মির্জা ফখরুল: কিছু কথা-কিছু ব্যথা: সুলাইমান মাসুম

ভেবেছিলাম বিএনপি-জামায়াত জোটের সাম্প্রতিক টানাপড়েন নিয়ে কোন কথা বলবো না। কিন্তু বাধ্য হলাম। যেহেতু এখানে ইতিহাস নিয়ে টান দিয়েছেন মির্জা ফখরুল এবং আমি ইতিহাসের ছাত্র তাই এই বিষয়ে কথা না বলে থাকতে পারলাম না।

মির্জা ফখরুল জানিয়েছেন তারা ১৯৯১ সালে একাই নির্বাচন করেছেন এবং সরকার গঠন করেছেন তাই জামায়াত ছাড়াও তাদের চলবে।

জামায়াত ছাড়া তাদের চলবে কি চলবে না, সেটা নিয়ে আমার কোন প্রশ্ন নেই। বিএনপি এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। সবচেয়ে বেশি ভোট তাদের। তারা জামায়াত ছাড়া চলতে পারবে এই বিশ্বাস আমার আছে।

তবে তারা যদি মনে করেন জামায়াত তাদের করুণা ভিখারী সেটাও কিন্তু সঠিক নয়। আমার আপত্তি হলো ফখরুল সাহেবের দেয়া ইনফো নিয়ে। ফখরুল সাহেবরা ৯১ তে আলাদা নির্বাচন করেছেন সত্য কিন্তু জামায়াত ছাড়া তাদের সরকার গঠন করার যোগ্যতা তৈরি হয়নি।

জামায়াতের সাপোর্ট না পেলে তারা সরকার গঠন করতে পারতেন না। জামায়াত কোন শর্ত ছাড়াই তাদের সাপোর্ট দিয়েছে। বিনিময়ে কী পেয়েছে জামায়াত?

না কিছুই পায়নি। জামায়াতসহ সারা দেশের মানুষের সাথে স্বৈরাচারী আচরণ করেছে বিএনপির খালেদা জিয়া। খালেদাকে স্বৈরাচারী বানানোর পেছনে ভালো ভূমিকা রেখেছে মান্নান ভুঁইয়া, মওদুদ, ফখরুল ইত্যাদি নেতারা।

৯১ তে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামক অসাধারণ ফর্মুলাতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হয়েছিলো সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধানভুক্ত করতে রাজি ছিলো না বিএনপি। সারাদেশের মানুষের প্রত্যাশাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছিলেন তারা।

এর কারণেই বাংলাদেশের ২য় বড় দল আওয়ামীলীগকে মানুষ সাপোর্ট করেছিলো। এই দেশ থেকে যাদের অবস্থা মুসলিম লীগের মতো হওয়ার কথা ছিলো সেই ইসলাম বিদ্বেষী, ধর্মদ্রোহীদের পুনর্বাসন করেছে বিএনপি।

১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক ফর্মুলাতে নির্বাচন হয়। বিএনপি জয়ী হয়। কিন্তু সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জামায়াত ১৮টি সিট পায়। জামায়াত বিএনপিকে সমর্থন দেয়, বিএনপির সরকার গঠন করে।

এর কিছুদিন পরই সংসদে দাবী উঠে এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার। আওয়ামীলীগ এই দাবী উত্থাপন করে। ক্ষমতা পেয়ে বিএনপি এই দাবী প্রত্যাখ্যান করে।

এই নিয়ে জামায়াত বিএনপিকে রাজী করানোর চেষ্টা করে। সেই সময় সংসদে শহীদ মাওলানা নিজামী (রঃ) খালেদাকে বলেন আমরা মোটেই আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে ইচ্ছুক নয়। আমরা দেশগঠনে আপনাকে সহায়তা করতে রাজী। আপনি জোর করে আমাদের আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে বাধ্য করবেন না।

কিন্তু সেই সময়ে অহংকারী খালেদা জিয়া সেটা মেনে নিতে অসম্মত হয়। জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আওয়ামীলীগের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করে। কারণ তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু যতটা না আওয়ামীলীগের তার চাইতে বেশী জামায়াতের। এই ফর্মুলা জাতির কল্যাণের জন্য দিয়েছে জামায়াত।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা মানতে বাধ্য হয় বিএনপি। ১৯৯৬ তে দু’বার নির্বাচন হয়। ১ম বার বিএনপি এতরফা নিজেই ইলেকশন করে। সেই সংসদ ১৫ দিন মাত্র টিকেছিলো। স্বৈরাচারী আচরণের জন্য বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পতন হয় জনগণের আন্দোলনে। পরবর্তি নির্বাচনে হাসিনা ক্ষমতায় আসে।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার নির্বাচিত হয়েছে। এর মধ্যে দু’বার তারা দেশ শাসন করতে সক্ষম হয়েছে। আর ঐ দুবারই তাদেরকে জামায়াতের সহায়তা নিতে হয়েছে। আর একবার জামায়াত তাদের প্রত্যাখান করেছে সেবার তারা টিকেছিল মোটে ১৫ দিন।

জনাব মির্জা ফখরুল! আপনারা বিশাল জনসমর্থনওয়ালা দল। এদেশে আপনাদের সমর্থন ৩৫% এর মতো। জামায়াতের জনসমর্থন আপনাদের অর্ধেকও নয়। শুধু শুধু তাদের সাথে লাগতে গিয়ে ইতিহাস বিকৃতি করবেন না।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারেই কল্যাণ। কৃতজ্ঞতা স্বীকার কাউকে ছোট করে না। বরং মহৎ করে। আর অকৃতজ্ঞতার পরিণতি একবার ছিয়ানব্বইতে হয়েছিলো। আবার পতনকে ডাকবেন না। এমনিতেই যথেষ্ট পতনের মধ্যে আছি আমরা সবাই।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!