বাংলা নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি :প্রফেসর মুহম্মদ মতিউর রহমান

 

প্রাচীনকাল থেকে নববর্ষ উদ্যাপনের রেওয়াজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চালু আছে। এর মধ্যে প্রত্যেক জাতির নিজস্ব
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয় বিধৃত। ‘নববর্ষ’ অর্থে বছরের প্রথম দিন বুঝায়। ঐদিন বিভিন্ন উৎসব-আনন্দের মাধ্যমে নতুন
বছরকে বরণ করে নেয়া হয়। এ উৎসব-আনন্দের ধরন বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। এরমধ্যে বিশেষ দেশ-জাতি-জনগোষ্ঠির
সংস্কৃতির পরিচয় বিধৃত।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সন-তারিখ চালু আছে। প্রত্যেক সন বছরের ঠিক একই দিনে শুর“ হয় না।
তাই বিভিন্ন সনের প্রথম দিন বা নববর্ষও সারা বিশ্বে একই দিনে পালিত হয় না। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সন অনুযায়ী সারা
বিশ্বে বিভিন্ন দিনে নববর্ষ উদ্যাপিত হয়। বিশ্বব্যাপী খ্রীষ্টান স¤প্রদায় ইংরাজি নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জানুয়ারীতে নববর্ষ
উদ্যাপন করে। ৩১ ডিসেম্বরের রাত বারোটার পর থেকে তাদের নববর্ষ শুর“ হয়। ইয়াহুদীদের নিকট নববর্ষ ‘রাশহাস্না’ নামে
পরিচিত। প্রাচীন পারস্য তথা বর্তমান ইরান সাত দিনব্যাপী ‘নওরোজ’ উৎসব পালনের মাধ্যমে নববর্ষ উদ্যাপন করে। তাদের
নবর্ষের প্রথম দিন শুর“ হয় ২১ মার্চ তারিখে। হিজরী সন শুর“ হয় আরবি মাসের ১ মহররমে। বাংলা নববর্ষ শুর“ হয় ১
বৈশাখে। এভাবে বিভিন্ন সন বছরের বিভিন্ন সময়ে শুর“ হয়। ফলে তা উদ্যাপিতও হয় বিভিন্ন দিনে।
প্রত্যেক দেশ বা জাতিই তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় বিধান ও দেশীয় প্রথানুযায়ী নববর্ষ উদ্যাপন করে থাকে। প্রত্যেকের নববর্ষ
উদ্যাপনের রীতি-নীতি লক্ষ্য করলে এটা সহজেই উপলদ্ধি করা যায় যে, গোড়ার দিকে ধর্মীয় বিধি-বিধানই নববর্ষ উদ্যাপনে
গুর“ত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছে। কালক্রমে তার সাথে দেশীয় রীতি-প্রথার সংমিশ্রণ ঘটেছে। বর্তমানে একমাত্র হিজরী
নববর্ষ ব্যতীত অন্য সকল নববর্ষ উদ্যাপনে দেশীয় রীতি-নীতি, প্রথা ও সংস্কৃতির প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পা”েছ। অর্থাৎ
ধর্মের বহিরাবরণে সাধারণ মানবিক আচার-আচরণ, প্রথা-সংস্কার ও সংস্কৃতি ক্রমান্বয়ে নববর্ষ উদ্যাপনের প্রধান উপাদান
হয়ে উঠেছে। একমাত্র হিজরী নববর্ষ এর ব্যতিক্রম। হিজরী নববর্ষ উদ্যাপনে দেশীয় বা আঞ্চলিক রীতি-নীতি প্রথার কোন
প্রভাব নেই। শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রেরণা থেকেই বিশ্বব্যাপী মুসলিমগণ আবেগ-অনুভ‚তির সাথে এ দিনটি পালন করে থাকে। অন্য
ধর্মাবলম্বীরা যেভাবে তাদের নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে, হিজরী নববর্ষ উদ্যাপনের পদ্ধতি তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
হিজরী নববর্ষ উদ্যাপনে কোন জৌলুসপূর্ণ অনুষ্ঠান করার রেওয়াজ নেই। বড়জোর, ঐদিন ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে কোন
অনুষ্ঠানের আয়োজন করে হিজরী সনের উৎপত্তি তার গুর“ত্ব ও তাৎপর্য আলোচনা করা হয়। কেউ কেউ দোয়া-দরূদ পড়ে,
মিলাদ শরীফ পড়ে, নফল রোযা রেখে, নফল নামায পড়ে দিনটি উদ্যাপন করে থাকে। বাহ্যিক কোন অনুষ্ঠান বা আনন্দ-
স্ফূর্তির ব্যব¯’া মুসলিম বিশ্বে ঐদিনে কেউ কখনো করে না। হিজরী সনের বিভিন্ন মাস ও তারিখ অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী
মুসলমানেরা বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগী ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। সেদিক থেকে হিজরী সনের একটি আন্ত
র্জাতিক রূপ রয়েছে।
মুঘল আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে সরকারী সন ছিল হিজরী। এখনো বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে রাষ্ট্রীয় কাজে হিজরী
সনকে মান্য করা হয়। মুঘল আমলে সরকারী সন হিজরী হলেও তারা ইরানি ঐতিহ্য অনুযায়ী ‘নওরোজ’ উৎসব পালন
করতো। মুঘল সম্রাট হুমায়ন সর্বপ্রথম এ উৎসবের প্রচলন করেন। এরপর সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বিশেষ জাঁকজমকের
সাথে নওরোজ উৎসব প্রতিপালিত হয়। মুঘল সম্রাট আকবর খাজনাদি আদায় ও অন্যান্য রাজকর্ম সম্পাদনের সুবিধার জন্য
নতুন সন তথা বাংলা সন প্রবর্তন করলেও তারা ১ মহররম বা ১ বৈশাখ এ কোনটাতেই নববর্ষ পালন করতেন না। পরবর্তীতে
সম্রাট আকবর যেমন বাংলা সন প্রবর্তন করেন, তেমনি তাঁর প্রবর্তিত নতুন ধর্ম ‘দীনে-এলাহি’র স্বারক হিসাবে ‘এলাহি সন’
নামেও একটি নতুন সন প্রবর্তন করেন। এলাহি সনের প্রথম দিনে তিনি ‘নওরোজ’ উৎসব পালনেরও ব্যব¯’া করেন। নওরোজ
উৎসব ছিল সম্পূর্ণ পারস্যের রীতি অনুযায়ী। এতে ইসলাম-পূর্ব পারসিক রীতি-রেওয়াজ অনুসৃত হতো, ইসলামী ভাবধারার
কোন প্রতিফলন এতে পরিলক্ষিত হতো না। আকবর-প্রবর্তিত বাংলা সন বাংলায় ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও ¯’ায়িত্ব লাভ
করলেও তাঁর প্রবর্তিত ‘দ্বীনে-এলাহি’ যেমন কেউ গ্রহণ করেনি, তেমনি দ্বীনে এলাহী সনও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
প্রায় অর্ধ সহস্র বছর পূর্বে বাংলা সনের উৎপত্তি ঘটলেও বাংলা নববর্ষ বা ১ বৈশাখ উদ্যাপনের কোন প্রাচীন ঐতিহ্য
খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে বহুজাতির বাস। প্রাচীন যুগ থেকে এখানে শক-হুন-দ্রাবিড়, আর্য-অনার্য, জৈন-বৌদ্ধ, হিন্দুমুসলিম-খ্রীষ্টান
ইত্যাদি জাতি-ধর্ম ও স¤প্রদায়ের বসবাস। এখানে বসবাসকারী কোন জনগোষ্ঠীই কখনো বাংলা নববর্ষ
উদ্যাপন করেছে বলে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের পর থেকে এখানে মুসলিম
সমাজ ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে হিজরী নববর্ষ পালন করে এসেছে। সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা সন প্রবর্তিত হলেও
বাঙালি মুসলমানগণ কখনো বাংলা নববর্ষ বা ১ বৈশাখ উদ্যাপন করেছেন বলে জানা যায় না। বাংলাদেশ শতকরা ৯০ জন
মুসলিম অধ্যূষিত অঞ্চল। মুসলিমদের কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাংলা সন অনুযায়ী পালিত হয় না। ইসলামের সকল উৎসবঅনুষ্ঠান
বা ধর্মীয় বিধি-বিধান হিজরী সনের সাথে সংশিষ্ট। সে হিসাবে এটা আন্তর্জাতিক ও বিশ্বের সকল মুসলমানের জন্য
এক ও অভিন্ন। পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের রেওয়াজ সম্পূর্ণ অভিনব ও সা¤প্রতিক কালের উদ্ভাবনা।
হিন্দুদের বার মাসে তের পার্বণের রেওয়াজ থাকলেও পয়লা বৈশাখে নির্দিষ্ট কোন পার্বণ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নেই। তাদের
চৈত্র-সংক্রান্তির অনুষ্ঠান মূলত চৈত্রের শেষ দিনে উদ্যাপিত হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত মেলা অবশ্য চৈত্র মাস অতিক্রম
করে অনেক সময় বৈশাখ মাসের কয়েক দিন পর্যন্ত চলতে থাকে। কিš‘ তাই বলে তা কখনো নববর্ষের উৎসব হিসাবে গণ্য
হয় না, চৈত্র-সংক্রান্তির মেলা বা উৎসব হিসাবেই তা সকলের নিকট পরিচিত। তাছাড়া, চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে যে সব
অনুষ্ঠানাদি হয়, তা অনেকটা নিষ্ঠুর ও লোমহর্ষক। ঐদিন একজন মানুষের বুকে-পিঠে বা জিহŸায় বর্শি বিদ্ধ করে কাঠের
সাথে বেঁধে চড়কির মতো ঘুরিয়ে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ করা হয়। এ ধরনের নির্দয় অনুষ্ঠানের মধ্যে কোন
আনন্দানুভ‚তির প্রকাশ ঘটা সম্ভব নয়। অতএব, নববর্ষের উৎসব হিসাবে তা গণ্য হবার আদৌ উপযুক্ত নয়।
বৌদ্ধদের কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানও ১ বৈশাখে উদ্যাপিত হয় না। ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ নামে তাদের যে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান তা
বৈশাখ মাসে পূর্ণিমার রাতেই উদ্যাপিত হয়ে থাকে। ঐদিন বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জš§ ও মৃত্যু দিন হিসাবে
এটা সারা বিশ্বে বৌদ্ধদের নিকট অতি পবিত্র দিন। তাই তারা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন
করেই বৈশাখী পূর্ণিমা উদ্যাপন করে থাকে। ১ বৈশাখ বা নববর্ষ হিসাবে তাদেরও কোন নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান নেই। একসময়
বৌদ্ধ পাল যুগে বাংলাদেশে যখন বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতির একাধিপত্য ছিল, তখনো ১ বৈশাখে তারা কখনো নববর্ষের কোন
উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বলে জানা যায় না। পার্বত্য উপজাতীদের একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নাম ‘বৈসাবি
উৎসব’। চৈত্রের শেষ দিন থেকে বৈশাখের প্রথম দু’দিন মোট তিন দিন ধরে তারা এ উৎসব পালন করে। সাধারণত কুমারী
মেয়েরা এ অনুষ্ঠানে অবিবাহিত তর“ণদের সাথে মিলে এটা উদ্যাপন করে। এটা মূলত পানি উৎসব অর্থাৎ পরস্পরের গায়ে
পানি ছিটিয়ে তারা আনন্দ-স্ফ‚র্তিতে মত্ত হয়। অতএব, এটাও যে বৈশাখের প্রথম দিন উদ্যাপিত হয়, তা বলা যায় না।
বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের ক্ষেত্রে মাত্র দু’টি অনুষ্ঠানের কথা এখানে উলেখ করা যায়। একটি ‘হালখাতা’ ও অন্যটি
‘পূণ্যাহ’। সাধারণত জমিদারগণের বকেয়া খাজনাদি আদায়ের জন্য আগেকার দিনে মহাধূমধামের সাথে ‘পূণ্যাহে’র আয়োজন
করা হতো। এখনো বিভিন্ন উপজাতীয়দের মধ্যে পূণ্যাহ উদযাপনের রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। এটা মূলত খাজনা আদায়
এবং প্রজাদের নিকট থেকে নজর-নেয়াজ আদায়ের উদ্দেশ্যে উপজাতীয় রাজাদের বাড়িতে এ উৎসব পালিত হয়। এটা রাজার
প্রতি প্রজার আনুগত্য প্রদর্শনেরও এক সুবর্ণ মুহূর্ত।
‘হালখাতা’র আয়োজন বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। ব্যবসায়ী-মহাজন, সুদে টাকা লগ্নীকারী, সোনারূপা
বন্ধককারীগণ বকেয়া পাওনা ও সুদের টাকা উসূল করার জন্য হালখাতার আয়োজন করা হয়। রাজস্ব-বর্ষের শেষ মাস
হিসাবে সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে পূণ্যাহ এবং বর্ষ শুর“র মাস হিসাবে বৈশাখের প্রথমার্ধে হালখাতা পালিত হয়।
ফসলাদির অব¯’া ও প্রজাসাধারণের আর্থিক সঙ্গতির কথা বিবেচনা করে এ দুটি অনুষ্ঠানের দিন-ক্ষণ ঠিক করা হয়।
‘হালখাতা’র আয়োজন তো সারা বৈশাখ মাস ধরেই চলে এবং এখনো এভাবেই চলে আসছে। কিš‘ বাংলা নববর্ষ বা ১
বৈশাখের সাথে এ দুটি অনুষ্ঠানের তেমন কোন সম্পর্ক-সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৬ সালে জমিদারী প্রথা উ”েছদ করা হয়। ফলে পূণ্যাহের অনুষ্ঠানও অনেকটা অবান্তর
হয়ে পড়ে। তবু পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন কোন উপজাতির মধ্যে সামাজিক রীতি ও রাজার প্রতি বিশেষ আনুগত্য প্রদর্শনের
রেওয়াজ হিসাবে তা এখনো প্রচলিত আছে। হালখাতার রেওয়াজ বাতিল হয় নি। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি ব্যবসায়ীগণ
দীর্ঘকাল থেকে হালখাতার আয়োজন করে আসছে। ‘হাল’ অর্থ চলতি, ‘খাতা’ অর্থ হিসাব বা হিসাবের খাতা। দুটোই ফারসি
শব্দ, একত্রে এ দু’টি শব্দের অর্থ হলো নতুন হিসাব বা পুরাতন বছরের দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাবের খাতা
খোলা। তাই ‘হালখাতা’র সাথে মুসলিম ঐতিহ্যের সম্পর্ক বিদ্যমান।
পুরনো বছরের বকেয়া আদায় করে নতুন বছরের শুর“তে নতুন হিসাবের খাতা খোলার পদ্ধতি হিসাবে বাঙালি হিন্দুমুসলমানের
জন্য হালখাতা একটি পুরনো রেওয়াজ। কিš‘ তাই বলে এটাকে নববর্ষের অনুষ্ঠান বলা যায় না। এটা একটি
মহাজনী পদ্ধতি। ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে এর যতটা সম্পর্ক, বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ততটা নয়, বাংলা নববর্ষের সাথে তো
নয়ই। কারণ অনিবার্যভাবে এ অনুষ্ঠান কখনো বৈশাখের প্রথম দিন উদ্যাপিত হয় না, আগে যেমন এখনো তেমনি বৈশাখের
শুর“র দিকে অথবা বৈশাখ মাসের যে কোন দিন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাছাড়া, এ অনুষ্ঠান কেবল স্বল্পসংখ্যক
ব্যবসায়ী-মহাজন ও টাকা লগ্নীকারীদের, তাদের বকেয়া টাকা উসূল বা লগ্নীকৃত টাকার সূদ আদায়ের উপলক্ষ হিসাবে এ
অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিপুল সংখ্যক দরিদ্র শ্রেণীর খদ্দের তাদের গাঁইটের পয়সা দিয়ে মহাজনের পাওনা শোধ
করার বা উ”চহারে সূদের টাকা পরিশোধ করার জন্য যে অনুষ্ঠানে যোগদান করে সেটাকে সর্বজনীন আনন্দোৎসব বলা যায়
না। এ অনুষ্ঠান সকলে মিলে কোন একটি নির্দিষ্ট দিনেও পালন করে না। যার যার সুবিধামত দিন-ক্ষণ অনুযায়ী এর আয়োজন
করে থাকে। সে কারণেও এটাকে সর্বজনীন বলা যায় না। তাছাড়া, হিন্দু সমাজ ও মুসলিম সমাজের ‘হালখাতা’, বৌদ্ধদের
‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ ও পার্বত্য অঞ্চলে ‘পূণ্যাহ’ পালনের পদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও পার্বত্য উপজাতীয়গণ
তাদের ভিন্ন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। ফলে এতে কোন একক বাঙালি সংস্কৃতি নয়, বরং বাঙালি
হিন্দু, বাঙালি মুসলিম, বাঙালি বৌদ্ধ ও পার্বত্য উপজাতীয়দের স্বতন্ত্র সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে থাকে।
বৈশাখ মাসে উদ্যাপিত আর একটি অনুষ্ঠানের নাম ‘নবান্ন’। নতুন ফসল ঘরে তোলার পর যে অনুষ্ঠান করা হয় সেটাই
নবান্ন অনুষ্ঠান। কিš‘ এটা পালনেরও কোন নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ নেই। তাছাড়া, শুধু বৈশাখ মাসেই নয়, পৌষ মাসেও আমন ধান
কাটাকে উপলক্ষ্য করে নবান্ন উৎসব পালিত হয়। বলাবাহুল্য, এ অনুষ্ঠানটিও হিন্দু-মুসলিম উভয় স¤প্রদায় চিরকাল ভিন্ন
রীতি-পদ্ধতিতে তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী উদ্যাপন করে আসছে।
আগের দিনে ঘটা করে নবান্নের অনুষ্ঠান হতো। সাধারণত হিন্দু সমাজ এ অনুষ্ঠান পালনে অগ্রণী ভুমিকা পালন করতো।
মুসলিম সমাজে এটা এতটা ব্যাপকতা পায়নি। এটা অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান কাটার মৌসুমে একবার এবং বৈশাখে আউস
ধান কাটার মৌসুমে আরেকবার অনুষ্ঠিত হয়। বলাবাহুল্য, এক্ষেত্রেও হিন্দু ও মুসলমান উভয় স¤প্রদায়ের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ
ভিন্ন প্রকৃতির। উভয়েই তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ফলে এর মাধ্যমে বাঙালির
একক কোন সংস্কৃতি নয়, বরং উভয়ের ভিন্ন সাংস্কৃতিক জীবনধারার পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হিন্দুরা নতুন ধান-দুর্বা, আম-জাম-কলা-লিচু ইত্যাদি ফল এবং মৌসুমী নানা ফুল দিয়ে প্রসাদ তৈরি করে মাটির তৈরি
মূর্তি তথা তাদের কাল্পনিক দেব-দেবীর পাদমূলে অর্ঘ্য হিসাবে নিবেদন করে, মন্দিরের পুরোহিত নানারূপ মন্ত্রো”চারণ করে,
পূজা-অর্চণা শেষে নিবেদিত নৈবেদ্যের সদ্ব্যবহার করে। তাদের ভক্ত-অনুরক্তরা ও মন্দিরগামীরাও প্রসাদ পেয়ে পরমার্থ লাভের
আনন্দে খুশী হয়। আগেকার দিনে এসব অনুষ্ঠানে নাচ-গান, বাদ্য-বাজনার ব্যব¯’া থাকতো। মন্দিরের ঠাকুর-পুরোহিত,
পূজারী ও দেবানুগ্রহ-প্রত্যাশীদের জন্য এটা ছিল রীতিমত আনন্দোৎসব। হিন্দুদের মধ্যে এখনো নবান্নের উৎসব পালিত হয়,
কিš‘ আগের দিনের সে আড়ম্বর এখন আর চোখে পড়ে না।
অন্যদিকে, নবান্ন উপলক্ষে মুসলমানগণ মোলা-মুনশী-মুরব্বী ও আত্মীয়-প্রতিবেশীদের জিয়াফত করে মিলাদ মাহফিলের
আয়োজন করে। নতুন ধানের তৈরি ভাত, পিঠা, মোয়া-মুড়কি-নাড়–, আম, কলা, জাম ইত্যাদি নানা রকম ফল, গাইয়ের দুধ
ইত্যাদি পরিবেশন করে সংসারের আয়-বরকত, সকলের কল্যাণ ও পরলোকগত ব্যক্তিদের মাগফিরাত কামনা করে আলাহর
দরবারে দোয়া করে। মসজিদে শিরণী, পায়েশ, খিচুরী ইত্যাদি পাঠায়, মুসলীগণ ও গরীব-মিসকিনরা তা খেয়ে দোয়া করে।
কখনো আত্মীয়-স্বজনকে বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে এনে খাওয়ায়, কখনো তাদের বাড়িতে নতুন ফসলে তৈরি পিঠা, মুড়ি,
মুড়কি, নাড়–, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি পরব হিসাবে পাঠায়। এ রকম বিভিন্ন উৎসব-আনন্দে মুসলিম বাঙালিরা বছরের প্রথম
মাসটি অর্থাৎ বৈশাখ মাস (অনিবার্যভাবে ১লা বৈশাখ নয়) উদ্যাপন করে। তবে মুসলমানদের এসব অনুষ্ঠান ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের
মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়। তাতে কখনো নাচ-গান, বাদ্য-বাজনার আয়োজন থাকে না।
বাংলা নববর্ষ বা ১ বৈশাখে পূর্ব থেকে কোন উৎসব-অনুষ্ঠান চালু না থাকলেও বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখে বহু পূর্ব
থেকে নানা উৎসব-অনুষ্ঠান চালু রয়েছে। ব¯‘ত বাংলা সন চালু হবার বহু পূর্বেই ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে বিভিন্ন ঋতু বা
মাসে বিচিত্র উৎসব-অনুষ্ঠান চালু আছে। বৈশাখ মাসে নতুন ফসল ঘরে তুলে কৃষকরা যেমন সরকারী রাজস্ব আদায় করে,
অন্যদিকে তেমনি ব্যবসায়ী ও দোকানীরা হালখাতার আয়োজন করে ভোক্তাদের নিকট থেকে তাদের পাওনা আদায় করে
থাকে। হালখাতা উপলক্ষে ব্যবসায়ী-টাকা লগ্নীকারী ও মহাজনগণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, চিড়া-মুড়ি, দই-মিষ্টির দ্বারা
তারা স্ব স্ব গ্রাহক-খদ্দের-শুভানুধ্যায়ীদের আপ্যায়নের ব্যব¯’া করে। হালখাতা অনুষ্ঠানটি ব্যবসায়ীদের জন্য খুব গুর“ত্বপূর্ণ।
তাদের জন্য বাকি-বকেয়া উসূলের এটি একটি সুবর্ণ মুহ‚র্ত। হিন্দু মহাজনগণ যারা আগের দিনে উ”চ সূদে গরীব কৃষকজনসাধারণকে
টাকা ধার দিত, সোনা-রূপার গহনা, থালা-ঘটি-বাটি ইত্যাদি বন্ধক রাখতো তারাও এ সময় বিগত এক বছরের
সূদের টাকা কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিত। এমন একটা সময় ছিল যখন সুদূর আফগানিস্তান থেকে লম্বা লাঠি হাতে,
পাগড়ি পরা কাবুলিওয়ালারা এসেও বাংলার গরীব কৃষকদের টাকা ধার দিত, নতুন বছরে ফসল কাটার সময় তারাও এসে
সূদের টাকা উসূল করে নিত। তাই বৈশাখ মাস যেমন ফসলের মাস, প্রাপ্তির মাস, আবার তেমনি দেনা-পাওনা পরিশোধের
মাস হিসাবেও গুর“ত্বপূর্ণ।
বৈশাখ মাসে প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশে বিভিন্ন মেলার আয়োজন হতো। মেলায় কৃষকের উৎপন্ন দ্রব্য-বিভিন্ন
জাতীয় ফল, ফসলাদি, তাঁতীর তৈরি কাপড়-চোপড়, কামার-কুমারের বিভিন্ন তৈজষ-পত্র, কাঠ মিস্ত্রির তৈরি কাঠের
আসবাবপত্র, স্বর্ণকারদের সোনা-রূপার গহনা, নানা জাতীয় মিষ্টি, তরি-তরকারি, বাঁশ-বেতের তৈরি নানা জাতীয় আসবাবপত্র,
খেলনা ইত্যাদি অসংখ্য পণ্যদ্রব্য মেলায় আসতো। এটা বাঙালি সাধারণ মানুষের জন্য একদিকে যেমন অর্থকরী ফায়দা
নিয়ে আসে, অন্যদিকে তেমনি নানারূপ প্রয়োজনীয় সামগ্রী এক সঙ্গে পাওয়ার আনন্দে সকলে মেলায় আসে। ছেলেমেয়েদের
জন্যও এটা এক আনন্দের উৎসব। তাই বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত এসব মেলার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুর“ত্ব রয়েছে।
অবশ্য এসব মেলা যে বৈশাখের ১ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় তা নয়। আবার বৈশাখ মাস ছাড়া অন্যান্য মাসেও গ্রাম-বাংলা বিভিন্ন
ধরনের উৎসব-আনন্দ ও মেলার আয়োজন করা হয়।
বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম মাস হিসাবে এ মাসে একটা নবতর আবেগ অনুভ‚তি লাভের অবকাশ যেমন আছে তেমনি
বৈশাখের অন্য একটি রূপও আমাদের নিকট অতি পরিচিত। অনেক সময় খরা, অনাবৃষ্টি অথবা অকাল বন্যা আমাদের
একান্ত প্রত্যাশার ফসল বিনষ্ট করে ঘরে ঘরে বিষাদের কালো ছায়া বিস্তার করে। এছাড়া, কাল বৈশাখীর তাণ্ডব সম্পর্কে
তো সকলেই অবগত। অনেক সময় বৈশাখের প্রচণ্ড ঝড়ে গ্রাম-বাংলার সুখের সুনিবিড় ছায়াঘেরা ঘর-দুয়ার ভেঙ্গে তছনছ
হয়ে যায়। সে সাথে স্বপ্নভঙ্গ হয় সাধারণ অল্পবিত্ত অগণিত মানুষের। তখন বৈশাখ আনন্দ-উৎসবের মাস না হয়ে বিষাদের
বেদনাঘন অনন্ত দুঃখের মাসে পরিণত হয়। এভাবে বৈশাখ শুধু যে ‘ফসলী মাস’ হিসাবে বাঙালির নিকট আনন্দের মাস তা
নয়, কখনো ‘কাল-বৈশাখী’র রূপে তা ভয়াবহরূপেও ধরা দেয়।
বাঙালি হিন্দু-মুসলিম নিজ নিজ ধর্মীয় নিয়ম-নীতি ও প্রথানুযায়ী বৈশাখ মাসটি উদ্যাপন করলেও ১ বৈশাখ বা বাংলা
নববর্ষের প্রথম দিন সম্পর্কে কারোই কোন সচেতনতা ছিল না। আগেকার দিনে ১ বৈশাখে বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন
হতো না। বৈশাখ মাস ফসল কাটার মাস। তাই এ মাসে কৃষক-কৃষাণীগণ অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটায়। অনেকে খাবার সময়
পর্যন্ত পায় না, অনুষ্ঠান করার কথা ভাববার সময় কোথায়? অনেক সময় বৈশাখের নতুন পানির ঢল অকস্মাৎ কৃষকের পাকা
অথবা আধা পাকা ফসল ডুবিয়ে দেয়। তখন সারাদিন এমন কি রাতের বেলায়ও ডুবন্ত ফসল কেটে ঘরে তোলার কাজে
কৃষককে ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই আনন্দ-ফ‚র্তি বা অনুষ্ঠান করার মতো মনের অব¯’া তখন কারোই থাকে না। তবে ঠিক
মত ফসল ঘরে তোলার পর কৃষাণ-কৃষাণির মনে যে অনাবিল আনন্দের হিলোল বয়ে যায়, তার কোন তুলনা নেই।
অবশ্য হালখাতার অনুষ্ঠান অনেকে ১ বৈশাখে করে, আবার অনেকে বৈশাখ মাসের প্রথম দিকে এমনকি বৈশাখ মাসের
যে কোন দিন করে থাকে। এখনো ঠিক সেভাবেই চলে আসছে। হালখাতা অনুষ্ঠানের দিন হিসাবে ১ বৈশাখ কখনো নির্দিষ্ট
ছিল না, এখনও নেই। তাই বলা যায়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশ ও জাতিসমূহ বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে বা নতুন বছরের প্রথম
দিনে নববর্ষ উদ্যাপন করে থাকে। কিš‘ বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকে কখনও বছরের কোন একটি নির্দিষ্ট দিনে অথবা
নববর্ষের প্রথম দিনে বর্ষবরণ করার রীতি চালু নেই। মূলত পুরো বৈশাখ মাসটাই হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ সকলে স্ব স্ব ধর্মীয়
বিধান অনুযায়ী উদ্যাপন করে আসছে।
পাঁজি-পুঁথি, দিন-ক্ষণের হিসাব অনুযায়ী যতটা নয়; তারচেয়ে মওসুম হিসাবে বাঙালির নিকট এসব উৎসব-আনন্দের
কদর সর্বদা পরিলক্ষিত হয়েছে। অন্যান্য জাতি বিশেষত ইংরাজগণ যেমন বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষ ধরনের উৎসবঅনুষ্ঠানের
আয়োজন করে থাকে। বছরের অন্যান্য দিন তারা কঠোর পরিশ্রম করতে অভ্য¯’, বাঙালিরা সেদিক থেকে
অন্যরকম। তারা স্বভাবগতভাবে সংবৎসরই অল্প-বিস্তর কিছু একটা আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকতে পছন্দ করে। এ কারণেই
বাঙালি হিন্দু সমাজে বার মাসে তের পার্বণের রেওয়াজ চালু হয়েছে। এটা হলো এমন কিছু প্রথা বা সংস্কার যা দীর্ঘকাল ধরে
ধীরে ধীরে তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এতে ষড় ঋতুর একটি প্রভাবও পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীতে এটা তাদের ধর্ম
বা সংস্কৃতির অংগে পরিণত হয়েছে। তাই বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি প্রধানত ঋতু-বিবর্তনের সাথে
বহুলাংশে সংশিষ্ট। ষড়ঋতু-ভিত্তিক তাদের বিভিন্ন উৎসব-আনন্দ, আচার-অনুষ্ঠানের সাথে বিভিন্ন দেব-দেবীর মাহাত্ম্য যুক্ত
হয়ে কালক্রমে তা ধর্মীয় গুর“ত্ব লাভ করেছে। সে দিক থেকে হিন্দু ধর্ম-সংস্কৃতি বহুলাংশে লোকজ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। অনেকে
এটাকে আবহমান বাঙালির সংস্কৃতি বলে দাবী করেন।
কিš‘ আবহমান বাঙালির সংস্কৃতি বলে কোন একক সংস্কৃতি এদেশে কখনো ছিল না, এখনো নেই। প্রকৃতপক্ষে, আবহমান
কাল থেকে বাঙালি হিন্দু, বাঙালি বৌদ্ধ ও বাঙালি মুসলিমদের স্ব স্ব ভিন্ন সংস্কৃতি ছিল এবং এখনো তা বিদ্যমান রয়েছে।
প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও প্রথার ভিত্তিতে ভিন্ন সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে। ধর্মীয় প্রথানুযায়ী তারা প্রত্যেকে
নিজ নিজ উৎসবাদি পালন করে থাকে। মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ নির্বিশেষে বাঙালির কোন একক সর্বজনীন উৎসব-আনন্দ কখনো
ছিল না। কারণ প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় বিধি-বিধান অনুযায়ী উৎসব-আনন্দ উদ্যাপন করতো। অতএব, ভিন্নতা
ছিল অনিবার্য। তবে এ ভিন্নতা কখনো কোনরূপ বিরোধ বা সংঘর্ষের জš§ দেয়নি। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই নির্বিবাদে
ও শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ উৎসব-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে থাকে। এটাই আবহমান বাঙালির ঐতিহ্য।
বাংলাদেশ সর্বদাই ধর্মীয় স¤প্রীতির দেশ। বিশেষত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি ইসলামের অনুসারী। ইসলাম মানুষে
মানুষে স¤প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাব¯’ানের নীতি প্রচার করে। ফলে মুসলমানগণ সহনশীলতা, মানবিক স¤প্রীতি ও উদার
ভ্রাতৃত্ববোধে বিশ্বাসী। অন্য ধর্মের উপর জোর-জবরদস্তিতে তারা বিশ্বাসী নয়। বাংলাদেশে মুসলিম শাসনামলের সাড়ে
পাঁচশ বছরের ইতিহাসে একটিও সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় নি। মুসলিম শাসকগণ সর্বদা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের
প্রতি সমান ও উদার ব্যবহার করতেন, কেউ ন্যায়বিচার ও রাজানুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হতো না। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনে তারা
ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও নির্বিবাদে তারা স্ব স্ব ধর্ম পালন করত। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায়ও সকলে মুসলিম
শাসকদের নিকট থেকে সমান পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতো।
পরবর্তীতে ইংরাজ আমলে সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি বহুলাংশে বিনষ্ট হয়। তখন মুসলিমগণ নানাভাবে বঞ্চিত, শোষিত ও
নির্যাতিত হতে থাকে। অন্যদিকে, হিন্দুরা রাজানুগ্রহ পেয়ে অপরিমিত বিত্ত-বৈভব, জমিদারি-জোতদারি, চাকরি-বাকরি ও
বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে রাতারাতি অকল্পনীয় উন্নতি লাভ করে। ইংরাজদের ভেদ-নীতির কারণে হিন্দু-মুসলিম দ্ব›দ্ব সৃষ্টি
হয়। রাজানুগ্রহপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের দ্বারা সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিমগণ নানাভাবে নিগৃহীত হন। সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির মূল
কারণ এটাই। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাক্কালে উপমহাদেশের মুসলিমদের ন্যায্য দাবি অনুযায়ী যখন ভারত বিভক্ত হয়ে
‘পাকিস্তান’ নামে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন এ সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা আরো ভয়াবহ রূপ লাভ করে।
ইংরাজ আমলে রাজানুগ্রহ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে হিন্দুরা মুসলিম সমাজের উপর দীর্ঘকাল ধরে যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-
সামাজিক আধিপত্য বিস্তার ও শোষণ-নিপীড়ন চালিয়েছে, মুসলিমদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে হিন্দুদের সে আধিপত্য
বজায় থাকবে না বলে তারা এ ধরনের সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা, হিংসা ও নানারূপ বিদ্বেষমূলক আচরণ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু
স¤প্রদায় সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিমদের জন্য স্বাধীন, স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে সহজে মেনে নিতে পারে নি। ফলে
সা¤প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। বিভাগোত্তরকালে স্বাধীন ভারতে এ দাঙ্গা তথা সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিম নিধন-নির্যাতন অব্যাহত
থাকলেও, স্বাধীন পাকিস্তানে বা স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বদাই সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি বিরাজমান রয়েছে।
বাঙালি হিন্দু-মুসলিম আবহমান কাল থেকে বৈশাখ মাসে নিজ নিজ ধর্মীয় বিধান ও প্রথানুযায়ী বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানের
সাড়ম্বর আয়োজন করলেও বাংলা নববর্ষ বা ১ বৈশাখে তারা তেমন কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো বলে জানা যায় না। বাংলা
নববর্ষ বা ১ বৈশাখ উদ্যাপনের রীতিটি সা¤প্রতিক কালের। প্রধানত ইংরাজি নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি-রেওয়াজের অনুসরণেই
বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন শুর“ হয়। ফলে প্রথমোক্তের প্রভাব আমাদের নববর্ষ উদ্যাপনে বহুলাংশে প্রতিফলিত। অবশ্য ইদানীং
পাশ্চাত্য সংস্কৃতির চেয়ে হিন্দু সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব নববর্ষ উদ্যাপনে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হ”েছ। বাঙালি হিন্দুরা
আবহমানকাল থেকে চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে যেসব উৎসব-অনুষ্ঠান বা মেলার আয়োজন করতো এখন বাঙালি মুসলিমগণ,
বিশেষত শহরের একশ্রেণির মানুষ, বাংলা নববর্ষ অনেকটা সেভাবেই আনন্দ-স্ফূর্তির সাথে উদযাপন করা শুর“ করেছে।
একশ্রেণির মুসলিম নামধারী বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতি-কর্মীরাই এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করছে। এটাকে ‘মিশ্র সংস্কৃতি’ বা হিন্দু
সংস্কৃতির প্রভাবজাত বলা যায়। কোন বিশেষ সংস্কৃতির স্বভাব-প্রকৃতি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন অন্য সংস্কৃতি তার উপর ভর
করে। যেমন সেন আমলে বাংলাদেশে বৌদ্ধ আধিপত্য খর্ব হবার ফলে ক্রমান্বয়ে বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতিও হিন্দু ধর্ম-সংস্কৃতির মধ্যে
বিলীন হয়ে এক লোকজ ধর্ম-সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে। বর্তমানে ‘আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি’র নামে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ
জনগণের সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির উদ্ভাবন ও প্রচলনের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহ্য
বিলুপ্ত করার অপচেষ্টা চলছে। এটা এক আত্মঘাতি ষড়যন্ত্র। যে জাতি তার আপন সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে বিজাতীয় অপসংস্কৃতির
চর্চায় উৎসাহী হয়ে ওঠে, আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে গর্ব করার মত তার কিছুই থাকে না।
শতকরা ৯০ জন মুসলিম অধ্যূসিত বাংলাদেশে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকেও যৌক্তিকভাবেই বাংলাদেশের জাতীয়
অনুষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা যায়। ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশ বা বিধান পালনার্থে যে বিশিষ্ট জীবনধারা গড়ে উঠেছে সেটাই
বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি। আল-কুরআন ও আল হাদীসের নির্দেশানুযায়ী তা পালিত হয়ে আসছে। তবে যুগে যুগে তার
মধ্যে কিছুটা বিকৃতি ঘটেছে, ইদানীং সে বিকৃতির মাত্রা হয়তো আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা ঘটেছে মুসলমানদের অজ্ঞতা ও
ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশী-বিজাতীয় প্রভাবের ফলে।
শুর“তে ১ বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি যদিও রাজধানী শহরেই বিশেষরূপে সীমাবদ্ধ ছিল, কিš‘ ক্রমান্বয়ে
তা বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। কারণ মাছের পচন তো শুর“ হয় মাথা থেকেই। আবহমান বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির
প্রভাব মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের মধ্যে প্রতিফলিত নয় কেন সেটা যেমন একটি মৌলিক প্রশ্ন,
তেমনি হঠাৎ করে বিজাতীয় ইসলাম-বিরোধী নানা অপসংস্কৃতি বিশেষত হিন্দু সংস্কৃতির নানা উৎকট পৌত্তলিক বা কুফরী
প্রভাব আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কীভাবে, কাদের দ্বারা, কোন্ উদ্দেশ্যে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পা”েছ, তা আমাদের
জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য তাগিদেই গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সহস্রাধিক বছর ধরে আমরা আমাদের
গৌরবোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য টিকিয়ে রেখেছি এবং তার ভিত্তিমূলেই আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশ ঘটেছে এবং সে
স্বতন্ত্র জাতিসত্তা স্বরূপ ও প্রাণশক্তিতে এতই প্রবল যে, তা শেষ পর্যন্ত উপমহাদেশের মুসলিমদেরকে এক স্বতন্ত্র, স্বাধীন
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করে। সহস্রাধিক বছরের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ফলে আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তার উদ্ভব ঘটে। আর
একথা অস্বীকার করার কোন সঙ্গত কারণ নেই যে, ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশের যে এলাকাসহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়, সে
এলাকা নিয়েই ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটে। অথচ বিগত কয়েক দশকের মধ্যে আমাদের সাংস্কৃতিক
স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিহ্ন করে তথাকথিত ‘সনাতন সংস্কৃতি’র নামে এক পৌত্তলিক অপসংস্কৃতি আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়ার
অপতৎপরতা শুর“ হয়েছে। এ অপসংস্কৃতির নগ্ন হামলা প্রতিরোধ করার জন্য আজ বুদ্ধিজীবী ও সচেতন শিক্ষিত সমাজকে
এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলা নববর্ষের নামে বর্তমানে যে সব অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হয়, বাঙালি মুসলিমদের আবহমান সংস্কৃতি ও
জীবনাচারের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। বরং বাংলা নববর্ষের নামে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবী যাকিছু করছেন
তা মূলত হিন্দু সংস্কৃতিরই প্রতিরূপ। ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র নামে তা চালাবার ও একে সর্বজনীন বাঙালির সংস্কৃতি বলে দাবি
করা হলেও শতকরা নব্বই জন বাঙালি তথা বাংলাদেশী মুসলমানের ঈমান-আকীদা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে তা সংগতিপূর্ণ
নয়। এটা আমাদের জন্য বিজাতীয় অপসংস্কৃতি। বিগত হাজার বছর ধরে আমরা এ অপসংস্কৃতির প্রভাব এড়িয়ে চলতে
সক্ষম হয়েছি, আমাদের নিজস্ব প্রাণবন্ত সংস্কৃতির চর্চা ও উৎকর্ষতার মাধ্যমে। আমরা যদি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা
না করতাম এবং সে সংস্কৃতি যদি এতটা প্রাণবন্ত ও উৎকৃষ্টতর না হতো, তাহলে আমাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার বিকাশ কখনো
ঘটতো না এবং আমরা কখনো স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করতে পারতাম না। আজকের স্বাধীনতা আমাদের সে
স্বতন্ত্র জাতিসত্তারই অনিবার্য ফল। স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তা এক ও অবিমিশ্র, পরস্পর নির্ভরশীল। স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার
জন্য স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ করা একান্ত অপরিহার্য। আত্মবিস্মৃতি কালক্রমে আত্মঘাতি হয়ে দেখা
দেয়। তাই এ অপসংস্কৃতি তথা তৌহিদী বিশ্বাসের খেলাপ পৌত্তলিক সংস্কৃতির আগ্রাসন সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে
হবে এবং তা প্রতিহত করে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির উজ্জীবন বা চর্চা করার জন্য সচেতন শিক্ষিত মহলকে এগিয়ে আসতে
হবে।
বাংলা সন বাঙালি মুসলমানের ঐতিহ্য। বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চেতনা, জীবনাচার ও সামাজিক মূল্যবোধের
ভিত্তিতেই বাংলা নববর্ষ চিরকাল উদ্যাপিত হয়ে এসেছে এবং এখনও সে ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে হবে। নববর্ষের অনুষ্ঠান
আজ বিশ্বব্যাপী সর্বত্র অনুষ্ঠিত হ”েছ। প্রত্যেক দেশ ও জাতি তাদের স্ব স্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতির আলোকেই নববর্ষের অনুষ্ঠান
করে থাকে। মুঘল আমলে তৎকালিন শাসক-স¤প্রদায়ের অনুসরণে উ”চ পর্যায়ের অভিজাত মহলে ‘নওরোজ’ উদ্যাপিত
হয়েছে। ইংরাজ আমলে ইংরাজি নববর্ষ উদ্যাপনের রেওয়াজ শিক্ষিত স¤প্রদায়ের মধ্যে শুর“ হয়। ইংরাজরা আমাদের দেশ
থেকে বিদায় নিলেও, ইংরাজি শিক্ষা-সভ্যতা ও মন-মানসিকতায় গড়ে ওঠা একশ্রেণির বিত্তবান পাশ্চাত্যপšি’রা এখনো তার
অনুবর্তন করে চলেছে। বরং ইদানিং ইংরাজি নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে অভিজাত হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং নব্য বিত্তবান
শ্রেণির কিছুসংখ্যক তর“ণ-তর“ণী যে ধরনের উ”ছৃংখল আচার-আচরণ ও অনৈতিক-সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড শুর“ করেছে,
তা নিউইয়র্ক-লন্ডন-প্যারিসের তথাকথিত অভিজাত লম্পটদের আচরণকেও হার মানায়। এটাও এক নিকৃষ্ট ধরনের
অপসংস্কৃতি। নববর্ষ উদ্যাপনের নামে যে ধরনের লাম্পট্য শুর“ হয়েছে, তা কোন সুর“চি-শালীনতার পরিচায়ক নয়, কোন
ভদ্র-সভ্য সমাজের নিকটই তা গ্রহণীয় হতে পারে না।
বাংলা সনের প্রথম দিনে আগে কোন অনুষ্ঠান হতো না বলে এখন হতে পারবে না, তা নয়। তবে তা হতে হবে আমাদের
নিজস্ব গৌরবোজ্জ্বল আদর্শ-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আদলে, বিজাতীয় অপসংস্কৃতির প্রভাবে নয়। এক্ষেত্রে ইসলামের ইতিহাস
থেকে দু’টি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার উলেখ করা যায়।
রাসূলুলাহ্ স. মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় এসে দেখলেন যে সেখানকার মুসলিম ও অমুসলিম সকলেই বছরের
একটা নির্দিষ্ট দিনে আনন্দ-উৎসব করে। এ আনন্দ-উৎসব ছিল নেহায়েতই প্রথাগত, সামাজিক রীতি-নীতি অনুযায়ী। এর
মধ্যে কুফরী ও ইসলাম-বিরোধী অনেক উপাদান থাকায় তিনি মদীনার মুসলিমদেরকে ডেকে বললেন যে, তোমরা এটা
কীসের উৎসব পালন করছো? উত্তরে তারা বললো, পুর“ষানুক্রমে আমরা এ ধরনের উৎসব পালন করে আসছি। তখন
রাসূলুলাহ্ স. বললেন, আজ থেকে এ ধরনের উৎসব পালন থেকে বিরত হও। আলাহ্ এর বদলে তোমাদের জন্য বছরে
দু’টি উৎসবের দিন নির্ধারণ করেছেনÑ একটি ঈদ-উল ফিতর ও আরেকটি ঈদ-উল আযহা। এভাবে উৎসব-আনন্দ করার
সুযোগ বহাল রেখে রাসূলুলাহ্ স. উৎসবের মূল নীতি, প্রকৃতি ও উদ্দেশ্যকে বদলে দিলেন। কুফরী রীতি-নীতির বদলে
ইসলামী রীতি-নীতি ও মূল্যবোধ দ্বারা সেটাকে পরিমার্জিত, পরিশীলিত ও উৎকর্ষমণ্ডিত করলেন।
অন্য আরেকটি উদাহরণ দেয়া যায় পারস্যের ইতিহাস থেকে। ইসলাম-পূর্ব যুগে ইরানে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে
‘নওরোজ’ উৎসব পালিত হতো। সুপ্রাচীন কাল থেকে পারস্য বা বর্তমান ইরানে এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। প্রাচীন
ইরানের ফারস এলাকায় অগ্নিপূজক জরাথুস্ত্রীয়রা নববর্ষের সূচনায় এ অনুষ্ঠান পালন করতো তাদের ধর্মীয় বিধান ও আচারআচরণ
অনুযায়ী। এদিনে তারা ‘আহুরমাজদার’ (স্রষ্টা) উদ্দেশ্যে নিজেদেরকে নিবেদন করে তাঁর নিকট সততা,
ন্যায়পরায়ণতা, ঈমান, সদুপদেশ, সৎকর্ম, সৌভাগ্য, ক্ষমা ও অমরত্ব প্রার্থনা করতো। এগুলো অবশ্য সবই মানবিক
মূল্যবোধের পরিচায়ক, কিš‘ এর উৎসে রয়েছে শেরক্। তাই ইসলাম গ্রহণের পর ইরানিরা এ শেরক্রে মূলো”েছদ করে
ইসলামী রীতি-নীতি অনুযায়ী তা পালনের ব্যব¯’া করে। ইরানে ইসলাম আগমনের পর নওরোজ উৎসব বহাল রাখা হলেও
তা ইসলামী ধারণা-বিশ্বাস অনুযায়ী পালনের ব্যব¯’া করা হয়। ইরানিরা নওরোজকে ঈদ-ই-নওরোজ বলে। ঈদ মানে খুশী,
দুই ঈদের আনন্দ-উৎসবের মতোই সেখানে নওরোজ উৎসব পালিত হয়। ইরানে শিয়া মতাবলম্বীদের প্রাধান্য। শিয়াদের
নেতা, আওলাদে রাসূল স. ইমাম জাফর সাদেকের রা. নির্দেশ ছিল ঃ “নওরোজে তোমরা রোজা রাখো, গোসল করো,
পরিস্কার-পরি”ছন্ন পোশাক পরিধান করো, খুশবু ব্যবহার করো, চার রাকাত নামাজ পড়ো।”
এ নির্দেশ অনুযায়ী ইরানি মুসলমানগণ নওরোজের শুর“তে অযু করে পাক-সাফ হয়ে নামায পড়ে আলাহর দরবারে
দোয়া করার মাধ্যমে উৎসব শুর“ করে। দোয়াতে আল-কুরআনের আয়াত উলেখ করে বলা হয়: ‘ইয়া মুকালিবাল কুলুব
ওয়াল আবসার, ইয়া মুদাব্বিরাল লাইলি ওয়ান্নাহার, ইয়া মুহাভভিলাল হাল ওয়াল আহওয়াল, হাভভিল হালানা ইলা
আহসানিল হাল।’ অর্থাৎ ‘হে অন্তরসমূহ ও দৃষ্টিসমূহের বিবর্তনকারী, হে বৎসর ও অব¯’াসমূহের পরিবর্তনকারী, আমাদের
অব¯’াকে উত্তম অব¯’ায় পরিবর্তন কর“ন।’ এভাবে প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত একটি সামাজিক প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠানকে
মুসলিমগণ ইসলামী ধারায় রূপান্তরিত করেন।
ইমান, পরিস্কার-পরি”ছন্নতা ও সালাত ইসলামের গুর“ত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়। এটা ইসলামী সংস্কৃতিরও মৌল উপাদান।
সংস্কৃতি মানে সংস্কার, পরিস্কার-পরি”ছন্নতা, স্ব”ছতা, উৎকর্ষতা, সুর“চি ও সৌন্দর্য। ইসলাম এ সবের উপর গুর“ত্ব আরোপ
করেছে। সৎ, সুন্দর, পরি”ছন্ন, সুর“চিসম্পন্ন, নিষ্কলুষ জীবন গঠনই ইসলামের মূল উদ্দেশ্য। সু¯’, উৎকর্ষমণ্ডিত সংস্কৃতি
নির্মাণেরও এগুলো মৌল শর্ত। সেভাবে নওরোজ অনুষ্ঠানের রীতি-নীতি পরিবর্তন করে ইরানি মুসলিমগণ তা যুগ যুগ ধরে
পালন করে আসছে। ইরানে ইসলামী বিপব সাধনের পরও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। যে কোন দেশের সংস্কৃতিতে সে দেশের
ধর্মীয়, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও জাতীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে থাকে। যা কিছু এর বিপরীত তা অবশ্যই অপসংস্কৃতি হিসাবে
গণ্য হয়ে থাকে। ইরানের নওরোজ উৎসবেও এ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইসলাম-পূর্ব যুগে সে ধর্মীয়
ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ছিল এক রকম, ইসলামের আগমনের পর তা ভিন্নরূপ লাভ করেছে। ইরানে ইসলামী বিপব সংঘটিত
হওয়ার পরও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে।
কিš‘ বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের ক্ষেত্রে আমরা বিপরীত চিত্রটিই লক্ষ্য করছি। পূর্ব থেকে বাঙালি মুসলিমগণ নিজস্ব ধর্মীয়
রীতি-নীতি অনুযায়ী বাংলা নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠান অর্থাৎ হালখাতা, নবান্ন ইত্যাদি পালন করে আসছে। ইদানীং তাদের সে
সাংস্কৃতিক রূপ-রীতি পরিবর্তন করে তথাকথিত ‘সনাতন সংস্কৃতি’র নামে বিজাতীয় রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান তাদের উপর
চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যা”েছ। এটা আমাদের সংস্কৃতির উপর এক নগ্ন হামলা। এরদ্বারা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি
বিলুপ্ত করে বিজাতীয় অপসংস্কৃতির চর্চা করা হ”েছ। বাংলা নববর্ষ বাঙালি মুসলিমগণ আগে থেকে যেভাবে পালন করে
আসছে, এখনো তা অব্যাহত থাকা উচিত। কাল-বিবর্তনে সবকিছুর মধ্যেই উন্নতি-উৎকর্ষ সাধিত হয়। কিš‘ তা অবশ্যই
আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে নয়, বরং তার ভিত্তিতেই হওয়া বাঞ্ছনীয়।
বাংলা সন যেমন আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবি”েছদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনেও তেমনি
আমাদের আদর্শ-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটা বাঞ্ছনীয়। তাই বিদেশী-বিজাতীয় সংস্কৃতি তথা
অপসংস্কৃতির প্রভাব থেকে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানমালাকে বিমুক্ত রাখা আমাদের কর্তব্য। আমাদের নিজস্ব বোধ-বিশ্বাস ও
আচরিত সংস্কৃতির রূপরেখা অনুযায়ী তা পালিত হওয়া বা তার চর্চা করা কর্তব্য। পৌত্তলিকতা, অশীলতা, নারী-পুর“ষের
অবাধ মেলামেশা, উশৃঙ্খল ও কুর“চিপূর্ণ আচরণ আমাদের সংস্কৃতির সাথে অসংগতিপূর্ণ। তৌহিদী জীবনবোধসম্পন্ন সু¯’,
সুর“চিপূর্ণ সংস্কৃতিই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির মৌল পরিচয়। সু¯’ সংস্কৃতি, সু¯’-সুন্দর-স্বা¯ে’্যাজ্জ্বল জাতি গঠনের
অপরিহার্য শর্ত। হীনমন্যতা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে নয়, বরং ইতিবাচক ও প্রত্যয়ী মনোভাব থেকেই সু¯’ সংস্কৃতি চর্চার
মাধ্যমে আমাদেরকে অপসংস্কৃতির মোকাবেলা করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, যেসব অনুষ্ঠান জাতীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের বিপরীত এবং যেসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বেলেলাপনাকে
প্রশ্রয় দেয়া হয় এবং নৈতিকতার অধঃগতি ঘটে, তা সংস্কৃতি নয়, অপসংস্কৃতি। সংস্কৃতি হলো পরিশীলিত, পরিমার্জিত, সু¯’,
বিকাশোš§ুখ চেতনার ধারক। যা কিছু অসু¯’, অমার্জিত ও নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটায় তাই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি যুগে
যুগে বিভিন্ন দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। মুসলিম জাতিরও অবক্ষয় শুর“ হয়েছিল অপসংস্কৃতির প্রভাবে।
স্বকীয় আদর্শ, ঐতিহ্য ও নৈতিক চেতনা বিস্মৃত হয়ে বিজাতীয়, অনৈতিক অপসংস্কৃতি গ্রহণ করার ফলেই মুসলমানদের পতন
ঘটে। সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের মাধ্যমে যে স্খলন শুর“ হয়, ক্রমান্বয়ে তা রাজনৈতিক-সামাজিক ও জাগতিক অবনতির পথ
প্রশস্ত করে। ফলে অন্যের অধীনে মুসলিম জাতিকে দীর্ঘ কাল পরাজিত-অবহেলিত ও দুর্দশাগ্রস্ত জীবনযাপন করতে হয়।
আমরা কি অনিবার্য ধ্বংসের দিকে যেতে চাই, না সু¯’-সুন্দর জীবনবোধে উজ্জীবিত হয়ে মহৎ ও কল্যাণময় জীবন গড়তে
চাই? সে মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা করে জাতীয় সাংস্কৃতিক নীতিমালা তৈরি করে জাতিকে সুষ্ঠু-সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দিতে
হবে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির মৌল স্বভাব এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস, জাতীয় ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, সামাজিক
মূল্যবোধ, জীবন-যাপন পদ্ধতি ও আচার-আচরণের ভিত্তিতে পরিনির্মিত। সহস্রাধিক বছর ধরে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের
গভীরে অন্তঃসলিলার ন্যায় এর মূল স্রোতধারা প্রবহমান। মূলধারার পাশাপাশি অনেক সময় ক্ষুদ্র প্রস্রবণ বা নির্ঝর উদ্গত
হয়। এগুলোকেও উপেক্ষা করা যায় না। এগুলো তার নিজস্ব রূপ, স্বভাব ও প্রকৃতি নিয়ে সর্বদা বিরাজমান থাকে। এটা
যেমন বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করে, তেমনি সৌন্দর্য সৃষ্টিতেও সাহায্য করে।
সুপ্রাচীন কাল থেকে বাংলাদেশে কখনো আর্য, কখনো অনার্য, কখনো হিন্দু, কখনো জৈন, কখনো বৌদ্ধ, আবার কখনো
লোকজ মিশ্র সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। মুসলিমদের আগমনের পর বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ক্রমান্বয়ে মুসলিম হবার
ফলে এদেশে ইসলামী সংস্কৃতির প্রাধান্য সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের সামাজিক রূপ ও জাতীয় বৈশিষ্ট্য তার ভিত্তিতেই পরিচিহ্নিত।
কিš‘ তা সত্তে¡ও হিন্দু, বৌদ্ধ, বিভিন্ন নৃতাত্তি¡ক ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠির সংস্কৃতিও নির্বিবাদে তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। শাসক
বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ কখনো তাতে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। মুসলিম শাসনামলের সাড়ে পাঁচশ বছর
জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ বাঙালি শান্তি, সমৃদ্ধি ও স¤প্রীতি-সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি
ও রীতি-নীতি অনুযায়ী স্ব”ছন্দে নির“দ্বিগ্ন জীবন-যাপন করেছে। সৃষ্টিশীল কাজেও তারা পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা
করেছে। শাসন-ক্ষমতা মুসলিমদের হাতে থাকলেও এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম হওয়া সত্তে¡ও তারা সংখ্যালঘুদের ধর্ম-
বিশ্বাস ও সংস্কৃতি চর্চার উপর কখনো হস্তক্ষেপ করেনি। ফলে এটা ইতিহাসে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আমাদের
সংস্কৃতির মূলধারার পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, উপজাতীয় ইত্যাদি বিভিন্ন সংস্কৃতি জাতীয় জীবনে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে। এটা
শান্তিপূর্ণ সহঅব¯’ান ও গণতান্ত্রিক ঔদার্য ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচায়ক। কিš‘ ঔদার্য প্রকাশ করতে গিয়ে সংখ্যালঘিষ্ঠের
জীবনধারা ও সংস্কৃতির মধ্যে জাতীয় মূলধারাকে অবলুপ্ত বা একাকার করে ফেলা সঙ্গত নয়। এরদ্বারা কেবল আত্ম-অবলুপ্তি
ও আত্ম-বিনাশের পথই উন্মুক্ত হয়। প্রবল আত্মপ্রত্যয় ও আত্মমর্যাদাবোধের উদ্বোধনেই স্বাধীন জাতিসত্তার অস্তিত্ব ও
বিকাশ নিশ্চিত হতে পারে। জাতীয় আনন্দ-উৎসব ও দিবস পালনে এ অনুভূতি সর্বদা জাগ্রত থাকা বাঞ্ছনীয়।
বিগত শতকের ষাটের দশকের শেষ দিকে ঢাকায় বাংলা নববর্ষ তথা ১লা বৈশাখ উদ্যাপনের নতুনী রীতি হয়েছে। রমনা
বটতলায় সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে বাংলা নববর্ষের সূচনা করা হয়। ধীরে ধীরে এ
রেওয়াজ ব্যাপকভাবে চালু হয়। পরবর্তীতে এর সাথে যুক্ত হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার“কলা
ইনস্টিটিউট থেকে বিভিন্ন জীবজš‘র মূর্তি তৈরি করে ‘মঙ্গল ঘট’ সাজিয়ে যথারীতি বাদ্যবাজনা সহকারে ব্যাপক আনন্দ-
উলাসের মাধ্যমে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুর“ হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় পেঁচা, ইঁদুর, হাঁস, হনুমান, সিংহ, ময়ূর, সাপ, গাভী, সুর্য
ইত্যাদির মূর্তি বানিয়ে মহাসমারোহে বাদ্যবাজনা বাজিয়ে আনন্দ-ফুর্তির সাথে তা বহন করা হয়। হিন্দু ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী
পানিপূর্ণ কলস বা ‘পূর্ণঘট’ মঙ্গলের প্রতীক। তাদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী পেঁচা মঙ্গলের প্রতীক ও ল²ীর বাহন। ইঁদুর গণেশের
বাহন, হাঁস সরস্বতীর বাহন, হনুমান রামের বাহন ও মিত্র এবং সীতা উদ্ধারে সহযোদ্ধা, সিংহ দুর্গার বাহন, ময়ূর কার্তিকের
বাহন, গাভী রামের সহযাত্রী, আর সূর্য্য তাদের অন্যতম দেবতা। হিন্দু ধর্মের অনুসারীগণ যদি তাদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী এ
ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, তাতে আপত্তির কোন কারণ নেই। কিš‘ ঢাকা এবং স¤প্রতি রাজশাহী শহরেও এ ধরনের
শোভাযাত্রার আয়োজন পরিলক্ষিত হ”েছ, যার আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীগণ শতকরা ৯৫ ভাগ বা তারও অধিক মুসলিম।
এভাবে বাঙালি সংস্কৃতির নামে বাঙালি মুসলিম সমাজকে তাদের বিশ্বাস, আকীদাহ ও স্বকীয় সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত করার
এবং সম্পূর্ণ বিজাতীয় সংস্কৃতির ধারক-বাহক-অনুসারী করার এক হীন ষড়যন্ত্র চলছে। এ ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে আমাদের
নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে সচেষ্ট হতে হবে।
মুসলিমদের বিশ্বাসের মূল কেন্দ্র তৌহিদ। তৌহিদের অর্থ স্রষ্টা এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন অংশীদার নেই, তিনি সৃষ্টি
করেছেন মৃত্যু ও বিলয় তাঁরই কর্তৃত্ত¡াধীন, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বশক্তিমান, সকল ভাল-মন্দ, মঙ্গল-অমঙ্গল, কল্যাণ-অকল্যাণের
একমাত্র নিয়ামক তিনিই। এটাই মুসলমানদের ঈমান ও আকীদাহ। মুসলিমগণ সকল কাজের শুর“তে ‘বিস্মিলাহ্’ বলে।
কারণ সবকিছুর নিয়ামক শক্তি এটাই ইসলামী সংস্কৃতির মর্মবাণী। বাংলা সনের উৎপত্তি মুসলিমদের হাতে। এতকাল পর্যন্ত
বাঙালি মুসলিম সমাজ তাদের ঈমান-আকীদাহ অনুযায়ী বাংলা নববর্ষ পালন করে এসেছে। বর্তমানে আমাদের সংস্কৃতির
উপর যে অপসংস্কৃতির আঘাত এসেছে এবং ‘মূল ধারায়’ ফিরে যাওয়ার নামে ইসলাম-পূর্ব যুগের হিন্দু সংস্কৃতির দিকে
প্রত্যাবর্তনের যে অপপ্রয়াস লক্ষ্য করা যা”েছ, তার পরিণতি উপলদ্ধি করে আমাদেরকে এখনি স্বকীয় সংস্কৃতির ধারায় ফিরে
আসার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে।

প্রফেসর ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!