বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় আসন্ন

পিনাকী ভট্টাচার্য
ইন্দো প্যাসিফিক জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির হাত ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। তার আগে জেনে নিতে হবে ইন্দো প্যাসিফিক জোট কী এবং কেন?

১৯ জানুয়ারি ২০১৮ ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকার নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল প্রকাশ করে। যেখানে শত্রু হিসেবে চীন ও রাশিয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধিকে বিশ্বে মার্কিন প্রভাবের ওপর হুমকি হিসেবে দেখা হয়েছে। আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিসের ভাষায়, ‘জঙ্গিবাদ নয়, যথার্থ ক্ষমতার লড়াই এখন মার্কিন প্রতিরক্ষার মূল লক্ষ্য। এর অর্থ হচ্ছে আমেরিকা মুসলমান সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধের সেই ওয়ার অন টেররের কৌশল থেকে চূড়ান্তভাবে প্রস্থান করেছে। ট্রাম্প থাকলেও এই কৌশল চলবে, না থাকলেও এটা বন্ধ হবেনা। মার্কিন ফরেন পলিসিতে নির্বাচন বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রভাব খুব একটা নেই।

ট্রাম্পের এই প্রতিরক্ষা কৌশলের উল্লেখযোগ্য অংশ হলো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রকে নিজ নিজ প্রভাববলয়ের অধীনে এনে জোট গঠন করা। বাংলাদেশের জন্য আমেরিকা প্রভাব বলয়ের সৃষ্টি করেছে তা হচ্ছে ইন্দো প্যাসিফিক জোট।

আমেরিকা বাংলাদেশকে এই জোটে চায়। ট্রাম্পের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশকে “কী পার্টনার” বা প্রধান পার্টনার হিসাবে বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। একথা জানিয়ে ঢাকা সফররত মার্কিন উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী স্টিফেন ই বিগান বলেছেন, ইন্দো-প্যাসিফিকে সেন্টার পিস বা কেন্দ্রবিন্দুতেই বাংলাদেশের অবস্থান। আর এ কারণেই আমি বাংলাদেশ সফরে এসেছি। আমেরিকার এই জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা এই অঞ্চলে তার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণে যেভাবেই হোক বাংলাদেশকে ইন্দো প্যাসিফিক জোটে অন্তর্ভুক্ত করবে।

আমেরিকা ভারতকেও চেয়েছিলো শর্ত সাপেক্ষে। কি সেই শর্ত? শর্ত দু’টি হলো- যদি ভারতের অর্থনীতি উঠে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করা যায় আর দুই, বর্তমান ভারত রাষ্ট্র রাজনীতি ও দলে মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করে ও প্লুরাল সমাজ গড়তে রাজি হয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। মোদীর সরকার এ দুই শর্ত কোনো দিনই পূরণ করতে পারবে না। কারণ এই শর্ত পূরণ করার অর্থ হলো, বিজেপি-আরএসএসের নাম ও রাজনীতি পরিত্যাগ করা।

এই ইন্দো প্যাসিফিক জোটের কারণে এই অঞ্চলে আর কী কী গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে?

চলতি শতকের প্রথম দশক থেকে আমেরিকান নীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিলো, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের চোখ দিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। অর্থাৎ ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও দেখা হয়ে যাবে। এই নিরাপত্তা স্বার্থ কী? সেই নিরাপত্তা স্বার্থ হচ্ছে ওয়ার অন টেররের নিরাপত্তা স্বার্থ।

ভারত সেই সময়ে আমেরিকাকে মোটা দাগে যা বলেছিলো, তাকে আমাদের বৈঠকি ভাষায় রূপান্তরিত করলে এমন দাড়ায়, তোমরা যে ওয়ার অন টেরর করছো আমরা তো এই লড়াই সেই ১৯৪৭ থেকে করছি, এই যে দেখো কাশ্মীর। আমাদের দেশ তো মুসলমানেরা সন্ত্রাসের ভূমি বানাতে চাইছে, আমরা এইটার বিরুদ্ধে সেই ১৯৪৭ থেকে লড়াই করছি।

ওয়ার অন টেররের আঞ্চলিক কর্তৃত্ব ভারতের হাতে দিয়ে আমেরিকা ‘চীন ঠেকানোর’ স্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়েছিলো। চীন ঠেকানোর চৌকিদারি সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি অঞ্চলে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। তার ফলেই বাংলাদেশে ভারত সরাসরি কর্তৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ঠিক ভারতের মতোই বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ওয়ার অন টেররের নীতিকে নিজেদের মতো করে আত্মস্থ করলো। তারা বললো এই জামায়েতে ইসলামী এবং তাদের আশ্রয়দাতা বিএনপিই হচ্ছে সেই ইসলামী সন্ত্রাসবাদ, আমরা এদের নির্মূল করবো। এরই সূত্র ধরে হাসানুল হক ইনু বেগম খালেদা জিয়াকে “জঙ্গিমাতা” বলতে শুরু করলো। এরপরে আমরা তো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দেয়া আর আওয়ামী জামানায় বাইরে থেকে ছিটকানি আটকে দিয়ে জঙ্গি আত্মসমর্পণের নাটক করে নিরস্ত্র মানুষদের বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে জঙ্গি নিধনের পুলিশি কাহিনী শুনেছি অনেক।

এর পরেই কাশ্মীর এবং ভারতে ইসলামী সন্ত্রাসবাদ যেভাবে ভারত প্রশাসন দেখে সেভাবেই আমেরিকা দেখতে শুরু করলো।

গত সেপ্টেম্বরে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে এক ওয়েবিনারে আলোচনার সূত্র ধরে আমেরিকান গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর কথার সূত্রে মানবজমিনে খবর ছাপা হয়েছিল দিল্লির চোখে এখন আর বাংলাদেশকে দেখে না যুক্তরাষ্ট্র। এর অর্থ হচ্ছে ভারতকে দেয়া আমেরিকার চৌকিদারির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। আমেরিকা বাংলাদেশের সাথে সরাসরি ডিল করবে।

বাংলাদেশ কী ইন্দো প্যাসিফিক জোটে ঢুকবে? আমার মনে হচ্ছে বাংলাদেশ এখনো সময় ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে। যতদিন এই আমেরিকান চাপকে দুরে সরিয়ে রাখা যায় সেই কৌশল নিয়েছে। একেকবার একেক কথা একে আব্দুল মোমেনকে দিয়ে বলিয়ে ইন্দো প্যাসিফিক জোটের বিষয়ে নিজেদের ভিতরের সিদ্ধান্তহীনতার কথাই প্রকটিত করছে।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে, গত বারো বছরে বাংলাদেশের প্রশাসন ও ক্ষমতা কাঠামোকে হাসিনা যেভাবে ভারত বান্ধব করে সাজিয়েছে সেটা দিয়ে নতুন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব নয়। নতুন সম্পর্কে সেই কাঠামো হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়বে। আবার সেই কাঠামো ভেঙ্গে নতুন করে গড়ে তোলার সময় বা শক্তি কোনটাই এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ সরকারের নেই। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের জন্য যা সহজ ছিলো আজ ২০২০ এ এসে সেই একই কাজ করার সক্ষমতা আওয়ামী লীগ হারিয়ে ফেলেছে।

তবে আওয়ামী সরকার প্রকাশ্যে কি কী বলেছে ইন্দো প্যাসিফিক জোট নিয়ে তা থেকে আমরা হাসিনা সরকারের মনোভাব কিছুটা বুঝতে পারি।

যুক্তরাষ্ট্রের আইপিএস নিয়ে হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) নিয়ে সরকারের কোনও আপত্তি নেই, তবে এজন্য বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ করতে হবে।

এর সরল অর্থ হচ্ছে, আমরা চাইনিজ টাকা দিয়ে বিনিয়োগের প্রয়োজন মেটাচ্ছি, চীন বিরোধী জোটে গেলে যদি সেই বিনিয়োগের টাকা আসা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে যেন আপনাদের টাকার সাপ্লাই থাকে।

একে আব্দুল মোমেন ইন্দো প্যাসিফিক জোট নিয়ে আরো বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ডিফেন্সে যেতে চায়, ইকুইপমেন্ট বিক্রি করতে চায়, কিন্তু আমরা মারামারিতে নাই। সুতরাং ওই বিষয়গুলোতে আমাদের অনীহা আছে।’

অথচ একই সময়ে মোমেন দাবি করেন, বৈঠকে ইন্দো প্যাসিফিক নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ডিফেন্স কো-অপারেশন বা মার্কিন অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব সংক্রান্ত মন্ত্রীর নিজের বক্তব্যের সূত্র ধরে গত ক’দিন ধরে গণমাধ্যমে লেখালেখি চলছে তা নিয়ে তার সঙ্গে বৈঠকে কোন কথাই হয়নি। তার ভাষ্য মতে, ডিফেন্স কো-অপারেশন বা অন্য বিষয়ে আপনারা কয়েকদিন ধরে যেটা লিখেছেন, তা নিয়ে কোন আলোচনাই হয়নি।

তাহলে একে মোমেন জানলো কোথায় থেকে ‘যুক্তরাষ্ট্র ডিফেন্সে যেতে চায়, ইকুইপমেন্ট বিক্রি করতে চায়?

আমেরিকা কী বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় বসে থাকবে? কখনোই না। আমেরিকা নানা ভাবে চাপ সৃষ্টির কৌশল নেবে। এর মধ্যে আমেরিকার মিত্র দেশ সৌদি আরব ৪২ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চাপ দিয়েছে। এরপরের চাপ আসতে পারে বাংলাদেশের বাহিনীগুলোর অব্যাহত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বাহিনীগুলোর প্রধানদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেয়ার বিষয়। এই নিয়ে যে আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছে সেবিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার একটিভিষ্টরা অবগত আছেন।

ভারতের রাজনৈতিক সমর্থন আর চাইনিজদের বিনিয়োগের দুই লাইনের উপরে ভর করে আওয়ামী সাম্রাজ্যের যে ট্রেন নড়বড়িয়ে চলছিলো এখন আমেরিকান ঝড়ে তা টলোমলো হয়ে যাবার সময় এসেছে। আমেরিকার তরফে চাপ সৃষ্টির কৌশল কাজে না এলে আমেরিকা ওয়ান ইলেভেলের মতো আরেকটা ইন্টারভেনশন ঘটানোর চেষ্টা চালাবে এটা ধরে নেয়া যায়। আর এই ক্ষেত্রে আমেরিকার সক্ষমতা সর্বজনবিদিত। একটা মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অজনপ্রিয় ও ভোটারবিহীন প্রতারণার নির্বাচন করে ক্ষমতা ধরে রাখা সরকারের পতন ঘটানো কোন আন্তর্জাতিক পরাশক্তির জন্য জটিল কোন বিষয় নয়।

ঘটনা যাই ঘটুক, ভারতের হাত ধরে বাংলাদেশের বুকের উপরে চেপে বসা ফ্যাসিবাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। তবে এই অমানিশার কাল ঠিক কীভাবে শেষ হবে তা ইতিহাসই বলে দেবে।
Source:Amardesh uk

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!