মাহমুদুর রহমানের উপর হামলার নেপথ্যে যারা

গত ২২ জুলাই কুষ্টিয়ায় আদালত প্রাঙ্গনে ছাত্রলীগের নৃশংস হামলার শিকার হয়েছেন আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়। পুলিশি প্রহরায় এজলাস থেকে বের হওয়ার পর পুলিশের উপস্থিতিতেই প্রকাশ্যে নৃশংশভাবে তার গাড়িতে হামলা চালনো হয়। এ সময় কোর্ট চত্বরে থাকা পুলিশ অন্যদের মতো দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিল।

৩০ মিনিটের তাণ্ডবে মাহমুদুর রহমানের শরীরের সর্বত্র আঘাতে ক্ষতের চিহ্ন ফুটে ওঠে। এত আঘাতের পরেও বলিষ্ঠ ও মানসিকভাবে সবল থেকে তিনি পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। এই বর্বোরচিত হামলার পর পুলিশ তাকে আদালত এলাকার একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার করে যশোরের উদ্দেশে যেতে সহযোগিতা করে।

রক্তাক্ত মাহমুদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে কিন্তু পারেনি। আমি তাদের মোকাবেলা করে টিকে রয়েছি। তিনি বলেন, আমি দেশের জন্য লড়াই করে মরবো। বাংলাদেশ ও ইসলামের জন্য জীবন দেবো। আমি মৃত্যুর মুখোমুখি। কুষ্টিয়ার কোর্ট ইন্সপেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে আদালত থেকে বের করে গুণ্ডাদের হাতে লেলিয়ে দিয়েছে।

ঘটনার সময় পুরো আদালত চত্বরে ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ছাত্রলীগের ছোড়া ইটের আঘাতে বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহত হয়েছেন বলে জানা যায়।

এদিকে এই নৃশংস হামলায় কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার, ওসি ও জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সেক্রেটারি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে আগেই দাবি করা হয়েছিলো ওসি নাসির উদ্দিনই মাহমুদুর রহমানকে ছাত্রলীগের হাতে তুলে দেয়। এই সংবাদের সত্যতাও মিলেছে।

কুষ্টিয়া আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ ডেমোক্র্যাটিক কাউন্সিল আয়োজিত আলোচনা সভায় আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও নাতনি টিউলিপ সিদ্দিকীকে নিয়ে বক্তব্য দেন। সেই বক্তব্য ইউটিউবে দেখে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইয়াসির আরাফাত তুষার গত বছরের ১০ ডিসেম্বর মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া অতিরিক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বাদি হয়ে মানহানি মামলা করেন। ২২ জুলাই সেই মামলায় মাহমুদুর রহমান আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করলে বিচারক এম এম মুর্শেদ তা মঞ্জুর করে স্থায়ী জামিন দেন।

এ দিকে আদালত জামিন মঞ্জুর করায় অসন্তোষ প্রকাশ করে ছাত্রলীগ নেতারা। জামিন লাভের পর দুপুর ১২টা থেকে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইয়াসির আরাফাত ও সেক্রেটারি সাদ আহমেদের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আদালত চত্বরে মাহমুদুর রহমানকে অবরুদ্ধ করে তার বিচার চেয়ে বিক্ষোভ করে। খবর পেয়ে মাহমুদুর রহমান আদালতের বিচারককে বিষয়টি জানালে তিনি এজলাসে বসে থাকার অনুমতি দেন। এ সময় তিনি এবং তার সঙ্গীরা বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান; কিন্তু কেউ তার অনুরোধে সাড়া দেননি।

এ ঘটনার ৪ ঘণ্টা পরে বিকেল সোয়া ৪টায় এজলাসে বসে থাকা মাহামুদুর রহমানকে কুষ্টিয়া কোর্ট ইন্সপেক্টর বলেন আপনার জন্য নিরাপত্তা স্কট রেডি আপনি নিরাপদে যেতে পারবেন দ্রুত রুম থেকে বের হন। তিনি এ সময় কোর্ট ইনন্সপেক্টরকে বলেন, আমার গাড়ির চাবি তারা নিয়ে গেছে আপনি আমাকে কিভাবে নিরাপত্তা দিয়ে পাঠাবেন? তিনি বলেন, আপনি দ্রুত চলুন এ ছাড়া ভালো আর কোনো ব্যবস্থা হবে না।

তিনি কোর্ট ইন্সপেক্টরের কথা বিশ্বাস করে এজলাস থেকে হেঁটে গেটের বাইরে বের হন। সেখানে থাকা একটি সাদা কারে তাকে উঠতে বললে মাহামুদুর রহমান তার সঙ্গীদের সাথে নিয়ে কারে উঠে বসার সাথে সাথে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পেছন থেকে কারের ওপর ইট ও সেন্ডেল ছুড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে কারটি একটু এগিয়ে জজ কোর্টের গেটে সম্মুখে পৌঁছানো মাত্র গাড়ির ওপর আক্রমণ শুরু হয়। কয়েক মিনিট গাড়ির ওপর হামলা চলে। এ সময় বিএনপিপন্থী কয়েকজন আইনজীবী তার কারটি ঘিরে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। জজ আদালত ছাড়িয়ে কুষ্টিয়া বার অফিসের সামনে পৌঁছলে সেখানে কয়েকজন আইনজীবী কারটির গতিরোধ করেন।

এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ওই কারের ওপর বৃষ্টির মতো ইট ছুড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে কয়েকজন লাঠি নিয়ে কারের পেছন এবং সামনের দিকে হামলা চালায়। এ সময় ওই কারে থাকা বিএফইউজে মহাসচিব এম আবদুল্লাহ ও ঢাকার একজন আইনজীবী বিপন্ন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। আক্রমণের ভয়াবহতা এমন ছিল যে, কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারছিল না। এ সময় মৃত্যুর মুখে পড়া মাহামুদুর রহমান সঙ্গীদের নিয়ে পাশের একটি কক্ষে আশ্রয় নেন।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পরক্ষণে এ রুমের জানালা এবং দরজায় ইট দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এ সময় আদালত চত্বরে থাকা পুলিশ নিজেদের জীবন বাঁচাতে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছিল। ১৫ মিনিট একপেশি আক্রমণ শেষে কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি নাসির উদ্দিন ওই রুমে গিয়ে জানালা দিয়ে মাহামুদুর রহমানকে বেরিয়ে আসতে বলেন। এ সময় মাহামুদুর রহমান ওসিকে বলেন, কোর্ট ইন্সপেক্টর আমাকে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছাত্রলীগের গুণ্ডাদের হাতে দিয়ে পালিয়েছে, আবার আপনি কি সেফটি দেবেন? পরে তিনি সদর ওসির কথায় ওই রুম থেকে বের হয়ে এলে তাকে জজ কোর্টের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মাহামুদুর রহমানকে কোনো চিকিৎসা এমনকি বসার জায়গা না দিয়ে নানা ওজুহাতে সময় ক্ষেপণ করছিলেন ওসি নাসির উদ্দিন। এ সময় মাহমুদুর রহমানের শরীরের বিভিন্ন অংশ দিয়ে অনর্গল রক্ত বের হচ্ছিল।

জানা গেছে কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার মেহেদী হাসানের নির্দেশেই কোর্ট এলাকায় পুলিশ মাহমুদুর রহমানকে নিরাপত্তা দেয়নি। এই কুখ্যাত পুলিশ সুপার ঢাকায় এডিসি থাকাকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালানোর অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কট্টর আওয়ামী পরিবারের সন্তান মেদেহী হাসান ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্রলীগ ক্যাডার। সে সুবাদে শেখ হেলাল এমপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তার। সে সুযোগে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের আঙুলের ইশারায় ঘোরান এই মেহেদী হাসান। তার প্রত্যক্ষ ইন্ধনেই মাহমুদুর রহমানের উপর ছাত্রলীগ এমন নৃশংস হামলা চালিয়েছে।

অ্যানালাইসিস বিডি ডেস্ক

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!