‘ভিপি নুর’কেন গলার কাঁটা!

সাঈদ তারেক
‘ভিপি নুর’ ছেলেটা কি সরকারের গলার কাঁটা হয়ে গেল! ভাব দেখে মনে হচ্ছে- না যাচ্ছে গেলা না যাচ্ছে ফেলা! কিভাবেই যেন উঠে এলো ছে‌লেটা! ঠেকানোর চেষ্টা কম হয় নাই। মারধোর মামলা মোকদ্দমা, হাসপাতালে পাঠানো মাথা ফাটানো, গ্রেপ্তার হাজতবাস- মায় শিবিরের তকমা সেঁটেও দাবিয়ে রাখা যায় নাই। বাঘের ঘড়ে ঘোগের বাসা বেঁধে শেষ পর্যন্ত ডাকসুর ভিপিও হয়ে গেল। একবার দেখলাম প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ার সাথে দেখা করে আশীর্ব্বাদ নিয়ে এলো। ভেবেছিলাম বুঝি ঠিকানা হয়ে গেছে। কিন্তু ক’দিন না যেতেই আবার মাইর! সর্বশেষ ধর্ষন মামলা দিয়ে ইমেজ নষ্টের চেষ্টা! ‘ভিপি নুর’ এতটা মাথাব্যথার কারন হয়ে উঠলো কেন বুঝলাম না!
যৌবনটাই তো মানুষের বাঁধা না মানার কাল। তরুন যুবারা সব সময়ই এন্টি এষ্টাব্লিশমেন্ট। অন্যায়ের প্রতিবাদকারি, উচিত এবং ন্যায়ের পক্ষে। রাজনীতির নষ্টকালে সরকারি ছত্রচ্ছায়ায় মুষ্ঠিমেয় কিছু তরুন যুবক উচ্ছন্নে গেলেও সাধারন ছাত্ররা সব সময়ই স্বাধীনচেতা। এদেরই একটি অংশ কোটা সংষ্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়েছিল, সরকার এবং সরকারি সংগঠনগুলোর অব্যাহত দমনপীড়নের মধ্যেও মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে ছিল। এ আন্দোলনে ছিল কালেক্টিভ লিডারশীপ। কিন্তু নেতৃত্ব পার্সনিফাইড হয়েছিল নুরুল হক নুরু নামের গ্রামের সাধারন পরিবার থেকে উঠে আসা একটি ছেলের মাধ্যমে। এক সময় ছেলেটি হয়ে যায় আন্দোলনের আইকন। মামলা হামলা গ্রেপ্তার কারাবাস- যাবতীয় নিপীড়নের মাত্রা যত বেড়েছে তরুন যুব সমাজের মধ্যে ওর একটি আপোষহীন এবং সংগ্রামী ভাবমুর্তি তৈরী হয়েছে। এভাবেই এই নুরের সৃষ্টি। ঠিকই আছে। নেতা তো এভাবেই তৈরী হয়।
’৪৭এর পর থেকে আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় কেউ এসেছে তৃণমূল থেকে বেশীরভাগ ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে। আন্দোলন সংগ্রাম ত্যাগ-তিতিক্ষা, নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে করেই একএকজন নেতৃতের পর্যায়ে আসীন হয়েছেন। পঞ্চাশের দশক থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রায় সবারই একই ব্যাকগ্রাউন্ড, ছাত্র আন্দোলন। ’৭১এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত মোটামুটি এই ধারা অব্যাহত ছিল। স্বাধীনতার পরের কয়েক বছরেও রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব আসার সুযোগ ছিল। ব্যপক দমন-পীড়ন স্বত্বেও তখন রাজনীতির চর্চা ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাত্র রাজনীতি ছিল। ছাত্র আন্দোলন হতো। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের চল ছিল। ছেলেরা এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নেতৃত্বে চলে আসতে পারতো। ’৭৮ থেকে মরহুম জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে ‘টোকাই নেতা’ প্রতিষ্ঠার চল শুরু করলে তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব উঠে আসার প্রক্রিয়া হোঁচট খায়। তারপরও ’৮০এর দশক জুড়েই দেশে রাজনীতির চর্চা থাকায় তারুণ্যের উচ্ছলতা ছিল। কবি সাহিত্যিক শিল্পী সাংবাদিকরা সরকারের বিরুদ্ধে লিখতে পারতো গান গাইতে পারতো কবিতা রচনা করতে পারতো, ছাত্র যুবকরা রাজপথ কাঁপাতে পারতো পুলিশের সাথে পিটাপিটি করতে পারতো। রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল, লাগাতার, অবরোধ, অবস্থান, মিটিং, মিছিল করতে পারতো, সন্ত্রাস সহিংসতা জ্বালাও পোড়াও এমনকি সরকার পতনের আন্দোলন করতে পারতো। প্রায় সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ সরকারবিরোধীদের কব্জায় চলে গেলে সরকার কোথাও এসব নির্বাচন বাধা দিয়েছে বা বিরোধীদেরকে মেরে কেটে গুম করে ক্যাম্পাস নিজ দলের পেটোয়া বাহিনীর কব্জায় নিয়ে নিয়েছে এমন দেখা যায় নাই। নিয়মিত ডাকসুসহ বিভিন্ন ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফি বছর নতুন নতুন নেতার অভিষেক ঘটেছে। এরাই সরকার পতনের আন্দোলন করেছে, সরকারের পতন ঘটিয়েছে। পরবর্তীকালে এদেরই কেউ কেউ জাতীয় রাজনীতিতে স্থান করে নিয়েছ। সে হিসাবে গত তিন দশকের রাজনীতির ইতিহাসের সাথে তুলনা করলে বলা যায় আশির দশকটি ছিল দেশে ‘গনতন্ত্র চর্চার সুবর্ণকাল’!
’৯১ থেকে প্রতিহিংসা বলপ্রয়োগ এবং প্রতিপক্ষকে এলিমিনেশনের কালচার শুরু হলে রাজনীতির স্বাভাবিক চলার পথ রুদ্ধ হতে থাকে। এ সময় দায়িত্বশীল রাজনীতিকদের মধ্যে দুর্নীতির মাধ্যমে স্বল্প সময়ে বিশাল বিত্ত-বৈভব অর্জনের প্রবণতা তীব্র হয়ে ওঠে, রাজনীতি হারিয়ে যায় কানা গলিতে। নেতৃত্বের মাপকাঠি হয় তোষামোদী চাটুকারিতা তেলবাজী এবং তাবৎ নীতিহীনতার কদর্য চর্চা। পাশাপাশি অনুপ্রবেশ ঘটে নানা পেশার সুযোগ সন্ধানী এবং ধান্ধাবাজদের। এই গোষ্ঠী তেলবাজী এবং নীতিহীনতায় রাজনীতিকদেরকে পেছনে ফেলে দেয়। এক সময় রাজনীতি এবং সরকারের স্টিয়ারিংও নিয়ে নেয়। সব চাইতে সর্বনাশা কাজ এই তিন দশকের সরকারগুলো যা করেছে তা হচ্ছে রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব গড়ে ওঠার পথ বন্ধ করে দেয়া। তিরিশ বছর ডাকসু নির্বাচন দুরের কথা কোন একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত হতে দেওয়া হয় নাই। বিরোধী দল এবং মত নির্মমভাবে দমন করে দেশকে বিরাজনীতিকরনের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। রাজনীতি না থাকায় রাজনৈতিক নেতাও তৈরী হয় নাই। উত্থান ঘটেছে সম্রাট শাহেদ শামিম সাবরিনা পাপিয়াদের মত মাফিয়া ডনদের। যে যখন ক্ষমতায় এসেছে মনে করেছে তারাই বাংলাদেশের শেষ সরকার। কেউ কখনও চিন্তাও করে না যে তাকে এক সময় ক্ষমতা থেকে চলে যেতে হবে। ফলে এরা কখনও ক্ষমতায় দ্বিতীয় ব্যক্তি রাখে নাই। এরশাদ আমল পর্যন্ত দেশে রাস্ট্রপতির সাথে একজন করে উপরাষ্ট্রপতি থাকতেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে তিনজন উপ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারতেন। এই চলটা মরহুম জিয়াউর রহমানের করা। কিন্তু ’৯১এ ক্ষমতায় এসে তারই স্ত্রী এই পদগুলো বিলোপ করে দেন। পরের কোন সরকারই- সরকারে বা দলে কোন সেকেন্ড ম্যানের অপশন রাখে নাই।
ফলশ্রুতিতে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে- প্রধান দুই দলে কোন বিকল্প নেতা নাই। বেগম জিয়া তবুও উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁর ছেলেকে বসানোর চেষ্টা করেছেন কিন্তু আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার পরে কে এখনও পরিষ্কার না। দলে তার কোন সেকেন্ডম্যান নাই পরিবার থেকে কাউকে আনবেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের দেশে কখনই রাজনীতিকে স্বাভাবিক পথে বিকশিত হতে না দেওয়ায় কোন পর্যায়েই যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। আর এখন তো পলিটিক্যাল লিডাররা সব ‘পলিটিক্যাল অফিসার’! পদ-পদবী হাসিল হয় বাই এ্যাপয়েন্টমেন্ট!
অনেক বছর পর একটা ছেলেকে দেখা গেল কিছুটা হলেও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। যেভাবেই হোক মানুষের কাছে মোটামুটি গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে। তার রাজনীতি সম্পর্কে হয়তো অনেকের পরিষ্কার ধারনা নাই তারপরও বারবার সরকারের রোষানলে পড়ায় মনে করা হয় ছেলেটি হয়তো সত্য আর ন্যায়ের পক্ষে। মানুষ সব সময় সত্য ন্যায়ের পক্ষেই থাকে। এর আগে শাহবাগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ইমরান সরকার নামে একটি ছেলেও উঠে এসেছিল। তারও একটা নেতা হবার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছিল। কিন্তু যখন দেখা গেল সে একটা খেলনামাত্র, ছিটকে পড়লো। ইমরান সরকারের আকষ্মিক উত্থান এবং হঠাৎ পতনের মধ্য দিয়ে এটাই প্রমান হলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কখনও নেতা তৈরী হয় না।
চলমান রাজনীতি তিরিশ বছরে তিনটা নেতাও তৈরী করতে পারে নাই। নেতৃত্ব তৈরীর কারখানা বন্ধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি মদদে যে ছাত্র নেতৃত্ব কায়েম রাখা হয়েছে এরা ব্যস্ত আখের গোছানোর কাজে। রাজনীতি না থাকায় নতুন নেতৃত্ব বিকাশের পথ রুদ্ধ। একটা জাতি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া চলতে পারে না। শেরে বাংলা ভাসানী সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুর মত নেতা হয়তো আমরা কখনও পাবো না কিন্তু তাদের পরের প্রজন্মের অনেক নেতাই তো এক সময় আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন, আমরা কি তেমন কোন নেতাও আশা করতে পারি না! রাজনীতি তষ্করদের কব্জায় চলে গেলে কি অবস্থা দাঁড়ায় তা আমরা আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছি। সব কিছুই চোর বাটপার ঘুষখোর লুটেরাদের হাতে। এই সময়কালই বাংলাদেশের শেষ সময়কাল না, আমাদেরকে দেখতে হবে আজ থেকে পাঁচ দশ বিশ বছর পরের সময়কালকে। দেশ পরিচালনার ভার থাকতে হবে সৎ যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে। কোথায় সে নেতা!
নেতৃত্ব কখনও বাই এ্যাপয়েন্টমেন্ট হয় না, নেতৃত্বের গুনাবলী চাটুকারিতা তোষামুদি তেলবাজীর মাধ্যমেও অর্জিত হয় না। আন্দোলন সংগ্রামের সিঁড়ি বেয়ে একটা নুর যদি উঠে আসে, আসুক না! তাকে প্রমোট করতে না পারি নিগেট করে দেয়াটা কি ঠিক হবে?
(NB:প্রবন্ধে উল্লেখিত মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব)

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!