মাহাথিরের রাজনীতি ও মালয়েশিয়ার ক্ষমতা হস্তান্তর

মাসুম খলিলী
মালয়েশিয়ার ৯৪ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ তার অঙ্গীকার অনুসারে আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করছেন না বলেই মনে করতে শুরু করেছেন অনেকে। এতে আনোয়ারের মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তৃতীয় দফা সম্ভাবনা যেন বেশ খানিকটা অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অঙ্গীকার রক্ষা না করার ব্যাপারে মাহাথিরের নতুন এই কৌশলটি শতায়ুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছা এই মালয় রাজনীতিবিদের নিজেরও ক্ষমতাচ্যুতির কারণ হতে পারে।

ডা: মাহাথির মোহাম্মদ নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ক্ষমতার দুই দশক পূর্তির কাছাকাছি এসে তার উপপ্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দেন। তখন এশীয় অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় এক জটিল সময় পার করছিল মালয়েশিয়া। সঙ্কট উত্তরণ নিয়ে কিছু নীতিগত বিষয়ে মাহাথির ও আনোয়ারের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। এর জেরে মাহাথির আনোয়ারকে সরকার ও সরকারি দলের সব পদ থেকে বরখাস্ত করে তার বিরুদ্ধে সমকামিতার মামলা সাজিয়ে জেলে ঢোকান। এই চরম বিপর্যয়কর অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে দশককাল সময় লেগে যায় আনোয়ারের। জেল জীবনে তার স্ত্রী ডা: ওয়ান আজিজাহ আনোয়ারের জাস্টিজ পার্টির হাল ধরেন। মাহাথিরের উত্তরাধিকারী আবদুল্লাহ বাদাবির শাসনামলে আনোয়ার সুপ্রিম কোর্ট থেকে সমকামিতার মামলায় খালাস পান। ক্ষমতার অপব্যবহারের অন্য মামলায় পাঁচ বছর জেল খাটার পর মুক্ত হয়ে বিরোধী জোটের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন আনোয়ার।

Ad by Valueimpression
এর মধ্যে আবদুল্লাহ বাদাবির ক্ষমতার দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তার ওপর ক্ষিপ্ত হন মাহাথির। মাহাথিরের প্রচারাভিযান সরকারি দলের মধ্যে তীব্র বিভক্তি সৃষ্টি করে। মাহাথিরের আকাক্সক্ষা অনুসারে বাদাবি ড. নাজিব রাজ্জাকের কাছে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে বিদায় নিতে বাধ্য হন। নাজিবের সাথে প্রথম দিকে মাহাথিরের বোঝাপড়া ভালোই চলছিল। এক পর্যায়ে আনোয়ারের সামনে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন অর্জনের সুযোগ সামনে এলে মাহাথির পুরনো কৌশল কাজে লাগানোর বুদ্ধি দেন নাজিবকে। উপপ্রধানমন্ত্রী থাকতেই নাজিব সেই কৌশল কার্যকর করার বীজ রোপণ করেন। আর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেটি কার্যকর করতে আনোয়ারের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা সমকামিতার মামলা তৈরি করেন। মালয়েশিয়ার বিচার বিভাগ সম্পর্কে একটি কথা মাহাথির যুগ থেকে চালু হয়। সেটি হলো দেশটির বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে। কেবল রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা এলেই এটি সরকারের ইচ্ছার অধীন হয়ে যায়। নাজিবের শাসনকালেও সেটিই দেখা যায়। আদালতের রায়ে দ্বিতীয় সমকামিতার মামলায়ও আনোয়ারের শাস্তি হয় এবং তাকে জেলে যেতে হয়।

এর মধ্যে নাজিব রাজ্জাকের সাথে মাহাথিরের বোঝাপড়ায় গোলমাল দেখা দেয়। বাদাবিকে বিদায় করার মতো একই কৌশল নাজিবের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেন মাহাথির। স্বচ্ছ সরল রাজনীতিবিদ বাদাবির মতো ছিলেন না মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী তুন আবদুর রাজ্জাকের ছেলে নাজিব রাজ্জাক। তিনি মাহাথিরের বৈরিতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দ্বিতীয় মেয়াদ পূর্ণ করেন নাজিব। কিন্তু এর মধ্যে নাজিবের পতন ঘটানো হয়ে যায় বয়োবৃদ্ধ ডা: মাহাথিরের ধ্যানজ্ঞান। তিনি উমনুর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে নাজিবের উপপ্রধানমন্ত্রী মহিউদ্দিন ইয়াসিনকে নিয়ে দল গঠন করে নতুন করে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন।

বিরোধী জাতীয় ঐক্যের নেতৃত্ব নিজের হাতে নেয়ার জন্য আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে সমঝোতা করেন মাহাথির।
জোট ক্ষমতায় গেলে দুই বছর সরকারে নেতৃত্ব দেয়ার পর আনোয়ারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। নির্বাচনে আনোয়ারের পিকেআর ও মাহাথিরের পিপিবিএম সমান সংখ্যক আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিলেও জয় পায় পিকেআরের এক-চতুর্থাংশ আসনে। তখন মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ক্ষমতার মেয়াদকে দীর্ঘ করতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেন। এই কৌশলের অংশ হিসেবে একদিকে উমনু থেকে এমপিদের ভাগিয়ে নিজ দলের শক্তি বৃদ্ধি করেন। অন্য দিকে পিকেআরের ডেপুটি প্রেসিডেন্ট আজমিন আলীকে উত্তরাধিকারী বানানোর গোপন আশ্বাস দিয়ে আনোয়ারের সামনে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেন। পিকেআরের এই উচ্চাভিলাষী নেতা আজমিন আলী দলের কর্তৃত্ব আনোয়ারের অনুপস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে সব সময় কাজ করেছেন।

একসময় পিকেআর দলের সেলাঙ্গরের প্রথম চিফ মিনিস্টার খালিদ ইব্রাহিমকে বিদায় করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা নেন আজমিন। মিত্র ডিএপির সহায়তায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে স্থান দেয়ার জন্য ২০১৪ সালে ওয়ান আজিজাহকে (আনোয়ারের স্ত্রী) মনোনীত করেছিল পিকেআর। কিন্তু ইসলামপন্থী পাসের সমর্থন এবং সুলতানকে প্রভাবিত করে আজিজাহর পরিবর্তে আজমিন রাজ্যের চিফ মিনিস্টার হয়ে যান।

সেলাঙ্গরে সাফল্যের পর আজমিনের উচ্চাভিলাষ আরো বেড়ে যায়। তিনি পিকেআরে আনোয়ারের সমান্তরাল অনুগত একটি গ্রুপ তৈরির প্রচেষ্টা চালান। এ প্রচেষ্টায় শুরু থেকে সমর্থন দেন মাহাথির মোহাম্মদ। আনোয়ার ইব্রাহিমের মতামত না নিয়েই মাহাথির জোট সরকারে পিকেআরের মন্ত্রী নিয়োগ দান করেন প্রধানত আজমিন গ্রুপ থেকে। আনোয়ারের স্ত্রী ডা: আজিজাহকে উপপ্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হলেও তাকে মন্ত্রণালয় দেয়া হয় মহিলা উন্নয়নবিষয়ক। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করে এর দায়িত্ব দেয়া হয় আজমিনকে। আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের প্রধান বিষয়গুলো ন্যস্ত করা হয় তার হাতে। সরকার গঠনের সময় সেলাঙ্গরের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পিকেআর মনোনীত ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে আজমিন তার অনুগত যুব বয়সী একজনকে চিফ মিনিস্টার বানাতে বাধ্য করেন।

আর পিকেআরে আজমিন আলীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সব কাজে পেছন থেকে সমর্থন দিতে থাকেন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির। এমন ইস্যুও তখন সামনে নিয়ে আসা হয় যে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার হবেন নাকি হবেন আজমিন আলী। আনোয়ারের প্রধানমন্ত্রীত্ব ঠেকানো প্রকাশ্যে আজমিন আলী আর ভেতরে ভেতরে মাহাথির মোহাম্মদের মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়ায়। পিকেআরের নির্বাচনের সময় ডেপুটি প্রেসিডেন্ট পদে রাফিজির কাছে একপর্যায়ে আজমিন আলী হেরে যাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হলে মাহাথিরের বিশেষ হস্তক্ষেপে সাবাহ ও সারওয়াকের ভোটে আজমিন জয়ী হন। আজমিনের এই জয় আনোয়ারকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ আরো বাড়িয়ে দেয়। তিনি প্রকাশ্যে বলতে থাকেন মাহাথিরকে পূর্ণ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকতে দিতে হবে। সর্বশেষ পিকেআরের জাতীয় কংগ্রেসে আজমিন আলী তার অনুগতদের দিয়ে এক ধরনের অরাজক অবস্থা তৈরি করেন।

এখন শুরু হয়েছে মাহাথির-আজমিনের চূড়ান্ত নাটক মঞ্চায়ন। এর অংশ হিসেবে আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ৩নং সমকামিতার মামলা তৈরি করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন জোটের সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, মে ২০২০-এর মধ্যে ডা: মাহাথির তার উত্তরসূরি আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। এ সিদ্ধান্তের পর মাহাথির দৃৃশ্যত বেশ খানিকটা অস্থির হয়ে উঠেছেন। মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অব্যাহত থাকার পক্ষে ১১২ ভোট আকর্ষণের জন্য আজমিনকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছেন। আজমিন উমনু নেতা হিশামুদ্দিন হোসেনের নেতৃত্বে বিরোধী পক্ষের একটি দল এবং পিকেআরএ তার অনুগত এমপিদের একটি গ্রুপ নিয়ে সম্প্রতি এক গোপন সভা করেন। গত বছর ১৮ মে সাবাহর রাজধানী সান্দাকানের ফোর স্টার শেরাটন হোটেলে অন্য একজনের সাথে আজমিনের সমকামী ভিডিও প্রকাশের পর যেভাবে প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন একইভাবে এই বৈঠকের বিষয়েও আজমিনকে সমর্থন দিয়েছেন ডা: মাহাথির। মাহাথিরের এই সমর্থন আজমিনকে বেশ খানিকটা বেপরোয়া করে তুলেছে। তিনি পিকেআরের কংগ্রেস থেকে ওয়াকআউট করে আরেকটি সভা করার পর প্রকাশ্যে বলেন, এখন মাহাথিরের পূর্ণ মেয়াদ পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার জন্য তিনি কাজ করছেন। এর অংশ হিসেবেই যে আনোয়ারের বিরুদ্ধে তৃতীয় সমকামিতার মামলাটি তৈরি করা হয়েছে তা মালয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের কম লোকই অবিশ্বাস করেন।

প্রশ্ন হলো, ডা: মাহাথির আজমিনকে নিয়ে এই বুড়ো বয়সে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার যে নকশা তৈরি করেছেন তাতে কি সফল হবেন? এর মধ্যে দোহা সফরকালে তিনি বলেছেন, ২০২০ সালের নভেম্বরের আগে তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না। এরপর কবে ছাড়বেন এবং কার কাছে ক্ষমতা দেবেন এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা যাবে না বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। মাহাথির তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ চালটি সম্ভবত এবার চালছেন। এই দফা তিনি সফল হতে পারবেন কি না সেটিই হলো বড় প্রশ্ন।

মালয়েশিয়ার জন্য গত ১ নভেম্বর তানজং পিয়াই উপনির্বাচনের ফল ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। এই নির্বাচনী এলাকায় দুই দিন নিজ দলের পক্ষে প্রচার চালিয়ে যাওয়ার পরেও মাহাথির আগে জয় পাওয়া আসনটি ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারান। সংখ্যালঘু চাইনিজ ও ভারতীয়রা মাহাথিরকে শিক্ষা দেয়ার জন্য বিরোধীদের ভোট দিয়েছিলেন, এমনকি মালয়রাও মাহাথিরের প্রার্থীকে সেভাবে সমর্থন করেননি।

এই অবিশ্বাস্য পরাজয়ের পরে আজমিন তার বাসভবনে নৈশভোজে যোগ দিতে বিরোধী উমনু ও পিকেআরের প্রায় ২২ জন সংসদ সদস্যকে আমন্ত্রণ জানান। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজ্জাকের চাচাতো ভাই উমনু নেতা হিশামউদ্দিন হুসেনও তাতে যোগ দিয়েছিলেন। আজমিন জানতেন মাহাথিরকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অব্যাহত রাখার সংখ্যাগরিষ্ঠতা তার ছিল না। তবুও, তিনি এই চেষ্টা হয়তো করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য অপেক্ষমান আনোয়ারকে বিভ্রান্ত করার জন্য। তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, মাহাথিরের শিবিরে ২২২-আসনের সংসদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করার মতো কমপক্ষে ১১২ জন সংসদ সদস্য রয়েছে। এখন এটি পরিষ্কার যে আসলে সেই সংখ্যা নেই।

সম্ভবত আনোয়ার ইব্রাহিম, ডিএপি ও আমানাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের নিয়ে সরকার গঠনের মহাপরিকল্পনাটি অকার্যকর হয়ে গেছে। এ কারণে পাসের সভাপতি হাদি আওয়াং পেছনের দরজা দিয়ে সরকার গঠন করতে চান না বলে উল্লেখ করেন। মাহাথিরও আনোয়ারের সাথে প্রকাশ্যে একমত হয়ে বলেন যে, কেউ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে তাকে সঠিক চ্যানেলটি ব্যবহার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী মাহাথির আরো বলেছেন, পিকেআর সভাপতি আনোয়ার একমত হয়েছেন যে খুব বেশি চাপ সৃষ্টি না করেই ক্ষমতার হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি শেষ হওয়া উচিত।

তবে প্রশ্ন হলো পাস যদি মাহাথিরের সাথে পেছনে দরজা দিয়ে সরকার গঠনে আগ্রহী না হয় এবং উমনুর বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরাও মাহাথিরের পিপিবিএমের জন্য তাদের দল ত্যাগ করতে আগ্রহী না হন তবে তারপরও আজমিন আলী ১৫ জন পিকেআর এমপির সমর্থন পাবেন? সম্ভবত পাবেন না।

যদি মাহাথির ক্ষমতা অব্যাহত রাখার ১১২ সংখ্যার সমর্থন নিশ্চিত করতে পারতেন এবং আনোয়ারের পিকেআর দল আর মিত্র ডিএপি এবং আমানাহকে বাদ দিয়ে কেবল মালে দলগুলো (পিপিবিএম, উমনু, পাস এবং আজমিনের পিকেআর গ্রুপ) নিয়ে নতুন সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারতেন তাহলে এটি এখনিই হয়তো করতেন। কিন্তু হিসাব-নিকাশ খানিকটা অন্য রকম। মাহাথিরের দল পিপিবিএম, মে ২০১৮ এর সাধারণ নির্বাচনের ২২২ সংসদীয় আসনের মধ্যে কেবল ১৩টি আসন জেতে। দলটি উমনু সংসদ সদস্যদের ভাগিয়ে আনার মাধ্যমে এই সংখ্যাটি দ্বিগুণ তথা ২৬-এ উন্নীত করে। সম্প্রতি বিরোধী দলের কাছে তানজং পিয়াই আসন হারানোর পরে এর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ২৫-এ।

হিশামউদ্দিন কেবল উমনুর ১৭ জন সংসদ সদস্যকে গোপন নৈশভোজের সভায় আনতে সক্ষম হন। পিকেআরের এমপি ছিলেন মাত্র পাঁচজন। মাহাথির শিবিরে ২৫ পিপিবিএম এমপি, ১৮ পাস এমপি এবং ২৩ উমনু সংসদ সদস্য থাকবেন নতুন উদ্যোগে। আজমিনের পিকেআর থেকে কমপক্ষে ১৫ জন সংসদ সদস্য আনার কথা ছিল। তবে নৈশভোজে পিকেআরের মাত্র পাঁচজন এমপি থাকার মানে শুধু ৭১ জন এমপি মাহাথিরকে সমর্থন করতে রাজি। এমনকি শেষ পর্যন্ত ১৫ জন পিকেআর এমপিকে আজমিন পক্ষে রাখতে পারলেও সংখ্যাটি হবে ৮১।

একটি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য, মাহাথির হয় ৩১টি আসনের দল (যদি আজমিন কেবল পিকেআর থেকে ৫ এমপি আনতে পারেন) বা ৪১টি আসনের দলের (যদি আজমিন ১৫ পিকেআর এমপি পক্ষে পান) সমর্থন পাবেন। তার সাথে যদি পুরো বিরোধী বারিশান ন্যাশনাল (বিএন) জোট মাহাথিরকে সমর্থন করে তবে তার শিবিরে সর্বাধিক ৯৯টি আসন রয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে যে, বিএন থেকে ৪১ জন সংসদ সদস্য, পাসের ১৮ জন সংসদ সদস্য এবং পিপিবিএমের ২৫ জন সংসদ সদস্য আর সারওয়াকের গাবুনগান পার্টি সারওয়াকের (জিপিএস) ১৯ জন সংসদ সদস্য এবং আজমিনের দলটির ৯ জন সংসদ সদস্য এক জোটে থাকবেন মালয়েশিয়ার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে আনোয়ারের স্বপ্নকে নস্যাৎ করতে।

এ সমীকরণটিকে সত্য করতে হলে বর্তমানে উমনুর নাজিব রাজ্জাক, জাহিদ হামিদি, আবদুল আজিজ আবদুল রহিম, টেংকু আদনান, নাজনি আজিজ এবং খয়েরি জামালউদ্দিনের মতো নেতাদের অন্ধভাবে প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরকে সমর্থন দিতে হবে, যিনি ছিলেন গত বছর সাধারণ নির্বাচনে তাদের ক্ষমতার ট্রেনটিকে ধ্বংস করে দেয়া ব্যক্তি।

মূলত রাতের ডিনারে এই সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে যে আজমিন পিকেআরের বিশ্বাসঘাতক আর হিশামউদ্দিন হুসেন উমনুর বিশ্বাসঘাতক। যদিও বৈঠকটিতে আসলেই আজমিন মাহাথিরকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অব্যাহত রাখার সমর্থন আদায়ের ব্যর্থ চেষ্টাই করেছিলেন।

নাজিব ও জাহিদ যদি মাহাথিরকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে এর অর্থ হবে তাদের অর্থ পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ বাদ দেয়া। আর এর অর্থ এটিও স্বীকার করা যে, নাজিব ওয়ান এমডিবি সার্বভৌম তহবিল থেকে একটি পয়সাও চুরি করেননি এবং তাকে ভুলভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

মনে রাখতে হবে যে, যখন উমনুর ৪১ জন এমপি (মানে নাজিব, জাহিদ ও অন্যরা) মাহাথিরের পক্ষে তাদের সমর্থন ঘোষণা করবেন তখন পাকাতান হারপান জোট থাকবে না। আর তখনকার দৃশ্যপটটি হবে মাহাথির তার শত্রু নাজিবকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছেন। কারণ তারা একজোট হয়ে মালয় দলগুলোর নতুন সরকার গঠন করেছেন।

এ ছাড়া এই গ্যারান্টিও নেই যে, সারওয়াকের জিপিএস’র ১৯ জন সংসদ সদস্যই মাহাথিরকে সমর্থন করবে, যেখানে মাহাথিরের সরকার বোরনিও রাজ্যে ২০ শতাংশ তেল রাজস্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। আর এ ব্যাপারেও কোনো গ্যারান্টি নেই যে, আজমিন পিকেআরের ১৫ এমপিকে নিজ দলে ভেড়াতে পারবেন একটি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য।

এমনকি মাহাথিরও নিশ্চিত নন যে, জোট থেকে বেরিয়ে আনোয়ারের দলকে লাথি মারলে তার নিজের দল তাকে ১০০ শতাংশ সমর্থন করবে। তার দল পিপিবিএম সভাপতি মহিউদ্দিন ইয়াসিনও হয়তো পক্ষ পরিবর্তন করতে পারেন এবং কিছু পিপিবিএম এমপি আনোয়ারকে সমর্থন করার জন্য এগিয়ে আসতে পারেন। একজন জোহুরিয়ান হিসেবে, মহিউদ্দিনের আনুগত্য পিপিবিএমের চেয়ে জোহরের রাজ্যের সাথে বেশি।

এই ধরনের এক বাস্তবতায় মাহাথির ক্ষমতাসীন জোটের সমঝোতার বাইরে অন্য কোনো সরকার গঠন করতে চাইলে দেশটিতে এক অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। পাকাতান হারাপানের শরিক দল ডিএপি পিকেআর ও আমানাহ শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে। এমনকি মাহাথিরের দলের প্রেসিডেন্ট মহিউদ্দিন ইয়াসিনও তা-ই চান। এর পরিবর্তে অপেক্ষমাণ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সমকামিতার মামলা রুজু করা অথবা অনুগত মন্ত্রীকে দিয়ে জোটের প্রধান শরিক পিকেআরকে দ্বিধাবিভক্ত করার প্রচেষ্টা কোনো ভালো ফল নিয়ে আসবে না। উমনু পাসের সমর্থন নিয়ে একটি জাতীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আরো কিছু কাল মাহাথির ক্ষমতায় থাকতে চাইলে এই সরকারের আয়ুর জীবনকাঠি তাদের হাতেই চলে যাবে, যাদের অপমান-অপদস্থ করে মাহাথির ক্ষমতা থেকে বিদায় করেছেন এবং দলটিতে ভাঙন ধরিয়ে এমপিদের নিজ দলে টেনে এনেছেন। আর দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে দৌঁড়ের মধ্যে রেখেছেন। সে পথে মাহাথির হাঁটলে মালয়েশিয়ায় ২০২০ সালেই আরেকটি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। যেখানে উমনু-পাস জোটের বিজয় রোধ করা হবে কঠিন।

আর আনোয়ারের জন্যও কল্যাণ হবে সমঝোতার মাধ্যমে মাহাথির যদি সত্যি সত্যি ২০২০ সালের নভেম্বরে তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চান তাহলে সেই সুযোগ প্রদান করা। মালয়েশিয়ার জনমতের যে প্রতিফলন এখন দেখা যাচ্ছে তাতে তারা শাসক জোটের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট নন। বিগত নির্বাচনে যে প্রতিশ্রুতি পাকাতান জনগণকে দিয়েছিল সেটি বাস্তবায়নেও আরো সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে। দলগুলোর মধ্যে আনতে হবে সংহতি। সেটিই মালয়েশিয়ার জন্য নিশ্চিত করতে পারবে অগ্রযাত্রা। মাহাথির-আনোয়ার দ্বন্দ্ব অথবা রাজনৈতিক নোংরা খেলা সে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে দেশকে, যার শিকার হবেন দেশটির জনগণ।
উৎসঃ নয়াদিগন্ত

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!