বিখ্যাত ইসলামি দার্শনিক ও চিন্তক ডঃ আব্দুল হামিদ আবু সুলায়মান — ড. আব্দুস সালাম আজাদী

আমার চিন্তার জগতকে যারা আলো ঝলমলে করে দিয়েছেন, তার মধ্যে নিঃসন্দেহে আমার শিক্ষক প্রফেসর এমিরিটাস ডঃ আব্দুল হামিদ আবু সুলায়ামান অন্যতম। আমি তাকে ঘনিষ্ঠ ভাবে পেয়েছি, তাকে কাছে পেয়েছি, এবং তার কথা আমার আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে মালয়েশিয়াতে থাকা কালীন ২বছর ৫ মাস শুনে শুনে ঋদ্ধ হয়েছি।
আমি তার সাথে দুইবার সাক্ষাত করেছি। একবার আমার পিএইচডিতে সাব্জেক্ট পরিবর্তনের বিষয়ে পরামর্শ নেবার জন্য। আরেকবার তার কাছ থেকে শেষ বিদায় নেয়ার আগে। ওই সময় আনোয়ার ইবরাহীমকে ডিপুটি প্রাইম মিনিস্টারের পদ থেকে অপসারণ করেন তুন মাহাথির মুহাম্মাদ, এবং তাকে জেলে পুরেন। সে সময় আমি ডঃ প্রফেসর আবুল হাসান সাদেক, ডঃ ইউসুফ আলি ও মাজহারুল হক তপন ভায়ের সাথে আনোয়ার ইবরাহীমের বাসায় ডঃ ওয়ান আযীযাহ ম্যাডামকে সমবেদনা জানাতে যাই। সেখানেও দেখা হয় আমাদের রেক্টর ও তার পরিবারের সাথে।
আমি ১৯৯৬ সালে যখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে যাই, তখন ছিলো এর পূর্ণ যৌবন কাল। বিশ্ব সেরা অনেক ইসলামি চিন্তাবীদকে আমি সেখানে পাই। যাদের মধ্যে তুরস্কের সাবেক প্রধান আহমেদ দাওয়াতুগলু ছিলেন, গিনিয়ার মন্ত্রী কুতুব সানো ছিলেন, বিশ্ব সেরা ইসলামি মনোবিজ্ঞানী ডঃ মালেক বদরি ছিলেন, মালায়েশিয়ার সেরা আইনবেত্তা তান সিরি ডাটো আহমেদ ইবরাহিম সহ এক ঝাক তারকাগণ জ্বলজ্বল করে জ্বলছিলেন সেখানে। যাদেরকে ডঃ আব্দুল হামিদ আবু সুলায়মানের মত মানুষেই একত্রিত করতে পেরেছিলেন।
তিনি ১৯৩৬ সালে মক্কায় জন্ম গ্রহন করেন। সেখানেই প্রাথমিক, সেকেন্ডারি ও হাইয়ার সেকেন্ডারি শেষ করে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ ডিগ্রী নেন ১৯৫৯এ। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ তে তিনি এম বিএ গ্রহন করেন। এরপরে তিনি আমেরিকায় যান উচ্চ শিক্ষা গ্রহনার্থে। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক সুনামের সাথে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে সাঊদিতে ফরে আসেন ১৯৭৩এ। সাউদিতে তার ফিল্ডে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী, ফলে তাকে অনেক গুলো কাজ এক সাথে করতে হয়। বাদশাহ ফয়সাল (র) ও চাচ্ছিলেন এই ধরণের প্রতিভা।
এইজন্য তাকে তিনি দেশের প্লানিং কমিশনের প্রধান করে দেন। সেই সাথে কিং সাঊদ বিশ্ববিদ্যালয় (রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়)কে বিশ্বমানে আনতে তাকে কাজ দেন। তিনি সেখানের পাবলিক এডমিনেস্ট্রেশানের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন, তবে পরে এই ফ্যাকাল্টির ই রাস্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার দ্বায়িত্ব নেন। এর সাথেই তাকে দায়িত্ব পালন করতে হয় WAMY (World Assembly of Muslim youth) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে। রিয়াদে আন্তর্জাতিক স্কুল আলমানারাতও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। আমেরিকার ট্রিপল আই টি এরও প্রতিষ্ঠা করেন। সে সাথে ক্যানাডা ভিত্তিক মুসলিম সোশাল সাইন্টিস্টদের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ছিলেন হাফ ডজন আন্তর্জাতিক গবেষণা ম্যাগাযিনের সদস্য। ও আই সি সারা বিশ্বে ৩টা বড় বড় উঁচু মানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করে। যার একটা হয় মালেয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর। তিনি সে সময়ের শিক্ষামন্ত্রী আনোয়ার ইবরাহিম ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এ জন্য তাকে প্রায় জোর করেই আনা হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর করে। তিনি ১৯৮৮ সালে সেখানে যান ও ১৯৯৯ সালে সেখান বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেক উন্নত মানে এনে পরে চাকুরি ছেড়ে মাতৃভূমিতে চলে আসেন। মজার বিষয় হলো তিনি এতো বড় দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে কোন বেতন তো নিতেন না, বরং কোটি কোটি ডলার তিনি এখানে দান করেছেন।
আজ ১৮/০৮/২০২১ তিনি মক্কাতে ইন্তেকাল করেন। তার মেয়ে মুনা আব্দুল হামিদের টুইটারে আমি প্রথমে এটা জানতে পারি, পরে আমাদের আই আই ইউ এম এর হোয়াটসআপ এলামনাই গ্রুপের মাধ্যমে নিশ্চিত হই। আগামি পরশু ১১ই মুহাররাম মুতাবিক ২০শে আগস্ট জুমুয়ার পর কাবা শরীফে তার সালাতুল জানাযাহ শেষে দাফন হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদাওস দান করুন, ভুল ত্রুটি ক্ষমা করুন, ও শোক সন্তপ্ত পরিবারকে এই শোক কাটিয়ে ওঠার তাওফীক দান করুন।
আমরা যারা সাঊদিতে পড়েছি তাদের অধিকাংশ ইসলামি জ্ঞান নিয়েই পড়ার কারণে ঐ দেশের শায়খ শুয়ুখদের কথা আমরা বেশি জানি। এবং দেশের ইসলামি জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে তাদের অবদানের কথা আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু ওই দেশে অন্যন্য জ্ঞানে যারা ইসলামিক দার্শনিক হিসেবে প্রোথিতযশা তাদের খবর খুবই কম জানি। আজ আমি তাই আমার শিক্ষক আব্দুল হামিদ আবু সুলায়মানের ইসলামি জ্ঞানের অবদান সম্পর্কে জানানো দায়িত্ব মনে করছি।
ইসলামি জ্ঞান বলতে যারা আক্বীদাহ, কুরআন, হাদীস, ফিকহ ইত্যাদি বুঝান তারা ইসলামি জ্ঞানের সঠিক রূপরেখা জানেন বলে মনে হয়না। যে জ্ঞান বিশ্ব চালায়, সমাজ ঘোরায়, রাস্ট্র নিয়ন্ত্রন করে, সভ্যতা বিনির্মান করে, সংস্কৃতিতে আবহ তৈরি করে, মন রাজ্য তোলপাড় করে, আলোকিত জাতি বানায়, বিশ্বসেরা করে তা সবটাতেই ইসলাম একসময় নেতৃত্ব দিয়েছিলো। কিন্তু ঐ সবে এখন মুসলিম জাতি পর্যুদস্ত। ১৯৫০ এর পর দ্বিতীয় বিশ্ব পরবর্তি নতুন বিশ্ব ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে তখন মুসলিমরা ছিলো খেলাফত হারা, ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হারা, পন্ডিত হারা এবং বিশেষজ্ঞ হারা। ওই সময়ে আব্দুল হামিদ আবু সুলায়মানদের উত্থান, এবং তারাই হয়ে পড়েন বিশ্ববিদ্যলয়গুলোতে ইসলামি দর্শনের পরিচয় ঘটানোর মূল চালিকা শক্তি।
আমি মালয়েশিয়ায় ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত ছিলাম। সে সময় নিজ হাতে দেয়া তার দুইটা বই আমার কাছে গুছানো আছে। একটা হলো মুসলিম চিন্তার পূনর্গঠন কেন্দ্রিক, “আযমাতুল আক্বল আলমুসলিম” অন্যটি আধুনিক মানস গঠনে একজন মুসলিমকে যে সব বই পড়া উচিৎ তার একটা নির্ঘন্ট “দালীল মাকতাবাহ আল উসরাহ আল মুসলিমাহ”। তার প্রতিটা অনুষ্ঠান আমি শুনতাম, কারণ তার সাথে ছিলো আমার দুই দিকের সম্পর্ক। তিনি ছিলেন রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাণো অধ্যাপক, আমি ছিলাম ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাণো ছাত্র। আর খাঁটি ইসলামি চিন্তা, বিশেষ করে আলকুরআন ও সাহীহ হাদীসের ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই স্বচ্ছ ধারণার অধিকর্তা।
এই সময়ে তার যে সব দর্শন আমাকে ঋদ্ধ করে, ও আমার চিন্তার জগতে প্রভাব ফেলে সেগুলো নিচে বর্ণনা করছি। আমি আশা করছি আমার পাঠকগণ উপকৃত হবেন। এবং আমার বন্ধুরা আরো ব্যাপক লিখে আমার উস্তাযের জ্ঞানগুলো প্রচারে কাজ করবেনঃ
একঃ
গত শতকে যারা মুসলিম উম্মার চিন্তার রাজ্যে কাজ করা শুরু করেন, তারা প্রথমেই “ক্বাদায়া আল উম্মাহ আলইসলামিয়্যাহ” তথা মুসলিম উম্মাহর মূল সমস্যাগুলো নির্ণয় করতে প্রয়াস পান। তারা প্রথমেই দেখতে পান, মুসলিম ইন্টেলেকচুয়াল এখন মারাত্মক ভাবে অন্ধকারে। এই ব্যপারেই তিনিই প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন, “আযমাতুল আক্বল আল মুসলিম” নাম দিয়ে। এতে তার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, ইসলামি বিশ্বে অর্থের এখন অভাব নেই। আধ্যাত্মিকতা ও মূল্যবোধেও প্রাচূর্যতা আছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে আজকের বিশ্বে জ্ঞান- বিজ্ঞানে, চিন্তা- দর্শনে, আবিস্কার- উদ্ভাবনায়, জ্ঞানের মৌলিকতা ও সৃষ্টিশীলতায়, লেখা-প্রকাশনায়, তথা আধুনিক সভ্যতার সব কিছুতেই যেন পিছিয়ে পড়েছে মুসলিমরা।
তিনি ভাবতেন, যে সভ্যতা ও দর্শন একসময় শতাব্দির পর শতাব্দি ছিলো নেতৃত্বদানকারী। যাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিলো সারা দুনিয়ার অনুকরণীয়, যাদের অর্থ ব্যবস্থা ছিলো সারা বিশ্বের আবে হায়াত, যে সমাজ দর্শন ছিলো সারা দুনিয়ার পরিবর্তনের অনুঘটক তারা এমন হলো কেন?
তিনি মনে করেন, যে ইসলামি দর্শনের প্রধান উপাদান হলোঃ তাওহীদ, মেন্টরিং, সারা বিশ্বের জন্য মানানসই জ্ঞান এবং বিশ্ব পরিচালনায় কাজে লাগার মত তত্ব বা থিউরি। অথচ সেই জ্ঞান ও দর্শনের অধিকারীরা বিশ্ব সংসারে আজ পাদটীকা হয়ে গেছে, শতধা বিভক্ত হয়েছে, পিছিয়ে পড়েছে, এমনকি তাদের সার্বিক স্টান্ডার্ড এখন বৈশ্বিক স্টান্ডার্ডের অনেক নিচে।
মালয়েশিয়ায় এক বক্তৃতায় তিনি একবার বলেছিলেন, যে ইসলামি সভ্যতার প্রথম জেনারেশান ছিলো “مُتَتَلْمِذُونَ عَلَى القْرْآنِ، وكَانَ لَدَيْهمْ نَمُوذَجُ النَّبُوَّةْ “ অর্থাৎ কুরআনের ছাত্র ও নবুওয়াত ছিলো তাদের রৌল মডেল। এর অর্থ এই নয় যে, তারা কুরআনের আয়াত দিয়ে কথা বলতেন, হাদীসের কোটেশান দিয়ে আলাপ করতেন। বরং তাদের জ্ঞানের আকর ছিলো কুরআন ও হাদীসে রাসূল (সা)। তিনি উদাহরণ দেন, সায়্যিদুনা উমার (রা) একবার মিশরের গভর্ণর আমর ইবনুল আসকে (রা) ধমক দিয়ে বলেছিলেনঃ مَتَى اِسْتَعْبَدْتُمُ النَّاسَ، وقَدْ وَلَدَتْهُم أُمَّهَاتُهُم أَحْرَاراً মানে “কবে থেকে তুমি মানুষকে দাস বানাতে শুরু করলে, অথচ তাদের মায়েরা তাদেরকে স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছেন”। এই কথা কুরআন হাদীসে কোথায়ও নেই। অথচ যা তিনি বললেন তা হয়ে গেলো ইসলামের মূল শিক্ষার একটি। এইভাবে তারা পৃথিবীর স্রোত ধারা পরিবর্তন করেছিলেন, জীবন যাপন পদ্ধতি চেইঞ্জ করেছিলেন, সভ্যতা তৈরি করেছিলেন এমন শক্ত ভিতের উপর যা শত শত বছর ধরে টিকে ছিলো। তারা আরবি ভাষার যেমন উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন, তেমন ভাবে নানা ভাষায় ও সংস্কৃতিতেও ঝড় নিয়ে এসেছিলেন। সবচেয়ে মজার কথা হলো সে সময়ের সেরা দুই শক্তি রোম ওপারস্যের প্রতিটা চ্যালঞ্জের তারা জবাব শুধু দেননি, তাদেরকে হাত ধরে নতুনের কাছে নিয়ে এসেছিলেন।
দুইঃ
সেই উন্নত সভ্যতার চৈন্তিক স্খলন ও দার্শনিক বিপর্যয়ের বিচ্যুতির কারণ হিসেবে তিনি ৫টি বিষয় নিয়ে এসেছেন। যথাঃ
(ক) ইসলামের মূল শিক্ষার সাথে জ্ঞানগত, আক্বীদাহগত, আমলগত এমন কিছুর সংমিশ্রন ঘটেছে যা ইসলামের মূল জ্ঞান-বিজ্ঞান তথা ইলম ও হিকমাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় মুসলিম উম্মাহকে। কালক্রমে এভাবে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির উপরেও ছাপ পড়ে যায়। অথবা তাকে গন্ডিবদ্ধ করা হয় হয়ত কোন মাযহাবের মধ্যে, নতুবা কারো চিন্তা দর্শনের মাঝে কিংবা কোন রাজনৈতিক শক্তির নিগড়ে। ফলে নবীর (স) যুগের সেই স্বচ্ছ প্রস্রবনের অনেকাংশ শেষ হয়ে যায় সীমাবদ্ধ কূয়ায়।
(খ) ক্রমে ক্রমে ইসলামি চিন্তা দর্শন যেন ইতিহাস হয়ে গেল এবং জ্ঞান গবেষণায় মুসলিম মানস খুব দূর্বল হলো। নতুন ভাবনা, নতুন জগতের উপযুক্ত করে ইসলামের কথা গুলো সাজানোর ক্ষেত্রে উম্মাহ পিছিয়ে গেলো। যে চিন্তায় একেকজন সাহাবি দুনিয়ার একেক প্রান্তে যেয়ে জগতকে রাঙিয়ে ছিলেন, যে চিন্তার ঢেও বড় বড় ইমামগণ ইজতিহাদের সাগরে তুলতে পেরেছিলেন, তা যেন ক্ষয় হয়ে যেতে থাকে, দুষ্প্রাপ্য হয়ে যেতে থাকে, বদ্ধ খাঁচায় তড়পাতে থাকে। উম্মাতের মাথায় এমনও ঢুকে যায় যে, ইমামগণের পর ইজতিহাদের দরোযা আর খোলা নেই। যে যা বলবে তা ইমামদের বলয়েই থাকবে, নতুন কিছু আর হবে না।
(গ) তাক্বলীদ বা অন্ধ অনুসরণ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, যাকে অন্ধভাবে অনুগত্য করা হয়, তার কথা নবীর (সা) কথার বিপরীত হলেও নবীর (সা) কথাকে অগ্রাহ্য করতে শেখানো হতে লাগলো। নবীর (স) চেয়ে অন্য ব্যক্তি, দল, স্কুল অফ থট সবাইকে বড় করে দেখতে হলো। তাতে উম্মাহের অঙ্গ শতধা বিভক্ত হলেও যায় আসেনা যেন!
(ঘ) হিকমাহকে উম্মাহের জীবন থেকে ছুড়ে ফেলা হলো। হিকমাহর মূল প্রণোদনা ছিলো কুরআনের কথাগুলোর যথাযথ প্রয়োগ করতে শেখা। নতুন নতুন প্রশ্ন ও বিষয় এলে তার সমাধান করতে শেখা। নতুন কোন চ্যালেঞ্জ এলে তার মুখোমুখি হতে শেখা। এইজন্য কিতাব শেখানোর সাথে সাথে আমাদের নবী (সা) হিকমাহ শেখাতেন। যা ছিলো তাঁর জীবন আচরণ। সাহাবায়ে কিরাম আমাদের নবীর জীবনে কোন বিষয় না পেলে তা নিজের বুদ্ধি ও শুরায় সিদ্ধান্ত নিতেন। ঐগুলোকেও আমাদের নবী (স) মান্য হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু উম্মাহর জীবনে ঐসবের কোন ক্ষেত্র যেন আর বাকি থাকলো না।
(ঙ) সভ্যতার দর্শনগুলো সব যেন সেই গ্রীক, হিন্দু, পাশ্চত্যদের কাছ থেকেই নিতে হচ্ছে। মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে গেলো ওদের একচেটিয়া রাজত্ব। ঐখানে ইসলামের নাম গন্ধ যেন থাকবেনা। পাশ্চত্য দর্শন, পাশ্চত্য পদ্ধতি, পশ্চিমা মেথড সবই যেন মুসলিমদের টাকায় ও শ্রমে মুসলিমদের পড়াতে হবে, শিখাতে হবে, তোতার মত বুলি দিতে হবে মুখে। এভাবে প্রতিটি মুসলিম দেশে ইসলামি চিন্তা হলো দূর্বল, ইসলামের দর্শন হলো বলীর পাঠা।
আজ অবধি ইসলামি দর্শন বলতে ঐ সেই আগেকার কিছু মিউজিয়ামে থাকা বিষয়, আর এখনই চলার জন্য যে মত ও পথ তা হলো পশ্চিম থেকে আসা। এই ক্ষেত্রে আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের দর্শন চিন্তাকে আধুনিক যুগের জন্য উৎপাদনের উপযোগী বানাতে হবে। সেই জন্যই আসে মুসলিম সেন্টিমেন্ট তৈরি ও সংকল্পের বাঁধা।
তিনঃ
ডঃ আব্দুল হামিদ আবু সুলাইমানের এইটা আরেকটা শিক্ষা দর্শনের নাম। أزْمَةُ الإِرَادَة وَالوَجْدَانِ المُسْلِم । মুসলিম সেন্টিমেন্ট ও সংকল্প তৈরি হয় তারবিয়্যাহর মাধ্যমে। ইসলাম তাই শিক্ষাকে মেন্টরিং বা সার্বক্ষণিক পরিচর্যার মাধ্যমে কাওকে বড় করে তোলার দর্শনকে প্রমোট করে। তিনি এটাকে একজন সৈনিকের ট্রেইনিং প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করেছেন। বলেছেন একজন সেনাকে সাহস ও “অলা” বা দেশের সাথে কমিটমেন্টের উপর গড়ে তুলতে হয়। সরকার প্রধান চেইঞ্জ হতে পারে, দেশের প্রতি তার কমিটমেন্ট ঠিক থাকে, সাহসের সাথে। আমাদের নবী (সা) সেইটাই করেছেন। ছোটদের তিনি মেন্টরিং করতেন। কার ভেতরে কোন প্রতিভা আছে তা খুঁজে খুঁজে সেইভাবে প্রশিক্ষিত করেছেন। তাকে সাহসী বানাতেন। তারা নেতৃত্ব দিতেন। তাঁর সামনেই ১৭ বছর বয়সে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁর হাতে গড়া উসামা ইবন যায়েদ (রা)। কিন্তু আজ কি হচ্ছে, বাচ্চাদের “আক্বল” ও বুদ্ধিবৃত্তিকে খাট করা হয়। আমাদের পরবর্তি জেনারেশানের বুদ্ধিবৃত্তিতে খাদ ও ভ্রান্তি আছে বলা হয়। ফলে তাদের চিন্তা তাদের মাঝেই ঘুরে ফিরে, বাস্তব জগতে তার স্ফুরণ অথবা প্রকাশ হয়না কোথাও।
অন্য দিকে যারা তাদের পরিশীলিত করবে, বড় বানাবে তারা হোক না কোন প্রতিষ্ঠান, অথবা পলিসি অথবা রাজনীতি, তারা হয়ে গেছে পৃথিবির বড় বড় পরিবর্তনের সামনে গতিহীন ও স্বাভাবিক উন্নয়নের মুখোমুখি দাঁড়ানোয় অক্ষম। ফলে তাদের একমাত্র ভাষা হলো জবরদস্তি, জেল জুলুম বা তরবারি। ফলে একটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধি দাস শ্রেনীর উত্থান এখন সর্বত্র। যাদের মাঝে দুইটা রোগ মারাত্মক ভাবে সংক্রমিত হয়েছে। একঃ ভীরুতা। দুইঃ ইনিশিয়েটিভ বা পদক্ষেপ গ্রহনে অনীহা। ঠিক যেমনটি হয়েছিলো বানী ইসরাঈলের। মূসা (আ) যখন তাদের বললেন, আরদুল মুকাদ্দাসায় এগিয়ে যাও, সেটাই তোমাদের প্রমিজ ল্যান্ড বা ওয়াদা দেয়া দেশ। কিন্তু ওরা আমালিকাদের দেখে ভয় পেয়ে যায়। এবং সামনে যাবার গতি হারায়ে ফেলে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে আবার গড়ে তোলার দায়িত্ব দেন মূসা, হারুন, ইউশা ইবন নূন (আলাইহিমুসসালাম) কে। তাদের দেয়া হয় আলোময়ও জাগরণের তাওরাহ কিতাব, এবং ৪০ বছরের ট্রেইনিং সেশন। পরে স্বাধীন ও আল্লাহর উপর আস্থাশীল এক জেনারেশান সেই দেশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
চারঃ
তিনি এরই আলোকে দুইটি দর্শন নিয়ে কাজ করেন। একটা হলো এমন শিক্ষানীতি ও বিদ্যালয় তৈরি করা যা হবে বর্তমান জগতে পাশ্চত্যের বলয় থেকে বের হওয়ার “বিকল্প”। রিয়াদের আল মানারাতের মাধ্যমে প্রাইমারি থেকে কলেজ লেভেল পর্যন্ত শিক্ষার ইসলামি করণের কাজে হাত দেন। এবং ১৯৮৮ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় যেয়ে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়কে সুশোভিত করতে সচেষ্ট হন। তার একটা সাক্ষাতকারে এই শিক্ষা দর্শনকে ব্যাখ্যা করেন। তিনি শিক্ষা নীতির প্রথম ভাগকে বলে আযমআতুল ইরাদাহ ওয়াল উজদান। যার মূল নীতি হলো শিক্ষক শুধু জ্ঞান দান করে ক্ষান্ত হবেন না, ছাত্রের সাথে গড়ে তুলবেন অন্য রকম সম্পর্ক। তিনি বলেন, পাশ্চত্য শিক্ষা ব্যবস্থার মূল যায়গায় আসে প্রতিযোগিতা, বা survival for the fittest দর্শনে। সেখানে একজন ছাত্রের সাথে আরেকজনের সম্পর্ক হলো পৃথকীকরণ। সেখানে আরেকটা হলো নিজকে অন্যের উপরে স্থাপনের ভয়ংকর মানসিকতা। ফলে শিক্ষকের কাজ শিক্ষা দিয়েই শেষ।
তিনি মনে করেন ইসলামি তারবিয়্যাহর মূল প্রণোদনা হলো সব মানুষ আদম ও হাওয়ার সন্তান। এখানে প্রত্যেকের আলাদা আলাদা প্রতিভা ও প্রভাব থাকলেও সবাই এক দিকেই অগ্রসর হওয়া একে অপরে সহযোগী বা সতীর্থ। ফলে এদের সম্পর্ক জান্নাত পর্যন্ত পরিব্যপ্ত। এরই আলোকে তিনি ছাত্রদের মাঝে সম্পর্ক গড়ে তোলার দুইটা পদ্ধতি পরিচিত করানঃ
(ক)একটার নাম দেন উসরাহ, বা পরিবার। যেখানে একই ক্লাসে পড়া ছাত্র দের মাঝ থেকে যে বেশি তাক্বওয়ার অধিকারী ও লীডারশিপের যোগ্যতা রাখে তার নেতৃত্বে নির্দিষ্ট সংখ্যক ছাত্র বা ছাত্রী দিয়ে প্রতি সপ্তাহে নানা ধরণের প্রোগ্রাম করানো। এইগুলো থাকবে এতো অন্তরিকতায় ঋদ্ধ ও জ্ঞানের বিভায় বিকশিত যে, সবাই এখানে সময় দেয়া জীবনের একটা ব্রত মনে করবে।
(খ) দ্বিতীয় পদ্ধতির নাম দেন fostering বা পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের সম্পর্ক। এতে করে একজন ছাত্রকে খুব সফল এক পরিবারের কিছুদিনের জন্য পাঠানো হবে, সেখানে যেয়ে সন্তানের মর্যাদা নিয়ে সে থাকবে, তাদের ব্যবহার ও আচার আচরণে অভ্যস্ত হবে, এবং জীবনের জন্য রৌল মডেলের একটা যায়গা খঁজে পাবে। আমি দেখেছি এতে করে ছাত্রদের মাঝে অনেক বড় হবার সাধ যেমন জাগে, তেমন হীনন্মন্যতা থেকে মূক্ত হতে পারে।
পাঁচঃ
তার শিক্ষা দর্শনের আরেকটা দিক হলো “বিকল্প” উদ্ভাবন। আধুনিক জ্ঞান গবেষণা আজ থেকে দুই তিন শত বছর আগে এটাই করে ছিলো। তারা মুসলিমদের জ্ঞান বিজ্ঞান ধার নিয়ে সেখান থেকেই তা ডেভালপ করে সামনে এমন ভাবে নিয়ে যায়, এখনকার কেও জানেই না যে এই সব জ্ঞান বিজ্ঞানের অনেক কিছু মুসলিম শিক্ষানীতির প্রসবিত সন্তান। তিনি এই বিকল্পকে إِسلامِيَّةُ المَعْرَفَة বা জ্ঞানের ইসলামি করণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ভার্জিনিয়ার ট্রিপল আইটি হয়ে ওঠে এই প্রকল্পের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। আর একে কেন্দ্র করে উঠে দাঁড়ায় পৃথিবীর নানা দেশের অনেক স্কলার। এই দর্শনকে প্রাক্টিক্যাল ফিল্ডে আনতে তিনি যে কাজ করেন, তা হলোঃ
১- স্কুল, কলেজ, প্রি বিশ্ববিদ্যালয় কোর্স, বিশ্ববিদ্যালয় কোর্স সমূহের সিলেবাস কারিকুলামকে ইসলামি করণ করার পরিকল্পনা গ্রহন করেন। এর জন্য নতুন বই, যার কন্টেন্ট হবে ইসলামাশ্রিত, ব্যাপকভাবে প্রকাশ শুরু হয়। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ইসলামি করণ, বিজ্ঞান প্রযুক্তি, মেডিকেল সাইয়েন্স, অর্থ ও ফাইনান্স, এডমিন ও আইন, সব সব কিছুকে ইসলামের ছাঁচে ঢেলে সাজানো হয়। এর জন্য অর্থ লগ্নি হয় কোটি কোটি টাকা। এবং সেমিনার সিম্পোজিয়াম সহ বই প্রকাশ হতে থাকে ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর।
২- বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শোনা করা হয় খুবই প্রাগমটিক পন্থায়ঃ
(ক) এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যারাই পড়বে তাদেরকে কুরআন, আরবি ভাষা, ইংরেজি ভাষা ও ইসলামিক স্টাডীজের ৮টা আবশ্যক কোর্স নিতে হবে। যাকে বলা হবে URC, মানে University requirement course, এতে করে যে কোন ফ্যাকাল্টির ই হোকনা কেন তাকে মুসলিম মানস তৈরি করা সম্ভব হয়। অমুসলিম ছাত্রদের কুরআন পাঠ বাধ্য করা হয়না। তবে অন্য গুলো পড়তে হবে।
(খ) কিছু কোর্স হলো FRC বা faculty requirement course, যা কোন নির্দিষ্ট ফ্যাকাল্টির সবাইকে পড়তে হবে। ফলে ঐ ফ্যাকাল্টির মূল বিষয়গুলোতে ঐকমত্য তৈরি হয়। যেমন আমি আরবি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়েছি। কিন্তু আমার ফ্যকাল্টির নাম ছিলো IRKH বা Islamic Revealed Knowledge and Heritage, এতে আমাকে আরবি ভাষা ও সাহিত্য ছাড়াও অন্য কিছু কোর্স করতে হয়।
(গ) তিনি প্রতিটা বিভাগে স্পেশালাইজেশনের ক্ষেত্রে একাধিক বিষয় পরিচিত করেন, ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে কেও যেন বেকার না থাকে।
(ঘ) কো- কারিক্যুলাম ও এক্সট্রা কারিক্যুলাম সাবজেক্টগুলো এমন ভাবে ইসলাম সমৃদ্ধ ও আধুনিকায়ন করা হয় যে, বিশ্ব সেরা ফোরামগুলোতে এই বিশ্ববিদ্যলায়ের নাম ছড়িয়ে পড়ে।
তার এই বিকল্প উদ্ভাবনটা কালের চক্রে এখন কিছুটা হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা দেখেছি তা যথেষ্ঠ প্রভাব ফেলেছিলো।
ছয়ঃ
কিং সাঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অবদান ছিলো আরব বিশ্বের মধ্যে এই বিশ্ববিদ্যলয়ের লাইব্রেরিকে সেরা করে বানানো। মালয়েশিয়াতেও তিনি লাইব্রেরি গড়ে তোলেন সেরা করে। সমস্ত মত ও পথের বই এখানে পাওয়া যেতো। একবার আমার থিসিসের জন্য অনেক টাকার বই লাগতেছিলো। আমার সুপারভাইজার তার কাছে আলোচনা করতেই জবাব দিলেন বই এর লিস্ট লাইব্রেরিয়ান প্রফেসর ডঃ মুমতাযকে দিতে বলেন, আমি বলে দিচ্ছি ৩ সপ্তাহের মধ্যে এনে দেবে।
আমরা যারা বড় স্কলারশিপ নিয়ে পড়তাম, তাদের স্কলারশিপকে তিনি “শিক্ষা ঋণ” বলতেন। একবার তাকে আমরা একান্তে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, উস্তায এই যে আপনি আমাদের কাছ থেকে সিগনেচার নিয়ে এই দেয়া স্কলারশিপ কে ঋণ বানায়ে দিলেন, আমরা যদি শোধ না করতে পারি, তখন কি হবে? তিনি বললেন, আমি চাইনা তোমার মনের দিক দিয়ে ছোট হয়ে গড়ে ওঠো। এই টাকা তোমরা নিচ্ছ পড়া শুনা করে উম্মাতের কন্ট্রিবিউটার হবে। তখন তোমার তোমাদের সাধ্যমত এই টাকা পরিশোধ করবে, আর না পারলে তো স্কলারশিপ ই। এতে করে এই বিশ্ববিদ্যলায়ে অর্থের অভাব হবে না।
সাতঃ
ডঃ আব্দুল হামিদ অনেক অনেক বই ও গবেষণা আর্টিকেল লিখে গেছেন। বিশেষ ভাবে পরিচিতগুলো হলোঃ
১- আযমাতুল আক্বল আলমুসলিম (মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তির ক্রাইসিস)
২- দ্বারবুল মারআহ (স্ত্রীকে মারা)
৩- ইশকালিয়্যাতুল ইসতিবদাদ ওয়াল ফাসাদ ফিল ফিকর (চিন্তা ও দর্শনে স্বৈরাচারবৃত্তি ও ক্ষতি)
৪- জাযীরাতুল বান্নাঈন (সৃষ্টিশীলদের দ্বীপ)
৫- আন নাযরিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ লিল আলাক্বাত দাওলিয়্যাহ (ইসলামের দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক)
৬- আল ইসলাহ আল ইসলামি আলমুআসির (আধুনিক ইসলামি সংস্কার)
আল্লাহ তাআলা এই ক্ষণজন্মা প্রফেসরকে কবুল করুন, এবং তার সমস্ত অবদানকে জান্নাতে যাওয়ার উসীলাহ বানায়ে দিন, আমীন।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!