মাদরাসা শিক্ষায় সাফল্য

 

প্রান্তিকে পড়ে নেই এখন আর মাদরাসা শিক্ষা। আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির যুগে পিছিয়েও নেই এই শিক্ষা। শুধু গ্রামীণ ও গরীব ঘরের ছেলেমেয়েরা নয়; বিত্তশালী পরিবারের ছেলেমেয়েরাও মাদরাসায় পড়ে ডিগ্রি নিচ্ছে। দেশের সাধারণ শিক্ষার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই এগিয়েও চলছে মাদরাসাগুলো। অর্নাস চালু, যুগোপযোগী পাঠ্যবই, আইসিটি শিক্ষা, ল্যাবরেটরি, আধুনিক শিক্ষা সবকিছুই এখন মাদরাসায় হচ্ছে। মাদরাসার ছাত্ররা বিসিএস পরীক্ষাসহ সরকারি চাকরিতে পরীক্ষা দিয়ে সাফল্য দেখাচ্ছে। শুধু কি তাই! মাদরাসা পড়–য়া ছাত্রছাত্রীর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অভাবনীয় মেধার পরিচয় দিচ্ছে। গত কয়েক বছরে মাদরাসা শিক্ষার অগ্রগতি পাল্টে দিয়েছে দেশের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার চালচিত্র।

গত প্রায় ১০ বছরে বর্তমান সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগের কারণে মাদরাসা শিক্ষা ক্ষেত্রে অভাবনীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সরকার স্বতন্ত্র ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে, আলাদা মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেছে, স্কুল-কলেজের প্রধানদের সাথে মাদরাসার সুপার/অধ্যক্ষদের বেতন বৈষম্য দূর করেছে, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সমান সুযোগ করে দিয়েছে, ৫২টি মাদরাসায় বিষয় ভিত্তিক অনার্স খুলেছে, ৩৫টি মাদরাসাকে মডেল মাদরাসায় রূপান্তর করেছে, মাদরাসা শিক্ষাধারার সিলেবাসকে আরো উন্নত ও আধুনিক করা হয়েছে। এসব দেশের মাদরাসা শিক্ষার চিত্রই পাল্টে দিয়েছে। মাদরাসা শিক্ষার উত্তরোত্তর সাফল্যই শুধু নয়; ক্লাসে নৈতিকতা ও মানবিকতাবোধের শিক্ষার প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয়ায় এখান থেকে শিক্ষিতরা অন্যদের মতো অনৈতিকতা জড়াচ্ছে না; মাদকের দিকে ঝুটছে না। যা দেশের নীতি নির্ধারকদের দারুণ ভাবে নজর কেড়েছে। আর এসবের নেতৃত্ব দিয়েছে মাদরাসা শিক্ষকদের একক ও একমাত্র অরাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন। সংগঠনটির সভাপতি এ এম এম বাহাউদ্দীন ও মহাসচিব অধ্যক্ষ শাব্বীর আহমদ মোমতাজীর নেতৃত্বে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ থেকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই মাদরাসা শিক্ষকরা কোন রকম আন্দোলন ছাড়াই এসব দাবি আদায় করে নিয়েছেন বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জমিয়াতের সভাপতি ও মহাসচিবের সুদক্ষ নেতৃত্বেই এটি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন মাদরাসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসচিব অধ্যক্ষ শাব্বীর আহমদ মোমতাজী বলেন, বর্তমান সরকার আন্তরিকতার সাথে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ মাদরাসা শিক্ষায় অবদান রেখেছেন। এজন্য জমিয়াতুল মোদার্রেছীনসহ মাদরাসা শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ এবং ঋণী। আমরা প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করেছি। তিনি আরও বলেন, অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক দাবি আদায় করার জন্য আন্দোলনের প্রয়োজন হলেও মাদরাসা শিক্ষকদের কোন দাবির জন্য আন্দোলন করতে হয়নি। জমিয়াত সভাপতি আলহাজ্ব এ এম এম বাহাউদ্দীনের নেতৃত্বে আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মাদরাসা শিক্ষা ও শিক্ষকদের দাবি জানিয়েছি এবং সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সেইসব দাবি বিবেচনায় নিয়ে পূরণ করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, মাদরাসা শিক্ষায় এখনো যেসব সমস্যা আছে অতীতের মতো আগামী দিনেও সরকার আলোচনার মাধ্যমেই তা সমাধান করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ইসলামী শিক্ষিতরা শুধু আলেম নয় সকল ক্ষেত্রে দক্ষ হবে। এখন লাখে লাখে আলেম তৈরি হচ্ছে। একজন ভালো আলেম যদি ভাল অফিসার হয় তাহলে তিনি দুর্নীতি করবেন না। এই পথ এতো দিন ছিল না। আমরা আধুনিক শিক্ষা সম্পৃক্ত করার ফলে এই সুযোগ তৈরি হয়েছে। মাদরাসায় এখন কম্পিউটার শিক্ষা, দাখিল-আলিম স্তরে বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটা পড়ে তারা মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের বৃত্তি বাড়ানো হচ্ছে।

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: শত বছর ধরে এ দেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ এবং ইসলাম প্রিয় মানুষ ইসলামী শিক্ষার উন্নয়নের জন্য ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা দাবি জানিয়ে আসছিলেন। মাদরাসা শিক্ষকদের সর্ববৃহৎ সংগঠন জমিয়াতুল মোদার্রেছীন বহু বছর যাবত মাদরাসা শিক্ষার জন্য পৃথক একটি এ্যাফিলিয়েটিং ক্ষমতাসম্পন্ন ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছিলো। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মাদরাসা শিক্ষা আধুনিকায়নের ঘোষণা দেয়। শিক্ষানীতিতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে দ্রæত এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি আলহাজ্ব এ এম এম বাহাউদ্দীনের নেতৃত্বে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেন। গত ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের নেতৃবৃন্দ এক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের নেতৃবৃন্দসহ উপস্থিত আলেম-ওলামাদের সাথে আলোচনার পর এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ি ২০১৩ সালের ৬ আগস্ট ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১২ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রী সভায় অনুমোদনের পর একই বছর ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ বিল-২০১৩। বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। কোন ধরণের বিরোধিতা ছাড়াই বিলটি অনুমোদন করেন জাতীয় সংসদের সদস্যগণ। অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ করা হয়। আর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয় একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর। এর ফলে বদলে যায় মাদরাসা শিক্ষার ধারা। এখন ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাদরাসা শিক্ষাধারার ফাজিল/স্নাতক ও কামিল/স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ডিগ্রী প্রদান করা হয়। মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন, ফাজিল/¯œাতক, কামিল/¯œাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাক্রম/পাঠ্যপুস্তক অনুমোদন, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষাঙ্গনগুলোর তদারকি ও পরিবীক্ষণ এবং পরীক্ষা পরিচালনাসহ সার্বিক তত্ত¡াবধান করবে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে ৯২ ভাগ মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশের মাদরাসা ও ইসলামী শিক্ষার উন্নয়ন-গবেষণায় সৃষ্টি হয় ঐতিহাসিক মাইলফলক। অবসান হয় এদেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও ইসলাম প্রিয় মানুষের বহু বছরের অপেক্ষা-প্রতীক্ষা।

মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর: ১৯৮০ সাল থেকে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার দাবি করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি এ এম এম বাহাউদ্দীনের নেতৃত্বে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদসহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে দাবির যৌক্তিকতা এবং আলেম-ওলামাদের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। এর ফলে সরকার মাদরাসা শিক্ষার জন্য পৃথক একটি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করে। ইতোমধ্যে এই অধিদপ্তরের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ২০১৫ সালের ৫ জুলাই অধিদপ্তেেরর যাত্রা শুরু হওয়ার পর জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। অধিদপ্তরের জন্য আড়াই কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নের জন্য ১২টি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বর্তমান সরকার এ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করে মাদরাসা শিক্ষাকে তার গৌরব ও মর্যাদা নিয়ে অগ্রসর হওয়ার পথে একধাপ এগিয়ে দিয়েছে।

যুগোপযোগী পাঠ্যবই : মাদরাসা শিক্ষার জন্য সুনির্ধারিত, সুবিন্যস্ত ও যুগোপযোগী কারিকুলাম ছিল না। বর্তমান সরকার যুগ চাহিদার আলোকে তৈরি কারিকুলাম অনুযায়ী পাঠ্যবই প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বীর আহমদ মোমতাজী ও জমিয়ত নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ইসলামী ও আরবি বিষয়সমূহের পাÐুলিপি তৈরি করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সরাসরি তত্ত¡াবধানে প্রকাশ ও বিতরণের ব্যবস্থা করেছে।

নতুন নতুন ভবন নির্মাণ : মাদরাসা শিক্ষা ছিল সব সময় অবহেলিত। পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে হাজার হাজার মাদরাসা গড়ে উঠেছে। অবকাঠামোর অভাবে পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। অতীত সরকারসমূহ বিদেশি অর্থে ছোটখাটো প্রজেক্ট নিয়ে কিছু কিছু কাজ করেছে কিন্তু সরকারি অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণ হয়নি। বর্তমান সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এক হাজার মাদরাসা ভবন নির্মাণ করেছে। বর্তমানে আরও দেড় হাজার প্রক্রিয়াধীন, যা মাদরাসা শিক্ষার পরিবেশ গঠনে বিরাট ভূমিকা পালন করছে।

বৃত্তি প্রদান : স্কুলের ৫ম ও ৮ম শ্রেণীতে বৃত্তি পেলেও মাদরাসা তা থেকে বঞ্চিত ছিল। বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের দাবির মুখে প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীসহ শিক্ষা পরিবারের আন্তরিকতায় সরকার সাধারণ শিক্ষার ন্যায় ইবতেদায়ী ৫ম ও দাখিল ৮ম শ্রেণীতে সরকারি বৃত্তি চালু করেছে। মাদরাসা শিক্ষার ইতিহাসে এটি একটি সাড়া জাগানো পদক্ষেপ। এর ফলে মেধার বিকাশ সাধনের সুযোগ পেয়ে অধিকহারে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার প্রতি মনোযোগী হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানিয়েছেন, এখন ইবতেদায়ীতে সাড়ে ৭ হাজার শিক্ষার্থীকে মেধা বৃত্তি এবং ১৫ হাজার সাধারণ বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। যারা মেধাবী তারা এই বৃত্তি সমানভাবে পাচ্ছে। আগামী বাজেটে ইবতেদায়ী থেকে ফাজিল পর্যন্ত বৃত্তির জন্য ৩৩ কোটি ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা পাস হলে আরও বেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিতে পারবো।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান : দেশে সাধারণ শিক্ষার জন্য শতাধিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ইনস্টিটিউট থাকলেও মাদরাসার জন্য বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বিএমটিটিআই) নামে একটি মাত্র শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট রয়েছে। এ কারণে মাদরাসা শিক্ষকগণ প্রশাসনিক ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত ছিল। বর্তমান সরকার প্রতিটি জেলায় জেলা শিক্ষা অফিসারের নেতৃত্বে ও প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রশাসনিক ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে, যা শিক্ষার মান উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।

বিএমএড কোর্স চালু করা : সাধারণ শিক্ষায় বিএড, এমএড কোর্স চালু থাকলেও যুগ যুগ ধরে মাদরাসা শিক্ষা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। বর্তমান সরকার মাদরাসা শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিএমটিটিআইতে বিএমএড কোর্স চালু করেছে।

৫২টি মাদরাসায় অনার্স চালু: বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি পদক্ষেপ মাদরাসা শিক্ষায় ফাজিল ¯œাতক পর্যায়ে অনার্স কোর্স চালু করা। মাদরাসা শিক্ষায় অনার্স কোর্স চালু হবে এ কথা কেউ ভাবতেই পারেনি। শিক্ষামন্ত্রীর আন্তরিকতায় ৫২টি মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালু হয়েছে।

৩৫টি মডেল মাদরাসা: মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার অবকাঠামোর উন্নয়নে সাইন্সল্যাব, কম্পিউটারল্যাবসমৃদ্ধ ৩৫টি মাদরাসাকে মডেল মাদরাসায় রূপান্তরিত করেছে, যা মাদরাসা শিক্ষাকে একধাপ এগিয়ে নিয়েছে।

শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসন: মাদরাসার অধ্যক্ষ, সুপার ও শিক্ষকগণের বেতন স্কেল অতীত সরকার সমূহের আমলে ধাপে ধাপে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার সাধারণ শিক্ষার অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষকদের চেয়ে মাদরাসা শিক্ষার অধ্যক্ষ-সুপারগণের স্কেল একধাপ এগিয়ে দিয়ে সমান স্কেলে স্থাপন করে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে মাদরাসার অধ্যক্ষ, সুপারগণ তাদের ন্যায় মর্যাদার অধিকারী হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে সামাজিকভাবে সম্মান পেয়েছেন। অর্থনৈতিকভাবেও হয়েছে সমৃদ্ধ। এছাড়া সরকার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কোনোরূপ আন্দোলন ছাড়াই ৮ম জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করেন।

আইসিটি শিক্ষা: সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদরাসা শিক্ষাকে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধনে সরকার যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করার জন্য মাদরাসায় ল্যাপটপ, কম্পিউটার, প্রজেক্টরসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বর্তমানে ফলাফল গ্রহণ, পরীক্ষা সংক্রান্ত সব কাগজপত্র অনলাইনে গ্রহণ করার সুযোগ হয়েছে। মাদরাসাসমূহে ওয়েবসাইট খোলা হয়েছে। প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম চলছে। সাধারণ শিক্ষার মতো তথ্য-প্রযুক্তিকে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মাদরাসা শিক্ষা পিছিয়ে নেই।

মাদরাসা শিক্ষা সমমানে উন্নীত: জাতীয় শিক্ষানীতি বর্তমান সরকারের এক অনন্য অবদান। শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষানীতি হওয়াই ছিল যুক্তিযুক্ত। তারপরও সব ধর্ম, শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে রচিত এ শিক্ষানীতি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এবং মাদরাসা শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ। যাতে মাদরাসা শিক্ষার স্বকীয়তা, প্রয়োজনীয়তা ও সমমর্যাদা স্বীকৃতি পেয়েছে। এ শিক্ষানীতিতে মাদরাসা বোর্ড সম্প্রসারণ, মাদরাসার ফাজিল, অনার্স ও কামিল স্তর পরিচালনার জন্য একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি স্থান পেয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়াও দুই শতাধিক মাদরাসাকে এমপিওভুক্ত করা, দাখিল ও আলিম পর্যায়ে সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদ সৃষ্টি, মাদরাসা শিক্ষার কারিকুলাম প্রণয়ন, পাঠ্যবই পরিমার্জন এবং পরিকল্পিত উপায়ে শ্রেণিতে পাঠদান নিশ্চিত করার জন্য সকল মাদরাসার জন্য অভিন্ন কাঠামোতে পাঠ-পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। ৯ হাজার ৪০০ টি মাদরাসার ওয়েব পোর্টাল চালু করা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে ৪০০ জন শিক্ষক ও ৮০০ জন অধ্যক্ষ/সুপারকে ট্রেইনার হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

এই সরকারের সময়ে মাদরাসা শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা তুরে ধরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর শিক্ষানীতি প্রণয়ন হয়েছে। এখানে মাদরাসা শিক্ষাকে আলাদা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি হবে ধর্মীয় শিক্ষা। আমরা ক্ষমতা গ্রহণের সময় শিক্ষকদের চাকরি ও বেতনে বৈষম্য ছিল। দাখিল-আলিম পর্যায়ের শিক্ষকরা এসএসসি-এইচএসসি পর্যায়ের শিক্ষকদের সমান বেতন-মর্যাদা পেতেন না। আমরা সেটা সমান করেছি। বেতন-মর্যাদা সমান দিয়েছি। সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউশন করা হয়েছে। অধিদপ্তরের দাবি ছিল অনেক দিন ধরেই। জমিয়াতুল মোদার্রেছীনসহ মাদরাসা শিক্ষকদের দাবির প্রেক্ষিতে আলাদা মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর করা হয়েছে। মাদরাসা উন্নত করার জন্য ৩৫টি মাদরাসাকে মডেল মাদরাসা করেছি। ভবন-আইসিটি শিক্ষা, ল্যাবরেটরি, আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। ৫১টি মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার ইতোমধ্যে এক হাজার তিনশর বেশি মাদরাসার ভবন নির্মাণ করেছে। আরও ৯০টির মাদরাসার কার্যক্রম চলছে। দুই হাজার মাদরাসা ভবনের জন্য প্রকল্প একনেকে উপস্থাপন করেছি। পাস হলে এগুলোর কাজও চালু হবে। এছাড়া শত বছরের বেশি সময় ধরে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি ছিল। শেখ হাসিনার কাছে এই দাবি জানানোর পর তিনি ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। কামিল-ফাজিল মাদরাসা এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মানের জন্য ৩০ একর জমি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ৪১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বাজেট অনুমোদনের জন্য পেস করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১৩ কোটি টাকা ইতোমধ্যে সরকার দিয়ে দিয়েছে। এই অর্থে একটি বিশ্বমানের ক্যাম্পাস নির্মান করা হবে। এটা হয়ে গেলে সেখানে ইসলামী শিক্ষা আরও ত্বরান্বিত হবে।

উৎসঃ   ইনকিলাব

 

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!