মার্কিন ভণ্ডামি: কায়রো থেকে তেহরান  সুমাইয়া ঘানুশি

মার্কিন ভণ্ডামি: কায়রো থেকে তেহরান 
সুমাইয়া ঘানুশি
ইসফাহানের শহরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ গত সপ্তাহে রাজধানী তেহরানসহ ইরানের অবশিষ্ট শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে ।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বঞ্চনা ও বেকারত্ব এবং দরিদ্র ইরানিদের মধ্যে অবিচারের অনুভূতি থেকে সৃষ্ট এই বিক্ষোভে সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বান পর্যন্ত জানানো হয়েছে। এই গ্রুপগুলো অকার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং ইরানের উপর আন্তর্জাতিক পক্ষের বহু বছর ধরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরূপ প্রভাবের আঘাত সহ্য করেছে।
প্রতিবাদ বিক্ষোভকারীরা রক্ষণশীল ও সংস্কারবাদী উভয় সরকারের সময় শিক্ষিত ইরানি যুবক ও ইরানী সরকারের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির যে ব্যাপক ব্যবধান তার বিরুদ্ধে অসন্তোষের প্রকাশ ঘটিয়েছে।
একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব?
তিন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অভিনেতা বিদ্যুৎ গতিতে তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও সমীকরণ থেকে ইরানের এই রাজনৈতিক সংকটের ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যাতে সামাজিক আন্দোলন থেকে এটাকে সরকারের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবে রুপান্তর করা যায়। 
প্রথম পক্ষ উপসাগরীয় দেশগুলি, যারা ২০১৩ সালে মিশরে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের কারিগর হিসেবে কাজ করেছে। তারা আরব জাগরণকে চূর্ণ করার জন্য অর্থ এবং গণমাধ্যমের সাহায্যে তাদের ভূমিকাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বিস্ময়করভাবে, এই দেশগুলি ইরানের বিক্ষোভকে “পারসিক বসন্ত” বানানোর চেষ্টা করেছে। অন্য কথায়, আরবের জন্য যা নিষিদ্ধ তা ইরানের জন্য তাদের কাছে শুধু অনুমোদিতই নয় বরং কাঙ্ক্ষিতও।
দ্বিতীয় পক্ষ হলো ইসরাইল, যে ২০১১ সালে এই অঞ্চলের মধ্যে যে সব রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল তাকে প্রথমবারের মতো “আরব শীত” হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এটাকে তারা তাদের অস্তিত্বগত হুমকি এবং নিজেদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসনের মধ্যে একমাত্র গণতন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে একটি বিপদ হিসেবে দেখেছে। 
তৃতীয় পক্ষটি হল যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন, যে অতীতে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোন আগ্রহ দেখায়নি। এর পরিবর্তে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তিকে অকার্যকর করার জন্য এবং ইরাকে তার পরাজয়ের পর ধারাবাহিকভাবে মার্কিন প্রত্যাহারের পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে নিজস্ব অবস্থান পুনর্বিন্যস্ত করার প্রতি তার শক্তিকে নিয়োজিত করছে।
জাতিসংঘে তার প্রতিনিধি নিরাপত্তা পরিষদের এজেন্ডা হিসাবে ইরানের প্রতিবাদকে উত্থাপনের জন্য এগিয়ে আসেন। তিনি এ কাজ এমন একটি প্রতিষ্ঠানে করেছেন যেখানে কয়েকদিন আগে তার বিরুদ্ধে নিন্দার জন্য বিষোদগার করে প্রতিষ্ঠানটি ইসরাইলের প্রতি বৈরি বলে অভিযোগ করে এবং এতে তার তহবিল প্রদান স্থগিত করার হুমকি দেয়।
ভণ্ডামি ছাড়া
ইরানের যুবকদের সংগঠিত করার প্রবণতার পেছনে প্রান্তিকতা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য হার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ যে বেশ কিছু কারণ আছে তাতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই । এই আন্দোলনের পিছনে প্রধান চালিকাশক্তিটি দারিদ্র্য এবং প্রান্তিককৃত সামাজিক খাত বলে মনে করা হয়। আন্দোলনে তারা স্পষ্ট কোনও রাজনৈতিক দাবি জানায়নি।
২০০৯ সালে সংস্কারবাদীদের দ্বারা পরিচালিত বিক্ষোভের বিপরীতে এই সর্বশেষ আন্দোলন কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের এ নিয়ে রেটরিক বা কথাবার্তার কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, কারণ মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র ও তেলের ব্যাপারে ব্যাপক আর্থিক লেনদেন এবং সম্পৃক্ততার কারণে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন গণতন্ত্র ও এই অঞ্চলের মানবাধিকার উন্নয়নে তেমন কোন ভুমিকা রাখছে না। (যেমন ট্রাম্পের সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সফরে তিনি কেবল চুক্তি এবং উপহার নিয়ে ফিরে গেছেন)।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো যে, ইরানের কাছ থেকে মাত্র কয়েকশ মাইল দূরে মিসরে এক রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জনগণের ইচ্ছাকে চুরমার করে যে নিখুঁত একনায়কতান্ত্রিক শাসন জারি করা হয় আর একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে জেলে পাঠিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার নীতি নেয়া হয় সে বিষয়ে আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো চুপ মেরে আছে শুধু তাই নয় অধিকন্তু এটাকে অনুমোদনও করছে।
এই হলো এক ভ্রান্তিকর ভণ্ডামি – তারা আমাদের স্বৈরশাসকদের বন্ধু বানিয়ে সমর্থন করছে, আমাদের মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের আন্দোলন দমনে নিষ্পেষণকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে আবার সেই মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের শ্লোগান দিয়ে অন্য দেশে তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের এ কাজ মধ্যপ্রাচ্য এবং এর বাইরের লোকজন বেশ বেদনার সাথে প্রত্যক্ষ করে। 
স্পষ্টতই, ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আদর্শ অবস্থান থেকে অনেক দূরে এবং সরকার এখনও ইরানের সমাজে অনেক রাজনৈতিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতা আরোপ করে রেখেছে।
রাজপথের অনুভুতি
তবুও সেখানকার পরিস্থিতি এমন একটি অঞ্চলের চেয়ে অনেক ভালো যেখানকার অধিকাংশ রাষ্ট্রে শাসকরা সংবিধান, সংসদ বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান (যেমন মিশর, সিরিয়া, পূর্ব লিবিয়া, সুদান এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে) বা রাজতন্ত্র দিয়ে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা কায়েম করে রেখেছে। এসব দেশের শাসকরা পরম ক্ষমতা ও সম্পদ উপভোগ করে, তাদের লোকদের ভাগ্য ক্রুশ থেকে কবর পর্যন্ত ঐশ্বরিক কর্তৃত্ব বা “শাসন করার প্রাকৃতিক অধিকার” এর নামে পিতার কাছ থেকে পুত্র পর্যন্ত চলে যায়।
আর এটিও সত্য যে ইরানের ব্যবস্থার প্রতি আমাদের রিজার্ভেশন যাই থাক না কেন, এটা এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের আরব সহযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি গণতান্ত্রিক।
এমন একটি অঞ্চলে আধা-গণতন্ত্রের একটি ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার পরিবর্তে অত্যাচার ও নিপীড়নের রাজ কায়েম করে রাখা নৃশংস একনায়কত্বের প্রতি মনোযোগী হওয়া ওয়াশিংটনের জন্য বেশি ভাল হবে।
এর মানে হল, এসব দেশে নির্বিচারে আটক এবং নির্যাতনের ঘটনাগুলি আটকায় এবং মুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে এমন এক বিশ্ব মানকে সম্মান করার মতো শাসনতন্ত্র প্রবর্তন করা। প্রথমে অন্তত পৌর কাউন্সিলের স্তরে হলেও এটি করা যায়। আমরা নির্বাচিত সংসদ বা সরকার সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করার আগে এমন একটি অন্তর্বর্তী সরকারের কল্পনা করতে পারি যারা শাসকদের কোন সমালোচনাকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করার মতো লৌহ মুষ্ঠি থেকে জনগণকে মুক্তি দেবে।
গণতন্ত্র ও ধর্মশাসন
ইরানের বিক্ষোভের এই সর্বশেষ তরঙ্গ সম্ভবত দ্রুত বা কিছু সময়ের মধ্যে সমাধান করা হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে ইরানি রাস্তায় যে মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে তার প্রতি আরো মনোযোগ দিতে হবে। একটি রাজনৈতিক বৈধতা ও জনপ্রিয় উত্থান থেকে এটি উদ্ভূত হওয়ায় ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে আরো রাজনৈতিক উন্মুক্ততা এবং গণ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার উপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করতে হবে। 
সংস্কারপন্থী মোহাম্মদ খাতামির মেয়াদ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক কঠোর অবরোধ এবং ইরাক থেকে সিরিয়ায় [ইয়েমেন, লেবানন ও অন্যান্য জায়গায়] ইরানের হস্তক্ষেপের ব্যাপক চাপের পরও বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্মুক্ততার পক্ষে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
১৯৭৯ সালে শাহের শাসনকে উৎখাত করে যে ইসলামী বিপ্লব হয় তার পর গণতন্ত্র ও ধর্মশাসন উভয়কেই সমন্বয় করে ইরানে একটি সরকার প্রতিষ্ঠা হয়।
খুব শীঘ্রই অথবা কিছু সময় পরে ইরানের সরকার আরো উদার ইসলামিক পদ্ধতির আওতায় বৃহত্তর স্বচ্ছতা অনুমোদন করতে বাধ্য হবে। সম্ভবত বর্তমান প্রতিবাদ দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে সেই দিকে।
আমেরিকানরা যদি তাদের স্বাধীনতার আহ্বানের ব্যাপারে আন্তরিক হয় তবে তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরী কাজ হবে এই অঞ্চলে রক্তঝরানো জেনারেল শাসক থেকে কর্তৃত্ববাদী রাজা ও আমীর মিত্রদের উপর ন্যূনতম মাত্রার হলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রয়োগ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা।
[সুমাইয়া ঘানুশি তিউনিশিয়ার বংশোদ্ভুত একজন ব্রিটিশ লেখক এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ। ব্যক্তিগতভাকে তিনি তিউনিশিয়ার আন নাহদা দলের নেতা ড. রশিদ ঘানুশির মেয়ে।]
https://obolokon.com/…/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8…/

Image may contain: 4 people

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!