ভাঙনের মুখে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা

কাফি কামাল | ১৬ অক্টোবর ২০১৮, মঙ্গলবার

ভাঙনের মুখে পড়েছে বিকল্পধারা বাংলাদেশ। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন দলটির নেতারা। শীর্ষ নেতাদের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে নেতাকর্মীরা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ হওয়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দলটির বেশির ভাগ নেতা।

কিন্তু বিএনপিসহ  জাতীয় ঐক্যের নেতাদের ওপর অযথা চাপ প্রয়োগ ও শর্তজুড়ে দেয়ার মাধ্যমে ঐক্য প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছিল দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। শেষ পর্যন্ত বিকল্পধারার শীর্ষ নেতৃত্ব জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থান নেয়ায় প্রকাশ্যে এসেছে সে বিক্ষোভ, বিদ্রোহ। শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যাওয়ায় বহিষ্কৃত হয়েছেন বিকল্পধারার ভাইস প্রেসিডেন্ট শাহ আহমেদ বাদল ও কৃষি সম্পাদক জানে আলম হাওলাদার। কিন্তু যে অভিযোগে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ দলটির অন্দরমহলেই।

বিগত ১৪ বছরে দলের কাউন্সিল না হওয়ায় কাউকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা শীর্ষ নেতৃত্বের আছে কি না সেটা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শিগগিরই তলবি সভা ডেকে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি নতুন কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন একাধিক নেতা। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে তারা আলাদা তলবি সভা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সেই সঙ্গে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তারা দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে একাত্মতা পোষণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিকল্পধারার নেতারা জানান, ৭১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে বর্তমানে সক্রিয় রয়েছেন ২৬-২৭ জন। তাদের মধ্যে ১৭ জনই এখন বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়েছেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন- সমবায় সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাবুল, যোগাযোগ সম্পাদক খন্দকার জোবায়ের, কৃষকধারার আহ্বায়ক চাষী এনামুল, প্রচার সম্পাদক প্রকৌশলী জুনু প্রমুখ। ওদিকে বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট প্রফেসর বি. চৌধুরীর নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জে তিনি এবং তার পুত্র মাহী বি. চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।

সেখানে অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে নিজ দল বিকল্পধারার অবস্থান। এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আত্মপ্রকাশ ও বিকল্পধারা সে প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ানোই স্থগিত করা হয়েছে যুক্তফ্রন্টের কার্যক্রম। তবে যুক্তফ্রন্টের দুই দল জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হওয়ায় যুক্তফ্রন্টের কার্যকারিতাও আর নেই।

বিকল্পধারার সহসভাপতি শাহ আহমেদ বাদল বলেন, বিগত ১৪ বছরে বিকল্পধারার শীর্ষ নেতারা দলটির কোনো সম্মেলন করেননি। বরং বিকল্পধারার কর্ণধার হিসেবে পরিচিত মাহী বি. চৌধুরীর অসাংগঠনিক সিদ্ধান্তে আগেও অনেক গুণীজন দলত্যাগ করেছেন। কাউকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, কাউকে করা হয়েছে অকারণে বহিষ্কার। এভাবে রাজনীতি চলতে পারে না। তিনি বলেন, প্রফেসর ডা. বি. চৌধুরী পুত্রস্নেহে অন্ধ। তাই বিকল্পধারা মানেই মাহী বি. চৌধুরীর স্বেচ্ছাচারিতা, একনায়কত্ব ও স্বৈরাচারী আচরণ। সবচেয়ে বড় কথা, সাংগঠনিক কাজে নয় মাহী বি. চৌধুরী বিকল্পধারাকে একটি বাণিজ্যিক সংস্থায় ও বার্গেনিং এজেন্সিতে পরিণত করেছে। আর প্রফেসর বি. চৌধুরী তার ছেলের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন। মহাসচিব মেজর (অব.) মান্নান বেকায়দায় আছেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা ও ব্যাংকঋণের চাপে। আসলে উনাকে মাহী বি. চৌধুরীই চাপে রেখেছেন। মাহী একের পর এক গঠনতন্ত্রবিরোধী কাজ করেছেন, দলের সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান- তাই তার বিরুদ্ধেই আমাদের এই বিদ্রোহ। বাদল বলেন, আমি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিকল্পধারার রাজনীতি করছি।

দলের প্রচার সম্পাদক থেকে যুগ্ম সম্পাদক ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছি পর্যায়ক্রমে। কিন্তু আমরা অনেক কথা বলতে পারিনি। দলের একটি কেন্দ্রীয় কার্যালয় নেই। যেটি কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয় সেটি টঙ্গীর কাছাকাছি। এভাবে রাজনীতি করা যায় না। আমরা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে জাতীয় প্রেস ক্লাবে যেতে চেয়েছি। এই জন্যই আমাদের নাকি বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু নিজেরা দলের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে অন্যকে শাস্তি দেয়ার অধিকার রাখে না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি- দুয়েকদিনের মধ্যে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তলবি সভা ডেকে বিকল্পধারার বর্তমান সভাপতি-মহাসচিব ও যুগ্ম মহাসচিবের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব। তারপর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে বিকল্পধারার প্রতিনিধিত্ব করবো। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বর্তমানে সক্রিয় ২৬-২৭ জন নেতার মধ্যে বেশিরভাগই আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। নাটোর, লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী জেলা দলের যে কমিটি রয়েছে তারাও আমাদের সঙ্গে আছেন। কৃষক ধারা আমাদের সঙ্গে আছেন। অন্য অঙ্গসংগঠনগুলো এখন নিষ্ক্রিয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, খোদ মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান থানা কমিটির নেতাকর্মীরাও আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। বাদল বলেন, জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে দেশে একটি জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিকল্প নেই। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণদাবি অনুযায়ী যে আন্দোলন শুরু হয়েছে সে আন্দোলনের সঙ্গে আমরা একাত্মতা প্রকাশ করব। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হয়ে ৭ দফা ও ১১ লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশের কল্যাণে ভূমিকা রাখবো।

বিএনপির প্রথম মহাসচিব প্রফেসর ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপি ভেঙেই গঠিত হয়েছিল বিকল্পধারা। নানা কারণে দুটি দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দূরত্বও ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে সে দূরত্ব ভুলে ঐক্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বিএনপি। দেশের রাজনৈতিক মহল বিষয়টিকে নিয়েছিল ইতিবাচক এক পদক্ষেপ হিসেবে। ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে দুটি দল একমঞ্চে আসছে ভেবে স্বস্তিবোধও করছিল অনেকেই। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া ছিল বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জে। বিকল্পধারা গঠনের পর নেতাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের কারণে ক্ষুব্ধ ছিল স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। তার পরও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল তারা। তবে শেষ পর্যন্ত বিকল্পধারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংযুক্ত না হওয়া ও তাদের তরফে ষড়যন্ত্রের বক্তব্য আসার পর সে ক্ষোভ এখন তুঙ্গে। মুন্সিগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ২০০২ সালে থেকে এমন কোনো কাজ নেই যা বিকল্পধারার শীর্ষ নেতারা করেননি।

বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী ও জনভিত্তিহীন দলটি যুক্ত না হওয়ায় বরং শাপেবর হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করতে পারবে। মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির বন ও পরিবেশ সম্পাদক মোহাম্মদ সাইদুজ্জামান সিমু বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করেন এখনও বিএনপি ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে চৌধুরী পরিবার। বিশেষ করে বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরীর কার্যকলাপ ও কথাবার্তায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকরা দারুণভাবে ক্ষুব্ধ। এছাড়া মুন্সিগঞ্জে বিকল্পধারার কোনো সাংগঠনিক অবস্থান নেই। এলাকায় জনভিত্তি নেই। এলাকায় বিকল্পধারার শীর্ষ নেতাদের আনাগোনাও নেই। দলটির রাজনীতি বেঁচে আছে কেবল রাজধানীতে মিডিয়ার সহায়তায়। সিমু বলেন, ২০০৮ সালে প্রফেসর বি. চৌধুরী যখন নির্বাচন করেছিলেন তখন তিনি ৩০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। এখন কুলো মার্কায় এককভাবে নির্বাচন করলে মাহী বি. চৌধুরী ৩-৪ হাজারের বেশি ভোট পাবেন না। কারণ, যারা ২০০৮ সালে প্রফেসর বি. চৌধুরীর নির্বাচন করেছিলেন তারা ইতিমধ্যে বিএনপির রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন। পদ-পদবি নিয়ে সক্রিয়ভাবে বিএনপির রাজনীতি করছেন।

বিকল্পধারার বহিষ্কৃত ভাইস প্রেসিডেন্ট শাহ আহমেদ বাদলের অবস্থানের পক্ষে পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করেন বিকল্পধারার কৃষি সম্পাদক (বহিষ্কৃত) জানে আলম হাওলাদার। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই দলের রাজনীতি করি। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার অগ্রগতির অংশ হিসেবে প্রফেসর বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেন ১৫ই সেপ্টেম্বর শহীদ মিনারে গিয়ে যে দাবি ও লক্ষ্য ঘোষণার কথা ছিল সেটা শেষ পর্যন্ত হয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাবে। আমরা সেদিন প্রেস ক্লাবে অপেক্ষা করছিলাম। একপর্যায়ে ঘোষণা হলো শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় মগবাজার থেকে বি. চৌধুরী ফিরে যাচ্ছেন। এই সময় আমি মহাসচিবকে বলেছিলাম- দেশের মানুষ অপেক্ষা করে আছে। তাই বি. চৌধুরী অসুস্থ হলে মহাসচিবের অন্তত উপস্থিত হওয়া উচিত।

জানে আলম বলেন, আমার সেই ফোন করাটাই অপরাধ বিবেচিত হলো এবং আমাকে ৭ দিনের শোকজ দিয়ে বহিষ্কার করা হলো। কিন্তু সেদিন প্রেস ক্লাবে বিকল্পধারার যিনি প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি কোনো শাস্তির মুখে পড়েনি। যে নেতারা ১৪ বছরে দলের একটি কাউন্সিল করতে পারেনি তারা কাউকে বহিষ্কারও করতে পারে না।

এদিকে যুক্তফ্রন্টের ব্যাপারে জোটটির অন্যতম শীর্ষ নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই জোট গঠন করা হয়েছিল, সেখান থেকে বিকল্পধারা সরে গেছে। নাগরিক ঐক্য, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ও সমপ্রতি এই জোটে যুক্ত হওয়া সোনার বাংলা পার্টি এবং বাংলাদেশ জনদল নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছে। সুতরাং এককভাবে বিকল্পধারা দিয়ে এই যুক্তফ্রন্টের কার্যকারিতা থাকে না।

বিকল্পধারা নেতারা বলছেন, বিএনপি নেতাদের যে দুটি শর্ত দেয়া হয়েছিল দুটিই বাস্তবতা বিবর্জিত। বিকল্পধারার নেতাকর্মীরা এই দুই শর্তের ব্যাপারে একমত নয়।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!