মন্দের মোকাবেলা করার উত্তমপন্থা –চতুর্থ পর্ব : প্রভাষক বদরুল ইসলাম বিন হারুন

ধর্মিয় ও সাধারণ বিষয়ে সত্য ও ইনসাফের বৃত্তের মধ্যে থাকতে হবে।
এ বিষয়টি আলোচনার পূর্বে আমরা একটি ঐতিহাসিক বাক্য দিয়ে শুরু করতে পারি।মিশরের বিশিষ্ট খৃষ্ঠান পন্ডিত নাজমি লোক্বার কথা বলছি।তিনি বলেছিলেন-
ما اري شريعةادعي للانصاف ولا شريعة انفي للاجحاف والعصبية من شريعة تقول( وَلاَ يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلاَّ تَعْدِلُواْ اعْدِلُو)ْ

আমি এমন কোন ধর্ম পাইনি যে ধর্ম অধিক ন্যায় বিচার,ধর্মান্ধতা বিরোধী,যে ধর্মের বাণিটি-
এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না।(সুরা মায়েদা 😎

হ্যা,এটাই আপনার ধর্ম।প্রতিপক্ষের সাথে দরবার থাকত পারে।রকমারি বিষয়ে ফারাক থাকতে পারে।কিন্ত,এই পার্থক্য শুধু বিরোধপূর্ণ বিষয়েই সীমাবদ্ধ রাখা চাই।বিষয় ভিত্তিক আলোচনা সমালোচনা হতে পারে।এখানে ধর্ম,বর্ণ জাতপাত,দলীয় দৃষ্টিকোন যেন প্রান্তিকতার দিকে ধাবিত না করে।

ইনসাফের যত নির্দেশ রয়েছে মহাগ্রন্থ আলকোরানে সব কটি কোন নির্দিষ্ট জাতী ধর্মের ব্যাপারে নির্দেশিত নয়।যেমন পবিত্র কোরআনের সুরা নাহলের 90 তম আয়াতে এসেছে-

إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاء ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاء وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্নীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।
সুরা নিসার 58 তম আয়াতে এসেছে-

إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّواْ الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُواْ بِالْعَدْلِ إِنَّ اللّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায় ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদিগকে সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।
এবং আরো এসেছে সুরা সুরার 15 তম আয়াতে-
وَأُمِرْتُ لِأَعْدِلَ بَيْنَكُمُ
আমি তোমাদের মধ্যে ন্যায় বিচার করতে আদিষ্ট হয়েছি।
উপরোক্ত সব কটি আয়াতে ইনসাফের আদেশ শব্দটি যোগ করা হয়েছে।তার অর্থ হ্চ্ছে ন্যায় আচরণ করা কোন ঐচ্ছিক বিষয় না।এই বিষয়টি সম্পুর্ণ নির্দেশিত,নির্ধারিত।এর বাস্তবায়ন হয়েছে প্রিয় রাসূলের জীবন সংগ্রামের পরতে পরতে।রাসুল সঃ সাত প্রকার মানুষ যাদেরকে আল্লাহ আরশের নিচে জায়গা দিবেন বলে উল্লেখ করছেন,তাদের মধ্যে একজন আছেন যিনি দুনিয়াতে ন্যায় বিচারক ছিলেন।
বলা হয়েছে-
امام عادل
ন্যায়পরায়ণ শাসক।এই শাসকের কাজ শুধু নিজের জাতিগোস্টির প্রতি ন্যায় পরায়ণ নয়,সবার প্রতি ।সে যদিও তার বিরোধী দলের হয়।
সমান্যতম অবকাশ নেই যে,প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে ছলচাতুরি,বাকাপথ অবলম্বন করার।তা সম্পুর্ণ ধর্ম বিরোধী বলে বিবেচিত হবে।
ইসলামের শতসিদ্ধ নীতি হলো-
وانه لم ياثم امرء بحليفه،وان النصر للمظلوم
অন্যায় পরিত্যাজ্য।মজলুমের সাহায্য অপরিহার্য।এই মজলুম এহুদি,খৃষ্টান,হিন্দু,মুসলিম যে কেহ হতে পারে।ইনসাফ সবার সাথে হবে।হয়তো কখনো আপনার প্রতিপক্ষ হতে পারে।
[ ] এখানে নাজরান গোত্রের খৃষ্টানদের ব্যাপারে বলা হয়েছে-কেহ কারো কাছ থেকে অন্যায় ভাবে নিতে পারবে না।
لا يؤخذ رجل بظلم اخر
মুসলিম ও খৃষ্টানদের মধ্যে পরস্পরের বুঝাপড়া সঠিক ভাবে পরিচালনা করতে রাসুল সঃ এক ব্যাক্তিকে নির্ধারণ করেছেন।এই ব্যাক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে,ন্যায়পরায়ণ।যদি রাসুলের সব কজন সাহাবি ছিলেন ন্যায় পরায়ণ,তার পরও তিনি বললেন-আমি তোমাদের কাছে একজন পরিপূর্ণ ন্যায়পরায়ণ ব্যাক্তিকে পাঠাবো।
لابعثن معكم رجلا امينا حق امين(البخاري)و خذيفة بن اليمان.
[ ] খায়বার যুদ্ধজয়ের পর দুটি গোত্রের মধ্যে ফলের বাগান ভাগ করে দিতে এহুদ ও মুসলিমদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে পাঠিয়ে ছিলেন।
[ ] এহুদ,খৃষ্টান অধ্যুষিত এলাকা ইয়ামনে পাঠিয়েছিলেন মুসলমানদের সবচেয়ে ন্যায় নীতিমান ব্যাক্তি মুয়াজ ইবনে জাবালকে।
عن عبدالله بن عباس رضي الله عنهما قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لمعاذ بن جبل حين بعثه إلى اليمن: ((إنك ستأتي قومًا أهل كتاب، فإذا جئتَهم فادعهم إلى أن يشهدوا أن لا إله إلا الله وأن محمدًا رسول الله، فإن هم أطاعوا لك بذلك فأخبرهم أن الله قد فرض عليهم خمس صلوات في كل يوم وليلة، فإن هم أطاعوا لك بذلك فأخبرهم أن الله قد فرض عليهم صدقة تؤخذ من أغنيائهم فتُرَدُّ على فقرائهم، فإن هم أطاعوا لك بذلك فإياك وكرائمَ أموالهم، واتقِ دعوة المظلوم؛ فإنه ليس بينه وبين الله حجابٌ))؛ متفق عليه
এই ফরমান ছিলো তার সাথে।আর বলেছিলেন-যেনে রেখো,মজলূম ও আল্লাহর মধ্যখানে কোন পর্দা নেই।এখানে দেখা হয়নি কে কোন ধর্মের,কোন জাতিগোষ্টির।ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার প্রতি ছিলো একই নীতি।একই আদেশ।
অন্য হাদিসে এসেছে-
اتقوا دعوة المظلوم وان كان كافرا،فانه ليس دونها حجاب(احمد عن انس بن مالك )
[ ] অন্য হাদিসে এসেছে-
دعوة المظلوم مستجابة وان كان فاجرا؛ففجوره علي نفسه(احمد عن ابي هريرة)
এখানে ভাল,মন্দ দেখার বিষয় নয়।আশরাফ আতরাফ মুখ্য নয়।পাপিতাপি সবারই ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।প্রতিপক্ষ যেই হোক।ভাল ও ন্যায় সঙ্গত আচরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
[ ] এই হচ্ছে আপনার আমার ধর্ম যা নিয়ে আমরা আত্মসম্মান পেতে পারি এবং উনি হলেন আমাদের প্রিয় নবী সঃ যিনি সবসময় ছিলেন মজলুমের পক্ষে।অথচ আমরা প্রতিপক্ষের ব্যাপারে না জেনেই ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে থাকি।তা কাম্য নয়।এভাবে সঠিক কোন সিদ্ধান্তে পৌছা যায় না।

সপ্তম পদ্ধতি
—————–
চুড়ান্ত শিষ্টাচারের উপর অঠল থাকতে হবে।

যেসব করণে আমরা প্রতিপক্ষের মনের মনিকোটায় পৌছতে পারি তার সবকটি নীতি আমাদের মেনে চলতে হবে।একজন শত্রু আমার সাথে শত্রু হতে পারে,তবে সে একথাও বলতে বাধ্য থাকবে যে মানুষটি নম্র ও ভদ্র।ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের মূল্য সবার শির্ষে।প্রতিপক্ষের সাথে এই ফর্মুলা পালন করে আপ হতে পারেন বিশ্বজয়ী।হ্যা,বিশ্বজয়ী!এটা আপনাকে শিখিয়েছে আপনার ধর্ম।আপনার নেতা বিশ্বনবী মোহাম্মদ সঃ।এবার আসুন একটু তারঁ নীতির পর্যালোচনা করি।
এখানে আমরা এমন এক জাতির ইতিহাসের কথা বলছি,যাদেরকে বিতাড়িত করা হয়েছে তাদের দেশ থেকে।ভিটেমাঠি ছাড়া করা হয়েছে।জালিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের ঘরবাড়ি।এই চরম অবস্থার মধ্যেও কেমন ছিল তাদের চরিত্র,ধর্য।
[ ] রাস্তায় এক অসহায় বৃদ্ধার সাথে দেখা হয়েছে।তার নাম উম্মে মা’বাদ।যার ঘরে কোন পুরুষই ছিলনা।সে ছিল মুশরিকা।আর পরিস্থিতি ছিল যুদ্ধের,যেখানে বিতাড়িত ছিলেন তারা।তারা তার কাছে চেয়েছিলেন কিছু গোশত ও খেজুর কিনতে।তারা ছিলেন সম্পুর্ণ ক্ষুধার্ত।তারা কিছুই পেলেন না।
ইতো মধ্যে রাসুলের সঃ প্রশ্ন, এই বকরিটি কি?
উম্মে মাবাদ-এটি দূর্বল পরিত্যাক্ত একটি ছাগল।
রাসুল সঃ-তাতে দূধ আছে?
উম্মে ম’বাদ-এটাতো এখনো বাচ্ছাও দেয়নি।
রাসুল সঃ-আপনি এর থেকে দুধ দোহন করতে অনুমতি দেবেন?
রাসুলের সঃ প্রশ্নের ধরণ দেখুন।শিষ্টাচারের ভাষা বুঝুন।একজন বৃদ্ধাকে অন্তর থেকে সম্মান ও ভদ্রতা কিভাবে করেছেন তার প্রতি লক্ষকরুণ।সে কিন্ত এখনো মুশরিকা।
এই শিষ্টাচারের উত্তরে উম্মে ম’বাদ বলেছেন-আপনার জন্য আমার মা-বাবা উতসর্গ। অবশ্যই আপনাকে অনুমতি দিলাম।এভাবে উত্তর দানের কারণ কি?সে তো এখনো মুসলিম নয়।এই সিষ্টাচারের সবক তাকে কে দিয়েছেন?
আপনি যা দেবেন,তা’ই পাবেন।এই মহিলিটি যখনই বুঝতে পেরেছেন যে,এই ব্যাক্তিটি একজন ভদ্র,নম্র ও সম্রান্ত।তাকে প্রাকৃতি বাধ্য করেছে এর প্রতিদান দিতে।
[ ] রাজনৈতি শিষ্টাচারের অনুনম নমুনা এবার দখুন।মক্কাবিজয়ের পর যখন হুনাঈনের দিকে যাত্রা দিয়েছিলেন।রাস্থায় বিশিষ্ট অশ্র ব্যাবসায়ী সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার সাথে ব্যাবহারটি বিশ্বসভ্যতার নজির হিসেবে দেখতে পারেন।এই ব্যাবসায়ী ছিলো মুশরেক।তখন এই মুসরিকরা পরাজিত।মুসলমানরি ছিল বিজয়ী।রাসুল সঃ হুনাইন যুদ্ধের জন্য অস্রের প্রয়োজন ছিল।সাফওয়ানের ইতিহাস ভাল ছিলনা।তার দুনাম্বারির ব্যাপারে সকলই মোটামুটি ছিলেন অবগত।রাসুল সঃ যখন তার কাছে অস্র ধার চাইছেন,সে ভীত হয়েগেছে।সে বিশ্বাস করতে পারছিল না এ কি হতে যাচ্ছে।আসলেই কি এই প্রতিপক্ষ শত্রুরা অস্র ধার চায় না কি আক্রমন!এই দুদুল্লমান অবস্থায় সাহস করে সে বলেই ফেলল-মোহাম্মদ,জুরকরে নিতে চাও না আসলেই ধার চাও?রাসুল সঃ বললেন-না।ধার দাও।ফেরত দিয়ে দেব।জামানতের মাধ্যমে।এই নাও জামানত।যদি নষ্ট হয়ে যায় ক্ষতিপুরণ দেব।
[ ] প্রতিপক্ষের সাথে যুদ্ধাবস্থায় এমন শিষ্টাচারের নমুনা নিশ্চিত পয়গাম্বরের কাজ।পরাজিত বাহিনী যারা ইতোমধ্যে যাদের ভিটেবাড়ি দখলে নিয়েছিলো।এখন পরাজিত বাহিণীর সাথে ছিলো এই আচরণ।তাই,প্রতিপক্ষ যে’ই হোক।শিষ্টাচারের গন্ডির ভেতর থেকে কোন অবস্থাতে বের হওয়া যাবে না।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!