুর ব্যাবসা। সুন্দরবন থেকে মধু এনে চিটাগাং বিক্রী করা। সুন্দরবনের ভাইটা বুঝাচ্ছিলেনঃ কেনা হবে ত্রিশ টাকা কেজি, বিক্রী হবে একশ’ টাকা নির্ঘাত। এতো লাভ!! পরে সবটাই জলে গিয়েছিলো। এর পরে তৌবা করেছি, ব্যবসায়ে আর না”। তিনি আমাকে জোর করেননি। পরে তার এক বন্ধু ও ব্যবসায়ে শরীক ব্যারিস্টার ভাই আমাকে জানালেন, আমার ভাইজান এখানে মারাত্মক মার খেয়েছেন, এবং ইনভেস্টরদের টাকাও ফিরিয়ে দিতে পারছেন না। আমি বুঝলাম ব্যবসা সবার দিয়ে হয়না।

আরেকটা লম্বা কথোপকথন পড়ে আবারো নিজকে সংযত করলাম। তিনি হঠাত করে একজন ফেইসবুক এক্টিভিস্ট এর আসল পরিচয় জানতে চাইলেন। যিনি আমার, ডঃ কালামের, ভাইজানের, বন্ধু ব্যারিস্টার মোল্লা ও সহযোদ্ধা আখতার সহ প্রায় সবার পেছনে লেগেই থাকেন। একটা ইসলামি স্ট্যাটাস দিলেই তিনি বাতিল আক্বীদার আলোকে সেটার বিরোধিতা করতেন। ফলে আমি তাকে ব্লক করে দেই। ভাইজান আমাকে সেইদিন বললেন, ভাই এই লোক কিন্তু খুব মারাত্মক। অনেক বড় শিক্ষিত, কিন্তু বড় ধরণের এজেন্ট। আমি তাজ্জব হলাম। তিনি তখন কয়েকজনের নাম দিয়ে বললেন, এরা দেশের অনেক বড় স্থানে। আপনার ভক্ত। এবং আপনাকে অনেক কথা সজাগ করে দেন। আমি সেই দিন ই বুঝে ছিলাম ভাইজান কেন ফোন করে বলতেনঃ “ভাইজান, ঐ দুটো স্ট্যাটাস এখুনি ডিলেট করেন”।

তার কাছে ইসলামিজম ছিলো একমাত্র প্রতিপাদ্য। তাই সকল ইসলামি দল ও ইসলাম পন্থীরা তাকে ভালো বাসতো। একদিন আলোচনা করছিলাম তার এই স্ট্যান্ডের ভয়াবহতা নিয়ে। তিনি বললেন, ভাই মুসলিম কম্যুনিটি এমনিতে এখনকার সভ্যতায় গণনার বাইরে চলে গেছে। এই মুসলিম কম্যুনিটির যারা ইসলাম জানে ও মানে তাদের সংখ্যাও ১৫% এর বেশি না। আমি যাদি এর মাঝেও আবার বিভক্ত হয় তা হলে আমি কোথায় গেলাম। আমার মনে আছে ঠিক এই রকমই কথা আমরা ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাংগীরের কাছে সব সময় শুনতাম।

আরেকটা লম্বা কনভারসেশন পড়লাম। তিনি মুসলিম বিশ্ব নিয়ে অনেক হতাশার চিত্র বলে চলছেন। হঠাত বললেন, ভাইজান, আপনার এখন কি কাজ? আপনি সারা রাত দিন মুসলিমদের জাগানো ও দিক নির্দেশনার কাজে ব্যস্ত হয়ে যান। সাঈস নুরসী (রহ) জীবনেও ভাবেননি তিনি কয়েদি খানায় বসে লিখে যাওয়া ‘ফাও’ কথা গুলো একদিন তুর্কিতে ইসলামের জোয়ার এনে দেবে। আপনি লেখেন, আপনার লেখায় শক্তি আছে’। তখনি আমি প্রস্তাব দিলাম ভাইজান, তুরস্কে ইসলামি আন্দোলনের রোডম্যাপ নিয়ে আমরা দুইজন একটা বই লিখি। আপনি তুরস্কের ব্যাপারে এক্সপার্ট, আর আমি ইসলামি আন্দোলন নিয়ে কাজ করি। তিনি আনন্দ করলেন। বললেন, এটা করতে ম্যাক্সিমাম একমাস লাগবে, আপনি আসেন, আমারা শুরু করি। কিন্তু আমার সেই যাওয়া গত এক বছরের আর ও হয়নি।

তন্ময় হয়ে আমাদের ভালোবাসা ঋদ্ধ চ্যাট পড়তে ছিলাম। তিনি বলছেন, ভাইজান, খুব দুর্বল হয়ে গেছি। ডাক্তাররা ভয় পেয়ে গেছেন। ক্যান্সারের সম্ভাবনা উড়াচ্ছেন না। আমি শকড হলাম। বলেন কি ভাইজান, অসম্ভব?! বললাম, কিচ্ছু না ভাইজান। কিচ্ছু হবে না আপনার। ডাকতারের ধারণা ভুল হবে ইনশাআল্লাহ। তিনি বললেন, “তাই যেন হয়”।

ঢাকা থেকে তার ভাগ্নী এবং লন্ডন থেকে ছোট্টভাই হাফেজ মাহফুজ জানালো ভাইজানের ক্যান্সার ধরা পড়েছে একদম শেষ স্টেইজে। লন্ডনে গেলাম তাকে দেখতে। ফ্যাকাশে ঐ চেহারা দেখেই বুঝলাম তা মৃত্যর বার্তাই পেয়ে গেছে। তিনি শুধু জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন, আর বললেনঃ ভাইজান, আমার কোন অভিযোগ নেই, শুধু দুয়া করেন যেন আমার রব্বের কাছে যখন যাবো, যেন তিনি মায়া দিয়ে আমার সারা শরীর ঢেকে দেন। আমার আমলের সঞ্চয় যে একেবারে নেই!!!

আজই ভাইজানকে তার নিজের গ্রামে দাফন করা হলো। বড় বেশি মনে হচ্ছে আমার ভাইজানকে। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের মেহমান বানিয়ে নিন।Image may contain: 5 people, people smiling, people standing, phone and beard

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!