বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিএনপি নেতার সাথে ভারতীয় নীতি নির্ধারকদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন সাবেক র কর্মকর্তা

image.png

চন্দন নন্দী, সাউথ এশিয়ান মনিটর, জুলাই ৩০, ২০১৮ 

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর প্রায় এক মাস বিএনপির এক সিনিয়র নেতা অনেকটা গোপনে সাবেক এক র কর্মকর্তার সাথে দেখা করেন, যিনি আগে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিএনপি সূত্রমতে, নয়াদিল্লীর নীতি নির্ধারকদের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এই কর্মকর্তা এর আগে বাংলাদেশে ভারতীয় হাই কমিশনে কূটনৈতিক পরিচয়ে কাজ করেছেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলের নেতাদের সাথেই তার উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংয়ের সাবেক এই বিশেষ সেক্রেটারিকে জানুয়ারিতে আসামের বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর সাথে আলোচনার জন্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা আমলাতন্ত্রের শীর্ষ ব্যাবস্থাপকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলেন ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর অজিত দোভাল। বিএনপি নেতার উদ্দেশ্য ছিল, তার আস্থাশীল সূত্রের মাধ্যমে অজিত দোভালের সাথে যোগাযোগ করা। তারা আরও জানান যে, ঢাকা-ভিত্তিক বিএনপির শীর্ষ নেতারা যখন নিশ্চিত হয়েছেন যে, বিএনপির সাথে বৈঠকের ব্যাপারে ভারতীয় নীতি নির্ধারকদের আপত্তি নেই, তখনই কেবল জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

বিএনপির শীর্ষ সূত্রগুলো অবশ্য এটা স্পষ্ট করেছে যে, গত প্রায় দুই বছর ধরে দলের নেতারা ভারতীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং নীতি নির্ধারকদের অনেকের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছেন। যদিও বৈঠকের সিদ্ধান্ত দ্রুত নেয়া হয় খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পরে।

বিএনপি সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, দোভাল দলের নেতাদের সাথে বৈঠকের ব্যাপারে খানিকটা আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। সে সময় র’এর একজন সাবেক প্রধান যিনি বর্তমানে ইন্ডিয়ান এনএসএ’র সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন, তিনি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আঁচ করতে পেরেছিলেন। শুরুতে কিছুটা গরিমসি করলেও সাবেক এই র প্রধান বিএনপি প্রতিনিধি দলের সাথে স্বল্প সময়ের জন্য বৈঠক করেন। বিএনপির প্রতিনিধি দল সে সময় ভারতীয় বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং নীতি নির্ধারকদের সাথে বেশ ধারাবাহিক কতগুলো বৈঠক করেন। বিজেপি’র নীতি নির্ধারক পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও কংগ্রেস প্রধান রাহুল গান্ধীর সাথে বৈঠক করেন তারা।

বিএনপির এই প্রতিনিধি দলের সফরের ব্যাপারে খোদ খালেদা জিয়ার ছেলে ও দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক রহমান অনুমোদন দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। প্রতিনিধি দলের উদ্দেশ্য ছিল তাদের মধ্যস্থতাকারীদের এই বার্তা দেয়া যে বিএনপি তাদের ভারত-বিরোধী অবস্থান থেকে সরে এসেছে এবং দিল্লীর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে তারা প্রস্তুত, যদি তারা ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে জয়লাভ করে।

ভারতের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সাউথ এশিয়ান মনিটরকে এটা নিশ্চিত করেছেন যে, আমেরিকান কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দিল্লীর কর্মকর্তার সাথে কাজ করে যাবে যাতে বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা যায়। দোভালের সঙ্গে বৈঠকে প্রতিনিধি দলের অন্তত একজনকে এনএসএ বলেছেন যে, বাংলাদেশে নির্বাচনের আগ দিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে কোন ধরনের সঙ্ঘাতমূলক রাজনীতি চায় না ভারত।

ভারতের নীতি নির্ধারকরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সাবেক কূটনীতিক ফারুক সোবহানের কথা ভেবেছিল। যাতে তিনি দুই দলের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেন। কিন্তু সোবহান বিনয়ের সাথে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

যদিও বিএনপি ও ভারতীয়দের মধ্যে এবং আওয়ামী লীগ ও নয়াদিল্লীর মধ্যে টানাপড়েনটা  চলছেই, কিন্তু বাংলাদেশে এরই মধ্যে একটা ভারত-বিরোধী মনোভাব মাথাচাড়া দিয়েছে। এই বৈঠক এবং আগামী আগস্টে আরও যে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোর কথা বাদ দিলে বাংলাদেশের নির্বাচনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার ব্যাপারে ভারতের তেমন কোন পদক্ষেপ নজরে পড়ছে না।

বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে বৈঠক করার বাইরে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা কামাল হোসেনসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটা যুক্ত ফ্রন্ট করার কথাও চিন্তা ভাবনা করছেন ভারতের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশী সূত্রগুলো এটা নিশ্চিত করেছে যে হোসেন কয়েক দফা ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশন এবং দিল্লী দুই জায়গাতেই বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা যেখানে বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কে তাদের ‘সম্ভাব্য পরিকল্পনা’র কথা প্রকাশ করতেই উদ্বিগ্ন থাকেন, ঢাকার রাজনীতিবিদরা সেখানে বিশ্বাস করেন যে, নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিভিন্ন শাখার মধ্যে ব্যাপক দ্বন্দ্ব এবং মতপার্থক্য রয়েছে। সেটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, র, ভারতীয় হাই কমিশন এবং রাজনৈতিক নেতা – যাদের কথাই বলুন না কেন। ঢাকার কিছু রাজনীতিবিদ আসলেই বিশ্বাস করেন যে, কিভাবে নির্বাচন হওয়া উচিত তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মত রয়েছে এদের মধ্যে।

ভারতের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একটা প্রধান ভাবনার বিষয় হলো চীন এবং বেইজিংয়ের কাছ থেকে সহায়তা নেয়ার প্রশ্নে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ কেমন আচরণ করবে। বাংলাদেশী পর্যবেক্ষকরা মনে করেন যে, বিএনপি চীনাদের কাছে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে। আওয়ামী লীগও গত মাসে শেখ হাসিনা সরকারের এক সিনিয়র মন্ত্রীকে বেইজিংয়ে পাঠিয়েছিলেন। সাধারণ ধারণা হলো বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়েই এ ক্ষেত্রে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে যে চীন বাংলাদেশের নির্বাচনে সেভাবে ভূমিকা রাখবে না, ভারত যেভাবে প্রথাগতভাবে রেখে থাকে। তবে দুই দলের যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, অর্থনৈতিক সহায়তার ক্ষেত্রে তারা উভয়ের চীনের কাছ থেকে বড় ধরনের সহায়তা নেয়ার কথা ভাববে।

ভারতীয় নীতি নির্ধারকদের সাথে বিএনপির যে টিম সাক্ষাত করেছিলো জুনের শুরুর দিকে, তারা সে সময় বাংলাদেশের বিদ্যমান ‘ভারত-বিদ্বেষী’ মানসিকতার বিষয়টি তুলে ধরেছিল। রাজনীতিবিদদের মধ্যে, বিশেষ করে বিএনপির রাজনীতিবিদ ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন যে, ভারত এক ব্যক্তি এক নীতির ভিত্তিতে চলছে এবং তাদের সব স্বার্থই তারা একটি মাত্র পক্ষের সাথে জুড়েছে। বিএনপির ভেতরে ছোট হলেও জোরালো একটি গ্রুপ রয়েছে যাদের সাথে ভারতের কোন বিরোধ নেই। বাংলাদেশের এক শীর্ষ বুদ্ধিজীবী – যিনি আওয়ামী লীগের সাথে তার আদর্শিক সম্পর্কের ইতি টেনেছেন – তিনি এমনকি এটাও বলেছেন যে, “শুধু হাসিনা সরকারকে সমর্থন দিয়ে গেলে সেটা ভারতের স্বার্থের জন্য ইতিবাচক হবে না, কারণ হাসিনার জনপ্রিয়তা ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে”।

তবে বিএনপির কিছু নেতা সাউথ এশিয়ান মনিটরকে জানিয়েছেন যে জুনের শুরুর দিকে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির তিন সদস্যের প্রতিনিধি দলে যখন দিল্লীতে যান, তখন ভারতীয় নীতি নির্ধারকদের মধ্যে তারা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখতে পেয়েছেন। একইসাথে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন দলের মধ্যেও তারা পরিবর্তন দেখতে পেয়েছেন বলে জানান তারা। খালেদা জিয়া বর্তমানে ঢাকা কারাগারে রয়েছেন। এ কারণে শুধুমাত্র চৌধুরীকে গোপন সফরে দ্বিতীয়বারের মতো দিল্লী পাঠিয়েছিল বিএনপি। খালেদা জিয়ার ব্রিটিশ আইনি উপদেষ্টা লর্ড অ্যালেক্সান্ডার কার্লাইলকে ভারতে প্রবেশে যে সময় বাধা দেয়া হয়, তারই কাছাকাছি সময়ে চৌধুরীকে দিল্লী পাঠানো হয়েছিল।

বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশান্সের চেয়ারম্যান এ এস এম শামসুল আরেফীনের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যেখানে এখন একটা শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে, নয়াদিল্লীর উচিত হবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে জনমত সৃষ্টি হয়েছে, সেদিকেও খেয়াল রাখা। আরেফিন বলেন, “বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে ভারত বাংলাদেশে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জঙ্গিদের উপস্থিতি নিয়ে ভারতের যে উদ্বেগ ছিল, সেটা নিরসনে ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা”।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, এরপরও একটা ধারণা রয়েছে যে, যেসব র কর্মকর্তা বাংলাদেশে কাজ করেন, তাদের দীর্ঘমেয়াদি কোন পরিকল্পনা নেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বেশ কয়েক জন নেতা সাউথ এশিয়ান মনিটরকে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশের মধ্যে আগে যে ঘনিষ্ঠতা এবং সুসম্পর্ক ছিল, সেটা এখন একেবারেই নেই। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ আমলের সরকারের সাবেক মন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন কেন ভারতীয় হাই কমিশনের কর্মকর্তারা তার সাথে কথা বলা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, যদিও নয়াদিল্লী দাবি করে আসছে যে আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে (২০০৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত), কিন্তু কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আমলে র বেশ গোপনে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আজমের সাথে দেখা করেছিলো, তার সাথে শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছিল এবং এরপর হেলিকপ্টারে তাকে আজমির শরীফে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আজম ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হন। ৯০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পর দণ্ডকালীন অবস্থায় ২০১৪ সালের অক্টোবরে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে তথাকথিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে ওই কারাদণ্ড দেয়।

souce:: http://bn.southasianmonitor.com/2018/07/30/36131

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!