মাতৃভাষা দিবস:আমাদের মাতৃভাষা:ড. এম এ সবুর

মাতৃভাষা দিবস:আমাদের মাতৃভাষা:ড. এম এ সবুর

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,বুধবার, 

ভাষা বহতা নদীর মতো চঞ্চল। স্থিরতা এর স্বভাববিরুদ্ধ। পরিবর্তন-পরিবর্ধন ভাষার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে যুগে যুগে নতুন কত ভাষার জন্ম হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই, আবার কালের আবর্তে কত ভাষা হারিয়ে গেছে তারও কোনো হদিস নেই। এ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে সব ভাষাই সমান নয়। কোনো ভাষায় বেশি লোকে কথা বলে, আবার কোনো ভাষায় কথা বলে কম লোক। কোনো ভাষা আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছে, আবার কোনো ভাষা আঞ্চলিকতার পর্যায়েই রয়েছে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষা। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যের প্রশাসনিক ভাষা বাংলা। ভারতের বিহার, আসাম ও মনিপুর রাজ্যের অনেক লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। বর্তমানে একাধিক দেশের প্রায় ৩০ কোটি মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। এ ছাড়া মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ানো হয়ে থাকে। 

বাংলা ভাষা কবে থেকে শুরু হয়েছে তার নির্ধারিত সন-তারিখ নেই। ভাষা উৎপত্তির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো দিন-তারিখ থাকেও না। দিনক্ষণ ঠিক করে কোনো ভাষার জন্মও হয় না। কোনো লোকগোষ্ঠীর দীর্ঘকালব্যাপী বোধগম্য শব্দ গ্রহণ, বর্জন ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে ভাষার জন্ম হয়। হঠাৎ করেই যেমন কোনো ভাষার উদ্ভব হয়নি, বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। ভাষা গবেষকদের মতে, এ অঞ্চলের স্থানীয় ভাষার সাথে বহিরাগত আর্যদের ভাষার সংমিশ্রণে প্রাকৃত-অপভ্রংশ রূপ ধারণ করে দীর্ঘ দিন ধরে অনেক পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মাধ্যমে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে। ‘চর্যাপদ’কে বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন বলা হয়ে থাকে। তবে চর্যাপদের ভাষার সাথে বাংলা ভাষার হুবহু মিল পাওয়া যায় না। চর্যাপদের ভাষা অস্পষ্ট। এ জন্য সাহিত্যিকেরা এর নাম দিয়েছেন ‘আলো-আঁধারি’ বা ‘সান্ধ্যভাষা’। চর্যাপদকে ‘মৈথিলী’, ‘হিন্দি’, ‘উড়িয়া’ ও ‘অহমি’ ভাষার আদি ভাষা হিসেবেও দাবি করা হয়। ‘হিন্দি’ ও ‘মৈথিলী’দের দাবি ধোপে না টিকলেও ‘উড়িয়া’ ও ‘অহমি’দের দাবি একেবারে অযৌক্তিক নয়। কারণ, চর্যাপদের সাথে উড়িয়া ও অহমি ভাষার অনেক মিল আছে। যেমন মিল আছে বাংলা ভাষার সাথে। এ জন্য ভাষা গবেষকদের মতে, বর্তমানে ভিন্নতার আগে বাংলা, উড়িয়া ও অহমি ভাষার অভিন্ন রূপ থাকতে পারে। হতে পারে সে অভিন্ন রূপেই চর্যাপদ রচিত হয়েছে। তবে চর্যাপদের সময়কাল নিয়ে ভাষা গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, সুখময় মুখোপাধ্যায় প্রমুখের মতে, চর্যাপদ রচিত হয়েছে খ্রিষ্টীয় নবম শতক থেকে দ্বাদশ শতকে। অন্য দিকে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে অষ্টম শতকে চর্যাপদ রচিত হয়েছে। তবে সবাই ঐকমত্য হয়েছেন পাল শাসনামলের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ সব ভাষা গবেষকের মতে, পাল আমলেই চর্যাপদগুলো রচিত হয়েছে। এসব চর্যাপদে তৎকালীন বৌদ্ধ ধর্মের বিধিবিধান, সাধারণ মানুষের সুখ-দঃখ, জীবন-জীবিকা, সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে। চর্যাপদের ব্যাকরণ, ছন্দ-অলঙ্কারের কিছু কিছু ব্যতিক্রম দৃষ্টিগোচর হলেও সেগুলোতে বাংলার আদিরূপই বিধৃত হয়েছে। বেশির ভাগ চর্যাপদ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশে রচিত এবং এগুলো বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদ। তাই বলা যায়, চর্যাপদই বাংলা ভাষার শৈশবকাল। কিন্তু চর্যাপদের ভাষা স্থায়িত্ব লাভের আগেই ভারতের দক্ষিণ কর্নাটক থেকে আগত সংস্কৃতভাষী সেন শাসকেরা বাংলা ভাষার চর্চা নিষিদ্ধ করেন। আর সংস্কৃত ভাষাকে করেন রাজভাষা। অধিকন্তু ‘রৈরব’ নামক নরকের ভয় দেখিয়ে বাংলা ভাষাকে সাধারণ মানুষ থেকে দূরে রাখার কৌশল করেন তারা। এ ভয়ে সরকারি কর্মচারী ও উঁচু বর্ণের মানুষেরা বাংলা ভাষা চর্চা বাদ দিলেও সাধারণ মানুষেরা তাতে কর্ণপাত করেননি। তারা ‘পক্ষির বুলি’ তথা বাংলা ভাষাকে ছাড়েননি এবং বিদেশী ভাষা সংস্কৃতকে মন থেকে গ্রহণ করেননি। 
১২০৩ সালে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে সেন শাসনের অবসান হলে এদেশীয়রা আবার নতুন করে বাংলা ভাষা চর্চা করার সুযোগ পান। তুর্কিরা বিদেশী হলেও তারা স্থানীয় বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করেননি। ফার্সিকে তারা রাজভাষা করলেও বাংলা ভাষা নিষিদ্ধ করেননি। অধিকন্তু বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চায় উৎসাহ দিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ-অস্থিরতা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের কারণে এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কোনো সাহিত্য পাওয়া যায় না। তখন বাংলাদেশ কিংবা বাংলা ভাষাভিত্তিক কোনো অঞ্চলও ছিল না। সুলতানি শাসনামলের প্রথম দিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত ছিল বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী। হাজী শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ সালে বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, পুন্ড্রবর্ধন, লক্ষ্মণাবতী, হরিকেল, সমতট ইত্যাদি বাংলাভাষী অঞ্চলকে একত্রিত করে ‘সুবহি বাঙ্গালা’ নাম দেন। আর এর অধিবাসীদের নাম দেন ‘বাঙালি’। এতে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায় এবং বাংলা ভাষার পুনর্জন্ম হয়। এ সময় বড়– চণ্ডিদাস ‘শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন’ (১৩৫০) কাব্য রচনা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বন্ধ্যত্ব ঘুচান। আর শাহ মুহাম্মদ সগীর ‘ইউসুফ জুলেখা’ (১৩৮৯-১৪১০) রচনা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে রোমান্টিকতার আবির্ভাব ঘটান। এ ছাড়া গিয়াসউদ্দীন আযম শাহ, জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ, রুকনুদ্দীন বারবাক শাহ, আলাউদ্দীন হুসেন শাহ প্রমুখ শাসকের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু, জৈনুদ্দীন, বিজয়গুপ্ত, কৃত্তিবাস, মুজাম্মিল, বিপ্রদাস পিপিলাই প্রমুখ কবি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। এরপর মোগল শাসনামলে সৈয়দ সুলতান, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, আব্দুল হাকিম, দৌলত উজীর বহারাম খান, কোরেশী মাগন ঠাকুর, সৈয়দ আলাওল, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর প্রমুখের সাহিত্য সাধনায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি লক্ষ করা যায়। কিন্তু ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার শাসকের পরিবর্তনের সাথে ভাষা-সংস্কৃতিরও পরিবর্তন হয়। এতে বাংলা ভাষার পুনর্জাগরণ স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং নি¤œমানের মিশ্র ভাষার ‘পুঁথি সাহিত্য’ ও ‘কবিয়াল গান’-এর আবির্ভাব ঘটে। এ সময় ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজিকে রাজভাষা করা হয়। উল্লেখ্য, মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষায় আরবি, ফার্সি, উর্দু, পর্তুগিজ, হিন্দিসহ অনেক বিদেশী শব্দের সমাবেশ ঘটে। আর ইংরেজ শাসনামলে বাংলা ভাষায় ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশসহ বিভিন্ন ভাষার অনেক শব্দ যোগ হয়। এতে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার, সৌন্দর্র্য ও বৈচিত্র্য বেড়ে যায়। ইংরেজ শাসনামলের প্রথম দিকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাঘাত ঘটলেও পরে উন্নতি সাধিত হয়। ইংরেজ শাসনামলেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে শুধু কাব্য সাহিত্য পাওয়া যায়, এ সময় বাংলা ভাষায় কোনো গদ্য সাহিত্য রচিত হয়নি। অন্য দিকে ইংরেজ শাসনামলে বাংলা ভাষায় গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি গদ্য সাহিত্যের সূচনা হয়। এ সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মীর মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, জীবনান্দ দাশ, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদ প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। ১৯১৩ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে নোবেল বিজয় বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্যের মর্যাদা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে মুসলিম ও ইংরেজ শাসনামলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ও ব্যাপ্তি বাড়লেও কখনো রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়নি। অথচ ভাষা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না পেলে জাতীয় ভাষার উন্নতি ও মর্যাদা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসন অবসানের পর বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) অধিবাসীরা বাংলা ভাষা নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখেন। তারা বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন। কিন্তু উর্দুভাষী শাসকেরা বাঙালিদের দাবি উপেক্ষা করে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এতে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হন এ দেশের ছাত্র, রাজনীতিবিদসহ সর্বস্তরের জনতা। জেল-জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়ন উপেক্ষা করে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করেন তারা। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ বাংলা) তারিখে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, সালাউদ্দীন, শফিউদ্দীনসহ অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৫৬ সালে তৎকালীন সরকার পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রথম বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। আর ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে আমাদের ‘শহীদ মিনার’ নির্মিত হয়েছে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ দিবস’ পালন করা হয়। আর বিশ্ব্যব্যাপী দিবসটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপন করা হয়।
বাংলা ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর মাধ্যমে জাতিসঙ্ঘ ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করেছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় দুই শতাধিক রাষ্ট্র এ দিবসটি পালন করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে অনেক বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে বিশ্বদরবারে আমাদের মাতৃভাষার অবস্থান সুসংহত হয়েছে। আর এ ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জনের জন্য আত্মত্যাগ করে বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান ভাষাশহীদগণ বিশ্ববরণীয় হয়েছেন।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!