মাছের পচন মাথা থেকে, দেশের পতন নেতা থেকে

শিবলী সোহাইল
ইংরেজিতে একটি প্রাচীন প্রবাদ আছে, “A Fish Rots from the Head Down” – অর্থাৎ, একটি মাছের পচন শুরু হয় তার মাথা থেকে। অনেকেই বলে এটি চিনের প্রবাদ, কেউ বলে রাশিয়ার আবার কেউ বলে গ্রিক প্রবাদ। আক্ষরিক অর্থে নয় বরং এই প্রবাদটি দিয়ে বোঝানো হয় কোন দেশের পচনের জন্য তার মাথা বা নেতৃত্বই মূল কারণ। একটি প্রতিষ্ঠান, সমাজ বা রাষ্ট্রের সমস্যা শুরু হয় মূলত শীর্ষ থেকে। দেশের শীর্ষ নেতাদের চরিত্রে যখন পচন ধরে সে পচন ছড়িয়ে পড়ে সমাজের আনাচে-কানাচে। বাংলা ভাষায় এরকম হুবহু প্রবাদ না থাকলেও সম্ভবত ‘গোড়ায় গলদ’ প্রবাদটি বেশ কাছাকাছি অর্থ বহন করে। তবে গোড়ায় গলদ আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হয়। শুধুমাত্র রাষ্ট্র, সমাজ বা প্রতিষ্ঠানের গোড়ায় গলদ না যে কোন কাজের গোড়ায়ও গলদ থাকতে পারে। তবে ইংরেজি প্রবাদ মাছের পচন মাথা থেকে বলতে কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের মাথাকেই বোঝানো হয়। খুব সহজ ভাবে বলা যেতে পারে একটা সমাজের পচন শুরু হয় সে সমাজের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ থেকেই।
ইংরেজিতে আরেকটি কথা প্রচলিত আছে যা মূলত উপরের প্রবাদকেই সমর্থন করে। এটি সম্ভবত খুব একটা প্রাচীন নয়। দু’হাজার এক সালের দিকে শীর্ষ নেতৃত্বের দুর্নীতির কারণে এনরন, টাইকো এবং ওয়ার্ল্ড কমের মত বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠান ধ্বসে পড়ার পর থেকে এই কথাটি বেশী শোনা যাচ্ছে। সেটি হল, Tone at the top – এই কথাটির বাংলা হতে পারে ‘শীর্ষের সুর’। অর্থাৎ, একটি প্রতিষ্ঠানে যিনি শীর্ষে আছেন তিনি যে সুর ধরিয়ে দেন প্রতিষ্ঠানের সবাই সে সুরেই গায়। তিনি যে পথ দেখিয়ে দেন সে পথেই প্রতিষ্ঠানটি চলে। এবং তিনি যেই সংস্কৃতি তৈরি করেন সেটাই হয় সেই সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি। যারা বিভিন্ন বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত, বিশেষ করে হিসাবরক্ষণ বা অডিটিং-এর সাথে যুক্ত আছেন তারা এই কথার সাথে খুব ভালোভাবে পরিচিত। কারণ আজকাল কর্পোরেট গভর্নেন্সের জন্য যতগুলো কঠোর আইন করা হয়েছে তার সবগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই টোন এট দি টপ বা শীর্ষের সুর ঠিক করা। অর্থাৎ, কোনও সংস্থার প্রধানদেরকে তাদের তৈরি সংস্কৃতির জন্য দায়বদ্ধ করা এবং সঠিক নেতৃত্বের দ্বারা কর্মক্ষেত্রে নৈতিক পরিবেশ তৈরি করা।
দেশের মানুষের মূল্যবোধ এবং সমাজের নৈতিক পরিবেশ নির্ভর করে সেই দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের চরিত্রের উপর। নেতৃবৃন্দের আচার আচরণ দেশের প্রশাসন থেকে শুরু করে সবার উপর ট্রিকল-ডাউন (trickle-down) প্রভাব ফেলে। সর্বপ্রথম প্রভাবিত হয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থকরা। তারা খুব সহজেই বুঝে নেয় নেতারা কোন্ ধরণের কাজগুলোকে প্রশ্রয় দেয় আর কোন্ গুলোকে দেয় না। এই প্রভাব সমসময় উপর থেকে নিচে নামে, নিচ থেকে উপরে নয়। আর এভাবেই একটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি সুস্থ হতে পারে আবার অসুস্থও হতে পারে। সুস্থ সংস্কৃতি যেমন, শিক্ষা, উৎপাদন, শিল্প, সাহিত্য, উদ্ভাবন ইত্যাদি সবকিছুতেই ভালো করার প্রতিযোগিতা। আবার অসুস্থ সংস্কৃতি যেমন, প্রশ্ন ফাঁস, নকল, মূল্য বৃদ্ধি, ভেজাল, চুরি-ডাকাতি, বাটপারি, ধর্ষণ ইত্যাদি। নেতৃত্ব যদি স্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা না করে এবং সুরক্ষা না দেয় তবে অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতিগুলো সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নেয়।
ধরুন, আপনি এমন একটি সমাজে থাকেন যেখানে সরকার চোর, সন্ত্রাসী, খুনি অথবা ধর্ষকদেরকে ধরার চাইতে বিরোধী মত নিধনে ব্যস্ত। সেখানে আপনি চুরি, খুন অথবা ধর্ষণ করতে ভয় পাবেন না। তাছাড়া আপনি যদি ধরাও পড়েন, ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত থাকলেই আপনার আর কোন চিন্তা নেই। আপনার নেতা তখন আপনাকে শাস্তি দেবার পরিবর্তে আপনাকে যে ধরেছে সেই আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকেই শাস্তি দেবে। অতএব চুরি, খুন অথবা ধর্ষণে আপনি আরও উৎসাহিত হবেন। আর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও চিন্তা করবে অযথা আপনাকে ধরে ঝামেলায় পড়ার চাইতে, আপনার সহযোগী হলে আপনার দুষ্কর্মগুলো থেকে সে কিছু ফায়দা লুটতে পারবে।
বিপরীতে, আপনি যদি এমন একটি সমাজে বাস করেন যেখানে এধরনের ঘটনা বিরল, এবং আপনি যেই হন না কেন আপনার ধরা পড়ার এবং শাস্তির সম্ভাবনা যথেষ্ট, সেক্ষেত্রে আপনি এধরণের দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকবেন। একারণেই দেখা যায় চোর, বাটপার, খুনি, ধর্ষকরাও উন্নত দেশগুলোতে আসলে ভালো মানুষের মতই বসবাস করে।
একজন নেতা কিভাবে একটি দেশকে ধ্বংস করতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে জিম্বাবুয়ে এবং ভেনিজুয়েলা।
উনিশশো আশি সালে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের মধ্যদিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরা জিম্বাবুয়ের নেতৃত্বে আসে। তখন দেশটির নাম ছিল রোডেসিয়া। পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি হয়েছিল জাতীয়তাবাদী নেতা এবং মার্কসবাদী রবার্ট মুগাবে। যুদ্ধের আগে রোডেসিয়া আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ ছিল। রবার্ট মুগাবে বিস্তৃত অবকাঠামো, উন্নত কৃষিকাজ এবং বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ সহ একটি দেশ হাতে পায়। দেশটির অর্থনীতিকে তখন সমগ্র আফ্রিকার সবচেয়ে দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে ধরা হতো। সেসময় জিম্বাবুয়ে ভুট্টা, তুলা, গরুর মাংস, তামাক, আখ ইত্যাদি রফতানি করতো। দুঃখজনকভাবে এখন তারা রফতানি করে শরণার্থী। অপুষ্টি ও অনাহার এখন ওদেশে সাধারণ বিষয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই মুগাবের অপশাসনে দেশে এক ভয়াবহ দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এই দুর্বৃত্তায়ন ছড়িয়ে পড়ে রাজনীতি, প্রশাসন, সামরিক, বেসামরিক সকল পর্যায়ে। মুগাবের মিলিশিয়াদের নিয়মিত ধর্ষণের শিকার হয় সেখানকার নারীরা।
সত্তর দশকের গোড়ার দিকে যে দেশে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫৬ বছর তা ধীরে ধীরে নেমে আসে মাত্র ৩৫ বছরে। কিন্তু মুগাবে সেদিকে না তাকিয়ে তার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য জনগণের মধ্যে বিভক্তি আর বিদ্বেষের বিষ ঢেলে দেয়। সাঁইত্রিশ বছর অপশাসনে দেশকে এভাবে ধ্বংস করে দিয়ে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০১৭ সালে বিদায় নেয় এই নেতা।
এতো গেলো জিম্বাবুয়ের কথা, এবারে আমরা তাকাই ভেনিজুয়েলার দিকে যেখানে বিশাল তেলের মজুদ আছে। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে ধনী অর্থনীতিকে মাত্র দশ-বারো বছরের মধ্যে একজন সমাজতান্ত্রিক নেতা, হুগো শ্যাভেজ সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। এবং দুই হাজার তের সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতা নিয়ে সেই একই পথে হেঁটে চলছে। আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের ভাণ্ডার নিয়ে ভেনিজুয়েলার নব্বই ভাগ মানুষ আজ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করছে। চরম মুদ্রাস্ফীতি দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। বেকারত্বের হার ওখানে এখন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, খুন-রাহাজানির হার বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ এবং দুর্নীতিতে ভেনিজুয়েলা এখন বিশ্বের দশম স্থানে।
জিম্বাবুয়ের মুগাবের মতই ভেনিজুয়েলার শ্যাভেজও দেশের মানুষকে চরম মেরুকরণের মাধ্যমে বিভক্ত করে ক্ষমতায় টিকে ছিল। ব্যবসা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমনকি আদালত পর্যন্ত নিজের পছন্দের অথচ অযোগ্য লোকদের নিয়ে দখল করে নিয়েছিল। ফলাফল, এত বিশাল সম্পদ থাকার পরও দেশের মানুষের চরম ভোগান্তি । বর্তমানে নিকোলাস মাদুরোও মুগাবের মতই ভেনিজুয়েলায় ঘৃণার চাষ করছে। তার সমর্থকদের কাছে ভিন্নমতের মানুষেরা এখন চরম শত্রু। এইতো গতবছরই সে প্রায় এক হাজার মানুষকে হত্যা করে তা গায়েব করে ফেলার চেষ্টা করল। এর সাথে সাথে ধর্ষণ-গুম তো রয়েছেই।
এভাবে যখন একটি দেশের পচন শুরু হয় তখন দেশের মানুষের প্রয়োজন এদিকে ওদিকে না তাকিয়ে মূল কারণের দিকে আঙ্গুল তোলা। লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন, এসব নেতারা সবসময় চেষ্টা করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে জনগণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে। দেশ যখন সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ধর্ষণে ছেয়ে যায়, দেশের সংস্কৃতি যখন এভাবে ভেঙে যায়, সমাজের চারিদিকে যখন পচন ধরে যায় তখন নতুন নেতৃত্বই কেবল এই পতন থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারে।
আফ্রিকা, দক্ষিণ অ্যামেরিকার কথা তো শুনলাম, এবারে একটু পাশের বাড়ী নেপালের গল্প বলেই আজকের লিখা শেষ করি।
দুহাজার বারো সালে নেপালে পুলিশের হাতে সীতা রায় নামে একজন ধর্ষিতা হয়। সঠিক তদন্ত ও ধর্ষককে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের গড়িমসিতে ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে নেপালের তরুণ-তরুণীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে তারা Occupy Baluwatar নামে আন্দোলন গড়ে তোলে। এই আন্দোলন ছিল সরকারি দুর্নীতি, অবিচার এবং ধর্ষণের বিরুদ্ধে। আন্দোলনকারীরা একশ সাতদিন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করে। হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে, কারণ ওরা জানে যে-
“মাছের পচন মাথা থেকে,
দেশের পতন নেতা থেকে!”
(এসপ্তাহে আমারদেশে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়)

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!