বিএনপির নির্বাচনী ঐক্য কত দূর

মঈন উদ্দিন খান

একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বেশ কিছু দিন ধরেই একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা করছে বিএনপি। ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা কিছু দলকে সাথে নিয়ে এই ফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ চলমান থাকলেও তা চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোতে সময় নিচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলন ও নির্বাচনী জোট গঠনে কোনো আপত্তি নেই ওই সব দলে। কিন্তু ফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টনের সুরাহা কিভাবে হবে, পার্লামেন্ট বা কেবিনেটে কিভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষিত হবে সে বিষয়ে আগেই ফয়সালা চান তারা। চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী থাকায় ‘জটিল’ এই প্রক্রিয়া সমাধানে ভেবেচিন্তে এগোচ্ছে বিএনপি। দলটির আশা ‘সন্তোষজনক’ ঐকমত্যের ভিত্তিতে বৃহৎ স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখেই অচিরেই গঠিত হবে এই নির্বাচনী মোর্চা।

চলতি বছরের শেষ দিকে অর্থাৎ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে ফল নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনী জোট গঠনের তৎপরতা শুরু করেছে। বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন থেকেই দল দুইটি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বিএনপি ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে গঠন করেছিল চারদলীয় জোট। ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর সেই জোট সম্প্রসারিত হয়ে প্রথমে ১৮ দল, পরে ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়। এবারো জোটের বাইরে আরো বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে নির্বাচনী ফ্রন্ট করতে চায় বিএনপি।

এই ফ্রন্ট গঠনের জন্য এ পর্যন্ত বিএনপি বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সাথে যোগাযোগ করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেÑ সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য এবং ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি বাম দলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম এমন কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ফ্রন্টে আনতে চায় বিএনপি। এসব দলের মধ্যে বিকল্প ধারা, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্য এই চারটি দল নিয়ে মাস কয়েক আগে গঠিত হয়েছে যুক্তফ্রন্ট। এই ফ্রন্টের নেতৃত্বে রয়েছেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও মাহমুদুর রহমান মান্না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন যে নির্বাচনী জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, তার নাম হতে পারে জাতীয় যুক্তফ্রন্ট।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী ফ্রন্ট গঠনের কোনো রূপরেখা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা ইতোমধ্যে একাধিকবার দলের নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে দলগুলো দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান, সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা ও দুর্নীতি কমিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় তারা একটি জোট গঠনেরও পক্ষে রয়েছেন। তবে কোন প্রক্রিয়ায় তা গঠিত হবে, তা নিয়ে কোনো পক্ষই এখনো একমত হতে পারেনি।

জানা গেছে, যুক্তফ্রন্টের নেতারা গত ২০ জুলাই গুলশানে বিকল্পধারা মহাসচিবের বাসায় সর্বশেষ যে বৈঠক করেছেন, তাতে বিএনপির সাথে নির্বাচনী ঐক্য গঠনের আগে বেশ কয়েকটি বিষয়ে সুরাহা হতে হবে বলে মত দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেÑ আসন বণ্টন অর্থাৎ ফ্রন্টভুক্ত দলগুলোকে বিএনপি কতগুলো আসন ছেড়ে দেবে, সেটির ফয়সালা চায় যুক্তফ্রন্ট নেতারা। এর পাশাপাশি গঠিত ফ্রন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে কেবিনেট গঠনে অংশীদারিত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়নে জরুরি বিষয়গুলো আগেই আলোচনা করে নিতে চায় তারা। গত কয়েকটি পার্লামেন্ট নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলগুলোর ইচ্ছেমতো ক্ষমতা ব্যবহার করার পটভূমি মাথায় রেখেই যুক্তফ্রন্ট নেতারা ক্ষমতার ভারসাম্য আনার এমন বিষয়টিতে জোর দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, নির্বাচনী ফ্রন্টে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কোনো কোনো দলের আপত্তি রয়েছে। ওই দলগুলো বলেছে, বিএনপিকেই এই সমস্যা সমাধানের পথ বের করতে হবে।

ঐক্যপ্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে আছে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও যুক্তফ্রন্ট নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘এটি এখন কোনো পর্যায়ে নেই। বিএনপি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রস্তাব তাদের কাছে করেছে। তাতে তারা সায় দিয়েছেন। কিন্তু ওয়ানডে ইলেকশনের জন্য তো আর জোট হতে পারে না। সেসব বিষয়ে তারা ভাবছেন, আরো বসবেন।’

তিনি বলেন, আসন ভাগাভাগির বিষয়টি এখনই তারা সামনে আনছেন না। তবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর যে কর্তৃত্বপরায়ণতা ফুটে ওঠে, সেটি যাতে কমিয়ে আনা যায়, সে জন্যই তারা ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টিতে কথা বলছেন। মান্না বলেন, তাদের মূল টার্গেট হচ্ছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান ও সুশাসন নিশ্চিত করা।
অন্য দিকে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বাচনী ঐক্য গঠনের কাজ চলছে। ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়ে যেসব কথা যুক্তফ্রন্ট নেতারা বলছেন, সে বিষয়ে বিএনপির এই নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সব বিষয়েই আলোচনা হচ্ছে।

এ দিকে বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বৃহত্তর জোট গঠনের পাশাপাশি একটি স্বল্পমেয়াদি আন্দোলনের পরিকল্পনাও করছে। অক্টোবরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।Daily Nayadiganta

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!