মন্দের মোকাবেলা করার উত্তমপন্থা -দ্বিতীয় পর্ব: প্রভাষক বদরুল ইসলাম বিন হারুন

প্রতিপক্ষের ভালো দিক গুলোর স্বীকৃতি দিন

প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলে তার প্রতি সম্মাননের সাথে তার রকমারী গুনের প্রতি সজাগ থাকতে হবে।শুধু তার মধ্যে যে বিষয়টি আপনার দ্বিমত আছে এতেই সীমাবদ্ধ থাকা,সর্বাবস্থায় ইনসাফের উপর কায়েম থাকা তার ধর্ম ও বিশ্বাসে আঘাত করা থেকে বিরথ থাকা চাই।এ ব্যাপারে ইসলাম আমাদেরকে সুন্দর একটি নমুনা দিয়েছে।ইসলাম আমাদেরকে শিখিয়েছে আমরা কিভাবে অন্যধর্মকে সম্মান দিতে হবে।মহাগ্রন্থ আল কোরআনে সব নবী রাসুলগনের নাম ও তাদের পদবী চমতকার ভাবে উপস্থাপন করেছে।তাঁদের নাম বার বার বর্ণনা করেছে।
পবিত্র আলকোরানের জরিপে দেখা যায় হযরত মোহাম্মদ সঃ এর নাম চারবার।আহমদ নাম একবার উল্লেখিত হয়েছে।যেখানে খৃষ্টান ধর্মের নবী ইসা আঃ আছে 25 বার।মাসিহ আছে 11বার।সব মিলে 36 বার ইসা আঃ নাম উল্লেখ আছে।এদিক দিয়ে নামের শীর্ষে রয়েছে নবী মূসা আঃ এর নামটি।বনী ইসরাইল বা এহুদীদের এ প্রিয় নামটি 140 বার উল্লেখ করা হয়েছে।

1-নির্দেশ-

ইসলামের শুরু থেকে যারা বিরোধীতা করেছেন,কঠোর বিরোধীতা অথচ কোরআনে তাদের নবী ও রাসুলগনের প্রসংসা করেছে।আমরা এ থেকে যে দিক নির্দেশনা পাই।তাই পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার 136 নং আয়াতে এসছে-

قُولُواْ آمَنَّا بِاللّهِ وَمَآ أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالأسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لاَ نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা, অন্যান্য নবীকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, তৎসমুদয়ের উপর। আমরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।
এ ব্যাপারে সাইয়েদ কুতুব তার প্রসিদ্ধ তাফসির ফি জিলালিল কোরআনে বলেন-
“এই হ্চছে ইসলামের বড়ত্ব ও মহত্যের নমুনা যা সব নবী রাসুলদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।সকল ধর্মের মধ্যে সেতু বন্ধন যা সকল রিসালাতের মূল এক ও অভিন্ন তার প্রমাণ।সব কিছুতেই ইমান আনা যেভাবে আল্লাহ চেয়েছেন।(সাইয়েদ কুতূব “ফিজিলালিল কোরআন 1/136)
আল্লামা ইবনে কাছির রাঃ ও বলেন- প্রেরিত সব নবীগনের স্বীকৃতি ও ইমান আনার নাম ইসলাম।

2-নির্দেশ-

সমতা প্রদানে কোন প্রকার পক্ষপাত থাকবে না।নির্দেশ এসেছে সূরা নিসার 150-151 আয়াতে-

إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُواْ بَيْنَ اللّهِ وَرُسُلِهِ وَيقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُواْ بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلاً

যারা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী তদুপরি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি বিশ্বাসে তারতম্য করতে চায় আর বলে যে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি কিন্তু কতককে প্রত্যাখ্যান করি এবং এরই মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করতে চায়।

أُوْلَـئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا

প্রকৃতপক্ষে এরাই সত্য প্রত্যাখ্যাকারী। আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী তাদের জন্য তৈরী করে রেখেছি অপমানজনক আযাব।
এই আল্লাহর কালাম।নবী মুসা আঃ এর কথা বলে।এই নবী মোহাম্মাদ সঃ এর মুখে মুসার আঃ প্রশংসা সুরা আলক্বসাস 14 নং আয়াতে এভাবে এসেছে-

وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَى آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ

যখন মূসা যৌবনে পদার্পন করলেন এবং পরিণত বয়স্ক হয়ে গেলেন, তখন আমি তাঁকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞানদান করলাম। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।
আরো এসেছে সুরা আল আরাফের 144তম আয়াতে-
قَالَ يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسَالاَتِي وَبِكَلاَمِي فَخُذْ مَا آتَيْتُكَ وَكُن مِّنَ الشَّاكِرِينَ

(পরওয়ারদেগার) বললেন, হে মূসা, আমি তোমাকে আমার বার্তা পাঠানোর এবং কথা বলার মাধ্যমে লোকদের উপর বিশিষ্টতা দান করেছি। সুতরাং যা কিছু আমি তোমাকে দান করলাম, গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞ থাক।

আপনার ধর্ম গ্রন্থ নবী ইসা আঃ এর একটি ভাষনের উদৃতি এভাবে দিচ্ছে সুরা মারিয়ামের 30-33নং আয়াতে-
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا

সন্তান বললঃ আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন।

وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا

আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে
وَبَرًّا بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا

এবং জননীর অনুগত থাকতে এবং আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি।

وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدتُّ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا

আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হব।

ঠিক অনুরূপ জাকারিয়া,ইয়াহইয়া ও ইলিয়াসের কথা বলেছেন সুরা আনআমের 85 তম আয়াতে-

وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِينَ

আর ও যাকারিয়া, ইয়াহিয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকে। তারা সবাই পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই সব সম্মান ও মর্যাদার আসন যে সময়ে ইসলাম দিয়েছিলো তখন চলছিল তুমুল যুদ্ধ ইয়াহুদ,খৃষ্ঠানদের সাথে।যখন অনবরত তারা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহের প্রতি বিষোদগার করছিলো,নবীকে পাগল ও জাদুগর বলে গালি দিচচ্ছিলো,মুসলমানদের বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়েছে।আর তাদেরকে ভিটাছাড়া করেছে।আর তাদের মধ্যে মতবিরোধ থাকার পর ও ইসলাম তাদের ভালোদিক গুলোর স্বীকৃতি দিয়েই যাচ্ছিলো।এমন এক চরম মূহুর্থে রাসুল মদিনায় দেখলেন ইয়াহুদীরা রোজা পালন করছে।জানতে চাইলেন এরা কোন কারণে এই আশুরার রোজা পালন করে আসছে।তারা বললেন,সাইয়েদুনা মুসা আঃ এই দিনে বনী ইসরাইল থেকে নাজাত পেয়েছিলো তাই তারা এর শুকরিয়া হিসেবে এ দিনটি এভাবে পালন করছে,তখন প্রিয় নবী সঃ বললেন-

“فانا احق بموسي منكم”
আর নিশ্চয় আমরা মুসার ব্যাপারে তোমাদের চেয়েও অধিক হকদার।
আর তিনি ইয়াহুদীদের অনুকরণে রোজা পালন করা শুরু করে দিলেন এবং তার সাথিদেরকে তা পালন করতে বললেন।(বুখারী 3342)।এটা কি অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাদের ভালোকাজের স্বীকৃতির চুড়ান্ত দৃষ্টান্ত নয়?

মূল ভিত্তির দিক দিয়ে সকল ধর্মের ভিত্তি অভিন্ন।সব মানুষ আপন ভায়ের মতো।তাদের পিতা এক মাতা ভিন্ন।ধর্মের মর্মবাণী এক শাখা প্রশাখা ভিন্ন।
وعن همام عن أبي هريرة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم أنا أولى الناس بعيسى ابن مريم في الدنيا والآخرة قالوا يا رسول الله كيف ؟ قال الأنبياء إخوة من علات وأمهاتهم شتى ودينهم واحد.
হযরত আবুহুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন-আমি উভয় জগতে ইসা ইবনে মারিয়াম থেকে উত্তম।তারা প্রশ্ন কললেন,এটা কিভাবে?তিনি বললেন,সকল নবীগন আপন ভাই।তাদের মা ভিন্ন।আর তাদের ধর্ম অভিন্ন।(বুখারী,কিতাবুল আন্বিয়া 3259)

উপরোক্ত স্বীকৃতি ও তাদের সাথে মদিনায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিলো রাসুলুল্লাহ সঃ এর বিশ্বজনিন ডিপ্লমেসির উজ্জল নমুনা।যেখানে তিনি তাদের সাথে করেছেন আর্থিক ও সামাজিক লেনদেন।ধর্রমীয় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।এমনকি আত্বীয়তার সম্পর্কের মতো নজীর ও রয়েছে।তার নীতি ছিলো ইয়াহুদী খৃষ্টানরা তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় থাকবে।তাদের মনে চাইলে মুসলমান হবে মনে না চাইলে নেই।তাদের সাথে জোর জবরদ্স্তি হবে না।বিভিন্ন গোষ্টির সাথে হবে সুসম্পর্ক।সামাজিক ভাবে একে অপরের সহায়ক।বহিশত্রুর আক্রমণে একে অপরের জন্যে ঝাপিয়ে পড়বে।

যুদ্ধ হয়েছে তাদের সাথে।আবার যুদ্ধাশ্র ও তাদের থেকে ধার নিয়েছেন।ধনী মুসলমানরা থাকতে ও তাদের কাছ থেকে ৠণ নিয়েছেন।তাদের সামাজিক কাজে সহায়তা করেছেন।তাদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছেন।সহায়তা দিয়েছেন।সন্ধী করেছেন।চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন।বার বার ইয়াহুদিদের দ্বারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।কিন্ত প্রতারণার জবাব দিয়েছেন উত্তম পন্থায়।আর এখানেই আমাদের ও রাসুলের ডিপ্লমেসিতে তফাত।তিনি প্রতিপক্ষকে চুড়ান্ত শত্রু মনে করেন নি।সর্বোচ্চ চারিত্রিক মাধুর্যের মাধ্যমে অন্তর জয় করেছেন।তাই যখনই আমরা প্রতিপক্ষের ভালোটা মেনে নেবো,তার খারাপটা ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে।দূরত্বটা কমে আসবে।আর এখানেই স্বর্থকতা।

আপনার সাথে আপনার প্রতিপক্ষের মতানৈক্য হতে পারে দু একটি বিষয়ে।কিন্ত মতৈক্য রয়েছে অগনিত।মতৈক্যের এই স্থানগুলো আপনাকে বাছাই করতে হবে।আর তাদের প্রতি আহবান করতে হবে এসব বিষয়ে যা তাদের ও আপনার মধ্যে স্বাদৃশ্য।এগুলোর ধুহাই দিয়ে তাকে চোখে আন্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে যে,বিরোধপূর্ণ বিষয় সামান্য।এটা মিটমাট করা কোন ব্যাপারই না।একমাত্র উভয় পক্ষের সদিচ্ছাই দিতে পারে এর সহজ সমাধান।

তৃতীয় পদ্ধতি

আলোচনায় মাধুর্যের সংমিশ্রন ও শুভাকাংখি মনোভাব থাকতে হবে।
যে ভাষায় প্রতিপক্ষের সামনাসামনি হবো,এই ভাষার তীর নিক্ষেপ যেন না হয়।তীর্যক পদ্ধতি কখনো একে অপরকে আকর্ষন করে না।করে বিকর্ষন।মনোভাবে হওয়া চাই মধ্যপন্থি।আর ভাষার শালীনতা,ছাড় দেয়ার মনোভাব এবং শুধু বিরোধপূর্ণ বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা। এবার একটি নমুনা দেখেন যেখানে আসমানী ফায়সালা হওয়ার পরে ও শুধু আলোচনার পদ্ধতি ও প্রতিপক্ষের বিষয়টির সাথে মিল খুজতে বলা হয়েছে সুরা সাবার 24-26 আয়াতে

قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلِ اللَّهُ وَإِنَّا أَوْ إِيَّاكُمْ لَعَلَى هُدًى أَوْ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ

বলুন, নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল থেকে কে তোমাদের কে রিযিক দেয়। বলুন, আল্লাহ। আমরা অথবা তোমরা সৎপথে অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছি ও আছ?

قُل لَّا تُسْأَلُونَ عَمَّا أَجْرَمْنَا وَلَا نُسْأَلُ عَمَّا تَعْمَلُونَ

বলুন, আমাদের অপরাধের জন্যে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না এবং তোমরা যা কিছু কর, সে সম্পর্কে আমরা জিজ্ঞাসিত হব না।

قُلْ يَجْمَعُ بَيْنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ يَفْتَحُ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ وَهُوَ الْفَتَّاحُ الْعَلِيمُ

বলুন, আমাদের পালনকর্তা আমাদেরকে সমবেত করবেন, অতঃপর তিনি আমাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফয়সালা করবেন। তিনি ফয়সালাকারী, সর্বজ্ঞ।

রাসুল মোহাম্মদের কি সন্দেহ ছিলো যে তিনি সত্যের উপর আছেন?
তার পর ও কেন বলা হলো-“আমরা অথবা তোমরা সৎপথে অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছি ও আছ?”
কারণ,এটাই হলো প্রতিপক্ষের সাথে আলোচনার উত্তম পন্হা।যা আমাদেরকে শেখানো হয়েছে।আলোচনায় বসার পূর্বে তালগাছ আমার এমন মনোভাব ছাড়তে হবে।নীতি রাখতে হবে-
“বলুন, আমাদের অপরাধের জন্যে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না এবং তোমরা যা কিছু কর, সে সম্পর্কে আমরা জিজ্ঞাসিত হব না।”
এখানে নিজেদের ব্যাপারে “অপরাধ”শব্দ জুড়ে দেয়া হয়েছে আর প্রতিপক্ষের ব্যাপারে বলা হয়েছে”তোমরা যা কিছু করো”।মূলত প্রতিপক্ষকে প্রাধান্য দেয়াই উদ্দেশ্য।

অপর একটি দলিল দেখেন যেখানে সূরা আনকাবুতের 46তম আয়াতে এসেছে-

وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ وَقُولُوا آمَنَّا بِالَّذِي أُنزِلَ إِلَيْنَا وَأُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَهُنَا وَإِلَهُكُمْ وَاحِدٌ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

তোমরা কিতাবধারীদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করবে না, কিন্তু উত্তম পন্থায়; তবে তাদের সাথে নয়, যারা তাদের মধ্যে বে-ইনসাফ। এবং বল, আমাদের প্রতি ও তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমাদের উপাস্য ও তোমাদের উপাস্য একই এবং আমরা তাঁরই আজ্ঞাবহ।
কত সুন্দর নীতি!মন ছুয়ে যায়।কত দরদমাখা আহবান।যেখানে কোন ছলচাতুরির লেশমাত্র নেই।বলা হলো-

“বল, আমাদের প্রতি ও তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি।”
অর্থাত,প্রতিপক্ষকে মেনে নেয়া হলো।মানতিকি বা যুক্তিবিদ্যার পরিভাষায় যাকে বলে-‘তাসলিমি জবাব।’বা প্রতিপক্ষকে মেনে নিয়ে তার উত্তর প্রদান।যেখানে কারো প্রতি কারো শত্রুতা,হিংসার ন্যুনতম উপস্থিতি নেই।আছে ভালোবাসা ও উদারতা।

দেখা যাক এ বিষয়ে আরো কয়েকটি আসমানি নীতি-
প্রথম নীতি-
সূরা আল ইমরানের 64তম আয়াত-

قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْاْ إِلَى كَلَمَةٍ سَوَاء بَيْنَن

قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْاْ إِلَى كَلَمَةٍ سَوَاء بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلاَّ نَعْبُدَ إِلاَّ اللّهَ وَلاَ نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلاَ يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضاً أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللّهِ فَإِن تَوَلَّوْاْ فَقُولُواْ اشْهَدُواْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ

বলুনঃ ‘হে আহলে-কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আস-যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান-যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে, ‘সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত।

দ্বিতীয় নীতি-
সূরা বাক্বারার 109 নংআয়াত-

وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُم مِّن بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّاراً حَسَدًا مِّنْ عِندِ أَنفُسِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ فَاعْفُواْ وَاصْفَحُواْ حَتَّى يَأْتِيَ اللّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

আহলে কিতাবদের অনেকেই প্রতিহিংসাবশতঃ চায় যে, মুসলমান হওয়ার পর তোমাদেরকে কোন রকমে কাফের বানিয়ে দেয়। তাদের কাছে সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর (তারা এটা চায়)। যাক তোমরা আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত তাদের ক্ষমা কর এবং উপেক্ষা কর। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে রাসুলের সঃ বাস্তব জীবন নিয়ে একটি ঘঠনা বলছি-
কুরাইশ বংশের নেতা উতবা ইবনে রাবিয়া এসেছেন মোহাম্মদকে বুঝিয়ে তার দীন থেকে ফেরাতে।নানা রকম যুক্তিতর্কের অবতারণা করছেন।বিভিন্ন লোভলালসার দিকে ইংগিত করছেন।এক পর্যায়ে বললেন-‘স্নেহের ভাতিজা,আজ তোমার কারণে আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরেছে,আমাদের অতীত নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হচ্ছে….।রাসূল মনযোগ সহকারে শুনছিলেন আর বলছিলেন-বলে যান হে আবাল ওয়ালিদ,আমি শুনছি।
এখানে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এক-
প্রতিপক্ষের কথাগুলো ছিলো তীর্জক,কলজাপোড়া।যা যে কোন রক্তমাংশের মানুষের জন্য একটি কঠিন পরিস্থিতি।
দুই-প্রতিপক্ষের কথাগুলো ছিলো অপবাদেপূর্ণ এবং প্রতিহিংসায় ভরপুর।
কিন্ত, রাসূল সাঃ আলোচনার চুড়ান্ত ডিপ্লমেসির পরিচয় দিয়েছেন দুটি পন্থায়।
এক-প্রতিপক্ষের সকল যুক্তি তর্ক মনযোগ দিয়ে শুনেছেন।মধ্যখানে বিরক্তিবোধ করেননি।
দুই-সবশেষে তাদেরকে আরোও কথা বলার ব্যাপারে বলেছেন।প্রশ্ন করছেন,আপনার কথা কি শেষ?
এখান থেকে বিশ্ব ডিপ্লমেসির চুড়ান্ত শালীনতার বহিপ্রকাশ ঘঠেছে।
সবশেষে নিজের বক্তব্য কোন প্রকার ইমোশন ছাড়া,শান্তভাবে উপস্থাপন করেছেন।
তাই,প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে তৃতীয় যে নীতি অবলম্বন করতে হবে,তা হলো-
আলোচনায় মাধুর্যের সংমিশ্রন ও শুভাকাংখি মনোভাব থাকতে হবে।

Chat Conversation End
Type a message…

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!