বাংলাদেশের  হাইব্রিড গণতন্ত্র  হতে পরিত্রানে কিছু সুপারিশ

ড. সুলতান আহমদ

জন্মের পর হতেই বাংলাদেশ চলছে হাইব্রিড গণতন্ত্র । হাইব্রিড বললাম এজন্য যে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত  হবার পরদিন থেকেই শুরু হয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন। এর অন্যতম ও প্রধান কারন হল ত্রুটিপূর্ন ও গণতন্ত্রের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ন সংবিধানের কতিপয় ধারা। এ গুলো রেখে গণতান্ত্রীক  শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। অন্যদিকে, সংবিধানের কিছু গুরুত্বপূর্ন নির্দেশাবলী  পালনে ক্ষমতাসীনদের অনীহা।

 সংবিধানের বর্নিত ক্ষমতা অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের কর্ম পরিধি:

৭৮। (১) সংসদের কার্যধারার বৈধতা সম্পর্কে কোন আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।
(২) সংসদের যে সদস্য বা কর্মচারীর উপর সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ, কার্যপরিচালনা বা শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকিবে, তিনি সকল ক্ষমতা-প্রয়োগ সম্পর্কিত কোন ব্যাপারে কোন আদালতের এখতিয়ারের অধীন হইবেন না।

(৩) সংসদে বা সংসদের কোন কমিটিতে কিছু বলা বা ভোটদানের জন্য কোন সংসদ-সদস্যের বিরুদ্ধে কোন আদালতে কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।

(৪) সংসদ কর্তৃক বা সংসদের কর্তৃত্বে কোন রিপোর্ট, কাগজপত্র, ভোট বা কার্যধারা প্রকাশের জন্য কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আদালতে কোন কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।

(৫) এই অনুচ্ছেদ-সাপেক্ষে সংসদের আইন-দ্বারা সংসদের, সংসদের কমিটিসমূহের এবং সংসদ-সদস্যদের বিশেষ-অধিকার নির্ধারণ করা যাইতে পারিবে।

আমি মনে করি অনুচ্ছেদে সংযোজিত এ ব ধারাসমূহ ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পরিপন্থি। এটা একটা দায়বদ্ধতাাহীন স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থারই ইঙ্গিত বহন করে।

অনুচ্ছেদের ৫ নং যত সর্বনাশের মূল এবং দুর্বিত্তায়িত  রাজনীতিকে উৎসাহিত করে। এর আওতায় দুনিয়ার হেন কোন কাজ নেই যা তারা করতে পারবে না। কাজের বিনিময়ে খাদ্য থেকে আরম্ভ করে নিজেরাই নিজেদের কর্ম পরিধি, আর্থিক ও অন্য সব ক্ষমতার নিয়ম করে নেয়। দেশে হাউজ অব কমন্সের পার্লামেন্টারি পদ্ধতি অনুসরন করে নাকি আমাদের গণতন্ত্র  চলছে। কৈ হাউজ অব কমন্সে কি সংসদ সদস্যদের এ ধরনের ক্ষমতা দেয়া আছে? নাই। আবার সংবিধানের কিছু বিধানাবলী সংশোধনের অযোগ্য হইবে – এই ধরনের কিছু বিধান সংযোজন করার ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকে কিভাবে? এটা দলীয় স্বেচ্ছাচারিতার নিকৃষ্টতম উদাহরন।

অর্থবহ নির্বাচন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমার প্রস্তাবসমূহ নিম্মরূপ: (১) বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা হ্রাস করে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা; (২) প্রধানমন্ত্রী দলীয় প্রধান না থাকার ব্যবস্থা করা; (৩) বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বমুক্ত করে পূর্ন স্বাধীনতা প্রদান করা এবং বিচার মন্ত্রনালয় স্থাপন করা; (৪) সংবিধানের নির্দেশ থাকা সত্বেও  বিচারপতি নিয়োগের জন্য নীতিমালা  প্রনয়নে শাসকগোষ্ঠি  ৪৭ বছরেওকোন উদ্যোগ গ্রহন করেনি  । অতি সত্বর বিচারপতি ও অভিজ্ঞ আইনজীবিদের নিয়ে একটি প্যানেলের মাধ্যমে নীতিমালা প্রনয়ন করতে হবে; (৫) সংখ্যানুপানতক পাওয়া ভোটের ভিত্তিতে সংসদীয় আসন বন্টন করা; (৬) সংবিধানের ৭০ ধারায় পরিবর্তন করা: সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ও বাজেট পাশের ক্ষেত্রে দলীয় সংসদ সদস্যদের দলের পক্ষে ভোট দান বাধ্যতামূলক  করা; (৭) সংবিধানের ৭৮(৫)বাতিল করে শুধু আইন প্রনয়ন ও বাজেট প্রনয়নের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা সীমিত করা; (৮) সর্বোচ্চ দুই টার্মের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেনা। যাঁরা ইতোমধ্যে ২ টার্ম সম্পন্ন করেছেন, তাঁরা আর প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না; (৯) দলীয় অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনের বিধান বাতিল করা। (১০) সংবিধানের নির্দেশ থাকা সত্বেও নির্বাচন কমিশন গঠনের  জন্য নীতিমালা  প্রনয়নে শাসকগোষ্ঠি  ৪৭ বছরেও কোন উদ্যোগ গ্রহন করেনি। সত্বর একটি প্যানেলের মাধ্যমে নীতিমালা প্রনয়ন করে, সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠন করা।

এ সব সংশোধন ক্ষমতাভোগি কোন রাজনৈতিক দল, জোট বা গোষ্ঠি করবেনা। তাই একটি দল নিরপেক্ষ সরকার ২ বছরের জন্য নিয়োগ করতে হবে। একটি বিশেষজ্ঞ সাংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করে ৬ মাসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করে (গনভোটেরও ব্যবস্থা করা যায়) রাষ্ট্রপতি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে কার্যকর হবে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত অর্ডিন্যান্স পাশ করার পরই নির্বাচিত গনতান্ত্রিক সরকার কাজ শুরু করবে।

E-mail:ahmaddrsultan@gmail.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!