মাহমুদুর রহমানকে কেন এত ভয়?

শিবলী সোহায়েল

বাইশে জুলাই, রোববার। সেদিন সিডনিতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটি অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠান শেষে বাড়ী ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। শুতে শুতে প্রায় রাত একটা। ঘুমানোর আগে ফেইসবুকে একটু চোখ বুলাতে গিয়ে আঁতকে উঠলাম। কুষ্টিয়ার জেলার আদালত প্রাঙ্গণে আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের উপর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের আক্রমণ ও তাকে শারিরীকভাবে আহত করার ঘটনা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে এমন ঘটনা আদালত প্রাঙ্গণে কেমন করে ঘটতে পারল? পুলিশ এবং সরকারের ভূমিকা নিয়েও সবার মনে অনেক প্রশ্ন।

আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ভাবতে থাকলাম আদালতের মত সম্মানিত জায়গায় এমন ঘটনা কি বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেছে? অথবা কোন সম্পাদক-বুদ্ধিজীবির গায়ে এভাবে কখনো কি অতীতে রাজনৈতিক পাণ্ডারা হাত উঠিয়েছে? পাশাপাশি ফেইসবুকে রক্তমাখা মাহমুদুর রহমানের ছবি নিয়ে কিছু প্রগতিশীল নামে পরিচিত প্রকৃত প্রতিক্রিয়াশীলদের উল্লসিত পোস্ট দেখে প্রথমে খুব হোঁচট খেলাম। একজন আহত রক্তাক্ত মানুষের লাল রক্ত দেখে এই বন্য উল্লাসের কারণ কি? কেন এত ঘৃণা, কেন এত ক্ষোভ ওদের? আসলেই কি ঘৃণা এবং ক্ষোভ থেকে এ আক্রমণ, না কি অন্য কোন কারণে মাহমুদুর রহমানের প্রতি ওদের প্রচণ্ড ভয়? সম্ভবত দুটোরই মিশ্রণ। অথবা ভয় থেকে শুরু হয়ে শেষপর্যন্ত এ ক্ষোভ।

আমার মনে হয় বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মাহমুদুর রহমানের গুরুত্ব এবং তাঁর প্রতি আওয়ামীলীগ ও চরমপন্থি  শাহবাগিদের ক্ষোভের বা ভয়ের কারণগুলো কি হতে পারে তা একটু গভীর ভাবে বোঝার চেষ্টা করা সকল বাংলাদেশীদের জন্য প্রয়োজন। তাই এখানে আমি সমসাময়িক বিষয়ের পর্যালোচনা করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরবো।

আমি খুব বড় কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষক নই। তবে দেশের সঙ্গে নাড়ীর গভীর টান থাকায় সবসময়ই দেশের খবরাখবর রাখি। হয়তো বা আর দশজন প্রবাসী বাংলাদেশীর চাইতে সামান্য কিছুটা বেশি রাখি। সেই পর্যবেক্ষণ থেকে বুঝতে পারি যে ২০০৬ সাল থেকে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত আওয়ামীলীগকে ব্যবহার করে যেই পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলছে, সে দুরভিসন্ধির সামনে মাহমুদুর রহমান একাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি একাই ভারতের আধিপত্যবাদী পরিকল্পনা তথা আওয়ামীলীগের বেশ কয়েকটি বড় ষড়যন্ত্রের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন।

দেশের স্বার্থে মাহমুদুর রহমানের বলিষ্ঠ অবস্থানের কথা ভারতের খুব ভালো করেই জানা। বিশেষ করে তিনি বাণিজ্য উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় যে কয়টি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছিল তার প্রতিটিতেই তিনি বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মায়ানমার, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা এবং ২০০৬ সালের শুরুর দিকে ভারতের টাটা গ্রুপের বেশ বড় একটি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা ছিল তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সবসময় চায় বিনিময়ে কোন কিছু না দিয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে সব ধরণের সুবিধা আদায় করে নিতে। যে কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি কিংবা বিনিময়ের ক্ষেত্রে এটি অবান্তর ও অযৌক্তিক চাওয়া হলেও বর্তমানে তাদের সে চাওয়া ভালোভাবেই পূরণ হচ্ছে। কিন্তু সেসময় এটি তারা পারেনি মূলতঃ মাহমুদুর রহমানের কারণেই। সেই থেকে তিনি ওদের চক্ষুশূল। আর ভারতের যিনি চক্ষুশূল আওয়ামীলীগের ক্ষোভ তো তার উপর পড়তেই পারে।

মাহমুদুর রহমানের মত অটল অবিচল মানুষকে ওদের ভীষণ ভয়। ভারত তার প্রয়োজনেই মেরুদণ্ডহীন দুর্নীতিবাজ এবং পরনির্ভরশীল লোকজনকে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী অবস্থানে দেখতে চায়। মাহমুদুর রহমানের মত দৃঢ়চেতা মানুষ যারা নিজ দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখে, তারা ওদের জন্য বিশাল বাঁধা। এদেরকে টাকা দিয়ে কেনাও যায় না, মৃত্যুর ভয়ও দেখানো যায় না। তাই ধীরে ধীরে এসকল মেরুদণ্ড সম্পন্ন মানুষদেরকে ফাঁসি দিয়ে, কাউকে গুম করে অথবা অন্যদেরকে জেল-জুলুম-আক্রমণ-নির্যাতনের মাধ্যমে কোণঠাসা করে রেখে, আওয়ামীলীগের কাঁধে বন্দুক রেখেই নিরাপদে ওরা ওদের পথের কাঁটা দূর করছে।

এক্ষেত্রে আরও একটি উল্লেখযোগ্য বড় বিষয় হল, টিপাইমুখ বিরোধী আন্দোলন। ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যে বিশাল আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তাতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন ইলিয়াস আলী ও মাহমুদুর রহমান। বাংলাদেশের গণ মানুষের কাছে মাহমুদুর রহমানের গ্রহণযোগ্যতা কত বেশি তা এ আন্দোলনের সময়েই স্পষ্ট হয়ে উঠে। আরও বোঝা গিয়েছিল রাজনীতির সাথে মূখ্য ভূমিকায় সরাসরি যুক্ত না থেকেও বিপুল জনগোষ্ঠীকে সংহত ও সংগঠিত করার কতটা সক্ষমতা তাঁর রয়েছে। টিপাইমুখ বিরোধী আন্দোলন দমন করতেই ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। পাশাপাশি মাহমুদুর রহমানকে পরাস্ত করার জন্য শুরু হয়েছিল তার ওপর নানা রকম অত্যাচার নিপীড়ন।

যতদূর মনে পড়ছে এরকম একটি পরিস্থিতিতেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরকারী আজ্ঞাবাহী প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে লিখিত নির্দেশ আসে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে সবরকম খোঁজ খবর নিয়ে সম্ভাব্য মামলার প্রস্তুতি নেবার জন্য। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো সেই নিয়ম বহির্ভূত নির্দেশনাটি কোনভাবে ফাঁস হয়ে যায়। এবং অসম সাহসী মাহমুদুর রহমান আমার দেশ পত্রিকায় সেটা ছাপিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ করে তখন একটি কলাম লেখেন। পরবর্তীতে মাহমুদুর রহমানকে পত্রিকা অফিস থেকে রাতের অন্ধকারে গ্রেফতার করে গুম করার এবং রিমান্ডে নিয়ে হত্যা করার উপর্যুপরি প্রচেষ্টাগুলো বিভিন্নভাবে বিভিন্নসময় নস্যাৎ হয়ে যায়। কিন্তু তাকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। এখনও তাকে প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হচ্ছে আইনী হয়রানীর, এমনকি শারিরীক হামলারও। ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী শাসনের জন্য ‘জ্বী হুজুর’ মার্কা লোকজনের প্রয়োজন বড় বেশি, অন্যদিকে যে কোন বিপক্ষমত তাদের জন্য বিশাল হুমকি। তাই যেকোনো দুর্নীতিবাজ স্বৈরাচারই মাহমুদুর রহমানের মত সৎ, সাহসী ও প্রতিবাদী মানুষকে ভয় পাবে। তাদেরকে সরিয়ে দিতে চাইবে চিরতরে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে আওয়ামীলীগের জন্য এখানে বিশাল একটি সমস্যা হয়ে গেছে। আর তা হচ্ছে, একদিকে একাত্তর সালে কোন ভূমিকা না থাকায় মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রাজাকার তকমা লাগিয়ে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া যাচ্ছে না। আবার অন্যদিকে একজন বড় মাপের এবং সর্বজনপরিচিত সাংবাদিক হওয়ায় তাঁকে নির্বিবাদে গুম করাও সহজ হচ্ছে না। কিন্তু আবার তাঁকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতেও তাদের মারাত্মক ভয় । আর তাই সম্ভবত নিরুপায় হয়ে তাদের ক্ষোভগুলো উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।

দুই হাজার তেরো সালের ফেব্রুয়ারি মাসের গোঁড়ার দিকে আওয়ামীলীগ তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগিয়ে সরকারী সকল সুযোগ সুবিধার অপব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে শাহবাগ আন্দোলনের নামে দেশে এক ম্যাস-হিস্টিরিয়া বা গণ-উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল। ফ্যাসিবাদের একটি বৈশিষ্ট্য হল তারা এধরণের গণ-উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে চায় অথবা অর্জিত ক্ষমতাকে আরও কুক্ষিগত করতে চায়। এর বেশ কয়েকটি দৃষ্টান্ত ইতিহাসে দেখা যায়। যেমন, ১৯৩৩ সালে জার্মান পার্লামেন্টে অগ্নিকান্ড, যা রেইসট্যাগ ফায়ার (Reichstag fire) নামে পরিচিত। এ অগ্নিকান্ড থেকে ম্যাস-হিস্টিরিয়া সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে হিটলার ক্ষমতায় আসে এবং শুরু হয় কম্যুনিস্ট ও ইহুদি ট্যাগ দিয়ে নির্মমভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিধন। এছাড়াও ১৯৬০ সালে অ্যামেরিকায় সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থার একটি ম্যাস-হিস্টিরিয়া তৈরি করেছিল । মার্কিন ইতিহাসে ম্যাকার্থিজম নামে পরিচিত এ রাজনৈতিক ফর্মুলায় গণ-উন্মত্ততা সৃষ্টির মাধ্যমে কম্যুনিস্ট ট্যাগ লাগিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয় বিজ্ঞানী জুলিয়াস রোজেনবার্গ ও তার স্ত্রী ইথেল রোজেনবার্গকে। অসংখ্য মানুষকে তো বটেই এমনকি চার্লি চ্যাপলিনের মত একজন বিশ্ববিখ্যাত অভিনেতাকে পর্যন্ত দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয় ঐ একই ট্যাগ লাগিয়ে। এমন গণ-উন্মত্ততা তৈরির আরেকটি উদাহারন দেখা যায় ১৯৯২ সালে আমাদের পাশের দেশ ভারতে। সেসময় ম্যাস-হিষ্টিরিয়া তৈরি করে, সমগ্র ভারত জুড়ে দাঙ্গা বাঁধিয়ে, উগ্র ও উন্মত্ত কিছু লোকদের সাথে নিয়ে ছয়শত বছরের পুরনো বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয় এবং ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বিজেপি অন্যতম প্রধান দল হিসেবে আবির্ভূত হয়।

নাজি-হিটলার, ম্যাকার্থিজম কিংবা সাম্প্রদায়িক বিজেপির মতই ফ্যাসিবাদী উদ্দেশ্যে সৃষ্ট শাহবাগের এই গণ-উন্মাদনার রাজনৈতিক কুটচাল বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি টের পেলেও সম্ভবত দূরদৃষ্টির অভাবে এবং নানা রকম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তহীনতায় তারা তখন নিশ্চুপ থাকাকেই শ্রেয় মনে করে। এই গণ-উন্মাদনা যখন সমগ্র দেশকে প্রায় আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল তখন বিভ্রান্ত দেশবাসীর ঘোর কাটাতে একমাত্র মাহমুদুর রহমানই তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতা দিয়ে প্রায় একাই এক অসম লড়াই আরম্ভ করেন। তিনি জাতির সামনে তুলে ধরলেন এ শাহবাগি গন-উন্মত্ততার প্রকৃত চেহারা। অকূতোভয় সাহস নিয়ে তিনিই নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে প্রথম উচ্চারণ করলেন, ‘শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি’!

তথাকথিত ‘শাহবাগ আন্দোলন’ এর বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিত বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে মাহমুদুর রহমান কিভাবে তাদের কত বড় পরিকল্পনার ছকে পানি ঢেলে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রগুলোকে নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন।

শাহবাগি গন-উন্মাদনার মিডিয়া কাভারেজ এবং ক্যাম্পেইন দেখে মনে হয় এর পেছনে শুধু  আওয়ামীলীগ একা নয় বরং তাদের পরম বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক, যারা ম্যাস-হিস্টিরিয়া সৃষ্টিতে আগে থেকেই অভিজ্ঞ, সেই আধিপত্যবাদী ভারতের পূর্ণ সহায়তা ছিল। আমার এখনও মনে পড়ছে সে সময় আমার একজন বন্ধু যে কিনা বাংলাদেশের একজন স্কুল শিক্ষক সে আমাকে কথায় কথায় বলেছিল, “বুঝলাম এটা গণজাগরণ কিন্তু সেখানে আমাদের স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে বাসে করে নিয়ে যাচ্ছে কেন? এভাবে বাসে করে নিয়ে যাওয়ার খরচই বা কারা দিচ্ছে?”

এই সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন  থেকে অনেক কিছুই বোঝা যায়। যাইহোক, এ গন-উন্মত্ততাকে আওয়ামীলীগ আরও চাগিয়ে তুলতে শুধুমাত্র স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই নয় বরং শিল্পী, অভিনেতা, লেখক এমনকি খেলোয়াড়দেরকে পর্যন্ত বাধ্য করেছিলা সেই শাহবাগে দলে দেলে যোগদান করতে। জাতীয় দলের একজন জনপ্রিয় ক্রিকেটারের ফেসবুকে তখন এরকম একটা পোস্ট দেখেছিলাম, “শাহবাগে যাব ভাল কথা কিন্তু জোর করবে কেন?” সেই ক্রিকেটার অবশ্য তাঁর পোষ্টে উল্লেখ করেননি কে বা কারা তাকে জোর করেছিল। তবে আমার মত অনেকেই হয়তো যা বোঝার বুঝে নিয়েছিল, কারণ ফ্যাসিবাদ-আক্রান্ত রাষ্ট্রে সব কথা পরিস্কার করে বলা সম্ভব হয় না।

শাহবাগে ম্যাস-হিস্টিরিয়া শুরু করার দিন দশেকের মাথায় এ আয়োজনের একজন প্রথম সারির উদ্যোক্তা এবং ব্লগার, যিনি থাবাবাবা ছদ্মনামে ব্লগ লিখতেন, সেই আহমেদ রাজীব হায়দার খুন হয়। তাকে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করে তার বাড়ির সামনেই ফেলে রেখে যাওয়া হয়। খুব স্বাভাবিক ভাবেই অজানা দুর্বৃত্তদের ঘটানো এ ঘটনার জন্য দোষারোপ করা হয় জামায়াত-শিবিরকে। ঠিক যেমনটা নাজি-হিটলার অথবা ম্যাকারথিস্টরা রেইসট্যাগ ফায়ার এবং অন্যান্য সকল অপকর্মের দায় সেসময় ইহুদি এবং কম্যুনিস্টদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিত।

ব্লগার থাবাবাবাকে হত্যা করার ঘটনা এসময় আগুনে ঘি ঢালার মত কাজ করে, গন-উন্মত্ততাকে আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিহতের বাড়ীতে গিয়ে তাকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ হিসেবে ঘোষণা করে। এর আগে বা পরে সন্ত্রাসীদের হাতে বাংলাদেশে অনেকেই নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে এতো দ্রুত কারো বাড়ীতে কখনোই যেতে দেখা যায় নি। তাই অনেকেই এটাকে গন-উন্মাদনার আগুন আরও উস্কে দেবার একটি পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। তবে এই হত্যাকাণ্ডের বেনিফিসিয়ারি চিহ্নিত করতে গেলে কিন্তু সবার আগে আওয়ামীলীগের দিকেই আঙ্গুল ওঠে।

এ সন্দেহটি আরও ঘনীভূত হয় কিছুদিন আগে একুশে টিভির অনুসন্ধানী প্রতিবেদক এবং ‘একুশের চোখ’ অনুষ্ঠানের জন্য পরিচিত সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের একটি ফেইসবুক পোস্ট দেখে। বাংলাদেশে টিকতে না পেরে যিনি বর্তমানে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, তিনি তথাকথিত ‘শাহবাগ আন্দোলন’ সময়কালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, থাবাবাবা হত্যার আগের দিন ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত একজন পুলিশ অফিসার ফোনে তাকে এ ধরণের বড় একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে বলে পরোক্ষভাবে আভাষ দেয়। এই কথাটা কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়া যাচ্ছেনা। কারণ ইলিয়াস হোসেনের একুশের চোখের প্রতিবেদন যারা দেখেছেন তারা তার সাংবাদিকতা, সাহসিকতা এবং সত্যবাদিতা সম্পর্কে অবগত আছেন।

শাহাবাগী গণজাগরণের নামে আওয়ামীলীগের ভয়ংকর এই ফ্যাসিবাদী কুটচাল প্রচণ্ড রকমের হোঁচট খায় আবারও সেই মাহমুদুর রহমানের কারনেই। তিনি তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় প্রতিবেদন ছাপিয়ে থাবাবাবা সহ সকল তথাকথিত ব্লগারদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে লুকিয়ে রাখা উগ্র সাম্প্রদায়িক এবং ধর্মবিদ্বেষী ঘৃণাচাষের আসল চেহারা সমস্ত দলীল-প্রমাণ সহ সবার সামনে উন্মোচন করে দেন। এরপরেই আওয়ামীলীগ ও ভারতের বিশাল বিনিয়োগ ও পরিকল্পনায় গড়ে তোলা গণজাগরণের নামে তৈরি করা ফ্যাসিবাদী গন-উন্মত্ততা থেকে দেশের মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। আল্লাহ এবং রাসুল সা. এর নামে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিবাদে চরম অশ্লীলতা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে আসা শাহবাগিদের কাজকর্ম মানুষ জেনে ফেলার পরই তারা বাংলাদেশে গণপ্রত্যাখ্যানের শিকার হয়। এক সময় যারা নিজেদের দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধা নামে গর্ব করে পরিচয় দিতো, সেই তাদের পরিচয় ‘শাহবাগি’ শব্দটি বাংলাদেশের মানুষের মুখে একটি অপছন্দসূচক বিশেষণে পরিণত হয়। এর শেষ পরিণতি দেখে মনে হয় আওয়ামীলীগ নিজেও শেষ পর্যন্ত এই ‘স্পনসরড রেভুলিউশন’কে আর কোন উপায় না দেখে একটি ব্যাড ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে পরিত্যক্ত করতে বাধ্য হয়েছে। মাহমুদুর রহমানকে ওদের ভয় এখানেই। তিনি একাই সামর্থ্য রাখেন এরকম একটি বিশাল ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক কুটচাল নস্যাৎ করে দেয়ার।

মাহমুদুর রহমানকে ওদের ভয় পাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে এই ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে আদালতসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুলোকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করার সামর্থ্য ও স্পর্ধা বাংলাদেশে সম্ভবত তাঁর ছাড়া আর কারও নেই। এর সবচেয়ে বড় নজির হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ-এর বিচারিক অনিয়ম ও দুর্নীতি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং বহুল আলোচিত “স্কাইপে লিক” ঘটানো। এ দুটো কারণেই মূলত তাকে জেলে যেতে হয় এবং আমার দেশ পত্রিকার বিশিষ্ট সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানকে বর্তমানে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হচ্ছে।

“স্কাইপে লিক” বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একটি ঘটনা, একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। এখানে যুদ্ধাপরাধী বিচারের সাজানো নাটক প্রমাণিত হওয়া নয় শুধু, বরং এর পাশাপাশি আরও উঠে এসেছে কিভাবে বিচার প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বাইরের একজন ব্যক্তি বেলজিয়ামে বসে বিচারের রায় লিখছেন, প্রসিকিউশন কে সহায়তা করছেন এবং এমনকি সরকারপক্ষের সাক্ষীকে ঠিক কি কি বলতে হবে তাও ঠিক করে দিচ্ছেন। ট্রাইবুনালের বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম এবং বেলজিয়াম প্রবাসী আইনের শিক্ষক আহমেদ জিয়াউদ্দিনের মাঝে কথোপকথনের ফাঁস হয়ে যাওয়া অডিও রেকর্ডগুলোতে দেখা যায় আহমেদ জিয়াউদ্দিন নামের আড়ালে থাকা রহস্যজনক ও গোপন মানুষটি, যাকে বাংলাদেশের মানুষজন চিনতো না, সে স্কাইপের মাধ্যমে দিনের পর দিন ধরে বিচারপতিকে তার বিচারকর্ম সম্পাদনের দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন।

বেলজিয়াম প্রবাসী লোকটি শুধু নির্দেশনাই দিচ্ছেন না বরং বিচারের রায়ও লিখে দিচ্ছেন এবং তা সম্পূর্ণ বিচার প্রক্রিয়া শেষ হবার আগেই। তিনি বলে দিচ্ছেন, কাকে সাক্ষী হিসেবে ডাকা যাবে এবং কাকে ডাকা যাবেনা। এ কথোপকথনের এক পর্যায়ে বিচারপতি নাসিম তার গুরু জিয়াউদ্দিনকে জানান, বিচারপতি সিনহা তাকে বলেছেন ‘তিনটা ফাঁসি দিয়া দাও তারপর তোমারে সুপ্রিম কোর্টে নিয়া আসি’। এই ঘটনার ভয়াবহতা এতোই বেশি যে তা আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘দি ইকনমিস্ট’ পর্যন্ত ফলাও করে প্রকাশ করে। পরবর্তীতে দেখা যায় স্কাইপে কথোপকথন ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে ট্রাইবুনালের বিচারপতি পদ থেকে নাসিম পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেও আওয়ামী লীগ শেষপর্যন্ত তাকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়। সাজানো বিচারপ্রক্রিয়া এবং ক্যাঙ্গারু ট্রাইবুনালে যারা আওয়ামী লীগের সেবা করেছে তাদেরকে তারা পুরোপুরি হাতে নাতে জনগণের সামনে ধরা খাওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পূর্ণ অপব্যবহার করে পুরস্কৃত করেছে।

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আপনারা অনেকেই বিভিন্ন কোর্টে জুরি হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। তারা সবাই জানেন যে জুরি হবার সাথে সাথেই প্রথম যে নির্দেশনা দেওয়া হয় তা হচ্ছে বিচার কার্য নিয়ে কোর্টের বাইরে তৃতীয় কোন ব্যক্তির সাথে কথা বলা সম্পূর্ণ নিষেধ। আরও একটি পরামর্শ দেওয়া হয় সেটা হচ্ছে সাক্ষীর বক্তব্য শোনার সময় তার ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন বা মুখভঙ্গি লক্ষ্য করতে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালে কি দেখতে পেলাম? বিচারপতি বেলজিয়াম প্রবাসী একজনের সাথে শুধু কথাই বলছে না বরং তার কাছ থেকে নির্দেশনা নিচ্ছে। এবং সেই ব্যক্তি বিদেশে বসেই কোন সাক্ষী বা শুনানি কোন কিছুই স্বচক্ষে নিরীক্ষণ না করেই চুড়ান্ত রায় লিখে দিচ্ছেন এবং তাও আবার বিচার কার্যাদি শেষ হওয়ার আগেই। শুধু তাই নয়, এই স্কাইপি কথোপকথনের এক পর্যায়ে বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম প্রসিকিউটর জিয়াদ আল মালুম সম্পর্কে মন্তব্য করে, “মালুম খালি লাফায় লাফায় ওঠে। না মানে, যখন ওঠে যৌক্তিক কারণ নিয়া তো ওঠে না”। তখন অপরদিক থেকে ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন বলে, “কি সেইটা বলেন?” জবাবে বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম জানান, “না কোনও কারণ নাই। আমি ধমক দিয়ে বসায় দিছি। পরে আবার রুমে ডাকছি। পরে কইছে এইডাই ঠিক আছে। আমি দাঁড়াইয়া যামু, আপনি আমারে বসাইয়া দেবেন। লোকে দেখুক আমাদের মধ্যে কোনও খাতির নাই।” একবার ভেবে দেখুন বাদী অথবা বিবাদীর আইনজীবীর সঙ্গে একটি মামলার বিচারপতির কি এই ধরনের সম্পর্ক থাকতে পারে?

এই একটি দৃষ্টান্ত থেকেই পরিস্কার হয়ে যায় কত বড় অনিয়ম এবং দুর্নীতি ছিল বাংলাদেশের তথাকিথত মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়াতে। বাংলাদেশে একমাত্র মাহমুদুর রহমানেরই সে সাহস ছিল বিচার কাজের এই অনিয়মগুলোকে প্রকাশ করে দিয়ে অসৎ কাজে লিপ্তদেরকে জনগণের আদালতে জবাবদিহীতার মুখোমুখি করার। বিচারালয়কে জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল বলা হয়। একটি দেশের বিচার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়লে সে দেশের আর কিছু থাকেনা। যে প্রতিষ্ঠান যত বেশী গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহীতা এবং নিয়ম-নিষ্ঠা নিশ্চিত করা দেশের স্বার্থেই তত বেশী প্রয়োজন।

মানুষের হৃদযন্ত্রে যদি কোন সমস্যা থাকে তাহলে তা গোপন করে না রেখে সঠিক চিকিৎসা করা প্রয়োজন। তেমনি গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে একটি দেশের হৃদযন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এর কোনটিতে অনিয়ম দেখা দিলে তা যদি গোপন করে রাখা হয় তাতে ক্ষতি আরও বেশী। দেশের মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে দীর্ঘদিন দুর্নীতি এবং কুশাসনের চর্চায় ব্যস্ত রাখলে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ভিত্তিমূলও একসময় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে, ভেঙে পড়তে থাকে। একটি সুস্থ রাষ্ট্র, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক অধিকারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই এসব দুর্নীতি, অনিয়ম ও অসততাকে প্রকাশ করে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হয়। এবং একজন সাংবাদিকের প্রকৃত দায়িত্ব হচ্ছে এ বিষয়গুলো প্রকাশ করা, তারপর প্রতিকারের দায়িত্ব হলো সরকারের। একজন সাংবাদিক হিসেবে মাহমুদুর রহমান সঠিক কাজটিই করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি বস্তুনিষ্ঠ এবং যথার্থ সাংবাদিকতার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে নিজেকে সাহসের বাতিঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

কিন্তু অনিয়ম এবং স্বেচ্ছাচারিতাই ফ্যাসিবাদের নিয়ম, স্বৈরাচারের অভ্যাস। তারা কখনোই চায় না এগুলো প্রকাশ হোক। মাহমুদুর রহমানের প্রকাশিত “স্কাইপে লিক” ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা বিশ্বের প্রায় সব ক’টি মিডিয়ায়। সারা পৃথিবীর মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়ে যায় বাংলাদেশের দুর্নীতি, নিপীড়ন এবং কূশাসনের প্রকৃত চেহারা। আন্তর্জাতিক সব ধরণের সংস্থা এবং সংগঠনগুলো বাংলাদেশের বিচারিক হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়েছে এর পরিণতিতে। তাই ওদের ভয়টা ঠিক এখানেই।

ফ্যাসিবাদীরা জানে তারা কতটা অন্যায় করছে। আর তাই তারা ভীত থাকে সবসময়। তাদের অস্ত্র হচ্ছে জনগণকে ভয় দেখিয়ে তাদের কৃতকর্মগুলোকে যতটা সম্ভব গোপন রাখা। এ ভয় দেখানোর জন্যই তারা মানুষ গুম করে, মতপ্রকাশের অপরাধে গ্রেফতার হয়রানি করে, চাকরিচ্যুত করে, কোটা ব্যবস্থার নামে নিজেদের দলান্ধ প্রার্থী ছাড়া সাধারণ মানুষদেরকে বঞ্চিত করে, এমন কি অনোন্যপায় হয়ে মাহমুদুর রহমানের মতো একজন ব্যক্তির উপর শারীরিক আক্রমণ পর্যন্ত করে বসে। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে আমরা সাধারণ জনতা ওদেরকে যত ভয় পাবো, ওরা ততই আরও বেশি আমাদের বুকের উপর চেপে বসতে থাকবে। আর আমরা যদি মাহমুদুর রহমানের মত সাহসী হয়ে অগণতান্ত্রিক খুনী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, রুখে দাঁড়াই তাহলেই দেখা যাবে ওরা লেজ গুটিয়ে পালাচ্ছে। ঠিক এমনটাই বারংবার ঘটেছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়, বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশে।

[লেখকঃ লেকচারার, চার্লস ষ্টার্ট ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া]

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!