বাংলাদেশ ও ‘বাংলা’: ‘আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে! ফরহাদ মজহার

 

শেষাবধি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বিধানসভায় পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলা’ করার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নাম আর ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থাকছে না। নতুন নাম হচ্ছে ‘বাংলা’। বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি—তিন ভাষাতেই পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ লেখা হবে। কংগ্রেস ও বাম দল ২০১৬ সালে নাম বদলের বিরোধিতা করেছিল। তারা এবার সায় দিয়েছে। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের ইংরেজি নাম West Bengal পালটিয়ে Paschimbanga রাখার প্রস্তাব দেয়। সেটা তাহলে হচ্ছে না।

বাংলাদেশে আমরা ভাবতেই পারি এতে আমাদের কী এসে যায়? পশ্চিম বাংলার জনগণ তাঁদের নাম বদলাবেন সেটা তাদের ব্যাপার। বাংলা ভাগ হয়ে গিয়েছে সে অনেক দিনের ব্যাপার। আমরা এখন দুজনেই না হয় গাইতে পারি, ‘আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে’। অতএব এই দ্বিখণ্ডিত ইতিহাস নিয়ে আমাদের মাথাব্যথার কারণ নাই।

তারপরও কথা থাকে। তাই এ বিষয়ে সারা দুনিয়ার বাংলাভাষীদের সঙ্গে কিছু কথা পেড়ে রাখতে চাইছি। উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাভাষীদের মধ্যে কথা বলবার ক্ষেত্র তৈরি ও জারি রাখার চেষ্টা । কারন পশ্চিম বাংলার নাম বদলানো বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি ও বাঙালির দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাপার। সেই দিকগুলো তোলা ও বোঝাবুঝির ক্ষেত্র তৈরির জন্য এই আলোচনার সূত্রপাত।

প্রথম জিজ্ঞাসা হচ্ছে পশ্চিমবাংলা তাদের নাম যা খুশি রাখবে, তাতে বাংলাদেশের কী! –এই যুক্তি ঠিক নাকি বেঠিক? আমরা বাংলাভাষা, বাংলা সংস্কৃতি ও বাঙালি ইত্যাদি নিয়ে কে কিভাবে ভাবি এবং এ সবের সঙ্গে কী ধরণের সম্পর্ক রচনা করি কিম্বা রচনার বাসনা করি তার সঙ্গে এই প্রশ্ন জড়িত। মানচিত্র, সমাজ ও রাষ্ট্র এখন আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্তাসত্তা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সীমান্তের দুই দিকেই এই তিনটি বিষয়েরই ভূমিকা রয়েছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

পশ্চিম বাংলার বাঙালির রাজনৈতিক পরিচয় ‘ভারতীয়’। পশ্চিম বাংলার বাঙালি তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে কোন রাজনৈতিক রূপ দিতে পারে নি। ভারতের সঙ্গে তাদের যুক্ত থাকবার যুক্তি একান্তই ধর্মীয়; ভাষা ও সংস্কৃতি ভারতীয় বাঙালির ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের অধীনস্থ, এর কোন রাজনৈতিক মর্ম নাই। এ কারনে বলা যায় পশ্চিম বাংলা তার হিন্দু পরিচয়ের উর্ধে উঠতে পারে নি। তারা হিন্দুই থেকে গিয়েছে বাঙালি হয় নি; বাঙালি মুসলমানের মতো বাঙালি হবার জন্য লড়বার কোন রাজনৈতিক কর্তাসত্তার আবির্ভাব পশ্চিম বাংলায় ঘটে নি। কিন্তু বাঙালি মুসলমান এখনও তার দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারে নি। এখন দেখা যাচ্ছে, ‘পশ্চিম বাংলা’যে ঐতিহাসিক বন্ধন ‘বৃহৎ বাংলা’র সঙ্গে ধারণ করতো ‘পশ্চিম’ ছেঁটে দিয়ে শুধু ‘বাংলা’ নাম পরিগ্রহণের মধ্য দিয়ে তার সঙ্গেও ছেদ ঘটিয়ে দিল।

দেখা যাচ্ছে, বাংলাভাষা, বাংলা সংস্কৃতি ও বাঙালি ইত্যাদি নিয়ে আমরা কে কিভাবে ভাবি তার সঙ্গে বাংলার দুই প্রধান ধর্ম ইসলাম ও সনাতন ধর্মের পারস্পরিক ইতিহাস, সম্বন্ধ এবং দ্বন্দের সম্পর্ক রয়েছে; একই সঙ্গে রয়েছে উভয় দিকে পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসিৎ ঘৃণা, হিংসা এবং রক্তপাতের ইতিহাস। এই দুই প্রধান ধর্ম ছাড়াও পাশাপাশি অবশ্যই ভূমিকা রয়েছে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ভক্তি আন্দোলন সহ নানান ধর্ম, সংস্কার, ঐতিহ্য ও স্মৃতির।

আমি এখানে সনাতন ধর্মের জায়গায় ‘হিন্দু’ চিহ্ন সজ্ঞানেই পরিহার করছি, কারণ ‘হিন্দু’ পাশ্চাত্যের ‘রিলিজিয়ন’ কিম্বা আরবি ‘দ্বীন’-এর মতো কোন কেতাবি ধর্মের নাম নয়। মিল্লাতে ইব্রাহিমের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে তার মৌলিক ফারাক আছে। তারপরও এর ব্যবহার খুব একটা অসুবিধার হোত না, কিন্তু পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের কালে একটি সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের আধুনিক জাতিবাদী নির্মাণ হিশাবে ‘হিন্দুত্ববাদ’ নামে যার প্রকট আবির্ভাব ঘটেছে তাকে আলাদা ভাবে পর্যালোচনার জন্য ‘হিন্দু’ কথাটিকে আলাদা করে রাখা দরকার।

হিন্দু মানেই ‘হিন্দুত্ব’ নয়। ঠিক যে অর্থে মুসলমান মানেই ‘মুসলমানিত্ব’ বা চিরায়ত জাতিবাদি পরিচয় নয়। ধর্মের বিচার আর আধুনিক জাতিবাদের বিচার আমাদের আলাদা ভাবে করতে জানতে হবে। হিন্দু জাতিবাদ কিম্বা মুসলমান জাতিবাদ ( কিম্বা পড়ুন, হিন্দু কিম্বা মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা) আধু্নিকতার সমস্যা, ধর্মের অন্তর্নিহিত কোন সমস্যা নয়। ধর্ম বরং জাতিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়তে সক্ষম সেটা ভক্তিবাদ কিম্বা সুফিবাদে আমরা দেখি।

একাট্টা বর্গ হিশাবে ‘হিন্দু’এই অঞ্চলের অধিবাসীদের সনাতন, লোকায়ত ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের বৈচিত্র ও বিভিন্নতার বিপজ্জনক নিরাকরণ ঘটায়। একই ভাবে ‘ইসলাম’ও একাট্টা কোন ধর্মের নাম নয়। তারও নানান মজহাব, তরিকা, ফেরকা, ব্যাখ্যা ও চর্চা আছে। শিয়া সুন্নি তো আছেই। হিন্দুত্ববাদ সনাতন জীবন যাপন, আচার, ধর্ম ও ঐতিহ্য থেকে উপাদান নিয়েছে বটে কিন্তু মুসলিম জাতিবাদ যেমন একান্তই আধুনিক নির্মাণ, হিন্দুত্ববাদও আধুনিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। মুসলিম জাতিবাদকে সাধারণত ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ বা পলিটিকাল ইসলাম বলা হয়। জাতিবাদী ইসলামিত্ব দিয়ে যেমন ইসলামের বিচার চলে না, তেমনি সনাতন ধর্ম, সংস্কার ও ঐতিহ্যের ইতিহাসকেও হিন্দুত্ববাদের ব্যানারে লীন হতে দেওয়া হবে চরম মূর্খতা। এই অঞ্চলের জনগণের জীবনযাপন, আচার ও সংস্কারের বিভিন্নতা, বৈচিত্র্য, শক্তি ও বিপুল দার্শনিক ঐশ্বর্যের ইতিহাস যদি মনে রাখি তাহলে ‘হিন্দুত্ববাদ’ আর ‘হিন্দু’ যে আলাদা সেটা মনে রাখতে হবে। সিন্ধু অববাহিকায় বাস করা অধিবাসী কথাটার সম্প্রসারিত অর্থ হিশাবে ‘হিন্দু’ পরিভাষাটিকে আলাদা ভাবে বোঝা দরকার। এই ভূগোলের অধিবাসীদের জীবনযাপন, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে ভিন্ন ভাবে পাঠ ও বিচার করবার শর্ত তৈরির জন্যই সতর্ক থাকতে হবে। ‘হিন্দুত্ব’ বা ‘হিন্দুত্ববাদ’ কথাটিকে আমাদের বুঝতে হবে আধুনিক জাতিবাদী নির্মান হিসাবে যার সঙ্গে সম্পর্ক আধুনিকতা ও পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের। এর সঙ্গে ‘হিন্দু’ নামে পরিচিত ধর্ম কিম্বা সনাতন ধর্মের সম্পর্ক সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে বিচারের বিষয়।

প্রশ্ন তো ছিল যে পশ্চিমবঙ্গের নাম পশ্চিমবাংলা হোল কেন? আর এখন প্রশ্ন হবে ‘বাংলা’ কেন? পশ্চিমবাংলা ‘বাংলাদেশ’ হোল না কেন? এখন যদি ভারতের একটি রাজ্য বা প্রদেশ হয় তাহলে ‘বাংলারাজ্য’ কিম্বা ‘বাংলাপ্রদেশ’ না কেন? কেন শুধু ‘বাংলা’?

পশ্চিম বাংলা তো ভারতের পশ্চিমে না, পুর্বে। তাহলে তার নাম পশ্চিমবাংলাই বা হোল কেন? এর ব্যাখ্যার জন্য পশ্চিম বাংলাকে তখন বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস নিশ্চয়ই পড়ানো হোত। সত্য ইতিহাস পড়ানো হোত এটা বিশ্বাস করার কোন কারন নাই। সহজ হিন্দুত্ববাদী প্রপাগান্ডা ছিল এই যে মুসলমানরা তাদের এক নেতা জিন্নাহর নেতৃত্বে একদিন দ্বিজাতিতত্ত্ব নামক একটা তত্ত্ব দিয়েছে তারপর দাঙ্গাহাঙ্গামা করে দেশ ভাগ হয়েছে। মুসলিম লীগই এর জন্য দায়ী আর গান্ধী, নেহেরু ও কংগ্রেস সবাই ছিলেন ধোয়া তুলসি পাতা। এই হিন্দুত্ববাদী কেচ্ছা এখন বিজেপির যুগে পশ্চিম বাংলায় আরো গাওয়া হবে। যদিও ত্রিশ থেকে সাতচল্লিশ অবধি অখণ্ড বাংলায় হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা এখন নির্মোহ পর্যালোচনার ধারা তৈরির চেষ্টা করছেন। যাতে প্রামাণিত হচ্ছে এই ক্ষেত্রে হিন্দু বাবুদের ভূমিকা নির্ধারক ছিল। পশ্চিম বাংলার ‘বাংলা’ নামকরণ পশ্চিমবাংলায় হিন্দুত্ববাদকে আরও জোরদার করবে, নাকি দুর্বল করবে, তা আসলেই তাহলে দেখার বিষয়।

দেখা যাচ্ছে পশ্চিম বঙ্গের ‘বাংলা’ নামকরণ খুব নির্দোষ পশ্চিম বঙ্গীয় ব্যাপার নয়। এতে বাংলাভাষা বাংলা সংস্কৃতি ও বাঙালির অনেক কিছুই আসে যায়।

আর এসে যায় বাংলাদেশেরও। বটেই।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!