বিনাভোটের পর এবার বেশি ভোটের অস্বস্তিতে আ.লীগ

শত চেষ্টা করেও অস্বস্তি আর সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ। যে নির্বাচনে বিনাভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছিল ১৫৩ জন। সংবিধান অনুযায়ী ১৫১ জন নির্বাচিত সদস্য হলেই সরকার গঠন করা যায়। আওয়ামী লীগের এই সরকারকে বিরোধীদল, বিশিষ্টজন ও আইনজ্ঞরা বিগত ৫ বছর যাবত বিনাভোটের সরকার হিসেবেই আখ্যা দিয়ে এসেছেন। আর এই বিনাভোটের এমপিদের নিয়ে বিগত দিনগুলোতে চরম বিব্রতকর অবস্থার মধ্যেই দিন কেটেছে আওয়ামী লীগের।

বিনাভোটের সেই অপবাদ গোছাতে সবদলকে নিয়ে আয়োজন করেছিল একাদশ সংসদ নির্বাচনের। তবে এবার ভোট ডাকাতি করতে গিয়ে অতিমাত্রায় করে ফেলেছে। যেখানে হিসাবও ঠিক রাখতে পারেনি। বিগত সংসদে গৃহপালিত বিরোধীদল জাতীয় পার্টিকে নিয়েও ছিল চরম অস্বস্তিতে। দলটি একদিকে সরকারে ও অন্যদিকে বিরোধী দলের আসনে বসায় এনিয়ে ৫ বছর ধরেই চলেছে সমালোচনা। শেখ হাসিনার টার্গেট ছিল এবার সেই সংকট থেকে বেরিয়ে এসে বিএনপিকে বিরোধীদলের আসনে বসাবে। কিন্তু নির্বাচনে ভোট চুরির লোভ সামলাতে না পারার কারণে এখন হিসাবে গোলমাল বেধেছে। বিনাভোটের পর এখন আবার বেশি ভোটের যন্ত্রণা ভুগতে হচ্ছে।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই যে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ব্যালটে সিল মারা হয়েছিল এটা এখন প্রতিষ্ঠিত। এটা প্রমাণ করার জন্য আর খুব বেশি যুক্তি দেয়ারও প্রয়োজন নেই। কারণ, বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান এতটাই বেশি যে সাধারণ মানুষও এগুলো বিশ্বাস করতে পারছে না।

অনেক এলাকায় বিএনপির প্রার্থীদের ভোটের সংখ্যা এতই কম যে, ওই সব এলাকায় বিএনপির যেসব নেতাকর্মীদের বিরুদ্দে বিভিন্ন অভিযোগে থানায় মামলা করা হয়েছে, আসামির সংখ্যা প্রাপ্ত ভোটের চেয়েও বেশি। এখন প্রশ্ন আসতে আসামিরা সব পলাতক। তারা ভোট দেয়নি। তাহলে তাদের পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের ভোটগুলো গেল কোথায়। তারপর ওইসব এলাকায়তো বিএনপি-জামায়াতসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিকদলগুলোরও অনেক কর্মী-সমর্থক আছেন। তাদের ভোটগুলো গেল কই?

তারপর, ভোটের রাতে ব্যালটে অতিমাত্রায় সিল মারার কারণে ভোটের দিন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও ভোট দিতে পারেন নি। যারা যুগ যুগ ধরে বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে ও আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, ভোটের দিন তাদের প্রিয় প্রতীক নৌকায় ভোট দিতে না পেরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন। দেশের প্রায় সবখানেই ভোট বঞ্চিত নৌকার সমর্থকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগ থেকে সমর্থনও প্রত্যাহার করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশের মাধ্যমে রাতে সিল মারার নির্দেশ ছিল দেশের সবখানেই। কিন্তু ৫০ শতাংশ ব্যালটে সিল মারার নির্দেশ ছিল না। এনিয়ে আলাপকালে ঢাকা মহানগর উত্তরের আওয়ামী লীগের একজন সাবেক ওয়ার্ড সেক্রেটারি হাসতে হাসতে বলেন, আমাদের কেন্দ্রে মোট ভোট আছে ৪ হাজার। আমরা রাতে ৭শ ব্যালটে সিল মেরেছি। বেশি মারার নির্দেশ ছিল না। আসলে এইভাবেই তারা সারাদেশে রাতে ব্যালটে সিল মেরেছে।

এদিকে, টিআইবির পক্ষ থেকে বিশাল এই ভোটের ব্যবধানের বিচার বিভাগীয় তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী কিছু বুদ্ধিজীবী ছাড়া কেউই এই ভোটের হিসাব মিলাতে পারছেন না। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও ভোটের ব্যবধান নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছেন।

এছাড়া আন্তর্জাতিক কয়েকটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমও ভোট নিয়ে নিয়মিত নেতিবাচক প্রতিবেদন করে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে তাদের বিশাল বিজয় হলেও দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সেই পরিমাণ খুশির আমেজ নেই। ভোট দিতে না পেরে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, দলের অনেক নেতাকর্মীরাও যে ক্ষুব্ধ হয়ে আছে সেই খবরও আসছে কেন্দ্রে।

আওয়ামী লীগ মনে করছে, ভোটের এই বিশাল ব্যবধানের কারণে বিরোধীপক্ষ রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনী পদক্ষেপও নিতে পারে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যদি আদালতে গিয়ে ভোট ডাকাতির সঠিক তথ্য তুলে ধরে তাহলে আগেকার বিনাভোটের চেয়ে এবার বেশি ভোট আরও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এসব নিয়ে এখন শেখ হাসিনাসহ দলের নীতিনির্ধারকরা চরম অস্বস্তিতে আছেন বলেও জানা গেছে।

অ্যানালাইসিস বিডি ডেস্ক

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!